আল ফজর মিডিয়া পরিবেশিত
গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে উলামায়ে দেওবন্দ
।। সংকলনঃ মাওলানা ইব্রাহিম হুসাইন – ।।
–।।থেকে- অষ্টম পর্ব
গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে উলামায়ে দেওবন্দ
।। সংকলনঃ মাওলানা ইব্রাহিম হুসাইন – ।।
–।।থেকে- অষ্টম পর্ব
মাওলানা হাফেজ আহমাদ
“পুঁজিবাদী গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকারকে আমরা সম্পূর্ণ অস্বীকার করি, শিরক, পথভ্রষ্ঠতা, গোমরাহি, আল্লাহর সাথে বিদ্রোহ অতি নিকৃষ্ট অত্যাচার ও সীমালঙ্ঘনের সমষ্টি মনে করি। আমরা এই নীতিকে তেমনি সম্পূর্ণ কুফরি বলি যেমন ইহুদীবাদ, খ্রিস্টবাদ, হিন্দুত্ব-বাদ, বৌদ্ধমতবাদ ও শিখ মতবাদকে সম্পূর্ণ কুফরি মতবাদ বলি।
অতঃপর তিনি ‘‘ইসলামী গণতন্ত্র’’ বলতে কিছু আছে কি না? এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন:
এর সোজা উত্তর তো এটিই যে, আমি প্রশ্ন করি ‘‘ইসলামী কুফর’’ বলতেও কি কিছু আছে? এটি স্বতঃসিদ্ধ কথা যে, কোন বিবেকবান মানুষ এর প্রবক্তা হবে না। বাস্তবতা হল চিন্তা করার বিষয় এই যে আমাদের কোন পরিভাষার সাথে ‘‘ইসলামী’’ শব্দটা লাগানোর প্রয়োজন কেন পড়ে? কেননা তা মূলত ইসলামী নয়। অধিকাংশ পরিভাষা যেগুলোর সাথে ইসলামী এই শব্দটা যুক্ত হয় তা সন্দেহ যুক্ত হয়। যেমন: ‘‘ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা’’, ‘‘ইসলামী টিভি চ্যানেল’’, ‘‘ইসলামী গণতন্ত্র’’ ইত্যাদি। অতঃপর তুমি এটাও একটু ভেবে দেখ কেউ তোমাকে কি কখনো এটা বলেছে যে, ‘‘ইসলামী নামায’’, ‘‘ইসলামী হজ্ব’’, ‘‘ইসলামী জিহাদ’’? এখানে ইসলামী শব্দ ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। কেননা এ সব পরিভাষা ইসলামের মাঝে বিধানগতভাবেই বিদ্যমান আছে। কখনো কারো এই সংশয় হয় না যে, হজ্ব বলা হবে আর এর দ্বারা কোন ব্যক্তি গঙ্গায় স্নান করা বুঝবে অথবা বৈশাখী মেলার দিকে তাদের খেয়াল যাবে!। তাই যেখানেই এমন পরিভাষা পাওয়া যাবে সেখানে আবশ্যক হল বিলম্ব করা হবে এবং খুব চিন্তা ভাবনা করার পর তা ইসলামী হওয়ার ফয়সালা করা হবে।
ইসলামী গণতন্ত্ররও এমন একটি পরিভাষা যার মাঝে চিন্তা ভাবনা করা প্রয়োজন। অনেক বুদ্ধিজীবিদের বক্তব্য হল পশ্চিমা গণতন্ত্র ও এবং ইসলামী গণতন্ত্র দু’টি ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ।
কারো কারো বক্তব্য হল (নাউযুবিল্লাহ) ইসলাম ও গণতন্ত্র একই মুদ্রার দু পিঠ।
এটি প্রতারণাপূর্ণ কথা। ইসলাম আমাদের খেলাফতের আকিদা শিখিয়েছে। আর খেলাফত ও গনতন্ত্রের মূলনীতি ও শাখাগত মাসআলার মাঝে আকাশ-পাতাল ব্যবধান বিদ্যমান। এর পরও শুধু শুধু ইসলামের খিলাফত নীতিকে গণতন্ত্র রূপে বিশ্বাস করানো বা গণতন্ত্রকে হুবহু ইসলামী নীতি সাব্যস্ত করার নাটক সাজানোর কি কারণ রয়েছে। গণতন্ত্রের আবিষ্কার ও সৃষ্টি পশ্চিমা বিশ্ব। ঐতিহাসিক ভাবে সাব্যস্ত যে, এটি ঈসা আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্বে পাঁচ ছয়শত বছর বিদ্যমান ছিল। গ্রীক সভ্যতায় গণতন্ত্রের প্রচলন হয় অতঃপর পশ্চিমা বিশ্বে তার পুনরায় প্রচলন ঘটে।
একটি কথা ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ আছে যে, কোন ধর্মীয় সমাজে কখনো গণতন্ত্রের প্রচলন হয়নি বরং আল্লাদ্রোহী সমাজেইে এর প্রচলন হয়। এই নীতিকে ঐ সমাজই গ্রহণ করেছে যারা আল্লাহ তা’আলা ও আম্বিয়া আলাইহি ওয়াসাল্লামদের অস্বীকারকারী সমাজ হিসেবে প্রচলিত ছিল।
সুতরাং যখন গণতন্ত্রের ব্যাপারে জানা গেল যে ইসলামের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই আর এটা কোন ইসলামী পরিভাষা নয় বরং কুফরী পরিভাষা। তাহলে এর ব্যবহার কিভাবে জায়েজ হবে? উলামাগন লিখেন যে ঐ শব্দ যার মাঝে কোন দিক থেকে কুফরির অর্থ পাওয়া যায় তা যদি মূলত মুবাহ (বৈধ)ও হয় তবুও তার ব্যবহার না জায়েয”।
সূত্র- সার মায়াদারানাহ জমহুরি নেজাম কি শরঈ হাইসিয়াত
মাওলানা মুহাম্মাদ হুযাইফা ওয়াস্তানাবী
“হায় আল্লাহ! এটি কেমন ব্যাপার যে মানব শত্রুরা এতো সব কিছু করার পরও থামেনি রাজনীতিকেও নিজেদের চক্রান্তের জালে আবদ্ধ করেছে। এবং এই কাল্পনিক মূর্তি দাড় করিয়েছে যে, রাজনীতি ও ধর্ম আলাদা আলাদা বস্তু। সুতরাং মানুষের রাজনৈতিক সফলতা কেবল গনতন্ত্রের মাঝেই নিহিত আছে।
আর নাউযুবিল্লাহ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আল্লাহ তা’আলার দেওয়া নীতিমালার কোন প্রয়োজন নেই। আর শরীয়তের স্থানে পার্লামেন্টকে হালাল হারামের ঠিকাদারী দিয়ে দিয়েছে।
সুতরাং হল এটাই যে পার্লামেন্টে উপস্থিত নাস্তিক্য চিন্তাধারার অধিকারি গ্রুপ মদ্যপান, জুয়াখেলা, বস্তুপূজাকে হালাল সাব্যস্ত করেছে। এবং ইসলামের ছোট থেকে ছোট আভিজাত্যকেও নিঃশেষ করে দিয়েছে।
আকীদা হরণের পর গণতন্ত্রের মাধ্যমে রাজনীতিকেও নিজেদের আয়ত্বে নিয়ে নিয়েছে। আর অবশেষে জীবনপরিক্রমা ও জীবিকামাধ্যমকে কমার্শিয়াল পদ্ধতিতে নিজেদের অধীনে নিয়ে যায়”।
মাওলানা আবদুল হক হক্কানী রাহিমাহুল্লাহ
ইসলাম এমন এক জীবন ব্যবস্থা যা স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের কারণে অন্য সকল ব্যবস্থাপনা থেকে অমুখাপেক্ষী।
সুতরাং ইসলামী জীবন ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক জীবন ব্যবস্থা কিংবা অন্যকোন মতবাদের সাথে মিলানো ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতারই দলিল। একথা-তো সকলেরই জানা যে, ইসলামে সকল ক্ষমতার উৎস হলেন আল্লাহ তায়ালা। পক্ষান্তরে গণতন্ত্রে সকল ক্ষমতার উৎস মানা হয় জনগণকে। জনসাধারণের রুচির আধিক্যতার উপর ভিত্তি করে আইন রচনা করা হয়। দেশের কোন প্রচলিত আইনও শুধু সংখ্যাধিক্যতার মতামতের ধরুন পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। আবার তারা চাইলে দ্বীন ধর্মের বিরোধী আইনও পাশ করাতে পারে। সুতরাং এটা এমন ব্যবস্থাপনা যাতে ক্ষমতার কল-কাঠি থাকে জনগণের হাতে। আর মন্ত্রী এমপিরা তাদের প্রতিনিধি করে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় শুধু সংখ্যা গণনা করা হয়। তাদের কোন যোগ্যতা বিবেচনা করা হয় না।
তাই ভোটের ক্ষেত্রে সকলেই সমান। চাই সে গণ্যমান্য ব্যক্তি হোক কিংবা নিম্মমানের হোক। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় এমপি মন্ত্রীদেরকে বাহ্যিকভাবে, জনগণের প্রতিনিধি বানানো মনে হলেও বাস্তবতায় জনগণেরই বেশি অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়।
এ ব্যাপারটা বুঝার জন্য পাকিস্তানের দৃষ্টান্ত সকলের সামনেই আছে। এটা কোন লুকোচুরির কথা নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার ফলে জাতি অধঃপতনের কোন সিঁড়ি অতিক্রম করেনি?
পক্ষান্তরে ইসলামের বিধান হল সৃষ্টি যার বিধান চলবে তাঁর। খলিফা শুধু আহকামে ইলাহিকে বাস্তবায়ন করবে। এছাড়াও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার শাসক নির্বাচন আর ইসলামিক ব্যবস্থাপনায় খলিফা নিয়োগ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কেননা শুরা সদস্যদের এই অধিকার নেই, তারা আল্লাহ তায়ালার বিধানের বিপরীত পরামর্শ দিবে। এমনিভাবে খলিফার ও আল্লাহ তায়ালার ফায়সালাকে উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই।
যদি কোন খলিফা আল্লাহর সীমাকে অতিক্রম করে তাহলে তাঁর আনুগত্য করা যাবে না। অন্যথায় খলিফার বিরোধিতা করা নাজায়েজ, বিদ্রোহ ঘোষণার শামিল। (আল আহকামুস সুলতানিয়্যাহ ৫৪)
সুতরাং সৃষ্টি যার আইন শুধু তারই চলবে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
(1) إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ(سورۃالانعام آیت 75 ،سورۃ یوسف آیت 40/67
অনুবাদ: বিধান দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তায়ালার
إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً ( سورۃ البقرۃ آیت 30)
অনুবাদ:আমি পৃথিবীতে খলিফা বানিয়েছি
أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ ( سورۃ الاعراف آیت 54)
অনুবাদ: সৃষ্টি যার আইন শুধু তারই চলবে।
(1) إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ(سورۃالانعام آیت 75 ،سورۃ یوسف آیت 40/67
অনুবাদ: বিধান দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তায়ালার
إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً ( سورۃ البقرۃ آیت 30)
অনুবাদ:আমি পৃথিবীতে খলিফা বানিয়েছি
أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ ( سورۃ الاعراف آیت 54)
অনুবাদ: সৃষ্টি যার আইন শুধু তারই চলবে।
সুতরাং ভাল করে স্মরণ রাখতে হবে ইসলাম সর্বকালের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ জীবন বিধান। যার সাথে পশ্চিমা বিবেক বুদ্ধিহীন কুফরী গণতন্ত্রের কোন তুলনাই হয় না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অযৌক্তিক ভোট পদ্ধতির মোকাবেলায় ইসলামে সুযৌক্তিক শুরা ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেছেন:
قولہ تعالیٰ : وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ ۖ فَإِذَاعَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللّہ ( سورۃآل عمران آیت 159)
আপনি তাদের সাথে কাজ কর্মের ব্যাপারে পরামর্শ করুন। তারপর আপনি কোন সংকল্প করলে আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা করুন।
তাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নোংরামিকে ছুড়ে ফেলে ইসলামের শুরা ব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরতে হবে”।
সূত্র- ফাতাওয়া হাক্কানিয়াহ- জিলদ-২, ৩৫৪ পৃষ্ঠা
Comment