বন্দি মুজাহিদ ও দ্বীনি ভাইদের তিলাওয়াত নিয়ে মিথ্যাচারের জবাব
-মুনশি আব্দুর রহমান
-মুনশি আব্দুর রহমান
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি লেখায় বন্দি মুজাহিদ ও দ্বীনি ভাইদের কুরআন তিলাওয়াত এবং ইলমি যোগ্যতা নিয়ে চরম অবজ্ঞা করা হয়েছে। [১] আংশিক সত্যের সাথে ডাহা মিথ্যার মিশ্রণ ঘটিয়ে নিজের মনগড়া একটি গল্প সাজানো হয়েছে। যিনি এই দাবিগুলো করেছেন, তার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক খণ্ডন নিচে তুলে ধরা হলো:
এক.
উক্ত ভাই দাবি করেছেন যে, কাশিমপুর কারাগারে এত এত বন্দির মাঝেও নাকি তিনি ছাড়া শুদ্ধ তিলাওয়াত করার মতো আর কেউ ছিল না! অথচ সদ্য কারামুক্ত ভাইদের বাস্তব অভিজ্ঞতা এই গল্পের অসারতা প্রমাণ করে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ছোট কারাগারে (যেমন নারায়ণগঞ্জ জেল) মাত্র ১৯ জন বন্দির মাঝেও যেখানে অধিকাংশের তিলাওয়াত বিশুদ্ধ পাওয়া যায়, সেখানে কাশিমপুরের মতো জায়গায় হাজার হাজার বন্দির মাঝে নাকি মাত্র ১-২ জনের তিলাওয়াত শুদ্ধ—এর চেয়ে হাস্যকর ও ডাহা মিথ্যা আর কী হতে পারে?
দুই.
এটিও সবাই জানেন যে, স্বৈরাচারী হাসিনার আমলে কীভাবে সাধারণ দ্বীনি ভাইদের বিভিন্ন ভুয়া সংগঠনের নাম দিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হতো। অনেক জেনারেল শিক্ষিত তরুণ, যারা সদ্য জাহেলিয়াত থেকে দ্বীনের পথে ফিরে আসতেন, তাদের মাঝে নতুন অবস্থায় অনেক আবেগ কাজ করত। তারা আবেগের বশে ফেসবুকে কিছু লিখলে, স্বৈরাচারের পুলিশ সেগুলোকে টার্গেট করে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে কারাগারে পাঠাত।
তিন.
কারাগারে যাদের তিলাওয়াতে কিছুটা জড়তা বা সমস্যা থাকে, তারা মূলত ওইসব জেনারেল শিক্ষিত ভাই, যারা সদ্য দ্বীনের পথে এসেছেন। সদ্য দ্বীনের বুঝ পাওয়া একজন মানুষ রাতারাতি সব শিখে ফেলবেন না, বরং ধীরে ধীরে শিখবেন—এটাই স্বাভাবিক। তাদের এই শেখার পর্যায়টিকে তাচ্ছিল্য করে ‘এরা আবার খেলাফত কায়েম করবে’ বলে ট্রল করা চরম অহংকার ও অজ্ঞতার পরিচয়।
চার.
যিনি দাবি করেছেন যে দ্বীনি কর্মীদের তিলাওয়াত শুদ্ধ নয়, তিনি সম্ভবত গ্লোবাল মুজাহিদদের সিলেবাস সম্পর্কেই জানেন না। যেকোনো মুজাহিদের জিহাদি-জীবনের একদম শুরুতেই যে বিষয়টির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়, তা হলো ‘তাজবিদ’। মুজাহিদরা তাঁদের সময়ের বড় একটি অংশ কেবল তিলাওয়াত শুদ্ধ করার পেছনেই ব্যয় করা হয়। সেখানে কারাগারে বন্দি অসংখ্য মুজাহিদ ও দীনী ভাইদের তিলাওয়াত অশুদ্ধ বলে দাবি করাটা দিনের আলোতে চোখ বন্ধ করে অন্ধকার দাবি করার মতোই অবান্তর।
পাঁচ.
সমালোচক ভাই তার লেখায় উল্লেখ করেছেন যে, তিনি চলে আসার পর কেউ নামাজ পড়াতে চাচ্ছিলেন না বা যোগ্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছিলেন। ইসলামি শিষ্টাচার ও তাকওয়ার একটি বড় দিক হলো ‘বিনয়’ বা নিজেকে ছোট মনে করা।
- ইলম ও শুদ্ধ তিলাওয়াতের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিনয়ের কারণে অনেকেই নিজে থেকে সামনে গিয়ে ইমামতি করতে চান না।
- তারা নিজেদের চেয়ে অন্য ভাইকে অগ্রাধিকার দেন এবং নিজেকে মুক্তাদির কাতারে একজন সাধারণ মুসল্লি হিসেবে রাখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সমালোচক এই বিনয় এবং ‘ইসার’ (অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া)-কে অযোগ্যতা বলে ভুল করেছেন।
ছয়.
এটা কে অস্বীকার করবে যে, যারা দ্বীনের পথে থাকেন, তারা কুরআন শিক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত আন্তরিক হন? কারাগারে বা যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশেও তাদের দায়িত্বশীলরা অত্যন্ত ইহতিমামের (গুরুত্ব) সাথে তিলাওয়াত সহিহ করা এবং দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান অর্জনের বিষয়টি খেয়াল রাখেন। এর জন্য নিয়মিত হালকা বা দারসের ব্যবস্থা থাকে। সুতরাং, দ্বীনি কর্মীদের মাঝে কুরআনের হকের প্রতি অবহেলা রয়েছে—এমন দাবি সম্পূর্ণ বানোয়াট।
সমালোচক ভাইয়ের প্রতি কিছু প্রশ্ন:
আলোচনার উপসংহার টানার আগে, যিনি বড় গলায় এই অভিযোগগুলো তুলেছেন, তার বিবেকের কাছে কয়েকটি যৌক্তিক প্রশ্ন রেখে যেতে চাই:
- প্রথমত: একটি কারাগারে যেখানে অসংখ্য আলেম, মুজাহিদ ভাই ও দীনী ভাই রয়েছেন, সেখানে কেবল নিজের তিলাওয়াতকেই একমাত্র ‘বিশুদ্ধ’ দাবি করাটা কি আত্মম্ভরিতা (Narcissism) নাকি পরিসংখ্যানগত মূর্খতা?
- দ্বিতীয়ত: কোনো সাধারণ শিক্ষিত ভাই যদি সদ্য দ্বীনের পথে এসে আবেগের বশে জুলুমের শিকার হন, তবে তার প্রাথমিক জড়তাকে পুঁজি করে তাকে জনসম্মুখে তাচ্ছিল্য করা কি দ্বীনি জ্ঞান রাখা কোনো মানুষের কাজ? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কি ভুলকারীকে ট্রল করতে শিখিয়েছেন, নাকি দরদ দিয়ে শুধরে দিতে বলেছেন?
- তৃতীয়ত: ইমামতির মতো গুরুদায়িত্ব থেকে নিজেকে আড়াল করে বিনয়াবনত হওয়া এবং অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া (ইসার) ইসলামের অন্যতম বড় শিক্ষা। আপনি কি অপরের এই তাকওয়াকে নিজের ‘অহংকারের চশমা’ দিয়ে দেখে ‘অযোগ্যতা’ বলে ভুল করেননি তো?
- চতুর্থত: ব্যক্তিজীবনে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালনের আগেই ইসলামি সমাজ বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা যাবে না—এমন অদ্ভুত শর্ত আপনি কোথায় পেলেন? কেউ কি অসুস্থ থাকলে সুস্থতার জন্য চেষ্টা করবে না? একটি চূড়ান্ত আদর্শের স্বপ্ন দেখা এবং সেই পথে নিজেকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করার মাঝে সাংঘর্ষিক কী আছে?
নিজের ব্যক্তিগত ক্ষোভ মেটাতে এবং নিজেকে বড় করে দেখানোর জন্য ‘খেলাফত’ বা ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ কায়েমের মতো মহান চিন্তাকে তাচ্ছিল্য করা কোনো সুস্থ মানসিকতার পরিচায়ক নয়। যারা নিজেদের সর্বস্ব ত্যাগ করে জুলুমের শিকার হয়েছেন, তাদের শেখার একটি পর্যায়কে পুঁজি করে পুরো জামাতকে প্রশ্নবিদ্ধ করা স্রেফ মিথ্যাচার ও বিদ্বেষেরই বহিঃপ্রকাশ।
*****
সংশ্লিষ্ট লিংক-
[১] নিচের লিংক থেকে কেউ চাইলে লেখাটি পড়তে পারেন- https://archive.ph/RPLVk
Comment