ভূমিকা:
মূল উত্তরে যাওয়ার আগে শরীয়তের একটি বিধান আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই যে, পাপাচারী বা অবিশ্বাসীদের পরিবেশিত কোনো সংবাদ যাচাই-বাছাই ব্যতিরেকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটি কেবল একটি সাধারণ নিয়ম নয়, বরং শরিয়তের এক শাশ্বত ও সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় ইরশাদ করেছেন:
"يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ"
অর্থাৎ, "হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও, যেন অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদের অনুতপ্ত হতে না হয়।"
অথচ কুরআনের এই অকাট্য নীতির সরাসরি বিরোধিতা করে কতিপয় হিংসুক ব্যক্তি শায়খ উসামা বিন লাদেনের বিরুদ্ধে ‘পর্নোগ্রাফি দেখা’ কিংবা ‘বিলাসবহুল জীবনযাপন’-এর মতো যেসব স্থূল অভিযোগ তুলছেন, তা মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অফিশিয়াল ডিসপ্যাচেরই অন্ধ অনুকরণ। এ প্রসঙ্গে জনৈক দাঈ যথার্থই বলেছেন—এই শ্রেণির মানুষেরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশনার প্রতি চরম শৈথিল্য প্রদর্শন করলেও আমেরিকান সরকার ও গণমাধ্যমের যেকোনো দাবিকে ‘পরম চরণামৃত’ বা চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নির্দ্বিধায় লুফে নেয়!
এখন তর্কের খাতিরে যদি আমেরিকার ভাষ্য অনুযায়ী ধরেও নেওয়া হয় যে, শায়খ উসামা বিন লাদেনের বাসভবন থেকে উদ্ধারকৃত হার্ডড্রাইভে সত্যিই পর্নোগ্রাফি পাওয়া গিয়েছিল, তবে তার যৌক্তিক জবাবটি কী হতে পারে? মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের উদ্ধার করা প্রায় ৬,০০০ পৃষ্ঠার অভ্যন্তরীণ চিঠিপত্র ও নথিপত্র নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছেন গবেষক নেলি লাহুদ। তাঁর রচিত ‘The Bin Laden Papers’ গ্রন্থটি এই দাবির সম্পূর্ণ অসারতা প্রমাণ করার পাশাপাশি এর পেছনের প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করেছে। এই গবেষণার আলোকে উদ্ভাসিত প্রকৃত সত্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. শাইখের কম্পাউন্ড উদ্ধারকৃত বিপুল পরিমাণ নথিপত্র ও চিঠিপত্রের কোথাও পর্নোগ্রাফি বা এ জাতীয় কোনো কিছুর সামান্যতম উল্লেখও পাওয়া যায়নি। এমনকি এ ধরনের কোনো সামগ্রীর জন্য কখনো কারো কাছে কোনো অনুরোধ পর্যন্ত করা হয়নি।
২. শায়খ উসামা বিন লাদেনের পরিবার অ্যাবোটাবাদে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার চাদরে আবদ্ধ থাকতেন এবং সেখানে তাঁদের কোনো ইন্টারনেট সংযোগ ছিল না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁদের চিঠিপত্রের ইলেকট্রনিক ফাইলগুলোতে প্রায়ই ভাইরাসের উপস্থিতি লক্ষ করা যেত, যা সাধারণত ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়া ছড়ানোর কথা নয়। এর মূল কারণ হলো, তাঁরা কখনো নতুন কোনো কম্পিউটার কিনতেন না। বরং খুব সাধারণ মানের ‘রিফার্বিশড’ বা ব্যবহৃত পুরোনো কম্পিউটার কিনে তাঁরা নিজেদের কাজ চালাতেন, যেগুলো আগে থেকেই ভাইরাসে আক্রান্ত থাকত।
৩. গবেষক লেখিকা নেলি লাহুদ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, হার্ডড্রাইভে যেসব পর্নোগ্রাফি বা আপত্তিকর ছবি পাওয়ার কথা জোর গলায় প্রচার করা হয়, সেগুলো মূলত ওই ব্যবহৃত কম্পিউটারগুলোর পূর্ববর্তী মালিকদের মুছে ফেলা বা ডিলিট করা ফাইল ছিল। প্রযুক্তিগত দিক থেকে যেকোনো বিশেষজ্ঞই পুরোনো হার্ডড্রাইভ থেকে তার পূর্বতন মালিকের মুছে ফেলা ফাইলগুলো অনায়াসে উদ্ধার করতে সক্ষম। আর আলোচ্য ক্ষেত্রে ঠিক এই ঘটনাটিই ঘটেছিল।
৪. নেলি লাহুদের গবেষণায় আরও দেখা যায়, আল-কায়েদার নেতারা নিজেদের মধ্যে হস্তমৈথুনের মতো বিষয়ের ধর্মীয় বৈধতা নিয়েও দীর্ঘ তাত্ত্বিক আলোচনা করতেন। ব্যক্তিগত জীবনে যাঁরা ধর্মীয় অনুশাসনের ব্যাপারে এতটা সূক্ষ্ম কড়াকড়ি আরোপ করতেন, তাঁদের ক্ষেত্রে পর্নোগ্রাফি ব্যবহারের এমন দাবি কেবল অবাস্তবই নয়; বরং চরম হাস্যকরও বটে।
আপত্তিকারীদের প্রতি কিছু প্রশ্ন
মার্কিন বয়ানকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করে যাঁরা এই সস্তা প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছেন, তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও মগজের সুস্থতা নিয়ে কয়েকটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া একান্ত আবশ্যক:
প্রথম প্রশ্ন: সিআইএ-র ট্র্যাকিং থেকে বাঁচতে যে মানুষটি কখনো কোনো ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করতেন না এবং নিছক নিরাপত্তার স্বার্থেই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যবহৃত পিসি চালাতে বাধ্য হতেন; সেই ব্যবহৃত পিসিতে পূর্ববর্তী মালিকের ডিলিট করা ডেটা রিকভার করে বর্তমান মালিকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়াটা কি আপনাদের স্রেফ প্রযুক্তিগত মূর্খতা, নাকি এটি পুরোপুরি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার?
দ্বিতীয় প্রশ্ন: আপনারা প্রতিনিয়ত নিজেদের ধার্মিক, লিবারেল কিংবা অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট হিসেবে দাবি করে থাকেন। অথচ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে সস্তা ও হাস্যকর সামরিক বয়ানটিকে কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই একেবারে ঐশী বাণীর মতো নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করে নিচ্ছেন। আপনাদের চিন্তার এই চরম দাসত্বের অন্তর্নিহিত কারণ কী?
তৃতীয় প্রশ্ন: আপনারা যখন আমেরিকার এই দাবিকে পবিত্র-বাক্য হিসেবে শিরোধার্য করছেন, তাহলে ঠিক একই যুক্তিতে রাষ্ট্রযন্ত্রের ফাঁসির দড়িতে ঝোলা আপনাদের নিজস্ব রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে আনীত হত্যা বা ধর্ষণের রাষ্ট্রীয় অভিযোগগুলোও কি আপনারা একইভাবে সত্য বলে মেনে নেবেন? কেবল অন্ধ বিরোধিতার মোহে কি আপনারা নিজেদের ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞানটুকুও বিসর্জন দিয়েছেন?
যেকোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের সমালোচনা তাঁর মতাদর্শ বা কর্মপদ্ধতির ভিত্তিতে হতেই পারে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের ছুড়ে দেওয়া সস্তা, প্রযুক্তিগতভাবে ভুল ও সম্পূর্ণ অসত্য বয়ান দিয়ে কারো চরিত্রহনন করার অপচেষ্টা কেবল সমালোচকের মানসিক দৈন্যকেই নগ্নভাবে প্রকাশ করে। নেলি লাহুদের মতো অমুসলিম গবেষকরা যেখানে বছরের পর বছর নথিপত্র ঘেঁটে এই সত্য বের করে আনছেন যে, ব্যবহৃত পিসির মুছে ফেলা ডেটাই হলো এই পর্ন-প্রোপাগান্ডার মূল উৎস; সেখানে কিছু মানুষের এই অন্ধ বিদ্বেষ অকাট্যভাবে প্রমাণ করে—তাঁরা প্রকৃত সত্য অনুধাবনের চেয়ে সস্তা প্রোপাগান্ডা গিলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। মিথ্যাচারের বেসাতি দিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে সস্তা হাততালি কুড়ানো যায়, কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ আদালতে তা কখনোই ধোপে টেকে না।
Comment