মার্কিন দূতাবাসের ইশারায় ইসলামপন্থী জোটে ভাঙন: গণতন্ত্রের অসারতা নিয়ে কিছু কথা-১
—মুনশি আব্দুর রহমান
—মুনশি আব্দুর রহমান
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামি দলগুলোর ঐক্যের প্রচেষ্টা এবং সেই ঐক্যে ফাটল ধরার নেপথ্যে মার্কিন দূতাবাসের প্রভাব ও বড় দলগুলোর অবস্থান নিয়ে সচেতন মহল বা ‘দ্বীনী ভাইদের’ মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া কিছু গোপন নথি ও অডিও বার্তা পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ইসলামি শক্তিগুলোর একাট্টা হওয়ার পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছে পশ্চিমা চাপ এবং সেই চাপের মুখে জামায়াতে ইসলামীর নীতিগত পরিবর্তন। ইসলামি দলগুলোকে বিতর্কিত করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু উম্মাহর স্বার্থে কিছু রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরা ইমানি দায়িত্ব বলে মনে করছি-
১. ইসলামি জোট ও 'ওয়ান বক্স' নীতির লক্ষ্য
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই)-এর বক্তব্য হলো, তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের সকল ইসলামি শক্তিকে এক ছাতার নিচে এনে একটি শক্তিশালী জোট গঠন করা। দলটির আমীর পীর সাহেব চরমোনাই ‘ওয়ান বক্স পলিসি’ ঘোষণা করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের পক্ষের সকল ভোট একটি বাক্সে জমা করা এবং ইসলামি আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পুনর্গঠন করা। ৫ই আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে ইসলামপন্থীদের সামনে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার এবং একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, এই নীতি ছিল তারই প্রতিফলন। [1]
এখানে পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটা নোক্তা দিয়ে রাখি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও আসলে পরিপূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম এবং পরিপূর্ণ শরীয়াহ বাস্তবায়নের প্রকল্প গ্রহণ করেনি, বরং ইসলামী আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই তাদের প্রকল্প। এ জন্যই তারা গণতান্ত্রিক ভোটাভোটির মানহাজ গ্রহণ করেছেন। তাঁদের অনেক দায়িত্বশীল নেতাকর্মী স্পষ্টভাবে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন; এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, যে মানহাজ তাঁরা গ্রহণ করেছেন সে মানহাজে এর চেয়ে বেশি সম্ভব নয়। কিন্তু গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ করা সত্ত্বেও আমেরিকার তৈরী করা মানদণ্ড অনুযায়ী তারা এখনো পর্যন্ত যথেষ্ট পরিমাণ মডারেট হতে পারেননি, আমেরিকাও সর্বোচ্চ পর্যায়ের মডারেট হওয়া ছাড়া কারো প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করছে না। ফলে আমেরিকা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে এক্সট্রিমিস্ট বা উগ্রপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করছে।
২. মার্কিন দূতাবাসের হস্তক্ষেপ ও চরমোনাইকে 'মৌলবাদী' ট্যাগ
জোট গঠনের এই প্রক্রিয়ায় মার্কিন দূতাবাসের সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া যায়। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের একটি বক্তব্যে উঠে এসেছে যে, তিনি যখন মার্কিন দূতাবাসে যান, তখন কূটনীতিকরা চরমোনাইয়ের সাথে জোট করার বিষয়ে সরাসরি আপত্তি তোলেন।
নায়েবে আমীর বলেন:
“আমরা যখন শুধু ইসলামিক পদ্ধতি নিয়ে যদি আমরা আগাতাম, তাহলে এটা মৌলবাদ দিয়ে একটা জোট হিসেবে চিহ্নিত হইত। আমরা যখনই অন্যদেরকে নেওয়া শুরু করছি, তখন এটা একটা জাতীয় জোট হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। ঠিক আছে, আমরা যখন প্রথমে; প্রথম জোট তো হচ্ছে আমাদের চরমোনাইর সাথে। আমেরিকান এম্বেসিতে আমি গেলাম, বললো যে, তোমরা তো মৌলবাদীদের সাথে আছো। এটা কেমন কথা! আমি বলছি, এটা কোন অসুবিধা নেই। তাদের ভিতরে যে কিছুটা এক্সট্রিমিজম আছে, আমরা ওদেরকে ওখান থেকে দূরে আনতেছি। বলে যে, তাহলে ঠিক আছে”। [2]
এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, মার্কিন দূতাবাস চরমোনাইকে ‘মৌলবাদী’ বা চরমপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং এ বিষয়ে জামায়াত নেতাদের কাছে কৈফিয়ত তলব করেছে। এর জবাবে জামায়াত নেতা তাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, তারা চরমোনাইকে তাদের কথিত ‘এক্সট্রিমিজম’ বা চরমপন্থা থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন! [3]
৩. চাপের মুখে জামায়াতের নীতি পরিবর্তন ও জোট ভাঙন
মার্কিন দূতাবাসের এই চাপপ্রয়োগের কৌশল যে সফল হয়েছে, তা জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক অবস্থানেই প্রতিফলিত হয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অভিযোগ, জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করেছেন যে, তারা ক্ষমতায় গেলে ‘শরিয়াহ আইন’ বা আল্লাহর আইন নয়, বরং ‘প্রচলিত আইনে’ রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।
ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র একটি সাংবাদিক সম্মেলনে এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
“আজকে আমাদের দুঃখজনক বাস্তবতা হলো- আমরা অবাক বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত আমীর জনাব ডা. শফিকুর রহমান তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, তারা ক্ষমতায় গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন...” ।
“...এবং তিনি যে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলছিলেন সেই খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একজন সম্মানিতা নারী তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, আমরা আশ্বস্ত হয়েছি যে জামায়াতের আমীর শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা করবেন না...... এই এই ওয়াদা তিনি করেছেন, এজন্য আমি আশ্বস্ত হয়েছি...”।
“...এখন যখন ক্ষমতায় যাওয়ার মত অবস্থা তৈরি হয়েছে, তখন তারা আল্লাহর আইন থেকে সরে গেলেন। তারা প্রচলিত আইনে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন - এই কথা যখন ঘোষণা করলেন, তখন আমাদের প্রশ্ন জাগে যে, সারা বাংলাদেশে এই জামায়াতে ইসলামীর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের এই যে আবেগ-অনুভূতি এই বিষয়টার প্রতি তারা আসলে খেয়াল করে নাই...” । [4]
যারা আজীবন আল্লাহর আইনের কথা বলে রাজনীতি করেছে, তারা এখন ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতেই পশ্চিমাদের বা মার্কিন এম্বেসির সন্তুষ্টির জন্য প্রচলিত আইনের কথা বলছে—যা ইসলামি জনতার সাথে প্রতারণার শামিল। মূলত মার্কিন এম্বেসির কাছে জামায়াতের এই ‘মাথানত’ করা বা প্রচলিত আইনের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই প্রমাণ করে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কখনো ইসলাম কায়েম করা সম্ভব নয়, এমনকি নিজেদের কমরেড ও সহযোদ্ধাদের সাথে জোটবদ্ধ থাকাও সম্ভব নয়।
*****
চলবে...ইনশা আল্লাহ
সংশ্লিষ্ট টীকা ও লিংক-
[1] নির্বাচনী সমঝোতা বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর অবস্থান নিয়ে সংবাদ সম্মেলন, লিংক- http://https://web.facebook.com/share/v/17aDeguER3/
[2] ড. তাহেরের স্বীকারোক্তি, লিংক- https://web.facebook.com/share/v/16gwVk9HX3/
[3] মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন কূটনীতিকের কথোপকথনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিলিপি, লিংক- https://web.facebook.com/share/p/1GJrusCXiD/
[4] নির্বাচনী সমঝোতা বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর অবস্থান নিয়ে সংবাদ সম্মেলন, লিংক- https://web.facebook.com/share/v/17aDeguER3/
Comment