জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর : আল কায়েদা কী সত্য বলেছিল? (২)
-মুনশি আব্দুর রহমান
-মুনশি আব্দুর রহমান

আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তি হল?
ইতিহাসের এক অদ্ভুত নির্মমতা হলো, মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আমাদের সামনে সুযোগ এসেছিল ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের। কিন্তু আমরা সেই সুযোগ হারিয়েছি কেবল ‘নির্বাচন’ আর ‘সরকার গঠন’-এর মরীচিকার পেছনে ছুটে। আজ ১৮ মাস পর যখন সেই জাতীয়তাবাদী সরকারই আমাদের টুঁটি চেপে ধরছে, তখন উস্তাদ উসামা মাহমুদ হাফিযাহুল্লাহ’র 'বাংলাদেশ: ইসলামের বিজয়ের আশা জাগানিয়া ভূখণ্ড' বার্তার প্রতিটি শব্দ যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে।
মিশরের ট্র্যাজেডি আমাদের জন্য আয়না ছিল!
আমরা ভেবেছিলাম স্বৈরাচারের পতন আর একটি নির্বাচনই বুঝি সব সমস্যার সমাধান। কিন্তু মিশরেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল। সেখানেও হোসনি মোবারকের পতন হয়েছিল, নির্বাচন হয়েছিল, ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় গিয়েছিল। কিন্তু ফলাফল কী ছিল? উস্তাদ উসামা মাহমুদ হাফিযাহুল্লাহ সেই ভয়াবহ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন: “মিশরে তো ৩০ বছর যাবৎ চেপে বসা সামরিক স্বৈরাচারী শাসক জেলে চলে গিয়েছে। শুধু তাই নয় বরং তারপর ইলেকশন হয়েছে। জনপ্রতিনিধিরা সরকার গঠন করেছে। কিন্তু তারপর কি হয়েছে? কিছুদিন পর ওই জনপ্রতিনিধিদেরকে হয় জেলে পাঠানো হয়েছে অথবা শহীদ করে দেয়া হয়েছে।”
আজ বাংলাদেশেও আমরা সেই একই চিত্র দেখছি। শাসকের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু যে রাষ্ট্রযন্ত্র বা সিস্টেমের ওপর ভর করে তারা ক্ষমতায় এসেছে, সেই সিস্টেম আজ গণঅভ্যুত্থানকারীদেরই গিলে খেতে যাচ্ছে বলে ধারণা পোক্ত হচ্ছে। কারণ, 'বাংলাদেশ: ইসলামের বিজয়ের আশা জাগানিয়া ভূখণ্ড'-এ সতর্ক করা হয়েছিল: “আরব বিশ্বের কোনো একটি দেশেও বিপ্লব (গণঅভ্যুত্থান) তার গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছুতে পারেনি। জনসাধারণ আগের মতোই বঞ্চিত, নিপীড়িত এবং পরাজিত রয়ে গেছে।”
আমরা কী একই গর্তে দুইবার দংশিত হতে যাচ্ছি?
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর একটি বিখ্যাত হাদিস উল্লেখ করে উস্তাদ উসামা মাহমুদ হাফিযাহুল্লাহ আমাদের সতর্ক করেছিলেন। হাদিসটি হলো: “কোনো ঈমানদার একই গর্তে দুইবার দংশিত হয় না।”
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমরা সেই একই গর্তে দ্বিতীয়বার দংশিত হয়েছি। আমরা পাকিস্তান, মিশর বা তিউনিসিয়ার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিইনি। আমরা ভেবেছিলাম প্রচলিত রাজনৈতিক দল বা সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় থেকে আমরা ইসলামকে বিজয়ী করব। অথচ উস্তাদ উসামা মাহমুদ হাফিযাহুল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন যে, এই পথটি ‘খুবই পিচ্ছিল’। তিনি বলেছিলেন: “বিগত ৭০-৮০ বছর যাবৎ শুধু উপমহাদেশ নয় বরং গোটা মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে দীনদারদের এই অভিজ্ঞতার কথা লিখিত রয়েছে যে, তাদের রাজনৈতিক কর্মপ্রয়াস এবং প্রচলিত সরকার ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তিমূলক চেষ্টা প্রচেষ্টা পাকিস্তান, মিশর, বাংলাদেশ ও তিউনিসিয়া কোথাও তাদের জন্য কোনো প্রকার কল্যাণ বয়ে আনেনি... রাষ্ট্র ও সমাজে ইসলামের শত্রু ও ইসলাম বিদ্বেষী শক্তিগুলো আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।”
আজকের সরকার যে গণঅভ্যুত্থানের প্রতীকগুলোকে অস্বীকার করা শুরু করছে, তা এই ‘ইসলাম বিদ্বেষী শক্তি’ শক্তিশালী হওয়ারই প্রমাণ। আমরা তাদের সমর্থন দিয়েছি, আর আজ তারা আমাদেরই শিকড় কাটছে।
ক্ষমতার আসল চাবিকাঠি কার হাতে?
আমরা যদি প্রতিবেশী পাকিস্তানের দিকে তাকাতাম, তবে দেখতাম সেখানেও বারবার সরকার বদলায়, কিন্তু ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। কারণ আসল ক্ষমতা থাকে অন্য কোথাও। 'বাংলাদেশ: ইসলামের বিজয়ের আশা জাগানিয়া ভূখণ্ড'-এ উল্লেখ করা হয়েছে: “পাকিস্তানের ইতিহাস সাক্ষী, সেখানে বাহ্যিকভাবে যাকেই ক্ষমতার চেয়ারে বসানো হয়েছে, প্রতিবার আসল ক্ষমতা দ্বীনের দুশমন ফৌজি জেনারেলদের হাতেই থেকেছে।”
বাংলাদেশেও গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা সেই একই কাঠামোর ওপর ভরসা করেছি। ফলে আজ ১৮ মাস পর আমাদের হতাশা ছাড়া আর কিছুই জুটছে না।
এখনও কি সময় আছে?
আমরা যদি এখনও সতর্ক না হই, তবে সামনে আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। আমাদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে উস্তাদ উসামা মাহমুদ হাফিযাহুল্লাহ বলেছিলেন: “সামগ্রিকভাবে দ্বিতীয়বার আমরা পুরানো গর্ত থেকে দংশিত হতে যাচ্ছি। এই দংশনের ফলেই আজ গাজায় আমাদেরকে জবাই করা হচ্ছে। কাশ্মীরে আমাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানেও আমাদেরকে কোণঠাসা করে ফেলা হচ্ছে।”
আজকের এই লাঞ্ছনা প্রমাণ করে যে, আমরা উস্তাদের সেই সতর্কবার্তা কানে তুলিনি। আমরা যদি এখনও তাগুতী ব্যবস্থার লেজুড়বৃত্তি বাদ দিয়ে নিজস্ব শক্তি অর্জনে মনোযোগী না হই, তবে গাজা বা কাশ্মীরের মতো পরিণতি আমাদের জন্যও অপেক্ষা করছে। সময় এসেছে আত্মোপলব্ধির, সময় এসেছে ‘একই গর্তে আর দংশিত না হওয়ার’ প্রতিজ্ঞা করার।
*****
চলবে... ইনশা আল্লাহ
উস্তাদ উসামা মাহমুদ হাফিযাহুল্লাহ’র সেই ঐতিহাসিক বার্তাটি পড়তে ক্লিক করুন- https://archive.ph/dMVxk
Comment