Announcement

Collapse
No announcement yet.

শহীদি হামলা : দুর্বলের অপ্রতিরোধ্য যুদ্ধকৌশল || মুনশি আব্দুর রহমান

Collapse
This is a sticky topic.
X
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • শহীদি হামলা : দুর্বলের অপ্রতিরোধ্য যুদ্ধকৌশল || মুনশি আব্দুর রহমান

    শহীদি হামলা : দুর্বলের অপ্রতিরোধ্য যুদ্ধকৌশল

    -মুনশি আব্দুর রহমান



    ​সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে একটি অত্যন্ত লোকরঞ্জনবাদী ও অগভীর ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রায়শই দাবি করা হয় যে, সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য, পড়াশোনা শেষে চাকরি না পাওয়ার হতাশা এবং সেই সাথে 'সামান্য ধর্মের ছোঁয়া'—এসব থেকেই যুবসমাজ উগ্রবাদের দিকে ধাবিত হয় এবং শরীরে বিস্ফোরক বেঁধে আত্মঘাতী হামলা চালায়। যেমন একজন ভাই একটি বক্তব্যে বলছেন-

    // সামাজিক যে বৈষম্য সমাজে আমাদের সমাজে যে বৈষম্য বিদ্যমান যে অর্থনৈতিক বৈষম্য সামাজিক রাজনৈতিক নানান ধরনের এর ফলে সৃষ্ট যে সামাজিক অস্থিরতা এই অস্থিরতা থেকে মানুষ এই উগ্রবাদের দিকে ধাবিত হয়।
    যখন সে দেখতেছে যে আমার পড়াশোনা করে কি লাভ? চাকরি পাচ্ছি না! তারপরে হচ্ছে যে সমাজের একটা শ্রেণী সমস্ত সুযোগ সুবিধাগুলো ভোগ করতেছে। আমি তো কোন সুযোগ সুবিধা পাচ্ছি না। আমার জীবনে এত কষ্ট। তো দেখা যায় যে এই এই ইয়ে থেকে হেজিটেশন থেকে একটা দল আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়। সুইসাইড করে। আরেকটা দল যারা একটু ধর্মের ছোঁয়াটোয়া পায় তারা উগ্রবাদের দিকে ধাবিত হয়। তখন তাদের মনে হয় যে এই জীবনটা কি? এটা তো আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে দিব। পিছনে বোমা বেঁধে সুইসাইড বোম্বিং করে আমি হচ্ছে জান্নাত পেয়ে যাব। এসতেশাদী হামলা যেটাকে বলে আর কি তারা। সো এটা আসলে এক ধরনের হেজিটেশন থেকে আসে। এক ধরনের মানসিক অস্থিরতা থেকে এটা আসে। আর এটা তৈরি হয় সামাজিক বৈষম্যের কারণে।// [১]



    কিন্তু আমরা যদি বিষয়টির মনস্তাত্ত্বিক, তাত্ত্বিক এবং ভূ-রাজনৈতিক স্তরগুলো ব্যবচ্ছেদ করি, তখন এই সরলীকরণ বা 'ওভারসিম্পলিফিকেশন' মারাত্মকভাবে বিভ্রান্তিকর ও অ্যাকাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে অসার বলেই মনে হয়। আসুন আমরা বিষয়টি একটু ভেঙ্গে দেখি-


    হতাশাগ্রস্ত ও সুদৃঢ় ইমানদারের মনস্তত্ত্বের মাঝে রয়েছে যোজন যোজন দূরত্ব

    যেকোনো বিষয়কে বিচার করতে হলে তার পেছনের মনস্তত্ত্ব বোঝা জরুরি। সাধারণ 'আত্মহত্যা' (ইসলামি পরিভাষায় যাকে ইন্তিহার বলা হয়) এবং একটি আদর্শিক 'শহীদী অভিযান'-এর মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান রয়েছে। মানুষ আত্মহত্যা করে মূলত চরম হতাশা, জীবনের প্রতি অনীহা, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে এবং আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরে অসন্তুষ্টির কারণে। এটি মূলত এক ধরনের পলায়নপরতা, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও জাহান্নামের কারণ হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে।
    অন্যদিকে, যাকে পশ্চিমা মিডিয়া 'সুইসাইড বোম্বিং' বলে প্রচার করে, তার পেছনের চালিকাশক্তি হতাশা বা শূন্যতা নয়; বরং এর ভিত্তি হলো সুদৃঢ় ইমান এবং একটি নির্দিষ্ট আদর্শের প্রতি তীব্র কমিটমেন্ট। একজন মুজাহিদ যখন শত্রুর মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তখন তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, দ্বীনকে সমুন্নত করা এবং জালিমদের আতঙ্কিত করার এক অদম্য স্পৃহা থেকে তা করেন। পেটের ক্ষুধা বা বেকারত্বের হতাশাগ্রস্ত একজন মানুষ আর যাই হোক, বৃহত্তর কোনো লক্ষ্যের জন্য শরীরে বিস্ফোরক বাঁধার মতো অকল্পনীয় সাহসিকতা দেখাতে পারে না।


    শহীদি হামলার পক্ষে রয়েছে ইতিহাস ও ফিকহের অকাট্য সমর্থন

    এই আত্মোৎসর্গ কোনো আধুনিক যুগের 'উগ্রবাদ' বা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ক্ষোভের ফসল নয়। এর শিকড় প্রোথিত আছে খোদ কুরআন ও সুন্নাহর গভীরে। কুরআনে আল্লাহ তাদের প্রশংসা করেছেন যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির খোঁজে নিজেদের জীবন বিক্রি করে দেয়। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত 'আসহাবে উখদূদ' বা গুহার বালকের ঘটনাটি এর একটি ধ্রুপদী দৃষ্টান্ত। সেই বালক বৃহত্তর মানুষের মাঝে ঈমানের আলো ছড়িয়ে দিতে স্বেচ্ছায় রাজাকে এমন উপায় বলে দিয়েছিল, যা নিশ্চিতভাবেই তার নিজের মৃত্যুর কারণ ছিল।
    ইতিহাস সাক্ষী, বদরের যুদ্ধে সাহাবী উমাইর বিন আল-হুমাম (রাদিআল্লাহু আনহু) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সমর্থন পেয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে শত্রুব্যূহে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি—চার মাজহাবের শীর্ষস্থানীয় ইমামগণ, যেমন ইমাম মুহাম্মাদ ইবন হাসসান আশ-শায়বানী থেকে শুরু করে ইমাম ইবনে তাইমিয়া পর্যন্ত সকলেই বৃহত্তর দ্বীনি স্বার্থে এবং শত্রুর বিপুল ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার এই কৌশলকে বৈধ ও অত্যন্ত প্রশংসনীয় বলে ফতোয়া দিয়েছেন। সুতরাং একে স্রেফ 'বিপথগামী তরুণদের উগ্রবাদ' বলা ইতিহাস ও ইসলামি ফিকহের প্রতি চরম অজ্ঞতা।



    গবেষণা বলছে, অর্থনৈতিক বৈষম্যের তত্ত্বটি সম্পূর্ণ ভুল

    চাকরি না পাওয়া বা সামাজিক বৈষম্যই উগ্রবাদের জন্ম দেয়—এই দাবিটি আধুনিক গবেষণায় বারবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে। রবার্ট পেপ বা মার্ক সেজম্যানের মতো আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের গবেষণার ডেটা স্পষ্ট বলে যে, এসব হামলায় জড়িত ব্যক্তিরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দরিদ্র বা অশিক্ষিত শ্রেণি থেকে আসে না; বরং তারা উচ্চশিক্ষিত এবং আর্থসামাজিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তান হয়ে থাকে। সুতরাং, এই লড়াই পেটের লড়াই নয়, এটি মূলত একটি আদর্শিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার লড়াই।



    শহীদি হামলা হচ্ছে দুর্বলের অসম ও অপ্রতিরোধ্য যুদ্ধকৌশল

    সবচেয়ে বড় সত্যটি লুকিয়ে আছে বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির অসম কাঠামোর মাঝে। একদিকে রয়েছে ন্যাটো জোটের মতো সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি, যাদের হাতে রয়েছে বি-৫২, পরমাণু বোমার মতো শহর ধ্বংসকারী সমরাস্ত্র এবং বিপুল অর্থনীতি। অন্যদিকে রয়েছে সীমিত অস্ত্র ও সম্পদধারী মজলুম প্রতিরোধকামী গোষ্ঠী। সামরিক শক্তির এই বিস্তর ফারাকের ময়দানে 'শহীদী অভিযান' বা আত্মোৎসর্গমূলক হামলা মূলত দুর্বলদের একটি মোক্ষম ও কার্যকরী সামরিক কৌশল। এটি সেই অস্ত্র, যার কোনো জবাব পরাশক্তিগুলোর কাছে নেই। এই কৌশলের মাধ্যমেই তারা শত্রুর অর্থনীতি ও সামরিক দম্ভে ভয়াবহ আঘাত হানে এবং যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ নিজেদের এই অসহায়ত্ব ও ক্ষতিকে আড়াল করতেই এই বীরত্বপূর্ণ কাজগুলোকে তাদের মিডিয়ার মাধ্যমে 'কাপুরুষোচিত আত্মহত্যা' বা 'উগ্রবাদ' বলে প্রোপাগান্ডা ছড়ায়।



    সম্মানিত পাঠক!

    সবকিছুকে কেবল বেকারত্ব, হতাশা বা সামাজিক বৈষম্যের ফ্রেমে আটকে দেওয়াটা এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতা। রাষ্ট্র, সমাজ এবং বুদ্ধিজীবী শ্রেণির একটি অংশ নিজেদের কাঠামোগত জবাবদিহিতা এড়াতেই প্রকৃত ভূ-রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং আদর্শিক প্রতিরোধের বিষয়টিকে আড়াল করে এই 'হতাশার তত্ত্ব' প্রচার করে। আমি মনে করি, সত্যের খাতিরে আমাদের এই লোকরঞ্জনবাদী বয়ান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নিছক ব্যক্তিগত হতাশা থেকে সৃষ্ট আত্মহত্যা এবং চূড়ান্ত আদর্শিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জালিমের বিরুদ্ধে শরীয়ত-সমর্থিত সর্বোচ্চ আত্মোৎসর্গের মাঝে যে সুস্পষ্ট সীমারেখা রয়েছে, তা স্বীকার করে নেওয়াই হলো বুদ্ধিবৃত্তিক সততার প্রথম শর্ত।



    এই পর্যায়ে শহীদি হামলা নিয়ে সংশয় সৃষ্টিকারীদের কাছে কিছু প্রশ্ন রেখে লেখাটি শেষ করতে চাই-

    ১. আপনারা হতাশা থেকে সৃষ্ট 'আত্মহত্যা' এবং আদর্শিক লক্ষ্য থেকে পরিচালিত 'শহীদী অভিযান'-কে এক পাল্লায় মেপেছেন। ইন্তিহারের পলায়নপর মনস্তত্ত্ব এবং শাহাদাতের অদম্য আদর্শিক মনস্তত্ত্বের মতো সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুটি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলা কি আপনাদের চরম বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যতার প্রমাণ নয়?
    ২. রবার্ট পেপ বা মার্ক সেজম্যানের মতো বিশ্লেষকদের গবেষণার ডেটা প্রমাণ করে যে, এই হামলায় জড়িতরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দরিদ্র বা অশিক্ষিত নয়, বরং উচ্চশিক্ষিত ও সচ্ছল। আধুনিক এই অ্যাকাডেমিক সত্যকে পাশ কাটিয়ে নিছক 'চাকরি না পাওয়া'-কে কারণ হিসেবে দাঁড় করানো কি আপনাদের অজ্ঞতা, নাকি কাঠামোগত যুলুমকে আড়াল করার সুকৌশলী অপপ্রয়াস?
    ৩. বৃহত্তর স্বার্থে মৃত্যু জেনেও ঝাঁপিয়ে পড়াকে আপনারা 'বিপদগামী যুবকদের কাজ' বলেছেন। তাহলে সহিহ মুসলিমে বর্ণিত 'গুহার বালকের' ঘটনা অথবা বদর যুদ্ধে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সাহাবী উমাইর বিন আল-হুমামের (রাদিআল্লাহু আনহু) শত্রুব্যূহে ঝাঁপিয়ে পড়ার অসামান্য আত্মোৎসর্গকে আপনারা কোন ফ্রেমে ফেলবেন?"
    ৪. আপনারা দাবি করেছেন আলেমরা এসব বিষয়ে আগে সচেতন ছিলেন না। অথচ ইমাম শায়বানী, ইবন হাজার আল-আসক্বালানী এবং ইবনে তাইমিয়াসহ (রহিমাহুমুল্লাহ) চার মাজহাবের শীর্ষ ইমামরাই বৃহত্তর দ্বীনি স্বার্থে শত্রুব্যূহে নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়াকে বৈধ ও প্রশংসনীয় ফতোয়া দিয়েছেন। এই অকাট্য ফতোয়াগুলোকে আড়াল করে আপনারা কি পশ্চিমাদের শেখানো বুলিই আউড়াচ্ছেন না?
    ৫. বি-৫২ বা পরমাণু বোমার মতো সমরাস্ত্রে সজ্জিত পরাশক্তির বিরুদ্ধে এটি দুর্বলদের একটি অত্যন্ত কার্যকরী অসম যুদ্ধকৌশল (Asymmetric Warfare)। সামরিক শক্তির এই বিস্তর ফারাক এবং বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে এটিকে স্রেফ 'লোকাল বেকারত্বের সমস্যা' হিসেবে দেখিয়ে আপনারা কি পরোক্ষভাবে বৈশ্বিক জালিমদেরই দায়মুক্তি দিচ্ছেন না?

    প্লিজ নিজেদেরকে জিজ্ঞাসা করুন! আল্লাহর কাছে সৎ হোন! উম্মাহর উপর ইনসাফ করুন!

    *****

    সংশ্লিষ্ট লিংক-
    [১] লিংকঃ https://web.facebook.com/reel/1499946188131776
    “ধৈর্যশীল, সতর্ক ব্যক্তিরাই লড়াইয়ের জন্য উপযুক্ত।”
    -শাইখ উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ

  • #2
    মা শা আল্লাহ, অত্যন্ত চমৎকার লেখা। রাব্বে কারীম আপনিতে লিখনিতে বারাকাহ দান করুন,আমীন।

    Comment

    Working...
    X