খারেজিদের হাতে শাইখুল হাদিস মাওলানা ইদরিস (রহিমাহুল্লাহ)-এর শাহাদাত:
বুদ্ধিবৃত্তিক অপপ্রচার এবং মুজাহিদদের প্রকৃত অবস্থান
-মুনশি আব্দুর রহমান
বুদ্ধিবৃত্তিক অপপ্রচার এবং মুজাহিদদের প্রকৃত অবস্থান
-মুনশি আব্দুর রহমান
পাকিস্তানের স্বনামধন্য দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া দারুল উলুম হাক্কানিয়ার শাইখুল হাদিস ও নিভৃতচারী জ্ঞানসাধক শাইখুল হাদিস মাওলানা ইদরিস (রহিমাহুল্লাহ)-এর মর্মান্তিক শাহাদাত মুসলিম উম্মাহর বুকে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। তবে এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি বেশ কিছু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান বা ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছে, যার একটি নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ হওয়া অত্যন্ত জরুরি-
(১)
শাইখুল হাদিস মাওলানা ইদরিস (রহিমাহুল্লাহ)-এর এই নির্মম শাহাদাতের পর মুজাহিদদের অন্যতম দল আল-কায়েদার উপমহাদেশ শাখার পক্ষ থেকে আস-সাহাব মিডিয়া (উপমহাদেশ) একটি আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা ও বিবৃতি প্রকাশ করে। উক্ত বার্তায় তাঁরা এই কাপুরুষোচিত হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁদের স্পষ্ট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে 'দায়েশ' (আইএস) নামধারী খারেজি গোষ্ঠী এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। ঐতিহাসিকভাবে এটি একটি প্রমাণিত সত্য যে, উগ্রপন্থী খারেজি গোষ্ঠীগুলো সবসময়ই আলেম-উলামা ও জ্ঞানচর্চার ধারকদের নিজেদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে থাকে।
শাইখুল হাদিস মাওলানা ইদরিস (রহিমাহুল্লাহ)-এর নির্মম হত্যাকাণ্ড যে আইএস ঘটিয়েছে, এই বিষয়টি আরও সুনিশ্চিত হয় খারেজিদের নিজস্ব বার্তার মাধ্যমে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি আনুষ্ঠানিক বার্তায় দায়েশ (ইসলামিক স্টেট খোরসান বা আইএস) এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের দায় প্রকাশ্যেই স্বীকার করে নিয়েছে। [১] তাদের এই নির্লজ্জ দায় স্বীকারের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন মুজাহিদদের দাবী সত্যতা শতভাগ প্রমাণিত হয়েছে, অন্যদিকে উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সন্তান আলেমদের প্রতি তাদের অন্ধ আক্রোশের বিষয়টিও পুনরায় উন্মোচিত হয়েছে।
(২)
এই সুস্পষ্ট বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলেম নামধারী কতিপয় ব্যক্তি সুকৌশলে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বয়ান দাঁড় করানোর অপচেষ্টা চালিয়েছেন। তারা এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের সাথে আল-কায়েদাকে যুক্ত করার হীন অপচেষ্টা চালানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
একজন ব্যক্তি তাঁর বক্তব্যে দায়েশের উগ্রপন্থার সাথে আল-কায়েদা-কেও একই পাল্লায় মেপে "আলকায়েদায়ীজম" নামক একটি ভিত্তিহীন তকমা ব্যবহার করেছেন। [২] তাঁর এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শব্দচয়নের মূল লক্ষ্য হলো প্রকৃত অপরাধী খারেজিদের আড়াল করা এবং খারেজিদের বিরুদ্ধে লড়াকু মুজাহিদদের দল আল-কায়েদার ঘাড়ে সুকৌশলে এই হত্যাকাণ্ডের দায় চাপিয়ে দেওয়া।
অন্যদিকে, আরেকজন ব্যক্তি তাঁর বক্তব্যে হত্যাকারীদের "উগ্রবাদী খারেজি" হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবেই আইএস (দায়েশ) বা আইএসআই-এর নাম এড়িয়ে গেছেন। [৩] অন্য সব ক্ষেত্রে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের নাম ধরে দোষারোপকারী একজন ব্যক্তি যখন এই সুনির্দিষ্ট ঘটনায় আইএস বা দায়েশের নাম উচ্চারণ করতে ব্যর্থ হন, তখন তার দুরভিসন্ধি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি মূলত প্রকৃত অপরাধী খারেজিদের পরোক্ষভাবে সুরক্ষা দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের মনে ধোঁয়াশা সৃষ্টির একটি সুপরিকল্পিত অপপ্রয়াস।
(৩)
এই শ্রেণীর লোকদের মতো ব্যক্তিরা যখন মুজাহিদদের ঘাড়ে আলেম হত্যার দায় চাপানোর অপচেষ্টা করেন, তখন আল-কায়েদা উপমহাদেশের "আচরণবিধি" [৪] পাঠ করলেই তাঁদের দাবির অসারতা প্রমাণিত হয়। এই আচরণবিধি অনুযায়ী আলেম-উলামাদের প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সুস্পষ্ট এবং শ্রদ্ধাপূর্ণ:
- ক. মুজাহিদরা দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করেন যে, উলামায়ে কেরাম হলেন ইসলামী সমাজের প্রকৃত নেতা। তাঁদের আনুগত্য ও নির্দেশনার মাধ্যমেই কেবল শরীয়ত প্রতিষ্ঠা হওয়া সম্ভব বলে তাঁরা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।
- খ. হক্কানি আলেম এবং দ্বীনি মাদরাসাগুলোর প্রতিরক্ষাকে তাঁরা নিজেদের অন্যতম 'অগ্রগণ্য দায়িত্ব' মনে করেন। আলেমদের ওপর সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো আগ্রাসন প্রতিহত করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁদের ওপর হওয়া যেকোনো নির্যাতনের প্রতিশোধ নেওয়াকে তাঁরা নিজেদের কর্তব্য বলে মনে করেন।
- গ. মুজাহিদরা তাঁদের সমস্ত জিহাদি সফর এবং কার্যক্রম হক্কানি উলামায়ে কেরামের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করেন। এছাড়া, যেকোনো ইলমি সমস্যায় তাঁরা আলেমদের সাথে পরামর্শ করাকে অত্যাবশ্যক মনে করেন।
এছাড়াও যেসব আলেম (উলামায়ে সু) দুনিয়ার তুচ্ছ লোভে নিজেদের জ্ঞান বিকিয়ে দিয়ে মুজাহিদদের অন্তরে গভীর আঘাত দেন, তাঁদের ব্যাপারেও মুজাহিদরা চরম সতর্কতা অবলম্বন করে থাকেন। যতক্ষণ পর্যন্ত এমন আলেমদের শরীয়ত প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে কার্যত সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ না পাওয়া যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁরা এদের হত্যা বা বন্দি করা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকেন।
(৪)
প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হওয়ার পর, সত্যের খাতিরে ও সাধারণ মানুষের মনে সৃষ্ট ধোঁয়াশা দূর করার লক্ষ্যে এই মিথ্যা ন্যারেটিভ-নির্মাতাদের কাছে আমাদের কিছু সুস্পষ্ট জিজ্ঞাসা রয়েছে:
- এক. আপনারা দায়েশের মতো একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠীর জঘন্য কর্মকাণ্ডকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘আলকায়েদায়ীজম’ তকমা দিয়ে মুজাহিদদের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করেছেন। অথচ মুজাহিদদের সুস্পষ্ট ‘আচরণবিধি’ বলছে, আলেম-উলামা ও মাদরাসার প্রতিরক্ষা করা তাদের অন্যতম 'অগ্রগণ্য দায়িত্ব'। এখন যখন দায়েশ (আইএস) নিজেই প্রকাশ্যে এই হামলার দায় স্বীকার করেছে, তখন কি আপনারা আপনাদের উদ্ভাবিত এই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট তকমাটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহারের সৎসাহস দেখাবেন?
- দুই. আপনারা পোস্টে ‘উগ্রবাদী খারেজি’ শব্দটি ব্যবহার করলেও অত্যন্ত চতুরতার সাথে দায়েশ বা আইএসআই-এর নাম এড়িয়ে গেছেন। অন্য যেকোনো বিষয়ে মুজাহিদদের নাম নিতে পারঙ্গম একজন ব্যক্তি যখন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকার পরও প্রকৃত অপরাধীর নাম নিতে কুণ্ঠাবোধ করেন, তখন সাধারণ মানুষ কি ধরে নেবে না যে—আপনারা সুকৌশলে প্রকৃত অপরাধীদেরই সুরক্ষা দিচ্ছেন?
- তিন. যে মুজাহিদরা আলেমদেরকে উম্মাহর প্রকৃত পথপ্রদর্শক মনে করে এবং মাওলানা ইদরিস (রহিমাহুল্লাহ)-এর এই মর্মান্তিক শাহাদাতে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে তীব্র শোক ও নিন্দা জানিয়েছে, তাদেরকেই কেন আপনারা সুকৌশলে খারেজিদের সমান্তরালে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা করছেন? দায়েশ খারেজিদের প্রকাশ্য দায় স্বীকারের পরও প্রকৃত খলনায়কদের আড়াল করে ইসলামি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের প্রতি এই বিদ্বেষ ছড়ানোর নেপথ্যে আপনারা আসলে কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন?
(৫)
শত্রুরা আজ মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে এক বহুমুখী ও সুগভীর ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে। একদিকে দায়েশের মতো খারেজি গোষ্ঠীগুলো আলেমদের রক্তে নিজেদের হাত রঞ্জিত করছে, অন্যদিকে কিছু অনলাইন এক্টিভিস্ট বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে সেই হত্যার দায় সুকৌশলে ইসলামি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ঘাড়ে চাপানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি হলো আলেম সমাজ ও মুজাহিদদের মাঝে অবিশ্বাস, বিভ্রান্তি ও দূরত্বের প্রাচীর গড়ে তোলার এক সুপরিকল্পিত নীলনকশা।
তাগুতি রাষ্ট্রযন্ত্র ও তাদের দোসররা খুব ভালো করেই জানে যে, উলামায়ে কেরামের আদর্শিক প্রজ্ঞা এবং প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ত্যাগের যদি শুভ সম্মিলন ঘটে, তবে তাদের মিথ্যার প্রাসাদ ধসে পড়তে বাধ্য।
এমতাবস্থায় সাধারণ মুসলমান, বিশেষ করে সচেতন তরুণ সমাজ এবং উলামায়ে কেরামকে এই সুকৌশলী প্রতারণার বিষয়ে অত্যন্ত সজাগ থাকতে হবে। ভিত্তিহীন প্রোপাগান্ডা ও চটকদার বয়ানের ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভুল বোঝার আজ আর কোনো অবকাশ নেই। দায়েশের মতো চরমপন্থী খারেজি ফিতনা এবং আইএসআই-এর মতো ষড়যন্ত্রকারী শক্তির এই সম্মিলিত অপপ্রয়াস রুখে দিতে হলে, আলেম সমাজ ও মুজাহিদদের মধ্যকার পারস্পরিক আস্থা ও ইস্পাতকঠিন ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। সময় এসেছে সচেতন হওয়ার এবং শত্রুর পাতা এই বিভেদের ফাঁদকে প্রজ্ঞার সাথে ছিন্ন করার।
(৬)
সম্মানিত পাঠক! উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, মুজাহিদদের কাছে আলেম-উলামাদের সম্মান ও জীবন অত্যন্ত পবিত্র। তাঁরা সর্বদা আলেম সমাজের সুরক্ষায় সচেষ্ট। সুতরাং, শাইখুল হাদিস মাওলানা ইদরিস (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতো একজন নিভৃতচারী জ্ঞানসাধক আলেমের মর্মান্তিক শাহাদাতকে কেন্দ্র করে কতিপয় ব্যক্তি যে বুঝে-না বুঝে যে প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছেন, তা সম্পূর্ণ অবাস্তব ও ভিত্তিহীন। এটি মূলত প্রকৃত অপরাধী দায়েশ খারেজি ও আইএসআই-কে আড়াল করে মুজাহিদদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর একটি সুস্পষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
*****
সংশ্লিষ্ট টীকা ও লিংক-
[১] খারেজি আইএসের দায় স্বীকার- https://archive.ph/DwA1v
[২] https://archive.ph/yWvzQ
[৩] https://archive.ph/2pZuw
[৪] সাধারণ মুজাহিদিন ও উমারাদের আচরণবিধি - উপমহাদেশে জিহাদের নির্দেশিকা - https://archive.ph/q81jK