i রাজাকারতত্ত্বের এপিঠ ওপিঠ i
বাংলাদেশে আর কোনো শব্দ এত দীর্ঘ সময় ধরে এত শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি, যতটা হয়েছে ‘রাজাকার’ শব্দটি।
"রাজাকার" শুধু একটি গালি কিংবা কেবল একটি বাহিনীর নাম ছিল না; বরং এই শব্দটি হয়ে উঠেছিলো ইসলামপন্থী রাজনীতিকে চিরস্থায়ী আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রাখার এক কার্যকর হাতিয়ার।
কিন্তু এই শব্দের রাজনৈতিক অপব্যবহারের সমালোচনা করতে গিয়ে ইতিহাসের অস্বস্তিকর সত্য থেকে পালানোরও সুযোগ নেই। কারণ অর্ধসত্যের বিরুদ্ধে আরেকটি অর্ধসত্য দাঁড় করালে ইতিহাসের মুক্তি ঘটে না; শুধু মিথ্যার মালিকানা বদলায়।
....
১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল—এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বিষয়। তৎকালীন পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার একটা যৌক্তিক রাজনৈতিক অবস্থান থেকেই দলটি এই ভূমিকা গ্রহণ করে। তারা পাকিস্তান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত বিভিন্ন সহযোগী ও আধাসামরিক বাহিনীতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে; এ কাজের জন্য তারা আল-বদর, আল-শামস, শান্তিবাহিনী সহ বিভিন্ন সংগঠন তৈরি করে।
এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখতে হবে। কোনো রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া এক বিষয়, আর নিজ জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্বিচার হত্যা, নির্যাতন, গুম-খুন ও ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পরও তার সহযোগী হয়ে থাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
....
৭১-এর প্রেক্ষাপটে প্রথম দিকে অনেকেই বিশ্বাস করত যে পাকিস্তান ভেঙে গেলে মুসলমানদের ব্যপক ক্ষতি হবে এবং তাদের চির শত্রু ভারত লাভবান হবে; তাই কেবল অখণ্ডতার পক্ষে এই রাজনৈতিক অবস্থান এবং এর জন্য নিজ দেশের সরকারের পক্ষাবলম্বনের কারণে কাউকে অপরাধী বলা যায় না। রাজনৈতিক ভুল আর মানবতাবিরোধী অপরাধ এক জিনিস নয়।
কিন্তু ২৫ মার্চের পাকিস্তান আর্মির নির্মমতার পর পরিস্থিতি আর নিছক রাজনৈতিক অবস্থানের জায়গায় ছিল না।
তাছাড়া সাধারণ রাজনৈতিক দূরদর্শিতা থেকেও এটা উপলব্ধি করতে পারা উচিৎ ছিলো যে, পশ্চিম পাকিস্তানিদের রেইসিসস্ট চিন্তাধারা ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা একটা অবধারিত বিষয়। বোঝা প্রয়োজন ছিলো ভবিষ্যতে এই ভূখণ্ডের মানুষদের মধ্যেই তাদের কাজ করতে হবে। সেই বিবেচনাতেও এমন কোনো অবস্থান গ্রহণ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক ছিলো যা দীর্ঘ মেয়াদে ইসলামপন্থাকে কলুষিত করে।
একটা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল হিসেবে সার্বিক পরিস্থিতির যথাযথ মূল্যায়ন করতে না পারা ছিলো তৎকালীন জামায়াত নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় নৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা।
একটি ইসলামী আন্দোলনের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অন্য সাধারণ রাজনৈতিক দলের চেয়ে বেশি। কারণ তারা শুধু রাজনৈতিক প্রজ্ঞার দাবি করে না; তারা আল্লাহর বিধান, ইনসাফ এবং জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথাও বলে। ফলে একটি সেক্যুলার রাজনৈতিক দল ভুল রাষ্ট্রনৈতিক হিসাব করলে সেটি কেবল রাজনৈতিক ব্যর্থতা হতে পারে; কিন্তু একটি ইসলামী সংগঠন জালিম শক্তির পাশে দাঁড়ালে তার ক্ষতি শুধু দলের হয় না, কারণ এর ওপর ভিত্তি করে মানুষ ইসলামের নৈতিক দাবিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করে।
১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান তাই বাংলাদেশের ইসলামপন্থার জন্য ভয়াবহ দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করেছে। গোটা ইসলামী রাজনীতিকে শিক্ষিত জনসমাজের কাছে আসামীর কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে দিয়েছে।
সুস্পষ্ট জুলুম নির্যাতনে জড়িয়ে পড়ার পরও পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষাবলম্বন ইসলামবিদ্বেষীদের হাতে এমন একটি অস্ত্র তুলে দিয়েছিল, যা তারা পরবর্তী অর্ধশতাব্দী ধরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে।
এর দায় দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী অস্বীকার করতে পারে না।
আর তারা এটাও বোধ হয় উপলব্ধি করছেন না যে, এই সত্য স্বীকার করে নেওয়ার মানে ইসলামপন্থার বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান গ্রহণ নয়; বরং এ দেশের ইসলামপন্থার নৈতিক পুনর্গঠনের জন্যই এই সুস্পষ্ট স্বীকারোক্তি অত্যন্ত প্রয়োজন।
তাই, পরিষ্কারভাবে বলা উচিৎ যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জুলুম অপরাধ ছিল। গুম-খুন, ধর্ষণ, নির্যাতন ও জনপদ ধ্বংসের কোনো ইসলামী ব্যাখ্যা হতে পারে না। যারা এসব অপরাধে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছে, বা যারা সহযোগিতা করেছে তাদের অপরাধকে ‘রাজনৈতিক পরিস্থিতি’ বলে হালকা করারও কোনো সুযোগ নেই।
...
স্বাভাবিক কারণেই আওয়ামী লীগ ১৯৭১-এর এই ঐতিহাসিক ক্ষতকে শুধু বিচার ও স্মৃতির বিষয় হিসেবে রাখেনি। ধীরে ধীরে তারা এটিকে তাদের রাজনৈতিক জুলুমের পক্ষে বৈধতা উৎপাদনের একটি ন্যারেটিভে পরিণত করেছে।
‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি’—এই দুই বাক্সে গোটা বাংলাদেশকে ঢুকিয়ে দিয়েছে তারা। প্রথম বাক্সের মালিকানা আওয়ামী লীগ নিজের নামে লিখে নিল। দ্বিতীয় বাক্সে সময় ও প্রয়োজন অনুযায়ী ঢুকিয়ে দিয়েছে জামায়াত, ইসলামপন্থী, সরকারবিরোধী, আলেম, মাদরাসার ছাত্র, ডানপন্থী, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নিছক ভিন্নমতাবলম্বীকেও।
এর মধ্য দিয়ে ‘রাজাকার’ একটি ঐতিহাসিক পরিচয় থেকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়।
অর্থাৎ আপনি ১৯৭১ সালে কী করেছিলেন, সেটি আর প্রধান প্রশ্ন থাকল না। আপনি আজ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কি না—সেটিই হয়ে উঠল আপনার ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ’ নির্ধারণের অঘোষিত মানদণ্ড।
এই ন্যারেটিভ ছিল ভয়ংকর কার্যকর। কারণ কাউকে ‘রাজাকার’ বা ‘রাজাকারের দোসর’ বলার পর তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় জুলুম বৈধতা পেয়ে যায়। তার মানবাধিকার নিয়ে কেউ কথা বললে সেও সন্দেহভাজন। তার বিচারপ্রক্রিয়ার ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন তুললে সে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’। তার গুম, গ্রেপ্তার বা নির্যাতনের প্রতিবাদ করলে প্রশ্ন আসত—‘আপনি কি রাজাকারের পক্ষ নিচ্ছেন?’
এভাবেই একটি শব্দ মানুষের নাগরিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার লাইসেন্সে পরিণত হয়েছিল।
দুঃখজনক হলেও অনস্বীকার্য বাস্তবতা হলো, ১৯৭১- সালে জামায়াতে ইসলামীর এই ভুল অবস্থানই এই ভূখণ্ডে ইসলামপন্থার বিরুদ্ধে আওয়ামী ন্যারেটিভের বৈধতা উৎপাদন করে গেছে। এর মাশুল দিতে হয়েছে এবং হচ্ছে দলমত নির্বিশেষে সকল ঘরানার ইসলামপন্থীদেরকে। এই দায় তারা কোনোভাবে এড়াতে পারেন না।
...
বাস্তবতা হলো, দুইটার কোনোটিই সমর্থনযোগ্য নয়।
- পাকিস্তানি বাহিনীর জুলুমের বিরোধিতা করতে হলে আওয়ামী লীগের জুলুমকে বৈধ বলতে হবে—এই যুক্তি অসৎ।
- আবার আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী আচরণের বিরোধিতা করতে হলে ৭১ এ পাকিস্তানি বাহিনীর অপরাধ অস্বীকার করতে হবে—এটিও সমান অসৎ।
....
২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা আন্দোলনের সময় 'রাজাকারেরে নাতিপুতিরা চাকরি পাবে' মর্মে শেখ হাসিনার মন্তব্যের পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নিজেদের ‘রাজাকার’ হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়েছে মনে করে ক্ষুব্ধ হয়।
১৫ জুলাইয়ের প্রথম প্রহরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ধ্বনিত হয়—‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার।’ পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়—‘কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।’
এই স্লোগান ছিলো দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জুলুমের সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যানের সুস্পষ্ট ঘোষণা। এটা ছিলো অন্যায় লেবেলিংয়ের বিরুদ্ধে এক ব্যঙ্গাত্মক বিদ্রোহ।
তবে সেদিন ছাত্ররা এই শ্লোগানের মধ্য দিয়ে ৭১-এর রাজাকার বাহিনীকে মহিমান্বিত করতে রাস্তায় নামেনি। তারা মূলত একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিল—তোমার সঙ্গে দ্বিমত করলেই যে তুমি আমাকে রাজাকার ট্যাগ দাও আমরা সেটা প্রত্যাখ্যান করলাম।
এই প্রত্যাখ্যান দীর্ঘদিনের আওয়ামী ন্যারেটিভের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। কারণ, একটি রাজনৈতিক অস্ত্র ততক্ষণই কার্যকর থাকে, যতক্ষণ মানুষ সেটিকে ভয় পায়।
জুলাইয়ে একটি প্রজন্ম সেই ভয় প্রত্যাখ্যান করেছিল। যে শব্দ উচ্চারণ করলেই আগে মানুষ আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যস্ত হয়ে পড়ত, সেই শব্দকেই ছাত্ররা ব্যঙ্গ করে শাসকের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিল।
শাসক বলল—রাজাকার।
ছাত্ররা যেন বলল—ঠিক আছে, তোমার অভিধানে যদি ন্যায়বিচার চাওয়া রাজাকার হওয়া হয়, তাহলে তোমার সেই অভিধানই আমরা মানি না।
এই জায়গাতেই ‘রাজাকার’ ন্যারেটিভ ভেঙে পড়ে।
...
এখন বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের সামনে সম্ভবত গত পঞ্চাশ বছরের সবচেয়ে বড় সুযোগ এবং সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
‘রাজাকার’ ট্যাগের রাজনৈতিক ক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। এখন তাদের নিজেদের ভাষায় ন্যাযতার সাথে নিজেদের ইতিহাস নিয়ে কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে যাদের কারণে রাজাকার ট্যাগ তৈরি হয়েছে তাদের প্রতি আমার কিছু পরামর্শ রয়েছে। এই পরামর্শের কিছু হলো জামায়াতসহ যেসব রাজনৈতিক দল একাত্তরে পাকিস্তান রিজিমকে সমর্থন করেছে তাদের প্রতি; আর কিছু সাধারণভাবে সকল ইসলামপন্থীদের প্রতি।
১. ইসলামি শরিয়ার মূলনীতি ও সততার আলোকে ৭১ নিয়ে ইসলামপন্থীদের স্বতন্ত্র ও সৎ অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। জামায়াতকে অস্পষ্টতা ও দ্বৈততা বন্ধ করতে হবে। নিজেকে শিশু মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য ইত্যাদি ধরনের সরলীকৃত আত্মপক্ষসমর্থনের নাটক নতুন প্রজন্মকে সন্তুষ্ট করবে না। ভারতপন্থী ও পাকিস্তানপন্থী দুই প্রান্তিক ন্যারেটিভকেই বর্জন করতে হবে।
২. রাজনৈতিক অবস্থান এবং অপরাধের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করতে হবে। স্বাধীনতার বিরোধিতা একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক অবস্থান; পক্ষান্তরে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন বা এসব অপরাধের প্রতি সমর্থন বা সহায়তা ফৌজদারি ও নৈতিক অপরাধ। এই দুই বিষয়কে এক করে সবাইকে অপরাধী বানানো যেমন অন্যায়, তেমনি রাজনৈতিক অবস্থানের আড়ালে প্রকৃত অপরাধীকে রক্ষা করাও অন্যায়।
৩. জামায়াতের উচিত নিজেদের ইতিহাস সামনে রেখে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা করা। কোথায় রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ভুল ছিলো, কোথায় নৈতিক সিদ্ধান্ত ভুল ছিল, কোন নেতা কী ভুমিকা রেখেছিলেন? কোথায় অপপ্রচার এবং কোথায় প্রমাণিত ঘটনা? তাদেরকেই এসব প্রশ্ন তুলতে হবে। কারণ আপনি নিজের ইতিহাস নিজে লিখতে অস্বীকার করলে আপনার শত্রুই আপনার ইতিহাস লিখবে।
৪. আওয়ামী লীগ নিজেদের ইতিহাসকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তুলে যে ভুল করেছে ইসলামপন্থীরা যেন একই ভুল না করে। ‘আমাদের সমালোচনা মানেই ইসলামবিরোধিতা’—এই ন্যারেটিভ ‘আওয়ামী লীগের সমালোচনা মানে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা’রই ইসলামী সংস্করণ হবে।
৫. ৭১ গনহত্যাকারী পাকিস্তান আর্মির প্রতি অন্ধভক্তি থেকে জামায়াতকে বেরিয়ে আসতে হবে। পাকিস্তান রিজিমের সমালোচনাকে ভারতের দালালির লেন্সে দেখার যে একাত্তরি টেন্ডেন্সি সেখান থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ মাঝেমধ্যে রাজনৈতিকভাবে পলিশড বক্তব্য দিলেও তৃণমূলের মধ্যে এই অন্ধভক্তি ও অন্যায় পক্ষপাত অত্যন্ত দৃষ্টিকটুভাবে পরিলক্ষিত হয়, এর দ্বারা তাদের দলের আভ্যন্তরীণ অবস্থা স্পষ্ট হয়ে পড়ে।
৬. ইসলামপন্থীদেরকে মুসলিম মেজরিটি বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। বাংলাদেশকে ‘ভুল করে সৃষ্টি হওয়া রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখার কোনো প্রকাশ্য বা গোপন মানসিকতা থাকলে সেটি পরিত্যাগ করতে হবে। এই দেশ এখন প্রায় আঠারো কোটি মানুষের মাতৃভূমি, যার মধ্যে ৯০% এর বেশিই মুসলমান এবং যেটা পৃথিবীর অন্যতম বড় মুসলিম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত দেশ। এর স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও মানুষের নিরাপত্তা রক্ষা ইসলামী রাজনীতিরও দায়িত্ব।
.....
ইতিহাসের কারাগার থেকে বের হওয়ার এখনি সময়
‘রাজাকার’ শব্দের একটি সত্যিকারের ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসে রক্ত আছে, বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আছে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সহযোগী কাঠামো আছে। এই ইতিহাস অস্বীকার করা যাবে না।
আবার ‘রাজাকার’ শব্দের আরেকটি রাজনৈতিক ইতিহাসও আছে। সেই ইতিহাসে ট্যাগিং আছে, নাগরিককে দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ বানানো আছে, ভিন্নমতকে রাষ্ট্রের শত্রু ঘোষণা করা আছে এবং একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাকে নৈতিকভাবে পবিত্র করার চেষ্টা আছে।
এই ইতিহাসও অস্বীকার করা যাবে না।
আমাদের দুর্ভাগ্য, এতদিন বাংলাদেশকে বলা হয়েছে—এই দুই সত্যের যেকোনো একটি বেছে নাও। পাকিস্তানের জুলুমের কথা বললে আওয়ামী লীগের ন্যারেটিভে দাঁড়াও। আওয়ামী লীগের জুলুমের কথা বললে ১৯৭১ অস্বীকার করো।
কিন্তু একটি পরিণত জাতিকে এই মিথ্যা দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আমরা বলতে পারি—১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী জুলুম করেছে।
আমরা একই সঙ্গে বলতে পারি—আওয়ামী লীগ ১৯৭১-এর স্মৃতিকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক জুলুমের বৈধতা তৈরি করেছে।
আমরা বলতে পারি—৭১ এ ইসলামপন্থীদের অবস্থান ঐতিহাসিক ভুল ছিল।
আবার একই সঙ্গে বলতে পারি—সেই ভুলের দায় উত্তরাধিকারসূত্রে প্রতিটি দাড়িওয়ালা মানুষ, প্রতিটি মাদরাসার ছাত্র কিংবা প্রতিটি ইসলামপন্থী তরুণের ঘাড়ে চাপানো অন্যায়।
জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত শুধু একটি সরকারের পতন নয়। জুলাই আমাদের রাজনৈতিক অভিধানের কিছু শব্দকে নতুন করে পরীক্ষা করার সাহস দিয়েছে।
এখন ইসলামপন্থীদের দায়িত্ব সেই সুযোগকে আত্মপক্ষসমর্থনের উৎসবে নষ্ট না করা।
ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা না করে ইতিহাসের সামনে দাঁড়ানো। ভুলকে ভুল বলা। জুলুমকে জুলুম বলা। নিজের লোকের অন্যায়েও একই ভাষায় কথা বলা।
সম্ভবত ‘রাজাকার’ নামের রাজনৈতিক অস্ত্রকে চিরতরে নিষ্ক্রিয় করার সবচেয়ে কার্যকর পথ এটাই।
~~~ফেসবুক থেকে সংগৃহীত~~~