মার্কিন দূতাবাসের ইশারায় ইসলামপন্থী জোটে ভাঙন: গণতন্ত্রের অসারতা নিয়ে কিছু কথা-২
—মুনশি আব্দুর রহমান
—মুনশি আব্দুর রহমান
মার্কিন কৌশল: অর্থনৈতিক চাপ ও শরিয়াহ বাস্তবায়নে বাঁধা
মার্কিন দূতাবাস কেন বাংলাদেশে ইসলামি শক্তির উত্থান বা শরিয়াহ আইন চায় না, তা কূটনীতিকদের বক্তব্যে পরিষ্কার। তাদের মূল মাথাব্যথা হলো—ইসলামি দলগুলো ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ফাঁস হওয়া একটি গোপন অডিওতে একজন সিনিয়র মার্কিন কূটনীতিকের বয়ানে বিষয়টি উঠে এসেছে। তার মতে, জামায়াত বা ইসলামি দলগুলো পশ্চিমা মূল্যবোধবিরোধী পদক্ষেপ নিলে বা শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধসে পড়বে।
সেই কূটনীতিক উল্লেখ করেন:
“যদি বাংলাদেশ নারীদের অধিকার সীমিত করে দেয় বা শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেয়, তবে কোনো অর্ডার আসবে না। আর অর্ডার না থাকলে বাংলাদেশের কোনো অর্থনীতি থাকবে না”।
তিনি আরও বলেন, আমেরিকা ও ইউরোপীয়রা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেবে যে ইসলামি আইন বা তাদের স্বার্থবিরোধী কিছু করলে তার পরিণতি কী হবে।
নিম্নে ওই ফাঁস হওয়া ফোনালাপের সারাংশ তুলে ধরা হলো:
"৫ই আগস্টের পর বাংলাদেশে যে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে, তা কোনো সরকার বা রাজনৈতিক দলের একক কৃতিত্ব নয়। বরং সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক দলগুলো সংঘাত এড়িয়ে চলার কারণে সমাজ নিজেই এই স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছে। ওয়াশিংটন প্রথমে সন্দিহান থাকলেও পরে এই বাস্তবতা মেনে নিয়েছে।
জামায়াত ক্ষমতায় এলেও তারা শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দিতে বা নারীদের অধিকার খর্ব করতে পারবে না। কারণ, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা (তৈরি পোশাক শিল্প) পুরোপুরি আমেরিকা ও ইউরোপের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। যদি তারা কোনো ক্যাথলিক প্রতিষ্ঠান দখল করে বা শরিয়াহ আইন চালু করে, তবে আমেরিকা তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে, যার ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি টিকে থাকবে না।
আমেরিকান এম্বেসি জামায়াত, হেফাজত বা ইসলামী আন্দোলনের সাথে যোগাযোগ বা ‘বন্ধুত্ব’ রাখতে চায় মূলত তাদের সতর্ক করার জন্য। কূটনীতিকরা তাদের ফোন করে সরাসরি বুঝিয়ে দেবেন যে, নির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নিলে (যেমন 'কট্টরপন্থা' (!) অবলম্বন করলে) তার পরিণতি ভয়াবহ হবে। এম্বেসি মনে করে, জামায়াত নেতারা যথেষ্ট 'শিক্ষিত' ও 'বুদ্ধিমান', তাই তারা নিজেদের ক্ষতি হয় এমন কাজ করবে না।
জামায়াত নির্বাচনে ভালো ফল করলেও পূর্ণমাত্রায় আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, পশ্চিমা বাজারের ওপর বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা একটি শক্তিশালী ‘সুরক্ষাকবচ’ (guardrails) হিসেবে কাজ করবে। বাংলাদেশ কখনোই সৌদি আরব হতে পারবে না। কারণ তাদের পণ্য চীনে নয়, বরং পশ্চিমে বিক্রি করতে হয়। এই বাণিজ্যের স্বার্থেই ইসলামি দলগুলো একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকতে বাধ্য হবে।" [4]
প্রিয় পাঠক! এখান থেকেই স্পষ্ট, মুসলিম ভূমিগুলোতে গণতন্ত্র আসলে ফ্যাসিজমেরই একটি সংস্করণ মাত্র। কোন মুসলিম ভূমির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণও যদি শরিয়াহ আইন চায় তবুও তারা তা বাস্তবায়ন করতে বাঁধা দেবে, জনগণের উপর গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম চাপিয়ে দিয়ে রাখবে, নিজেদের মতাদর্শিক, অর্থনৈতিক পরোক্ষ উপনিবেশবাদ টিকিয়ে রাখবে।
সুতরাং গণতান্ত্রিক পন্থায় দ্বীন কায়েমের চেষ্টা যারা করছেন, তাঁদেরকে আমরা বিনয়ের সাথে অনুরোধ করব - নিজেদের মানহাজ পুনর্বিবেচনার জন্য। পশ্চিমাদের বেঁধে দেওয়া সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেলে কি দ্বীন কায়েম করা আদৌ সম্ভব? বরং দ্বীন ও আকীদার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে কি গণতান্ত্রিক রাজনীতির ময়দানে টিকে থাকাটাও সম্ভব? এভাবে কি দ্বীন কায়েম হবে নাকি পশ্চিমাদের মতাদর্শিক উপনিবেশের পক্ষে বৈধতা উৎপাদন করা হবে?
এখান থেকে এটাও স্পষ্ট, দ্বীন কায়েমের পথে অন্যতম বাধা হল আমেরিকা। আমেরিকার মিত্র হয়ে আমেরিকার আনুগত্য করে কেনদিনই শরিয়াহ কায়েম করা সম্ভব হবে না, বরং দুনিয়াতে যারা দ্বীন, শরিয়াহ ও ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করেছেন, তারা আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়াই করেই কায়েম করেছেন।
*****
চলবে...ইনশা আল্লাহ
সংশ্লিষ্ট টীকা ও লিংক-
[4] মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন কূটনীতিকের কথোপকথনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিলিপি, লিংক- https://web.facebook.com/share/p/1GJrusCXiD/
Comment