বাংলাদেশে আরসার প্রধান গ্রেফতার—তবে কি একিউর সতর্কবাণী সত্যি বলে প্রমাণিত হলো?
বাংলাদেশে সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা ঘটে গেছে। চারদিকে গুঞ্জন আর সন্দেহের ছায়া। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটিই—আরসার প্রধান আবু আম্মার জুনুনির গ্রেফতার।[১] র্যাবের সফল অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়তেই অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে,আবু আম্মার কি আসলেই মাত্র গ্রেফতার হলেন নাকি আগে থেকেই র্যাব হেফাজতে ছিলেন? তবে কি একিউ এতদিন যা বলে আসছিল, সেটাই সত্য?
আমি আজ এই আলোচনায় আরসা সংগঠনের ভালো-মন্দ দিক নিয়ে কথা বলব না। বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করতে চাই—জিহাদি আন্দোলনকে যেকোনো দেশের গোয়েন্দা সংস্থার হাত থেকে দূরে রাখা কতটা অপরিহার্য! ইতিহাস সাক্ষী, যে কোনো আন্দোলনে যদি গোয়েন্দারা ঢুকে পড়ে, তবে তারা সেটাকে নিজেদের মতো চালিত করতে চায়। আর তাদের আদেশ না মানলে তারা পুরো সংগঠনটিকেই ধ্বংস করে দেয়।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও কাশ্মিরের ইতিহাস আমাদের কী বলে?
এই বিষয়ে অতীতের কিছু উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। বাংলাদেশের হুজি, পাকিস্তানের জায়শে মুহাম্মাদ এবং কাশ্মিরের হিজবুল মুজাহিদিন—এই তিনটি সংগঠনের পতনের পেছনে গোয়েন্দা সংস্থার বড় ভূমিকা ছিল। প্রথমে তারা সহযোগিতা করেছিল, কিন্তু পরে যখন সংগঠনগুলোর সিদ্ধান্ত গোয়েন্দাদের মনমতো হচ্ছিল না, তখনই তারা ধ্বংসের খেলায় নেমে পড়ে।
শাইখ আইমান আয-যাওয়াহিরী একটি বার্তায় বলেন-
"অবশ্যই পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ হলো, পাকিস্তানে আমেরিকার প্রধান সাহায্যকারী। তারা মুজাহিদিনকে এই পদ্ধতিতে কাজ করতে দেবে না কিছুতেই। তার চাইবে মুজাহিদরা যেন চিরতরে রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসাবে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
কাশ্মীর, পাকিস্তান, এবং বিশ্বজুড়ে সকল মুজাহিদদের অবশ্যই শরীয়াহর আলোকে তাদের জিহাদ পরিচালনা করা উচিত এবং এটা খেয়াল রাখা উচিত, যেন কখনো মুসলমানদের পবিত্রতা লঙ্ঘন না হয়ে পড়ে।"
- কাশ্মীরকে ভুলে যেও না, শাইখ আইমান আয-যাওয়াহিরী হাফিজাহুল্লাহ [২]
আল কায়েদা উপমহাদেশের বর্তমান আমীর উস্তাদ উসামা মাহমুদ হাফিযাহুল্লাহ একটি সাক্ষাৎকারে বলেন-
"আমাদের অবস্থান হলো জিহাদি আন্দোলনকে এই তাগুতদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা ছাড়া জিহাদ কখনও সফল হতে পারবে না। যদি আজ ইসলামী ইমারত আফগানিস্তান থেকে শুরু করে ইয়েমেন ও সোমালিয়া এবং মালি ও আলজেরিয়া পর্যন্ত জিহাদি আন্দোলনের সফল হচ্ছে, যেখানেই সব প্রতিবন্ধকতার পরও আল্লাহ মুজাহিদদের বিজয় দিচ্ছেন এবং জিহাদি আন্দোলন গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তো এর একটা বড় কারণ হলো তাগুতী সামরিক বাহিনীর প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করা।"
এছাড়াও একই সাক্ষাৎকারে উস্তাদ উসামা মাহমুদ হাফিজাহুল্লাহ "কাশ্মীরের সমস্যার কার্যকর সমাধান কি?" এর উত্তরে বেশ কিছু পয়েন্টের মাঝে একটি এটিও বলেছিলেন যে, "তৃতীয়ত, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীসহ সমস্ত তাগুতি সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাব থেকে নিজেদের আন্দোলনকে মুক্ত রাখা।"
উপমহাদেশ ভিত্তিক জিহাদি আন্দোলন – প্রকৃত বাস্তবতা!(দ্বিতীয় পর্ব) [৩]
সুতরাং এটি একটি শক্তিশালী প্রশ্ন যে, আরসার প্রধান আবু আম্মার জুনুনির ক্ষেত্রেও কি তাই ঘটল?
আমার দৃঢ় ধারণা, বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার ষড়যন্ত্রের কারণেই তিনি ধরা পড়েছেন। কারণ, তিনি বাংলাদেশের বাহিনীগুলোর প্রতি অগাধ বিশ্বাস রাখতেন। তিনি একাধিকবার প্রকাশ্যে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি অপেনে বাংলাদেশে প্রবেশ করতেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মিটিং করতেন। বাংলাদেশের বাহিনীগুলোর প্রতি সুধারনা রাখতেন। এমনকি একটি সাক্ষাৎকারে স্বীকারও করেছেন যে, বাংলাদেশের বাহিনীগুলো একাধিকবার বাংলাদেশে প্রবেশের সময় তাকে কিছু ক্ষেত্রে সহায়তা করেছিল!
এই বিষয়ে প্রমাণও রয়েছে। যমুনা টিভির একটি সাক্ষাৎকারে তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে, বাংলাদেশের বাহিনীগুলো কখনো কখনো তাকে সহায়তা করেছিল। ভিডিওর ৩১:৪০ থেকে ৩২:৫০ মিনিট পর্যন্ত অংশে এই বক্তব্য শোনা যাবে। [৪] তাহলে প্রশ্ন উঠছে—তিনি যদি বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলে থাকেন, তবে হঠাৎ করে তাকে গ্রেফতার করা হলো কেন?
তাহলে আমরা এই উপসংহারে যেতে পারি যে, একিউ যা বলে আসছে, তাই সত্য প্রমাণিত হলো।
যারা জিহাদি আন্দোলন সম্পর্কে সচেতন, তারা জানেন যে একিউ বরাবরই সতর্ক করে এসেছে—জিহাদি আন্দোলনকে গোয়েন্দা সংস্থার হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। বিভিন্ন অঞ্চলে জিহাদি আন্দোলন ধ্বংসের পেছনে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু অনেকেই এই ফাঁদে পড়ে নিজেদের এবং সংগঠনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছেন।
আজ আরসার প্রধানের গ্রেফতার সেই সতর্কবার্তাকেই আবারও সত্য বলে প্রমাণ করল। যদি জিহাদি আন্দোলন গোয়েন্দাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তবে তারা আন্দোলনের মূল লক্ষ্যকে ধ্বংস করে দেবে। তাই এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। ইতিহাস থেকে যারা শিক্ষা নেয় না, তাদের ভবিষ্যৎও অতীতের মতোই ধ্বংস হয়ে যায়।
*****
১৯ মার্চ ২০২৫ ইংরেজি
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন লিংক
[১] আরসা প্রধানসহ গ্রেফতার ১০, লিংক- https://archive.ph/CZbnX
[২] কাশ্মীরকে ভুলে যেও না, শাইখ আইমান আয-যাওয়াহিরী হাফিজাহুল্লাহ - https://archive.ph/OMW22
[৩] উপমহাদেশ ভিত্তিক জিহাদি আন্দোলন – প্রকৃত বাস্তবতা!(দ্বিতীয় পর্ব)- https://archive.ph/XW7Wm
[৪]যমুনা টিভির সেই সাক্ষাৎকার-
https://www.youtube.com/watch?v=Vd2hWrNzxPk
Comment