নতুন সিরীয় কর্তৃপক্ষ কি তবে তাদের পুরোনো মিত্রদের চিরতরে মুছে ফেলার কাজে হাত দিয়েছে?
[ 'আর-রুশদ সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ' থেকে প্রকাশিত আর্টিকেল ]
অনুবাদ: মুনশি আব্দুর রহমান
[ 'আর-রুশদ সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ' থেকে প্রকাশিত আর্টিকেল ]
অনুবাদ: মুনশি আব্দুর রহমান
ইদলিবের গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে বর্তমানে বিদেশি যোদ্ধাদের, বিশেষ করে উজবেকদের লক্ষ্য করে একটি সুপরিকল্পিত নিরাপত্তা অভিযান চলছে। কাফরিয়া, ফুয়া এবং কাফর জালিস এলাকায় ব্যাপক ধরপাকড় ও তল্লাশির খবর পাওয়া যাচ্ছে। এর পাশাপাশি গোলাগুলি ও চরম মাঠপর্যায়ের উত্তেজনার গুঞ্জনও বাতাসে ভাসছে।
এসব ঘটনার সংখ্যা ও বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে অবশ্য এখনও বিভিন্ন মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। কিছু সূত্রের দাবি, বেশ কয়েকজন উজবেক যোদ্ধাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আবার অন্য সূত্রের মতে, গ্রেপ্তারের এই সংখ্যা 'কয়েক ডজন' ছাড়িয়ে গেছে। এদিকে খোদ মুহাজিরদের নিজস্ব বলয় থেকে আসা খবরগুলো বলছে এই অভিযানের পরিধি আরও অনেক বিস্তৃত। এটি সরাসরি তাদের সম্মান ও পরিবারের নিরাপত্তার ওপর আঘাত হানছে।
সুতরাং, বিষয়টি আর কেবল বিক্ষিপ্ত কিছু গ্রেপ্তারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। একে পারিপার্শ্বিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো সাধারণ নিরাপত্তা-ঘটনা হিসেবে দেখারও আর কোনো সুযোগ অবশিষ্ট নেই।
আমরা আসলে এখন নিছক তল্লাশি বা নিরাপত্তা-চাপের চেয়েও অনেক বড় ও জটিল একটি দৃশ্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। এটি মূলত নতুন কর্তৃপক্ষের সাথে সেইসব যোদ্ধাদের সম্পর্কের একটি অগ্নিপরীক্ষা, যারা একসময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিল; কিন্তু এখন কর্তৃপক্ষের নতুন প্রকল্পে 'নীরব পুতুল-সৈন্য' হয়ে থাকতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। অন্যদিকে, তাদের জিহাদি প্রতিপক্ষরা এই নতুন প্রকল্পটিকে আদি আদর্শ থেকে বিচ্যুতি এবং আন্তর্জাতিক জোট ও ওয়াশিংটনের কাছে আত্মসমর্পণ হিসেবেই আখ্যায়িত করছে।
ইদলিবে বর্তমানে যা ঘটছে, তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আহমদ আশ-শারা (হায়াত তাহরির আশ-শামের নেতা আবু মুহাম্মাদ আল-জুলানি)-এর সম্পর্কের সমীকরণ থেকে আলাদা করে দেখার কোনো উপায় নেই।
ট্রাম্পের সাথে রিয়াদ বৈঠকের পর, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অন্যতম শর্ত হিসেবে বিদেশি যোদ্ধাদের বিষয়টি সামনে চলে আসে। এক্ষেত্রে মার্কিনীদের দাবি কেবল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তাদের স্পষ্ট দাবি ছিল—কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিদের তাদের নিজ দেশে অথবা আন্তর্জাতিক জোটের হাতে তুলে দেওয়া হোক। আর বাকিদের বাধ্য করা হোক সিরিয়া ছাড়তে। নতুবা নতুন রাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতরে এমনভাবে তাদের আত্মীকরণ করা হোক, যাতে তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত, স্লোগান ও অস্ত্র নিয়ে কোনোভাবেই একটি স্বাধীন গোষ্ঠী হিসেবে টিকে থাকতে না পারে।
পরবর্তীতে ওয়াশিংটন তুলনামূলক একটি নমনীয় প্রস্তাবে সম্মত হয়। শর্ত সাপেক্ষে হাজার হাজার বিদেশি যোদ্ধাকে সিরীয় সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি তারা মেনে নেয় ঠিকই, তবে এর জন্য পূর্ণ স্বচ্ছতা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণের শর্ত জুড়ে দেয়।
এর সোজা অর্থ হলো, নতুন কর্তৃপক্ষ এই কাজের জন্য কিছুটা বাড়তি সময় পেয়েছে মাত্র; এটিকে কোনোভাবেই তাদের জন্য উন্মুক্ত ছাড়পত্র বলা চলে না।
এখন তাদের প্রমাণ করতে হবে যে, তারা এই 'মুহাজির' সংকটটি সফলভাবে সামলাতে সক্ষম। তাদের নিশ্চিত করতে হবে—যারা এই অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবে কিংবা আমেরিকা ও আন্তর্জাতিক জোটের সাথে এই সমঝোতা-প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করবে, তারা কোনোভাবেই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারবে না।
পূর্ববর্তী আসাদ সরকারের পতনের ঠিক পরপরই এই বিদেশি যোদ্ধাদের অনেকেই নতুন কর্তৃপক্ষের প্রতি গভীর আস্থা ও সুধারণা পোষণ করেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, সময়টা এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। শাসনব্যবস্থা পরিচালনার নিজস্ব কিছু হিসাব-নিকাশ থাকে, তাই কর্তৃপক্ষের কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। তারা আরও বিশ্বাস করতেন যে, কর্তৃপক্ষের কিছু ছাড় দেওয়া হয়তো নিছকই রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা; এটিকে মূল পথ থেকে সরে যাওয়া বা আদর্শের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে আখ্যায়িত করার সুযোগ নেই।
যখনই আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে আঁতাত কিংবা বিদেশি স্বীকৃতির শর্তগুলোর কোনো নতুন দিক উন্মোচিত হতো, তখনই তাদের মাঝখান থেকে কেউ না কেউ ধৈর্য ধরার আহ্বান জানাত। তারা বিষয়টিকে নতুন একটি সুযোগ হিসেবে দেখত এবং এর সপক্ষে কোনো না কোনো ব্যাখ্যার খোঁজ করত।
কিন্তু একের পর এক পুঞ্জীভূত ঘটনা ক্রমশ সেইসব স্খলন ও ভুলত্রুটি ঢেকে রাখার পথ রুদ্ধ করে দিতে শুরু করে। হারেমে অবস্থানরত ফরাসি যোদ্ধাদের ঘটনা থেকে শুরু করে উজবেক নেতাদের গ্রেপ্তার, উইঘুর ও তুর্কিস্তানিদের নিয়ে গুঞ্জন, হুররাস আদ-দ্বীন-এর ডজন ডজন সদস্যকে বন্দি করা, বর্তমান সিরীয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক জোটের নিখুঁত বিমান হামলায় অসংখ্য যোদ্ধার প্রাণহানি—এবং সবশেষে ইদলিবে চলমান এই সাঁড়াশি অভিযান। এতোসব ঘটনার পর, পুরোনো সেই স্লোগানে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষের পক্ষে এগুলোকে আর বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া চরম কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই প্রেক্ষাপটে, মুহাজিরদের ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে একটি মারাত্মক অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ছে। বলা হচ্ছে যে, কাফরিয়া ও ফুয়া অঞ্চলে যে বাহিনী অভিযান চালিয়েছে, তাদের মধ্যে এমন অনেকেই রয়েছে, যারা অতীতে এই বিদেশি যোদ্ধাদের ঘোরতর শত্রু ছিল। এদের মধ্যে কাউকে কাউকে এসডিএফ (সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস) বা পূর্ববর্তী আসাদ আমলের 'শাবিহা' (সরকারপন্থী মিলিশিয়া) হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে; যারা পরবর্তীতে নতুন সমঝোতার অধীনে বর্তমান সাধারণ নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দিয়েছে।
ফলে মুহাজিররা এই অভিযানটিকে কেবল একটি সাধারণ নিরাপত্তা পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন না; বরং তারা একে একটি বৃহত্তর রূপান্তরের অংশ হিসেবেই পাঠ করছেন। তারা দেখছেন—নতুন কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে একসময়ের রণাঙ্গনের মিত্রদের ছুড়ে ফেলছে এবং নতুন রাষ্ট্রের স্বার্থের মানদণ্ডে পুরোনো শত্রু-মিত্রের সমীকরণ নতুন করে সাজাচ্ছে।
আর ঠিক এখানেই উজবেক সংকটের আসল তাৎপর্য লুকিয়ে আছে। কর্তৃপক্ষ তাদের সাথে কেবল আইন অমান্যকারী কোনো সাধারণ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে আচরণ করছে না; বরং তাদের মাধ্যমে বাকি সমস্ত মুহাজিরদের কাছে একটি প্রচ্ছন্ন বার্তাই পৌঁছে দিতে চাইছে।
বার্তাটি হলো—যে এই নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাঝে নিজেকে বিলীন করে দিতে রাজি হবে, তাকে সাদরে গ্রহণ করা হবে। আর যে পুরোনো আদর্শ আঁকড়ে ধরে বসে থাকবে এবং 'জিহাদ ও উম্মাহ'-এর বয়ান থেকে সরে এসে রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও ওয়াশিংটনের সাথে সমঝোতার নতুন বয়ান মেনে নিতে অস্বীকার করবে, তাকে গ্রেপ্তার, মানসিক চাপ অথবা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
মূলত এটাই হলো প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত মুহূর্ত। যে মুহাজিরকে গতকালও রণাঙ্গনে নিজের আপন ভাই হিসেবে বুকে টেনে নেওয়া হয়েছিল, আজ সেই একই ব্যক্তি নতুন রাষ্ট্রের চকচকে ভাবমূর্তির ওপর এক বিশাল বোঝায় পরিণত হয়েছেন। আসাদ পতনের দীর্ঘ যাত্রায় যে বন্দুকটি একসময় অপরিহার্য ছিল, আজ ট্রাম্প ও আন্তর্জাতিক জোটের শর্ত অনুযায়ী পরিচালিত হতে অস্বীকৃতি জানালে সেই একই বন্দুক আর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য থাকছে না।
একজন মুহাজির ততক্ষণই মিত্র হিসেবে গণ্য হন, যতক্ষণ তিনি কর্তৃপক্ষের নির্দেশিত পথে চলেন। কিন্তু যখনই তিনি নতুন বিশ্বব্যবস্থার কাছে আনুগত্য প্রমাণের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা কোনো প্রতিষ্ঠানের নিছক একটি 'নম্বর' বা সংখ্যায় পরিণত হতে অস্বীকৃতি জানান, তখনই তিনি কেবল একটি 'নিরাপত্তা-ফাইল'-এ পরিণত হয়ে যান।
তাই এখনকার প্রশ্নটি আর কেবল কতজন গ্রেপ্তার হলো তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের সেই প্রতিশ্রুতির মূল্য চুকাতে গিয়ে নিরাপত্তা-বলিদানের সময় কি তবে শুরু হয়ে গেছে? আসাদের পতন ঘটাতে যে মুহাজিররা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়েছিলেন, তারা কি এখন আসাদ পতনের পর গড়ে ওঠা এই নতুন রাষ্ট্রেরই শিকারে পরিণত হলেন?
*****
সতর্কবার্তা: এই লেখাটি মূলত আপনাদের তথ্যগত অবগতির উদ্দেশ্যে অনুবাদ করা হলো। সুতরাং, এখানে প্রদত্ত বিষয়গুলোকে চূড়ান্ত বা অকাট্য প্রমাণ হিসেবে ধরে না নেওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। উল্লেখ্য, রচনায় উপস্থাপিত যাবতীয় চিন্তাধারা ও বক্তব্যের দায়ভার একান্তই মূল লেখকের নিজস্ব। তাঁর সকল মতাদর্শ বা বিশ্লেষণের সাথে আমাদের পুরোপুরি মতৈক্য থাকতে হবে—এমনটি কোনোভাবেই অপরিহার্য নয়। তাদের চিন্তাধারা আমাদের জানা দরকার, আর মূলত এ কারণেই আমাদের এই আর্টিকেল অনুবাদ করা হয়েছে। -অনুবাদক
Comment