(সিরিয়ার দীর্ঘস্থায়ী জিহাদেস্থানীয় গোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি মুহাজির যোদ্ধারাও শুরু থেকেই একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছেন। এদের মধ্যে মধ্য এশিয়া, বিশেষ করে উজবেকিস্তান থেকে আগত যোদ্ধাদের একটি বেশ বড় অংশ রয়েছে। তবে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে এই যোদ্ধাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতেও আজ আদর্শিক ও কৌশলগত বিভাজন তৈরি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের সমর্থনপুষ্ট 'সিরিয়ান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার' সম্প্রতি তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সিরিয়ায় অবস্থানরত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সংঘবদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়। সরকারি এই কাঠামোর সাথে কিছু উজবেক যোদ্ধা যুক্ত হলেও, একটি বড় অংশ সেখানে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। অস্বীকৃতির পেছনে তারা পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সরকারের মিত্রতা এবং আদর্শিক বিচ্যুতির সুস্পষ্ট অভিযোগ তুলে ধরেন। ফলশ্রুতিতে তারা 'স্বাধীন উজবেক যোদ্ধা' হিসেবে নিজেদের লড়াই ও স্বকীয় পরিচয় অক্ষুণ্ন রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
বক্ষ্যমাণ নিবন্ধটি মূলত এই 'স্বাধীন উজবেক যোদ্ধাদের' পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে তখন, যখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনস্থ উজবেক যোদ্ধারা সরকারের পক্ষাবলম্বন করে স্বাধীন যোদ্ধাদের তীব্র সমালোচনাপূর্বক একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। বর্তমান লেখাটি তাদের সেই বিবৃতিরই একটি ক্ষুরধার, আদর্শিক ও যৌক্তিক প্রত্যুত্তর। স্বাধীন যোদ্ধারা সুস্পষ্ট অভিযোগ করেছেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অত্যন্ত সুকৌশলে যোদ্ধাদের নিজেদের মধ্যে বিভেদের আগুন উসকে দিচ্ছে। তাদের দাবি হলো, আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভের আশায় 'আইএস (ISIS) দমন'-এর মতো পরিভাষা ব্যবহার করে সরকার মূলত স্বাধীন যোদ্ধাদেরই দমন করতে চাইছে; আর এভাবেই তারা নিজেদের পশ্চিমা রাজনৈতিক স্বার্থ চরিত্রার্থ করছে। -অনুবাদক )
স্বাধীন উজবেক যোদ্ধারা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ তাদের সমকক্ষদের জবাব দিয়েছে এবং সরকারের বিরুদ্ধে বিভেদ উসকে দেওয়ার অভিযোগ এনেছে, যাতে যোদ্ধাদের বিভক্ত করে (আইএস)-এর অজুহাতে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা সহজ হয়।
'ওয়াশিংটনের মিত্র' বলে পরিচিত সিরিয়ান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত শুক্রবার তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা উজবেক যোদ্ধাদের দিয়ে একটি বিবৃতি প্রদান করিয়েছে। যারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিত্রতার কারণে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, ওই বিবৃতিতে তারা সেইসব স্বাধীন উজবেক যোদ্ধাদের ওপর আক্রমণাত্মক বাক্যবাণ নিক্ষেপ করেছে। বিবৃতিটিতে তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জোরালো সাফাই গেয়েছে এবং টেলিগ্রাম অ্যাপে স্বাধীন উজবেক যোদ্ধাদের আনুষ্ঠানিক চ্যানেলগুলো থেকে প্রকাশিত বিবৃতিগুলোকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে।
অহরহ সত্য অস্বীকার করা ও স্ববিরোধী কথাবার্তা বলাই হলো ওয়াশিংটনের মিত্রদের চিরাচরিত স্বভাব। আর এ বিষয়টি কেবল তাদের সাধারণ অনুসারীদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। সিরিয়ান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ ও বিচারমন্ত্রী 'মাজহার আল-উয়াইস' গত ফেব্রুয়ারিতে আলজাজিরা চ্যানেলে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারে সিরিয়ায় কোনো রাজনৈতিক কিংবা মতাদর্শিক বন্দি থাকার বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করেছিলেন। সুতরাং, তাদের বাকি অনুসারীরাও যে ঠিক একই পথে হাঁটবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
এর জবাবে সিরিয়ায় অবস্থানরত স্বাধীন উজবেক যোদ্ধাদের দলটি শনিবার একটি পাল্টা বিবৃতি প্রকাশ করে। সেখানে তারা জোর দিয়ে বলেছে যে, যারা শুক্রবারের বিবৃতিটি প্রকাশ করেছে, "উজবেকদের নামে কথা বলার কিংবা তাদের মতামত বা উদ্বেগের কথা ব্যক্ত করার বিন্দুমাত্র অধিকার তাদের নেই।" তারা আরও উল্লেখ করেছে যে, বর্তমান বাস্তবতা, উজবেকদের প্রকৃত অবস্থা এবং তাদের মূল লক্ষ্য সম্পর্কে সামান্যতম ধারণা না রেখেই তারা পুরো একটি সম্প্রদায়ের নামে বিবৃতি দেওয়ার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে।
দলটি সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ উজবেক যোদ্ধাদের দেওয়া বিবৃতিটিকে বিশ্লেষণ করে সুস্পষ্টভাবে বলেছে, "মজলুমদের দুর্দশা তুলে ধরার জন্য এটি লেখা হয়নি; বরং পার্থিব স্বার্থ রক্ষা, চাপের কাছে নতিস্বীকার এবং বিজয়ের পর তাদের যেসব পদ ও অবস্থান দেওয়া হয়েছিল, কেবল সেগুলো টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যেই এটি লেখা হয়েছে।" সত্য প্রকাশের পরিবর্তে জুলুমের প্রতি নীরবতা পালন এবং মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর দাবির প্রচার করার দায়ে তারা ওই গোষ্ঠীকে অভিযুক্ত করেছে।
বিবৃতিতে তারা আরও যুক্ত করেছে যে, উজবেক যোদ্ধারা এখনো প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সিরিয়ান সেনাবাহিনীর অধীনস্থ অন্যান্য ছোট ছোট শাখাগুলো ত্যাগ করে চলে আসছেন। এর কারণ কোনো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নয়; বরং তারা জুলুমকে মেনে নিতে এবং বাতিলকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন বলেই এমনটি ঘটছে।
দলটি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানিয়ে দিয়েছে যে, উজবেকরা যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের লক্ষ্য একটিই—মজলুমের পাশে দাঁড়ানো, জালিমের বিরোধিতা করা এবং ইসলামী ন্যায়বিচারের সাহায্যে এগিয়ে আসা। কোনো পদবি, নির্দেশ বা বাহ্যিক চাপ তাদেরকে এই পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।
মুহাজির যোদ্ধাদের মাঝে আরও বেশি বিভেদ উসকে দেওয়ার এবং তাদের একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করানোর এক গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তারা সরকারের বিরুদ্ধে এনেছে। তারা মনে করে, এর মূল উদ্দেশ্য হলো—যোদ্ধাদের বিভক্ত করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং (আইএস) দমনের মিথ্যা অজুহাতে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করা।
যারা জুলুমের সাফাই গায়, এর বিপরীতে নীরবতা পালন করে কিংবা মিথ্যা বিবৃতির মাধ্যমে তাকে সুন্দর রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে, তাদের কাঁধে যে এর বিশাল দায়ভার বর্তাবে, তারা সে বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। তারা জোর দিয়ে বলেছে যে, সত্যকে লুকিয়ে রাখলেই তা মুছে যায় না, জুলুমের সাফাই গাইলেই তা ন্যায়বিচারে পরিণত হয় না এবং বারবার মিথ্যা বললেই তা সত্যে রূপান্তরিত হয় না।
তারা আরও বলছে, সিরিয়ার জনগণ এখন নিজেদের চোখেই দেখতে পাচ্ছে, কারা তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, আর কারা রাজনৈতিক সমীকরণ ও ব্যক্তিগত পার্থিব স্বার্থের কাছে তাদের দুর্দশাকে বিক্রি করে দিচ্ছে।
সবশেষে দলটি তাদের বিবৃতির সমাপ্তি টেনে দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছে যে, উজবেক যোদ্ধারা গতকালও মজলুমদের পাশে ছিল, আজও তাদের পাশে আছে এবং আগামীতেও ঠিক এভাবেই থাকবে। তারা জোর দিয়ে বলেছে, তাদের এই পথ কোনো পদবি, বস্তুগত স্বার্থ বা চাকরি বাগানোর পথ নয়; বরং এটি কেবলই সত্য ও ন্যায়বিচারের এক সুকঠিন পথ। আর তাদের চূড়ান্ত ফয়সালাকারী কোনো ব্যক্তিসত্তা নয়, বরং স্বয়ং রাব্বুল আলামিন।
*****
সতর্কবার্তা: এই লেখাটি মূলত আপনাদের তথ্যগত অবগতির উদ্দেশ্যে অনুবাদ করা হলো। সুতরাং, এখানে প্রদত্ত বিষয়গুলোকে চূড়ান্ত বা অকাট্য প্রমাণ হিসেবে ধরে না নেওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। উল্লেখ্য, রচনায় উপস্থাপিত যাবতীয় চিন্তাধারা ও বক্তব্যের দায়ভার একান্তই মূল লেখকের নিজস্ব। তাঁর সকল মতাদর্শ বা বিশ্লেষণের সাথে আমাদের পুরোপুরি মতৈক্য থাকতে হবে—এমনটি কোনোভাবেই অপরিহার্য নয়। তাদের চিন্তাধারা আমাদের জানা দরকার, আর মূলত এ কারণেই আমাদের এই আর্টিকেল অনুবাদ করা হয়েছে। -অনুবাদক
Comment