আল হিকমাহ মিডিয়া পরিবেশিত
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- ষষ্ঠ পর্ব
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- ষষ্ঠ পর্ব
ইখওয়ানুল মুসলিমিন: বিপ্লবের মূলনীতি
এ দলটি বর্তমানে এক বিরাট চিন্তার কারণ। অধিকাংশ পশ্চিমা গবেষক ও তাত্ত্বিকদের ধারণা অনুযায়ী এটি স্বতন্ত্র শাসনব্যবস্থার প্রতিনিধিত্বকারী সবচেয়ে জুতসই উদাহরণ। ভারসাম্যপূর্ণ পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যবস্থার সবচেয়ে উত্তম বিকল্প, যার সাথে নির্বিঘ্ন নির্ঝঞ্ঝাট সহাবস্থান সম্ভব। বিশেষ করে ৯/১১-এর বরকতময় ঘটনার পর। এ হামলা তাদের দৃষ্টিতে উগ্রতা। কোনো অবস্থাতেই যার সাথে সহাবস্থান সম্ভব নয়।
আমরা ইখওয়ানুল মুসলিমিনের সবদিক নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি না। আমরা কেবল এ দলটির পরিবর্তন আনার যে পন্থা, তা নিয়েই আলোচনা করতে চাই। এই অধ্যায়ে আমাদের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু এটিই। আমাদের আলোচনার উদ্দেশ্য হলো, দ্বীনের পথে প্রচেষ্টাকারী ভাইয়েরা যেন নববী আদর্শ বিরোধী ও আল্লাহ কর্তৃক প্রতিশ্রুত চিরাচরিত প্রাকৃতিক নিয়ম বহির্ভূত এই মানহাজের ব্যাপারে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে সক্ষম হন। কারণ, ইখওয়ানুল মুসলিমিন দলটি শাসন ক্ষমতা লাভের জন্য এমন এক পন্থা অনুসরণ করেছে, যা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর অবতীর্ণ সত্যপন্থার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের শুরু হয়েছে "আল জিহাদু সাবিলুনা" স্লোগান দিয়ে আর তাদের শেষ শিরকী গণতন্ত্র দিয়ে।
গণতন্ত্রের মূল কথা হলো, জনগণ জনগণকে শাসন করবে। জনগণই শরীয়ত রচনা করবে। জনগণই নীতি নির্ধারণ করে শাসন করবে। জনগণই কোনো কিছুকে হালাল (আইনানুগ) সাব্যস্ত করবে। কোনো কিছুকে হারাম (বেআইনি) সাব্যস্ত করতে হলে তাও জনগণই করবে। জনগণের ক্ষমতার ঊর্ধ্বে কোনো ক্ষমতাই নেই এই মতবাদে, যদিও তা আল্লাহর ক্ষমতা হোক না কেনো। জনগণের শাসনের উপরে অন্য কারো শাসন হতে পারে না, যদিও তা আল্লাহর শাসন হোক না কেনো। জনগণের ইচ্ছার বাইরে অন্য কারো ইচ্ছা গ্রহণযোগ্য নয় এই গণতন্ত্রে, যদিও তা আল্লাহর ইচ্ছা হোক না কেনো। প্রকাশ্য ও সুস্পষ্ট কুফরী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।
অভিশপ্ত এই গণতন্ত্রের ব্যাপারে আল্লাহর ফয়সালা কী, তা জ্ঞানী চক্ষুষ্মান সত্যান্বেষীদেরর কাছে সুস্পষ্ট। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের উলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে বেখবর ও অসচেতন নন। তারা অব্যাহত ও অবিশ্রান্তভাবে এ বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ফয়সালা বর্ণনা করে যাচ্ছেন। এতে প্রবেশের ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করে চলেছেন। এসব কিছু তাঁরা করছেন কেবলই এর ভয়াবহতা এবং বিরাট অনিষ্টের কথা বিবেচনা করে। আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে এবং সকল মুসলিমকে এ থেকে হেফাজত করুন! (আমীন)
নিম্নে গণতন্ত্রের ব্যাপারে আল্লাহর ফায়সালা এবং দ্বীন ইসলাম ও মিল্লাতে ইবরাহীমের সঙ্গে এর সাংঘর্ষিকতা প্রসঙ্গে কিছু আলোকপাত করা হলো:-
প্রথম বিষয়:
গণতন্ত্র এমন একটি মতবাদ, যার মূল ভিত্তি হলো, জনগণ অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ আইনের উৎস। আল্লাহ নয় বরং তাদেরই রয়েছে আইন প্রণয়নের অধিকার। আর এটাই সর্বাধিক সুস্পষ্ট জঘন্য এক শিরক। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সাথে সাংঘর্ষিক সর্বাধিক জঘন্য বিষয় এটাই। কারণ, কালিমার দাবি হলো, শাসন এবং আইন প্রণয়নের একক অধিকার আল্লাহর, এই অধিকারে আল্লাহর সঙ্গে অন্য কারো কোনো অংশীদার নেই। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন,
وَأَنِ ٱحْكُم بَيْنَهُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَآءَهُمْ وَٱحْذَرْهُمْ أَن يَفْتِنُوكَ عَنۢ بَعْضِ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ إِلَيْكَ فَإِن تَوَلَّوْا۟ فَٱعْلَمْ أَنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ أَن يُصِيبَهُم بِبَعْضِ ذُنُوبِهِمْ وَإِنَّ كَثِيرًا مِّنَ ٱلنَّاسِ لَفَٰسِقُونَ ﴿المائدة: ٤٩﴾
‘আর আমি আদেশ করছি যে, আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুসারে ফয়সালা করুন; তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের থেকে সতর্ক থাকুন-যেন তারা আপনাকে এমন কোনো নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন। অনন্তর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে জেনে নিন, আল্লাহ তাদের নিজেদেরই কোনো গুনাহের জন্য তাদের কোনোরকম মসিবতে ফেলতে চান। মানুষের মাঝে (আসলে) অধিকাংশই হচ্ছে অবাধ্য’।[1]
অন্যত্র তিনি আরও ইরশাদ করেন-
أَمْ لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوا لَهُمْ مِنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَنْ بِهِ اللَّهُ ﴿الشورى: ٢١﴾
‘এদের কি এমন কোনো শরীক আছে, যারা এদের জন্য কোনো জীবন বিধান প্রণয়ন করে নিয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ তা’আলা দান করেননি’? [2]
দ্বিতীয় বিষয়:
গণতন্ত্র একটা নতুন ধর্মের মতো। এটা একেবারেই স্পষ্ট। এতে কোনই সন্দেহ নেই যে, গণতন্ত্র নামক এই মতবাদে, বিরোধ নিষ্পত্তি ও বিচার মীমাংসার ক্ষেত্রে বিচারক হচ্ছে জনগণ এবং তা এককভাবেই। এ কারণে কোনো অবস্থাতেই জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়া বৈধ নয়। জনগণই বিচারকারী, জনগণই আইন নির্ধারণকারী। সন্দেহ নেই উপরে যা বলা হলো তা লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ তথা ঈমান ভঙ্গের অন্যতম একটি কারণ। কারণ, এই কালিমার প্রতি ঈমান আনার অন্যতম একটি দাবি হলো, সব রকম বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ফয়সালাকারী হিসেবে মেনে নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَطِيعُوا۟ ٱللَّهَ وَأَطِيعُوا۟ ٱلرَّسُولَ وَأُو۟لِى ٱلْأَمْرِ مِنكُمْ فَإِن تَنَٰزَعْتُمْ فِى شَىْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلْيَوْمِ ٱلْءَاخِرِ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴿النساء: ٥٩﴾
‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, নির্দেশ মান্য করো রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। অতপর কোনো ব্যাপারে তোমরা যদি একে অপরের সাথে মতবিরোধ করো, তাহলে সে বিষয়টি (ফয়সালার জন্যে) আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও, যদি তোমরা (সত্যিকার অর্থে) আল্লাহর ওপর এবং শেষ বিচার দিনের ওপর ঈমান এনে থাকো! (তাহলে) এই পদ্ধতিই হবে (তোমাদের বিরোধ মীমাংসার) সর্বোৎকৃষ্ট উপায় এবং বিরোধপূর্ণ বিষয়সমূহের ব্যাখার দিক থেকেও (এটি) হচ্ছে উত্তম পন্থা’।[3]
তিনি আরো ইরশাদ করেন-
وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِن شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ ذَٰلِكُمُ اللَّهُ رَبِّي عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ ﴿الشورى: ١٠﴾
‘আর তোমরা যে কোনো বিষয়েই মতভেদ করো না কেনো তার রায় তো আল্লাহ্রই নিকট। ''তিনিই আল্লাহ্, আমার প্রভু, তাঁরই উপরে আমি নির্ভর করি, আর তাঁরই দিকে আমি প্রত্যাবর্তন করি’।[4]
তৃতীয় বিষয়:
গণতন্ত্র একটি সমসাময়িক আধুনিক ধর্ম। এতে ধর্ম, রাষ্ট্র এবং সামগ্রিক জীবন থেকে পৃথক। ধর্ম কেবল মসজিদ ও উপাসনালয়ে ইবাদাতের মাঝেই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ, রাজার শাসন জমিনে, আল্লাহর শাসন আসমানে। এর স্লোগান হলো, ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার। জীবনের সর্বক্ষেত্রে ধর্মের ব্যবহার? তা তো হতেই পারে না(!) আর এটাই অভিশপ্ত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মূলকথা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
فَقَالُوا۟ هَٰذَا لِلَّهِ بِزَعْمِهِمْ وَهَٰذَا لِشُرَكَآئِنَا فَمَا كَانَ لِشُرَكَآئِهِمْ فَلَا يَصِلُ إِلَى ٱللَّهِ وَمَا كَانَ لِلَّهِ فَهُوَ يَصِلُ إِلَىٰ شُرَكَآئِهِمْ سَآءَ مَا يَحْكُمُونَ
‘অতপর নিজ ধারণা অনুসারে বলে এ অংশ হচ্ছে আল্লাহর জন্য, আর এ অংশ হচ্ছে আমাদের অংশীদারদের। অতঃপর যে অংশ তাদের অংশীদারদের, তা তো আল্লাহর দিকে পৌঁছে না এবং যা আল্লাহর তা তাদের উপাস্যদের দিকে পৌছে যায়। তাদের বিচার কতই না মন্দ’। [5]
তিনি আরও ইরশাদ করেন-
إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَن يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَن يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَٰلِكَ سَبِيلًا ﴿النساء: ١٥٠﴾
أُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا ﴿النساء: ١٥١﴾
‘যারা আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূলদের অবিশ্বাস করে এবং আল্লাহ তা’আলা ও রাসূলদের মাঝে (এই বলে) একটা পার্থক্য করতে চায় যে, আমরা (রাসূলদের) কয়েকজনকে স্বীকার করি আবার কয়েকজনকে অস্বীকার করি, এর দ্বারা (আসলে) এরা (নিজেদের জন্যে) একটা মাঝামাঝি রাস্তা বের করে নিতে চায়।এরাই হচ্ছে সত্যিকারের কাফের, আর আমি এ কাফেরদের জন্যেই নির্দিষ্ট করে রেখেছি এক চরম লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি’। [6]
[1] সূরা আল মায়েদা; ৫: ৪৯
[2] সূরা আশ শুরা, ৪২: ২১
[3] সূরা আন নিসা ,০৪: ৫৯
[4] সূরা আশ শূরা; ৪২: ১০
[5] সূরা আনআম; ৬: ১৩৬
[6] সূরা আন নিসা; ৪: ১৫০-১৫১
আরও পড়ুন
পঞ্চম পর্ব
Comment