আল ফজর মিডিয়া পরিবেশিত
গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে উলামায়ে দেওবন্দ
।। সংকলনঃ মাওলানা ইব্রাহিম হুসাইন – ।।
–।।থেকে- সপ্তম পর্ব
গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে উলামায়ে দেওবন্দ
।। সংকলনঃ মাওলানা ইব্রাহিম হুসাইন – ।।
–।।থেকে- সপ্তম পর্ব
হযরত মাওলানা যাহিদ ইকবাল
“আসল কথা হল গণতান্ত্রিক পন্থা তথা নির্বাচন পদ্ধতি খেলাফত কায়েমের বাস্তবসম্মত পথ নয়।
তার কিছু কারণ নিম্মে তুলে ধরা হল:
১.গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র হল জনগণের জন্য সরকার, জনগণের মাধ্যমেই সরকার, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। যা ইসলামি ধ্যান ধারণার সাংঘর্ষিক। গণতন্ত্রে ইসলামি দলগুলো মানুষের কাছে ইসলাম বাস্তবায়নের জন্য ভোট চাওয়ার দাবীটা এমন হয়ে যায় যে, জনগণকে আইন কানুনের ব্যাপারে ইখতিয়ার দেওয়া হয়। সে চাইলে জনগণের শাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। চাইলে ইসলামের ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারে। অথচ জনগণকে এমন কথার অধিকার দেওয়া এবং কোন একটিকে বেছে নেওয়া ইসলামি রীতিনীতির সুস্পষ্ট বিরোধী।
২. পার্লামেন্টে জয়ী এবং অধিক রাজনৈতিক সদস্যদের উপর ভিত্তি করে আইন পাশ করা হয়। অতএব, যতদিন পর্যন্ত নামধারী ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্য সংখ্যা বেশি না হবে ততদিন তারা কোন আইন পাশ করাতে পারবে না। তাই যতদিন পর্যন্ত নামধারী ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্য সংখ্যা কম থাকবে ততদিন ইসলাম বিরোধী আইন পাশ করাকে মেনে নিতে হবে। আর তাদের এমন অধিকার মেনে নেওয়া সরাসরি ইসলাম বিরোধী।
৩. গণতন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতার সোনার হরিণ পাওয়ার আগ পর্যন্ত বাতিল সংবিধানের নিয়ম কানুন মানার হলফ করা আবশ্যক। কেননা শপথ করা ব্যতীত কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাওয়াতো দূরের কথা নির্বাচনই করতে পারবে না। আর গণতান্ত্রিক সংবিধানের হলফ করা শরিয়ত বিরোধী।
৪.নির্বাচনে বেশি ভোট পেয়ে যদি কোনভাবে ক্ষমতায় আসতেও পারে তাহলেও শুধুমাত্র ৫বছর হুকুমতের অধিকার পাবে।অবশ্য জনগণ চাইলে এর আগেও বিদায় করতে পারে। ক্ষমতাশীল দলের জন্য এ শর্ত মানা আবশ্যক। কেননা এগুলো হল গণতন্ত্রের মূলভিত্তি। সুতরাং যদি ধরেও নেওয়া হয় কোন ইসলামি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে তবু তা ৫ বছরের বেশি স্থায়ী হবে না।
নির্ধারিত সময়ের পর পুনরায় ক্ষমতায় আসার লড়াই করতে হবে। জনগণকে আবার এই অধিকার দিতে হবে তারা কি শরিয়া মোতাবেক চলতে চায় নাকি কুফরী অনুযায়ী চলতে চায়। এমনটাও হতে পারে এর ফলে নাস্তিক সেক্যুলারদের ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ হয়ে যাবে। যা ইজমায়ে উম্মাতের বিরোধী। কেননা ইসলামে খলিফা যতদিন পর্যন্ত যোগ্য থাকবে ততদিনই শরিয়াহ অনুযায়ী ক্ষমতা পরিচালনা করবেন।
৫. প্রত্যেক ব্যবস্থাপনার একটা মূল চিন্তাধারা থাকে। সেই ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত পৌছাতে হলে সেই পদ্ধতিকেই গ্রহণ করতে হবে যা তার সাথে নির্দিষ্ট।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হল সেক্যুলারিজম। তার সাথে নির্দিষ্ট পদ্ধতি হল ভোটের নির্বাচন।
পক্ষান্তরে খেলাফতের মূল ভিত্তিই হল ইসলাম। খেলাফত ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিও হল ইসলাম। সুতরাং বুদ্ধিমানের কাজ হল এটা বিবেচনা করা যে, নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পর্যন্ত পৌছাতে পারবে না খেলাফত পর্যন্ত। ইসলামের সাথে যেমন গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এছাড়াও অন্যান্য মতবাদ চলতে পারে না এমনিভাবে এগুলোর সাথেও ইসলামী খেলাফত চলতে পারে না। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, আরো যত তন্ত্রমন্ত্র আছে এসমস্ত পদ্ধতি দিয়েও ইসলাম কায়েম হবে না। ইসলামী খেলাফত কেবল ইসলামিক বিধি বিধান ও ইসলামিক পন্থায়ই হবে। তাই শরিয়ত সম্মত পন্থা বাদ দিয়ে এসমস্ত বাতিল কুফরী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যর্থ চেষ্টা করা শরিয়ত সমর্থন করে না। এটা ফিতরাত, আকলেরও পরিপন্থী।
৬. গণতন্ত্র পুঁজিবাদের একটি শাখা বলা যায়। এজন্য গণতন্ত্র ব্যবস্থার সাথে জড়িত হওয়ার দ্বারা শুধু গণতন্ত্রই করা হয় না বরং সমাজতন্ত্রকে শক্তিশালী ও মজবুত করা হয়। ইসলাম গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ কোনটাই সমর্থন করে না।
৭. গণতান্ত্রিক রাজনীতি এমনই এক ভয়ানক বিষয় একবার জড়িত হয়ে পড়লে বের হয়ে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কেননা যারা ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের মাঝে জড়িত হয়ে ইসলামি খেলাফত কায়েমের দিবাস্বপ্ন দেখে গণতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন চালিয়ে যায়। তারা তাদের গণতান্ত্রিক পন্থায় চালানো এই চেষ্টা প্রচেষ্টাকে প্রকৃতপক্ষে দ্বীন কায়েমের ফরজ আদায় করা মনে করে। এজন্যই তারা গণতান্ত্রিক পন্থা বাদ দিয়ে অন্য কোন পদ্ধতি গ্রহণ করাকে আবশ্যক মনে করে না। গণতান্ত্রিক পন্থা ব্যতীত অন্যকোন পদ্ধতিতে ইসলামি খেলাফত কায়েমকে অসম্ভব মনে করে।
৮.ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ থেকে স্বাধীনতার পর বিভিন্ন মুসলিম দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় দল ইসলাম কায়েমের জন্য গণতান্ত্রিক পথ গ্রহণ করেছে। (যা কিছু প্রসঙ্গ পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে) তারা এর মাধ্যমে খুব প্রচেষ্টার চালিয়ে আসছে, আজও একই পথে চলছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই দলগুলো সম্পূর্ণভাবে কোন ভূখণ্ডে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। কারণ গণতন্ত্র এমন একটা ব্যবস্থা যেখানে ধর্মীয় দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারে না, অর্থাৎ ইসলামী ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো কর্তৃত্ব-শীল হতে পারে না। কেননা প্রকৃত গণতান্ত্রিক কাঠামো এমনইভাবে সাজানো যে এটির মাধ্যমে শুধু নেতৃবৃন্দ, সরদার, বড় ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, শিল্প কারখানার মালিক, দুর্নীতিবাজ মানুষই নির্বাচিত হবে। যারা সুদ ঘুষ, লুণ্ঠন, জালিয়াতি, চুরি, ডাকাতি, কালোবাজারির মাধ্যমে অবৈধ টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছে।
৯. যদি সব বাধার পাহাড় অতিক্রম করে ধর্মীয় দলগুলো নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে, তবু তারা দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথেই যুক্ত থাকবে হবে। গণতান্ত্রিক আইন কানুন দিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। কারণ তারা ক্ষমতায় এসেছেই গণতান্ত্রিক পন্থায়। এই ক্ষেত্রে কতটুকু আর ধর্মীয় ইসলামিক জীবন ব্যবস্থাকে বাস্তবায়িত করতে পারবে? এছাড়াও সংবিধানের বেড়িতো গলায় ঝুলানো আছেই। যা নিয়ে কদম এদিকে সেদিকে করার কোন সুযোগ নাই। তবুও যদি কেউ গণতান্ত্রিক মতাদর্শকে বাদ দিয়ে ইসলামী ব্যবস্থা প্রয়োগ করতে চায়, তবে বিরোধী দল এবং গণতান্ত্রিক মোড়ল দাদারা তাকে কখনোই এই অনুমতি দিবে না। সুতরাং ধর্মীয় শক্তিগুলো ক্ষমতায় আসার আর কোন যৌক্তিকতাই বাকি থাকলো না। কেননা তাদের চেষ্টাটাও গণতন্ত্রের মৌলিক নীতির বিরোধী”।
সূত্র- “আসরে হাজের মে গলাবায়ে দ্বীন কা নববী তরিকা কার” “গণতান্ত্রিক পন্থা খেলাফত কায়েমের বাস্তবসম্মত পথ কি না?” শিরোনামের আলোচনা।
মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ রহমানী
“এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আমাদের দেশ ও অধিকাংশ দেশে গণতন্ত্রের যেই চিন্তাধারা রয়েছে তা মৌলিকভাবে ইসলামের বিপরীত। প্রচলিত গণতন্ত্র ও ইসলামি চিন্তাধারার মাঝে দুইটি মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান।
১. গনতন্ত্রের মাঝে জনগনকে আইন প্রণয়নকারী মানা হয়। জনগণের জন্য সকল প্রকার আইন তৈরির অধিকার থাকে। যেন হালাল-হারামের চাবি ও ভাল-মন্দের ফয়সালা তাদের হাতে হয় যাদেরকে জনগণ নির্বাচন করেছে। এটি পুরোপুরি ইসলামী চিন্তাধারার বিপরীত। ইসলামী চিন্তাধারায় আইনের মূল উৎস হল কিতাবুল্লাহ (কোরআন) এবং সুন্নাতে রাসূল (হাদিস)। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ আইনের ব্যাখ্যাদাতা আইন প্রণেতা নয়। এবং এর ব্যাখ্যা দেওয়ার অধিকার কেবল ঐসমস্ত লোকের রয়েছে যাদের কোরআন ও হাদীসের উপর যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। হাঁ তবে মাজলিসে শূরার জন্য বাস্তবায়ন পদ্ধতির ক্ষেত্রে আইন তৈরি ও পরামর্শের অধিকার রয়েছে। এটি খুব সূক্ষ্ম চিন্তাধারার মতানৈক্য”।
সূত্র- কিতাবুল ফাতওয়া
মাওলানা নাজিব আঁকবার আবাদী
“গণতন্ত্রের নীতি মানব ক্ষমতাকে এমন স্বাধীন পন্থায় ছেড়ে দেয় ও এই পরিমাণ চরিত্রহীন বানাতে চায় যে, মানুষ আপন রবের পরিচয় ও আল্লাহ তা’আলার ইবাদাতের খেয়াল বেশিদিন পর্যন্ত হৃদয়ে বাকি রাখতে পারবে না। নিরেট গণতান্ত্রিক নীতি নাস্তিক্যবাদ ও ধর্ম হীনতার সবচেয়ে ভয়াবহ আন্দোলন। যেমনিভাবে মরুভূমিতে ফসল হওয়া, স্থলভাগে মাছ জীবিত থাকা এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন ও দুষিত বায়ূর মাঝে মানুষ সুস্থ থাকা অসম্ভব তদ্রূপ নিরেট গণতান্ত্রিক নীতি দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্রের অধীনে ধর্মীয় চিন্তা-চেতনা, বাধ্যবাধকতা ও ইবাদতের ক্রমবিকাশ ঘটাও অসম্ভব। এবং কোন ওহীর ধর্ম বেশি দিন স্থায়ী থাকবে না। গণতন্ত্র ইসলামী শিক্ষার পরিপূর্ণ বিপরীত ও বনি আদমের জন্য একটি ভয়াবহ বিপদ জনক নীতি”।
সূত্র- তারিখে ইসলাম