তাকফিরি দর্শনের তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ
পর্ব-১
উলামায়ে দেওবন্দের উপর আইএসের উত্থাপিত আপত্তিসমূহের জবাব
পর্ব-১
উলামায়ে দেওবন্দের উপর আইএসের উত্থাপিত আপত্তিসমূহের জবাব
-মুনশি আব্দুর রহমান
সম্প্রতি পাকিস্তানে একজন বিশিষ্ট আলেমের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর খারিজি মতাদর্শী গোষ্ঠী আইএস-এর মুখপত্র ‘আন-নাবা’-তে একটি দীর্ঘ সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছে। এই লেখায় তারা ওই হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে এবং দেওবন্দি আলেমদের বিরুদ্ধে কুফর, শিরক ও ধর্মব্যবসার গুরুতর অভিযোগ এনেছে। মূলত এই সম্পাদকীয়টি তাদের চিরাচরিত তাকফিরি দর্শনেরই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। এখানে তারা কুরআন ও সুন্নাহর খণ্ডিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে মুসলমানদের রক্ত হালাল করার সেই প্রাচীন খারিজি পন্থাই অবলম্বন করেছে। নিম্নে আইএসের অবস্থান উল্লেখ করে তাদের উত্থাপিত প্রধান সংশয়গুলোর জবাব উপস্থাপন করা হলো—
অবস্থান-১. তাবীলের ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও ভোটদানের পক্ষে বলায় আলিমদের তাকফির করা।
আইএসের অবস্থান:
"الذهاب للتصويت عبادة، أرجو أن تتوضؤوا في الصباح الباكر وتصلوا ركعتين نافلة، وعندما تذهبون إلى مركز الاقتراع، ستكونون هناك وحدكم... ستكون وحدك أمام الله، فاستشعر مراقبته، وتوجه نحو القبلة، وصوّت لمن تراه مناسبًا." "تخيل أن هذا الخطاب الذي يتفجر ديمقراطية وبالضرورة كفرا، هو واحد من خطابات عديدة صادرة عن أبرز مشايخ "جامعة الجهاد" -كما يسمونها- وأشهر "الحوزات العلمية"..."
অর্থঃ 'ভোট দিতে যাওয়া একটি ইবাদত। ...আপনি কেবল আল্লাহর সামনে একাকী থাকবেন, তাই তাঁর নজরদারির অনুভূতি নিজের মধ্যে জাগ্রত করুন, কেবলার দিকে মুখ করুন এবং যাকে উপযুক্ত মনে করেন তাকে ভোট দিন।' — কল্পনা করুন, গণতন্ত্র এবং অপরিহার্যভাবে কুফরে ভরপুর এই বক্তব্যটি সেই অসংখ্য বক্তব্যের একটি, যা তথাকথিত 'জিহাদী জামিয়া' (জিহাদি মাদরাসা)-এর শীর্ষস্থানীয় শায়খদের কাছ থেকে এবং সবচেয়ে বিখ্যাত 'ধর্মীয় বিদ্যাপীঠ' থেকে নির্গত হয়েছে।"
জবাব: আইএসের এই দাবির খণ্ডনে এবং প্রকৃত সত্য অনুধাবনে আমাদের দুটি বিষয় অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বুঝতে হবে। প্রথমত, আলেমদের ইজতিহাদ ও নিয়ত কী; এবং দ্বিতীয়ত, তাত্ত্বিকভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রকৃত শরয়ি হুকুম কী।
উলামায়ে কেরাম যখন গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণের কথা বলেন, তারা কখনোই পশ্চিমা গণতন্ত্রকে ভালোবেসে বা একে ঐশী আইনের বিকল্প মনে করে তা করেন না। জনগণের সার্বভৌমত্ব কিংবা আইন প্রণয়নের ক্ষমতার মত গণতন্ত্রের কুফরী আকীদাগুলোকেও তারা গ্রহণ করেননা। তবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষমতা পুরোপুরি যেন সেক্যুলারদের হাতে না চলে যায়, সে জন্য তারা ভোটে অংশগ্রহণকে করাকে একটি শরয়ী জরুরত মনে করেন, এটাকে নাহি আনিল মুনকারের অংশ মনে করেন। খারাপ প্রার্থীর বিপরীতে তুলনামূলক ভালো প্রার্থীকে ভোট দেয়ার এই প্রক্রিয়াকে তারা শরিয়তের ‘শাহাদাহ’ (সাক্ষ্য), ‘শাফায়াত’ (সুপারিশ) বা ‘ওয়াকালাহ’ (প্রতিনিধিত্ব)-এর একটি রূপ হিসেবে ব্যাখ্যা (তাবিল) করেন। তাদের এই ইজতিহাদের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রচলিত সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঠামোতে যতটুকু সম্ভব জনকল্যাণ নিশ্চিত করা এবং ধর্মনিরপেক্ষ কুফরি আইনের পথ রুদ্ধ করা। তারা একে বৃহত্তর ক্ষতি থেকে সমাজকে বাঁচানোর একটি কৌশল বা 'আহওয়ানুল বালিয়্যাতাইন' (দুটি ক্ষতির মধ্যে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ক্ষতিটি বেছে নেওয়া) হিসেবেই মনে করে থাকেন। "খারাপ প্রার্থীকে ঠেকিয়ে ভালো প্রার্থী নির্বাচিত করা মুসলমানদের জিম্মাদারী, আর এ জন্য ভোট দেয়া একটি শরয়ী দায়িত্ব এবং আমানত"- এমন তাবীল ও ভুল ধারণা থেকেই সম্ভবত শায়েখ ইদরিস হাক্কানী রহিমাহুল্লাহ ভোটপ্রদানকে ইবাদত হিসেবে উল্লেখ করে বক্তব্য দিয়েছিলেন।
উলামায়ে কেরামের উদ্দেশ্য সৎ এবং ইসলাম রক্ষার স্বার্থে নিবেদিত হলেও, তাত্ত্বিক ও নিখাদ শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের এই কর্মপন্থা ও ইজতিহাদ সঠিক নয়। প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আসেম উমর রহিমাহুল্লাহ রচিত "ইসলাম ও গণতন্ত্র" বইতে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, গণতন্ত্র কেবল একটি নিরীহ নির্বাচন প্রক্রিয়া বা নিছক কৌশল নয়। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে হালাল-হারাম নির্ধারণ ও আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত ক্ষমতা বা 'রুবুবিয়াত' একটি সিফাত জনগণের হাতে (বা পার্লামেন্টের) হাতে ন্যস্ত করা হয়।
এই ব্যবস্থায় ভোট দেওয়াকে ইসলামি 'শূরা' বা পবিত্র আমানতের সমার্থক মনে করা একটি ভুল ধারণা। কারণ, ইসলামে কেবল মুত্তাকি ও জ্ঞানীদের পরামর্শের মূল্য আছে, কিন্তু গণতন্ত্রে একজন আলেম এবং একজন পাপিষ্ঠ-জাহেলের ভোটের মান সমান। তাছাড়া পার্লামেন্টকে সকল ধরনের আইন প্রণয়নের অধিকার দেওয়া মানে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে মাবুদ হিসেবে মেনে নেওয়া। সুতরাং, কুফরি ব্যবস্থার অধীনে থেকে বা মানবসৃষ্ট আইনের অংশ হয়ে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা তাত্ত্বিকভাবে একটি ভ্রান্ত ইজতিহাদ। এ ছাড়াও, একজন সংসদ সদস্যকে কুফরী সংবিধান রক্ষার শপথ নিতে হয়, অথচ প্রাণহানী বা অঙ্গহানীর বাস্তব হুমকির মুখে নিতান্ত অপারগ না হলে এই ধরনের শপথগ্রহণ কোনোভাবেই জায়েজ হয়না।
আবার এটাও বোঝা জরুরী, এই ইজতিহাদ এবং তাবীল সঠিক না হলেও, এটির উপস্থিতির কারণে তাকফির করার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। খারিজি আইএসের সবচেয়ে বড় বিচ্যুতি হলো— তারা উলামায়ে কেরামের এই তাত্ত্বিক বা ইজতিহাদি ভুলটিকে পুঁজি করে ঢালাওভাবে তাদেরকে ‘গণতন্ত্র নামক ধর্মের শাইখ’ বা 'মুরতাদ' আখ্যা দিয়েছে এবং তাদের রক্ত হালাল ঘোষণা করেছে।
অথচ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সুস্পষ্ট মূলনীতি হলো, কোনো মুসলমান (বিশেষত আলেম) যদি শরয়ি ব্যাখ্যা বা 'তাবিল'-এর ভিত্তিতে কোনো কাজে লিপ্ত হন, তবে তাকে কাফির বা মুরতাদ বলা যায় না। তাকফিরের মাওয়ানে' (তথা প্রতিবন্ধকগুলোর) মধ্যে অন্যতম হল তাবীল। আলেমদের কাছে 'তাবিল' রয়েছে যে তারা শরিয়তের স্বার্থেই এই পথে গেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে 'জরুরত' বা অপারগতার শিকার হয়ে তারা এ পথে গেছেন। ইসলামি শরিয়তের নীতি অনুযায়ী, বিচারক বা আলেম যদি ইজতিহাদ এবং তাবীলের ভিত্তিতে ভুলও করেন, তবু সেটা তাকফিরের প্রতিবন্ধক, এ ক্ষেত্রে তাকে কাফির সাব্যস্ত করা যায় না।
উলামায়ে কেরাম গণতন্ত্রকে শরয়ি ব্যবস্থা বা ধর্ম বা আকীদা হিসেবে গ্রহণ করেননি, বরং বাতিলকে প্রতিহত করার ভুল কৌশলকে সঠিক মনে করে একে ব্যবহার করেছেন। একটি ভুল কৌশল অবলম্বন করার কারণে তারা কখনোই 'গণতন্ত্রের শাইখ' হয়ে যাননি, আর তাদের হত্যা করাও শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হয়ে যায় না, যেহেতু তারা গণতন্ত্রের আকীদাকে প্রত্যাখ্যান করেন।। আইএসের এই তাকফির মূলত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সেই ভবিষ্যদ্বাণীরই চরম বাস্তব রূপ, যেখানে বলা হয়েছে খারিজিরা মুসলমানদের হত্যা করবে আর মূর্তিপূজকদের ছেড়ে দেবে। আলেমদের ইজতিহাদি ভুলকে কুফর আখ্যা দিয়ে তাদের হত্যা করা কেবল অবৈধই নয়, বরং এটি জঘন্যতম অপরাধ।
অবস্থান- ২. 'হিওয়ার ও সুলহ' তথা সংলাপ ও সন্ধিপ্রচেষ্টাকে 'কুফর' আখ্যা দেওয়া
আইএসের অবস্থান:
"...كما قاد جهود الإصلاح بين "حكومة القاعدة" والحكومة الباكستانية..." "لكن ما كان لافتا في ثناء الإخوان على شيخ القاعدة وطالبان؛ هو تسليطهم الضوء على دعمه للحوار بين طالبان وباكستان
"...যেমনটি সে (নিহত আলেম) 'আল-কায়েদা সরকার' এবং পাকিস্তান সরকারের মধ্যে সংলাপ ও সন্ধি প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিয়েছিল... তবে আল-কায়েদা ও তালেবানের এই শায়খের প্রতি ইখওয়ানদের (মুসলিম ব্রাদারহুড) প্রশংসার মধ্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে লক্ষণীয় ছিল; তা হলো— তালেবান এবং পাকিস্তানের মধ্যকার সংলাপে তার (নিহত আলেমের) সমর্থনের দিকটি তারা বিশেষভাবে তুলে ধরেছে..."
অর্থাৎ আইএসের 'আন-নাবা' সম্পাদকীয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা নিহত আলেমকে কেবল 'গণতন্ত্রের' কারণেই আক্রমণ করেনি, বরং তার কূটনৈতিক ও মধ্যস্থতামূলক ভূমিকার কারণেও তীব্র বিষোদ্গার করেছে। আইএস আক্ষেপ করে বলেছে যে, এই আলেম "আল-কায়েদা এবং পাকিস্তান সরকারের মধ্যে আপস-মীমাংসা বা সংস্কারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন"। এছাড়াও, আফগান তালেবান ও পাকিস্তানের মধ্যে 'সংলাপ'-এ তার সমর্থন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক মধ্যস্থতার কারণে আইএস তাকে এবং তার সমর্থক মুজাহিদদের 'আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার হাতের পুতুল' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
জবাব: আইএসের এই অভিযোগটি মূলত তাদের ঐতিহাসিক শেকড় এবং প্রকৃত খারিজি পরিচয়ের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এই বিষয়টি খণ্ডনের জন্য নিচের দুটি আলোচনা অনুধাবন করা অপরিহার্য:
১. ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, খারিজিদের আদি রূপটি ঠিক এই সন্ধিপ্রচেষ্টা বা 'সুলহ'-এর বিরোধিতার মাধ্যমেই আত্মপ্রকাশ করেছিল। হজরত আলী (রাদিআল্লাহু আনহু) এবং হজরত মুয়াবিয়া (রাদিআল্লাহু আনহু)-এর মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাত এড়ানোর জন্য যখন একটি সালিশি বা আপস-মীমাংসা (যাকে 'তাহকিম' বলা হয়) করা হয়েছিল, তখন প্রথম যুগের খারিজিরা এই সিদ্ধান্তকে মেনে নেয়নি। তারা এই 'তাহকিম' বা আপস-মীমাংসাকে ‘কুফর’ আখ্যা দিয়েছিল এবং স্লোগান তুলেছিল, “ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ” (বিধান কেবল আল্লাহর; সূরা ইউসুফ: ৪০)।
অর্থাৎ, খারিজিদের দাবি ছিল— আল্লাহর জমিনে কোনো মানুষের তৈরি সালিশি বা মধ্যস্থতা চলতে পারে না। তাদের এই স্লোগান সম্পর্কে হজরত আলী (রাদিআল্লাহু আনহু) বলেছিলেন, “কথাটি সত্য, কিন্তু এর মাধ্যমে তারা বাতিল অর্থ উদ্দেশ্য নিয়েছে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৬৬)। এবং এই আপস-মীমাংসায় অংশ নেওয়ার কারণেই খারিজিরা হজরত আলী (রাদিআল্লাহু আনহু)-কে কাফির সাব্যস্ত করেছিল।
২. আজকের যুগে আইএস ঠিক একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করছে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে থাকা আলেমরা যখন মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে মুজাহিদ এবং রাষ্ট্রশক্তির মধ্যে চুক্তি, সন্ধি বা সংলাপের উদ্যোগ নেন, আইএস তাকে 'কুফর' বা 'গোয়েন্দা সংস্থার দালালি' হিসেবে আখ্যায়িত করে। তারা মনে করে যে, লড়াই বা ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়া যেকোনো ধরনের আলোচনা বা চুক্তিই হলো তাগুতের প্রতি আত্মসমর্পণ। অথচ ইসলামি শরিয়তে প্রয়োজনবোধে কাফিরদের সাথেও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তি বা সন্ধি (যেমন হুদায়বিয়ার সন্ধি) বৈধ।
বৈধ বিষয়কে কুফর আখ্যা দেওয়া আদী খারেজী এবং বর্তমান আইএসের অন্যতম নিদর্শন।
অবস্থান-৩. তাবীলের ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদেরকে নিখাদ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের চেয়েও নিকৃষ্ট আখ্যা দেওয়া।
আইএসের অবস্থান:
"إن جريمة هؤلاء الديمقراطيين الإسلاميين أشدّ من جريمة الديمقراطيين الخُلّص، لأن الديمقراطيين الإسلاميين يشرعنون كفرهم باسم الدين! ويغلّفون الديمقراطية بشعارات نصرة الإسلام والمسلمين! وهذا جرم مضاعف وتجارة بالدين..."
অর্থঃ "এই 'ইসলামি গণতন্ত্রী'দের অপরাধ নিখাদ গণতন্ত্রীদের অপরাধের চেয়েও গুরুতর। কারণ, এই ইসলামি গণতন্ত্রীরা ধর্মের নামে তাদের কুফরকে বৈধতা দেয়! আর তারা ইসলাম ও মুসলমানদের সাহায্য করার স্লোগান দিয়ে গণতন্ত্রকে আবৃত করে!... আপনার বিস্ময় দূর হয়ে যাবে যখন আপনি জানবেন যে, এই ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলো ব্যালট বাক্সে তার প্রতিপক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া আর কিছুই নয়।"
অর্থাৎ আইএস এখানে দাবি করেছে যে, নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে যুক্ত 'ইসলামি গণতন্ত্রী'দের অপরাধ নিখাদ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের চেয়েও গুরুতর। কারণ, তারা ধর্মের লেবাসে কুফরকে বৈধতা দেয়। আইএসের মতে, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলো ব্যালট বাক্সে ইসলামি দলগুলোর নিছক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছাড়া আর কিছুই নয়।
জবাব: আইএসের এই দাবিটি অত্যন্ত সুকৌশলে তৈরি করা একটি 'ভুল সমতা' (False Equivalency) এবং শরিয়তের ‘মাকাসিদ’ (মৌলিক উদ্দেশ্য) সম্পর্কে তাদের চরম অজ্ঞতার পরিচায়ক। এই বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবনের জন্য আমরা ৩ টি পয়েন্টে আলোচনা করবঃ
১. নিখাদ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো সমাজ, রাষ্ট্র ও শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ধর্মের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ ঘটানো। অন্যদিকে, যে সকল উলামায়ে কেরাম নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশ নেন, তাদের উদ্দেশ্য হলো সাংবিধানিক উপায়ে ইসলামবিরোধী ও কুফরি আইনের পথ রুদ্ধ করা। তারা ইসলামি ফিকহের একটি মূলনীতি— "যার সম্পূর্ণটা অর্জন করা যায় না, তার সম্পূর্ণটা বর্জনও করা যায় না"— এর ওপর ভিত্তি করে বৃহত্তর ক্ষতি থেকে সমাজকে বাঁচানোর কৌশল গ্রহণ করেন। তাদের কাছে 'তাবিল' (শরয়ি ব্যাখ্যা) রয়েছে যে, তারা কুফরি ব্যবস্থাকে ভালোবেসে নয়, বরং জনকল্যাণ (মাসলাহাতে আম্মাহ, হাজাতে আম্মাহ) ও 'আহওয়ানুল বালিয়্যাতাইন' (অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ক্ষতি বেছে নেওয়া)-এর নীতি অনুযায়ী এই পথে নেমেছেন।
২। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা কোন তাবীলের ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশ নেয়না, বরং গণতন্ত্রের কুফরী আকীদাকে গ্রহণ করে নেয়। অন্যদিকে উলামায়ে কেরাম গণতন্ত্রের কুফরী আকীদা প্রত্যাখ্যান করেন, শুধু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নির্বাচনে তাবীলের ভিত্তিতে অংশগ্রহণ করেন। বিবেকবান মাত্রই আইএসের উক্ত ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে এই প্রশ্ন তুলতে বাধ্য হবেন যে, কুফরী আকীদা গ্রহণকারীর চেয়ে কুফরী আকীদা প্রত্যাখ্যানকারী কিভাবে বেশি নিকৃষ্ট হয়? গণতন্ত্রকে ভালোবেসে এতে অংশগ্রহণকারীর তুলনায় তাবীলের ভিত্তিতে অংশগ্রহণকারী কিভাবে বেশি খারাপ হয়?
৩। তবে আগেও বলা হয়েছে, আলেমদের এই কৌশলটি একটি ভুল ইজতিহাদ। কুফরি ব্যবস্থার অংশ হয়ে এবং মানবসৃষ্ট আইনের অধীনস্থ হয়ে ইসলাম রক্ষার এই কৌশলটি শরিয়তের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু তাবীল হলো তাকফিরের প্রতিবন্ধক। তাই, তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলেমদের কৌশলটি ভুল হলেও, তাদের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ সৎ এবং ইসলাম রক্ষার স্বার্থে নিবেদিত। আর এখানেই আইএস জঘন্যতম চরমপন্থার আশ্রয় নিয়েছে। যাদের উদ্দেশ্য ভুল পথে হলেও ইসলাম রক্ষা করা, তাদেরকে সেই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের চেয়ে 'নিকৃষ্ট' সাব্যস্ত করা— যারা সরাসরি ইসলাম ধ্বংস করতে চায়— চরম অন্ধত্ব ও বৈপরীত্যেরই নামান্তর।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সুস্পষ্ট নীতি হলো, কোনো আলেমের ইজতিহাদি ভুল বা ভুল রাজনৈতিক কৌশলের কারণে তার উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাকে 'নিকৃষ্ট কাফির' বা 'মুরতাদ' আখ্যা দেওয়া যায় না। তাদেরকে আসল গণতন্ত্রের আকীদাধারিদের চেয়ে নিকৃষ্ট বলা যায়না। একটি বাতিল ও ভ্রান্ত কৌশল (গণতন্ত্র) অবলম্বনের কারণে আলেমদের হত্যা করা কোনোভাবেই বৈধ হয়ে যায় না। বরং এই 'তাবিল' বা ইজতিহাদি ভুলের দোহাই দিয়ে তাকফির করা এবং মুসলিম উম্মাহর রক্তপাত ঘটানো আইএসের সুস্পষ্ট খারিজি মতাদর্শের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
অবস্থান-৪. ইলমে হাদিসের খেদমতকারীরা নয়, বরং তাদের মাথা ছিন্নকারীরাই প্রকৃত ‘আহলুল হাদিস’।
আইএসের অবস্থান:
"ومما شاع وراج عن هذه "الحوزة الديوبندية" وأئمتها من أرباب الديمقراطية، أنهم "مشايخ الحديث!"... فأهل الحديث هم أهل التوحيد والولاء والبراء، هم أهل منابذة المشركين وهدم مناهجهم وسياستهم وديمقراطيتهم التي يدين بها ويدعو إليها "إدريس" وغيره ممن قطف رؤوسهم أهل الحديث بحق..."
অর্থঃ এই 'দেওবন্দি বিদ্যাপীঠ' এবং এর ইমামদের সম্পর্কে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত... তা হলো তারা নাকি 'শাইখুল হাদিস বা হাদিসের শায়খ'! এটি মূলত আফগান-পাকিস্তান অঞ্চলে গভীরভাবে শিকড় গেড়ে থাকা একটি পদ্ধতিগত ও ঐতিহাসিক বিভ্রান্তি... কারণ 'আহলুল হাদিস' হলেন তাওহিদ এবং 'আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা'... এর অনুসারীগণ...। আর প্রকৃত আহলুল হাদিস তারাই যারা এদের মস্তকগুলো ছিন্ন করেছেন।"
এই আলোচনার মাধ্যমে আইএস মূলত আলেমদেরকে তাকফির করার পর তাদের হত্যা করার বৈধতা দাবী করেছে, এই বিষয়টা নিয়ে রীতিমত গর্ব করেছে, এবং এই হারাম রক্তপাতে সফল হওয়ার কারণে নিজেদেরকে প্রকৃত আহলুল হাদীস বলে দাবী করেছে, নাউজুবিল্লাহি মিন জালিক।
আইএস এখানে দাবি করেছে যে, দেওবন্দি বা হাক্কানি ধারার বিদ্যাপীঠগুলোর আলেমগণ যে নিজেদের 'শাইখুল হাদিস' বলে দাবি করেন, তা একটি ঐতিহাসিক বিভ্রান্তি। তাদের মতে, 'আহলুল হাদিস' হলেন কেবল তারাই, যারা (আইএসের নিজস্ব ব্যাখ্যাভিত্তিক) তাওহিদ এবং 'আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা' (আনুগত্য ও সম্পর্কচ্ছেদের নীতি)-এর অনুসারী। আইএস অত্যন্ত ধৃষ্টতার সাথে দাবি করেছে যে, যে সকল ব্যক্তি এই 'গণতান্ত্রিক' আলেমদের হত্যা করে তাদের মাথা ছিন্ন করেছিল, মূলত তারাই হলো প্রকৃত 'আহলুল হাদিস'।
জবাব: আইএসের এই জঘন্য আস্ফালন তাদের ইলমি দেউলিয়াত্ব এবং চরম খারিজি মানসিকতার এক অকাট্য প্রমাণ। এই অভিযোগের জবাবে দুটো কথা পেশ করাই যথেষ্ট মনে করছিঃ
১. দারুল উলুম দেওবন্দ এবং এর অনুসারী প্রতিষ্ঠানগুলো গত দেড় শতাব্দী ধরে বিশ্বজুড়ে ইলমে হাদিসের যে বিশাল খেদমত করেছে, তা আজ মুসলিম উম্মাহর কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট। ‘ফাতহুল মুলহিম’, ‘ইলাউস সুনান’-এর মতো কালজয়ী গ্রন্থগুলো প্রমাণ করে যে, অন্যান্য হক্বপন্থী মাসলাকগুলোর পাশাপাশি তারাও প্রকৃত অর্থেই হাদিসের ধারক ও বাহক। আইএস নিজেদের অজ্ঞতা ঢাকতে এবং রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে আলেমদের এই বিশাল দ্বীনি খেদমতকে অস্বীকার করে সাধারণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে।
২. সবচেয়ে ভয়ংকর ও চিন্তার বিষয় হলো, আইএস এখানে দাবি করেছে— যারা আলেমদের হত্যা করে মাথা ছিন্ন করেছে, তারাই নাকি 'প্রকৃত আহলুল হাদিস'! মূলত তাদের এই দাবিই প্রমাণ করে যে, তারা হাদিসের অনুসারী নয়, বরং হাদিসে বর্ণিত 'খারিজি'দেরই আধুনিক রূপ। সহিহ হাদিসে খারিজিদের সুস্পষ্ট নিদর্শন বর্ণনা করে বলা হয়েছে:
يَقْتُلُونَ أَهْلَ الإِسْلاَمِ وَيَدَعُونَ أَهْلَ الأَوْثَانِ
“তারা মুসলমানদের হত্যা করবে এবং মূর্তিপূজারিদেরকে (আসল কাফিরদের) ছেড়ে দেবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৩৪৪)
হাদিসের আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, খারিজিদের অবস্থা এমন যে তারা কুরআন-হাদিস পড়বে ঠিকই, কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালীর নিচে নামবে না; তাদের একমাত্র কাজ হলো নিজেদের বাতিল ব্যাখ্যার ভিত্তিতে মুসলমানদের রক্ত হালাল করা। আজকের যুগে যে সকল আলেম ভুল ইজতিহাদের শিকার হয়ে ভোটপ্রদানকে বৈধ বলেছেন, তারা গণতন্ত্রের কুফরি আকীদাকে প্রত্যাখ্যান করা সত্ত্বেও তাদের রক্তপাত ঘটিয়ে আইএসের এই গর্ববোধ মূলত নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সেই ভবিষ্যদ্বাণীরই এক জীবন্ত ও ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি।
সম্মানিত পাঠক! এই পুরো আলোচনার শেষে এসে সুনিশ্চিতভাবে একথা বলা যায় যে, আন-নাবা-এর এই সম্পাদকীয়টি তাকফিরের মূলনীতির লঙ্ঘন এবং কুরআন-সুন্নাহর বিধি-বিধান অপপ্রয়োগের এক নির্লজ্জ দলিল।
শরীয়তের অকাট্য দলিলাদির আলোকে এটি প্রমাণিত সত্য যে, মানবসৃষ্ট গণতন্ত্র একটি শিরকি ও কুফরি ব্যবস্থা; এর মাধ্যমে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কিন্তু যে সকল হাক্কানি উলামায়ে কেরাম এই নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে জড়িয়েছেন, তারা পশ্চিমা গণতন্ত্রকে ভালোবেসে বা ধর্ম ও আকীদা হিসেবে গ্রহণ করে তা করেননি; বরং তারা ইসলাম রক্ষার স্বার্থে 'তাবিল' বা ইজতিহাদের ভিত্তিতে বৃহত্তর ক্ষতি থেকে সমাজকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে এই ভুল পথে পা বাড়িয়েছেন।
শরিয়তের অকাট্য নীতি অনুযায়ী, একটি ভুল রাজনৈতিক কৌশল বা ইজতিহাদি ভুলের কারণে কোনো আলেমকে 'কাফির' বা 'মুরতাদ' আখ্যা দেওয়া যায় না। এই ইজতিহাদি ভুলের দোহাই দিয়ে উলামায়ে কেরামকে মুরতাদ ঘোষণা করা, তাদের রক্ত হালাল মনে করা এবং তাদের হত্যা করে গর্ববোধ করা— আইএসের সুস্পষ্ট খারিজি বিচ্যুতি। ইসলাম কখনো মুসলমানদের কেবল ধ্বংস, রক্তপাত এবং বিচ্ছিন্নতার সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ করে না। আলেমদের মাঝে ইজতিহাদি ভুল থাকলে তার ইলমি খণ্ডন ও সংশোধন কাম্য; খারিজিদের মতো তাকফির করে মুসলিম উম্মাহর রক্তপাত করা এবং ইসলামি ঐক্য বিনষ্ট করা কখনোই শরিয়তের কাম্য হতে পারে না।
*****
Comment