মালির প্রতিরোধ যোদ্ধারা কী আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে?
মূল: হামিদ আল-কৌসি
অনুবাদ: মুনশি আব্দুর রহমান

মূল: হামিদ আল-কৌসি
অনুবাদ: মুনশি আব্দুর রহমান
মালির রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে রুশ আধিপত্য উচ্ছেদের জোর দাবি জানানোর পাশাপাশি 'আজাওয়াদ লিবারেশন ফ্রন্ট' (#FLA)-এর সাথে 'জামা'আত নুসরাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন' (#JNIM) যে মৈত্রী গড়ে তুলেছে, তাকে কেন্দ্র করে একটি প্রশ্ন সঙ্গত কারণেই সামনে আসে। তা হলো—আল-কায়েদা কি তাদের দীর্ঘদিনের আদর্শিক রূপরেখা [১] থেকে সরে এসেছে? নাকি এই পদক্ষেপগুলোর শেকড় খোদ সংগঠনের পুরনো নীতিনির্ধারণী দর্শনের গভীরেই নিহিত রয়েছে?
সমালোচকদের দৃষ্টিতে এই প্রবণতাটি আল-কায়েদার প্রথাগত ধারা ও নীতিনির্ধারণী সাহিত্যের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কিন্তু তাদের এই দাবিটি সংগঠনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও কৌশলগত ঐতিহ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিককে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়। মূলত শাইখ উসামা বিন লাদেনের যুগ থেকেই আল-কায়েদা দ্বন্দ্ব ও সংঘাত পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাপক নমনীয়তার পরিচয় দিয়ে এসেছে। আর তাদের এই নমনীয়তার মূল ভিত্তি হলো 'মাসালিহ ও মাফাসিদ' (কল্যাণ ও ক্ষতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা) এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী অগ্রাধিকার নির্ধারণের নীতি।
এর সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলে ইয়েমেনে আল-কায়েদার তৎকালীন আমীর আবু বাসির নাসের বিন আবদুল করিম আল-উহায়শির কাছে লেখা শাইখ উসামা বিন লাদেনের একটি চিঠিতে; যা পরবর্তীতে অ্যাবোটাবাদের নথিপত্রে পাওয়া যায়। ইয়েমেনের রাজধানী সানা নিয়ন্ত্রণের অনুমতি চেয়ে আল-উহায়শি যখন চিঠি লিখেছিলেন, জবাবে বিন লাদেন তাকে তাড়াহুড়ো করতে নিষেধ করেন। তিনি মনে করেছিলেন, সেই মুহূর্তে আলী আবদুল্লাহ সালেহ সরকারের পতন ঘটানো সংগঠনের জন্য খুব একটা কল্যাণকর হবে না। কারণ, সম্ভাব্য অন্যান্য বিকল্পের চেয়ে ওই সরকারটি তাদের জন্য তুলনামূলক কম ক্ষতিকর ছিল। পাশাপাশি, কল্যাণ ও ক্ষতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বৃহত্তর নীতির অংশ হিসেবে তিনি সেসময় পরিস্থিতি শান্ত রাখা এবং সরকারের সাথে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোরও পরামর্শ দিয়েছিলেন।
ঠিক একই যুক্তির ওপর ভিত্তি করে 'জামা'আত নুসরাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন' মনে করে, মালির সরকার বা রুশ বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে স্থানীয় অন্যান্য পক্ষের সাথে বোঝাপড়ায় আসা তাদের জন্য অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর। সুতরাং, সাম্প্রতিক এসব পদক্ষেপকে আল-কায়েদার আদর্শিক রীতিনীতির লঙ্ঘন হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বরং এটিকে তাদের দীর্ঘদিনের সুপ্রতিষ্ঠিত কৌশলের একটি স্বাভাবিক সম্প্রসারণ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। এই কৌশল মূলত 'ফিকহুল মুওয়াজানাত' (ভারসাম্য রক্ষার ইসলামি বিচারবুদ্ধি) এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণের মাধ্যমে লাভ-ক্ষতি যাচাইয়ের নীতির ওপর সুদৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান।
*****
সংশ্লিষ্ট টীকা-
[১] এখানে আদর্শ বলতে মূলত আল-কায়েদার ঐতিহ্যগত ও আপোষহীন বৈশ্বিক জিহাদি রীতিনীতিকেই বুঝানো হয়েছে। তাদের প্রথাগত আদর্শিক রূপরেখার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো—কেবলমাত্র ইসলামি গোষ্ঠীগুলোর সাথেই কাজ করা। সেইসঙ্গে যেকোনো ধর্মনিরপেক্ষ, জাতীয়তাবাদী কিংবা 'তাগুত' (ধর্মত্যাগী) কাঠামোর সাথে সকল প্রকার আপোষ বা মৈত্রী সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা। অন্যদিকে, 'আজাওয়াদ লিবারেশন ফ্রন্ট' (#FLA) সম্পর্কে বলা হয় যে, এটি একটি স্থানীয় জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী। সুতরাং, তাদের সাথে 'জামা'আত নুসরাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন'-এর এই নবগঠিত মৈত্রী আপাতদৃষ্টিতে আল-কায়েদার সেই কঠোর ও আপোষহীন অবস্থান থেকে এক ধরনের 'বিচ্যুতি' বলেই মনে হতে পারে। অবশ্য আমরা পূর্বেই এক প্রবন্ধে দেখিয়েছি যে, আজাওয়াদ লিবারেশন ফ্রন্ট শরিয়াহ আইন মেনে নিতে রাজি হয়েছে। -অনুবাদক
সতর্কবার্তা: এই লেখাটি মূলত আপনাদের তথ্যগত অবগতির উদ্দেশ্যে অনুবাদ করা হলো। সুতরাং, এখানে প্রদত্ত বিষয়গুলোকে চূড়ান্ত বা অকাট্য প্রমাণ হিসেবে ধরে না নেওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। উল্লেখ্য, রচনায় উপস্থাপিত যাবতীয় চিন্তাধারা ও বক্তব্যের দায়ভার একান্তই মূল লেখকের নিজস্ব। তাঁর সকল মতাদর্শ বা বিশ্লেষণের সাথে আমাদের পুরোপুরি মতৈক্য থাকতে হবে—এমনটি কোনোভাবেই অপরিহার্য নয়। তাদের চিন্তাধারা আমাদের জানা দরকার, আর মূলত এ কারণেই আমাদের এই আর্টিকেল অনুবাদ করা হয়েছে। -অনুবাদক
Comment