ইনসাফ-সমতার চাপে চ্যাপ্টা হওয়ার উপক্রম একাধিক বিবাহের হিকমতপূর্ণ বিধান
অবস্থা এমন যেন- ইনসাফ-সমতাও সম্ভব নয়, (তাই) একাধিক বিবাহও জায়েয নয়।
ইসলামের শত্রুরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে একাধিক বিবাহের পবিত্র বিধানের উপর। তালে তালে বুঝে না বুঝে বহু আলেম উলামাও বিধানটি নিয়ে নেতিবাচক কথা বলে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছেন। এ বিষয়ে আমি সহজ সরল কয়েকটি কথা বলি।
= যে ইনসাফের ভয় দেখিয়ে একাধিক বিবাহে নিরুৎসাহিত করা হয়, সে ইনসাফ এক স্ত্রীর বেলায়ও ফরয। আয়াতের উদ্দেশ্য এমন নয় যে, একাধিক বিবাহ করতে গেলে ইনসাফ সমতার প্রসঙ্গ, এক স্ত্রীর বেলায় তা নাই। উলামায়ে কেরাম বলেন, স্ত্রীর সাথে ইনসাফ করা আবশ্যক -এটিই আয়াতের মূল কথা; স্ত্রী একজন হোক আর চারজন হোক।
অধিকাংশ সংসারেই স্ত্রীর সাথে ইনসাফ করা হয় না, এমনকি শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন কোন বিষয়ে কিভাবে কি করলে ইনসাফ হবে অন্যথায় হবে না: অধিকাংশ স্বামী হয়তো সঠিকভাবে জানেও না। আমরা কি ফতোয়া দিবো- এক বিবাহ হারাম? এত সমস্যার পরও যদি এক বিবাহ হালাল হয়, তাহলে একাধিক বিবাহেও একই কথা।
= মেয়েদের সংখ্যা ছেলেদের চেয়ে স্বভাবতই বেশি। একাধিক বিবাহ বন্ধ হলে বাকি মেয়েগুলো যিনার পথে যাওয়া ছাড়া উপায় কি?
= স্বাভাবিক দুনিয়ায় একজন পুরুষ বর্তমানে বহু মেয়ের সাথে সম্পর্ক রাখে। সরাসরি বিছানায় হয়তো সবার সাথে যায় না, অন্য অনেক কিছুই অনেকের সাথে করে কোনো বিধি নিষেধ ছাড়াই। অনেক কাজ তো সামাজিকভাবেও খারাপ মনে করা হয় না। যেমন একসাথে চাকরি করা, একসাথে পড়াশুনা করা, কথাবার্তা বলা, দেখা সাক্ষাত হওয়া। অথচ এগুলোর দ্বারাও একরকমের যৌন চাহিদা পূরণ হয়। কাজগুলো বিবাহের মাধ্যমে করলে অন্তত হারামভাবে করা থেকে বেঁচে গেল।
যেসব স্যাকুলার একাধিক বিবাহের বিরুদ্ধে নেমেছে তারা তো আর এমন বৈরাগি হয়ে পড়েনি যে, এক পুরুষ শুধু এক মেয়েতে আর এক মেয়ে শুধু এক পুরুষে নিজেকে সঁপে দিয়েছে, অন্য কেউ তাকে দেখতেও পাচ্ছে না। যদি তারা একাধিক বিবাহের এতোই বিরোধী, তো এতো পুরুষের সামনে বা পুরুষ এত নারীর সামনে নিজেকে উপস্থাপন এবং সম্পর্ক কেন? সব কিছুই জায়েয, শুধু বিয়েটা করলেই নাজায়েয!! শয়তানি ছাড়া আর কি!! দুঃখজনক হলো, বহু উলামায়ে কেরাম তাদের তালে নাচছেন।
= স্ত্রীদের ভরণপোষণ স্বামীকে সর্বাবস্থায় দিতে হবে, কিন্তু স্ত্রীদের সাথে থাকার বিষয়টি এমন নয়। স্বামী চাইলে উভয় স্ত্রী থেকে কিছুদিন করে আলাদাও থাকতে পারবে। একজনের কাছে থাকলে আরেকজনের কাছেও সমহারে থাকতে হবে। একজনের কাছে দুইদিন থাকলে আরেকজনের কাছেও দুইদিন। এভাবে বণ্টন করে নিতে হবে। এক দিন এক দিন, দুই দিন দুই দিন, তিন দিন তিন দিন, চার দিন চার দিন, পাঁচ দিন পাঁচ দিন, ছয় দিন ছয় দিন, সাত দিন সাত দিন। সাত দিনের বেশি -বিশেষ প্রয়োজন না হলে- ভাগ না করা। লম্বা সময় অপেক্ষা করা -যখন একজন স্ত্রী স্বামীর সোহাগ পাচ্ছে - অপর স্ত্রীর জন্য কষ্টকর হতে পারে। তবে আলাদা থাকার বিষয়টি ঠিক এমন না।
উভয়কে সময় দেয়ার পর স্বামী কিছুদিন আলাদা থাকতে পারে। আলাদা থাকা মানে স্ত্রীদের কাছে যাওয়া আসা করতে পারবে না তা না। আলাদা থাকা মানে কারও সাথে সহবাস করবে না এবং কারও সাথে রাত্রিযাপন করবে না। এছাড়া যাওয়া আসা, তদারকি, খোঁজখবর নেয়া - এগুলোতে কোনো সমস্যা নাই। যারা সমতার কথা বলে ভয় দেখান, তারা এমন একটা ভাব দেখান যেন স্বামী বেচারার বিশ্রামের কোনো সুযোগ নাই। একাধিক বিবাহ করেছো তো এই ঘরে আর ঐ ঘরের ঘানি টানতে টানতে তোমাকে মরতে হবে বিষয়টি এমন না।
= থানবি রহ. এর তরমুজ কেটে পাল্লা দিয়ে ওজন করে উভয় ঘরে দেয়ার কাহিনিটি সমতার ভয়াবহতার পক্ষে সবচেয়ে বড় দলীল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ কোনো ব্যক্তির দুর্বলতা বা চরম সতর্কতা কখনও অন্যদের জন্য দলীল নয়। কেউ যদি চরম পর্যায়ের সতর্কতা অবলম্বন করেন সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়, কোনো ব্যক্তির আমলকে কেন আপনি উম্মতের উপর চাপিয়ে দিচ্ছেন? যারা এই ঘটনা পেশ করেন, তাদের কাছে প্রশ্ন: তরমুজ কেটে পাল্লা দিয়ে ওজন করে দুই ঘরে সমান করে দিতে হবে এটা কি শরীয়তের আবশ্যকীয় কোনো মাসআলা?
শরীয়তের মাসআলা হলো, সব স্ত্রীকে থাকার ঘর দিতে হবে, সবার খাবার দাবার পোশাকআশাক দিতে হবে। প্রত্যেককে তার প্রয়োজন এবং সে কেমন ঘরের মেয়ে ঐ অনুপাতে দিতে হবে। সবাইকে সমান দেয়া আবশ্যক না। যার যার অবস্থা অনুপাতে দিবে। সবাইকে প্রয়োজনমতো দেওয়ার পর কাউকে যদি অতিরিক্ত দিতে চায় সেটাও দিতে পারবে, সমস্যা নাই।
অতএব, সবার ভরণপোষণ আদায় করার পর যদি একজনকে তরমুজ কিনে দেয়, অন্যদেরকে কিছু না দেয় তাতেও কিছু আসে যায় না। বিশেষত যদি একেক স্ত্রী একেক স্থানে থাকে, সবাই এক বাড়িতে না থাকে, তাহলে তো একজনকে কি দিল সেটা আরেকজন দেখছেই না, ঝামেলারও সম্ভাবনা নাই। তবে একজনকে না দিয়ে তার সামনে আরেকজনকে দিলে মনে কষ্ট আসতে পারে। এক্ষেত্রে স্বামী বেচারা যদি দিতেই চায় একটু হেকমত অবলম্বন করবে। এমনভাবে দিবে যাতে আরেকজন টের না পায় বা কষ্ট না পায়। যারা দুজন স্ত্রীর মাঝেই এতটুকু হেকমত রক্ষা করতে পারবে না, তারা উম্মতের বারো কিসিমের মানুষকে একসাথে নেতৃত্ব দিয়ে সন্তুষ্ট করবে কি করে? এসব বিষয় প্রমাণ করে, আমরা কেন উম্মতকে নেতৃত্ব দিতে পারছি না। আমরা নিজেদেরকে যোগ্য করে গড়ে তোলার পরিবর্তে বরং যোগ্যতার পথই বন্ধ করে দিতে চাই। অনেকটা মাথার ব্যথায় মাথা কেটে ফেলার মতো।
= মুহাব্বাত ভালোবাসা সবার জন্য সমান হবে না। আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে নিজেই এটি বলেছেন। কাউকে বেশি ভালো লাগতে পারে। কাউকে দেখলে বেশি উত্তেজনা হতে পারে, কাউকে বেশি কাছে পেতে মন চাইতে পারে, তার সাথে সহবাসের আগ্রহ বেশি হতে পারে। ফলত তার সাথে সহবাস বেশিও হতে পারে। এটা দোষের কিছু না। তবে অন্যজনের সাথে সহবাস এত কম করা যাবে না যে, অন্যজন পর পুরুষের দিকে হাত বাড়াতে বাধ্য হয়।
মোটকথা, সমতা ইনসাফকে যেভাবে ভয়াবহ করে দেখানো হচ্ছে বিষয়টা এত ভয়ানক না। যদি এমনটাই হতো তাহলে কি নবীগণ এতগুলো করে বিবাহ করতেন? সাহাবায়ে কেরামের ঘরে ঘরে বাদি থাকার পর আবার প্রায়জনের কয়েকজন করে বিবিও থাকতো?
ঝগড়া-ঝাটি আর বেইনসাফির কথা যদি বলি, তাহলে সেটা একাধিক বিবাহের বিষয় নয়, এক বিয়ের সংসারেই বরং বেশি হচ্ছে। অধিকাংশ পরিবারে তো একাধিক বিবাহ নাই, তাহলে ঝামেলা হচ্ছে কেন? একারণে যদি প্রথম বিবাহ হারাম না হয় তাহলে পরের বিবাহগুলোকে এতো বেশি ভয়াবহ করে দেখানোর কোনো অর্থ নাই।
যারা সমতার বিষয়টাকে বড় করে দেখান, তারা আসলে একাধিক বিবাহ শরীয়ত কেন দিলো- এ বিষয়টি নিয়ে ফিকির করেননি, ফলে সমস্যাটাই শুধু চোখে পড়ছে প্রয়োজন ও উপকারিতাগুলো চোখে পড়ছে না।
আরও বড় কথা হচ্ছে, তারা ইসলামের শত্রুদের প্রচারণার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।
Comment