তাকফিরি দর্শনের তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ
পর্ব-২
উলামায়ে দেওবন্দের উপর আইএসের উত্থাপিত আপত্তিসমূহের জবাব
-মুনশি আব্দুর রহমান
পর্ব-২
উলামায়ে দেওবন্দের উপর আইএসের উত্থাপিত আপত্তিসমূহের জবাব
-মুনশি আব্দুর রহমান
ইতোপূর্বে 'তাকফিরি দর্শনের তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ [পর্ব-১] : উলামায়ে দেওবন্দের উপর আইএসের উত্থাপিত আপত্তিসমূহের জবাব' নামক প্রবন্ধে আমরা আইএসের মুখপত্র ‘আন-নাবা’-এর সম্পাদকীয় থেকে তাদের জঘন্য তাকফিরি ও খারিজি মানসিকতার অকাট্য প্রমাণ তুলে ধরে এর তাত্ত্বিক ও শরয়ি বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছিলাম। বিকৃতি ও গোমরাহিতে ভরপুর ওই সম্পাদকীয়তে আইএস আরও বেশ কিছু মিথ্যা ও কাল্পনিক অভিযোগ উত্থাপন করেছে। প্রসঙ্গের প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় আমরা সেই অভিযোগগুলো এবং এর দালিলিক জবাব নিচে তুলে ধরছি:
অভিযোগ- ১. তালেবান-আল-কায়েদা হল পোষ মানা জিহাদি দল
আইএসের অভিযোগ:
"ومن العجائب أنّ أحد "الأفرع المجهرية" الذي تخرج بعض قادته من نفس الحوزة الديوبندية؛ سارع إلى نعي إمام الديمقراطية وعضو البرلمان السابق!! واتهم المجاهدين بأنهم أداة في يد الاستخبارات الدولية! مع أن الجميع بات يعلم أن الاستخبارات الدولية جرّبت كل الحلول، فلم تجد أنجع من تدجين "الجهاديين" لضرب المجاهدين من دمشق إلى كابل وما زالت العملية تتوسع."
অর্থঃ "আশ্চর্যের বিষয় হলো, একটি 'অণু-শাখা' (ক্ষুদ্র গোষ্ঠী), যার কিছু নেতা এই একই দেওবন্দি বিদ্যাপীঠ থেকে পড়াশোনা করে বের হয়েছে; তারা এই গণতন্ত্রের ইমাম ও সাবেক সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে শোক জানাতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে!! আর মুজাহিদদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হাতের পুতুল হওয়ার অভিযোগ তুলেছে! অথচ এখন সবাই জানে যে... দামেস্ক থেকে কাবুল পর্যন্ত মুজাহিদদের ওপর আঘাত হানার জন্য 'তথাকথিত জিহাদিদের' পোষ মানানোর চেয়ে অধিক কার্যকর কোনো উপায় তারা পায়নি..."
অর্থাৎ আইএস এখানে অত্যন্ত আক্ষেপ ও ক্ষোভের সাথে উল্লেখ করেছে যে, আফগান তালেবান এবং অন্যান্য প্রকৃত মুজাহিদ গোষ্ঠীগুলো কেন 'গণতন্ত্রের ইমাম' (নিহত আলেম)-এর মৃত্যুতে শোক জানাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল! আইএসের দাবি, যে সকল মুজাহিদ গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে যুক্ত আলেমদের সাথে সুসম্পর্ক রাখে এবং তাদের মৃত্যুতে শোক জানায়, তারা আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর 'হাতের পুতুল' এবং 'পোষ মানানো জিহাদি'।
জবাব: এই অভিযোগটি আইএসের চরম রাজনৈতিক অপরিপক্বতা, উম্মাহর ঐক্য বিনষ্ট করার সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত এবং খারিজি মানসিকতার এক অকাট্য প্রমাণ। বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবনের জন্য নিচের তিনটি পয়েন্টে বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য:
১. প্রকৃত মুজাহিদরা (যেমন ইমারতে ইসলামিয়া বা আল-কায়েদা) ইসলামি শরিয়তের প্রায়োগিক দিক ও বৈশ্বিক রাজনীতি সম্পর্কে গভীর প্রজ্ঞার অধিকারী। তারা খুব ভালোভাবে বোঝেন যে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় থাকা আলেমদের রাজনৈতিক কৌশলটি ভুল হলেও, সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামি মূল্যবোধ রক্ষার ক্ষেত্রে তাদের নিয়ত সৎ। মুজাহিদরা ‘কৌশলগত ভুল’ এবং ‘আকিদাগত কুফর’ -এর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করতে পারেন। আলেমদেরকে ইজতিহাদি ভুলের কারণে তারা কাফের আখ্যা দেননা, বরং উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে ইলমি অঙ্গন ও সামাজিক ময়দানে আলেমদের খেদমতকে তারা সম্মান করেন এবং ইলমী খণ্ডন ও উত্তম পদ্ধতিতে ভুল দূর করার চেষ্টা করেন।
২. এটিই সঠিক কথা যে, গণতন্ত্র, পার্লামেন্ট বা ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে কখনোই ইসলামি শরিয়ত ও খিলাফত প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। শরিয়ত প্রবর্তনের একমাত্র সুন্নাহসম্মত পথ হলো সশস্ত্র জিহাদ বা ‘কিতাল ফি সাবিলিল্লাহ’। আফগানিস্তানে তালেবানদের আত্মত্যাগ ও জিহাদ, তাদের কোরবানির মাধ্যমেই ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং কুফরি শক্তির দম্ভ চূর্ণ হয়েছে। আর প্রকৃত মুজাহিদরা আলেমদের ইজতিহাদি ভুল থাকা সত্ত্বেও তাদের সম্মান করেন, তাদের তাকফির করেন না বা তাদের রক্ত হালাল মনে করেন না।
৩. আইএসের মূল সমস্যা হলো, তারা ইসলামি সমাজনীতির এই ভারসাম্যপূর্ণ রূপটি ধারণ করতে অক্ষম। যারা তাদের তাকফিরি দর্শনের সাথে অন্ধভাবে একমত নয়, এমনকি সেই প্রকৃত মুজাহিদরাও আইএসের ফতোয়ায় 'গোয়েন্দা সংস্থার পুতুল' বা 'মুরতাদ'। একটি ভুল রাজনৈতিক কৌশলের (গণতন্ত্র) কারণে আলেমদের হত্যা করা এবং সেই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করার কারণে প্রকৃত মুজাহিদদেরও তাকফির করা— এটি স্পষ্টতই খারিজিদের নিদর্শন। এই গোষ্ঠীর একমাত্র কাজ হলো নিজেদের বাতিল ব্যাখ্যার ভিত্তিতে মুসলমানদের রক্ত হালাল করা এবং উম্মাহর মাঝে বিভেদ তৈরি করা। মুজাহিদ ও উলামায়ে কেরামের মধ্যকার সেতুবন্ধন বিনষ্ট করে মুসলমানদের বৃহত্তর ঐক্য ভেঙে দেওয়াই আইএসের মূল লক্ষ্য।
অভিযোগ- ২. তাসাওউফ ও পীর-মুরিদিকে অন্ধ অনুকরণ বলে কটূক্তি
আইএসের অভিযোগ:
"ولعل الجواب في فهم طبيعة العلاقة بين "شيخ الطريقة" الذي لا يُسأل عما يفعل، و"المريد" الذي لا يملك من أمره شيئا أمام قداسة "المولوي" العظيم. فالعلاقة بين المعلم والطالب في "الحوزة الحقانية" هي نسخة طبق الأصل من علاقة "الشيخ ومريده" في الطرق الصوفية! حيث يتم تنشأته على الطاعة العمياء للشيخ، وتقديسه وتعظيمه، حتى لو كان الشيخ يروّج لدين الديمقراطية والانتخابات الكفرية في الخطب المنبرية!"
অর্থঃ "সম্ভবত এর উত্তরটি লুকিয়ে আছে 'ত্বরিকার শায়খ' এবং 'মুরিদ' (মহান 'মৌলবি'-এর পবিত্রতার সামনে যার নিজস্ব কোনো ইচ্ছা বা স্বাধীনতা নেই)-এর মধ্যকার সম্পর্কের ধরনটি বোঝার মধ্যে। 'হাক্কানিয়া বিদ্যাপীঠ'-এ শিক্ষক এবং ছাত্রের মধ্যকার সম্পর্কটি মূলত সুফি ত্বরিকাগুলোর 'শায়খ ও মুরিদ' সম্পর্কেরই এক হুবহু প্রতিচ্ছবি! সেখানে ছাত্রকে শায়খের প্রতি অন্ধ আনুগত্য, তার পবিত্রতা রক্ষা এবং তাকে অতিভক্তি করার শিক্ষায় বড় করা হয়, এমনকি সেই শায়খ যদি মিম্বরের খুতবায় গণতন্ত্র নামক ধর্ম এবং কুফরি নির্বাচনের প্রচারণাও চালায়!"
অর্থাৎ আইএস এখানে দাবি করেছে যে, হাক্কানিয়া বা দেওবন্দি ধারার বিদ্যাপীঠগুলোতে শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্কটি মূলত সুফি তরিকার 'শায়খ ও মুরিদ'-এর মতো অন্ধ অনুকরণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। তাদের অভিযোগ, এই অন্ধভক্তির কারণেই ছাত্ররা তাদের শায়খদের নিজস্ব কোনো ইচ্ছা বা স্বাধীনতা থাকে না; এমনকি শায়খরা যদি খুতবায় 'গণতন্ত্র নামক ধর্ম' এবং কুফরি নির্বাচনের প্রচারণাও চালান, তবুও ছাত্ররা অন্ধভাবে তা মেনে নেয়।
জবাব: এটি দেওবন্দি মাসলাক এবং ইসলামি তাসাওউফের ওপর আইএসের একটি জঘন্য মিথ্যাচার এবং ইলমি দেউলিয়াত্বের চরম বহিঃপ্রকাশ। এই অভিযোগটি খণ্ডনে নিচের তিনটি পয়েন্টে আলোচনা করা জরুরি:
১. আইএস এখানে অত্যন্ত সুকৌশলে সেক্যুলার বা শরিয়তবর্জিত 'সুফিবাদ'-এর সাথে হাক্কানি আলেমদের 'প্রকৃত তাসাওউফ'-কে গুলিয়ে ফেলে সাধারণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। ইসলামি আকিদার সুস্পষ্ট অকাট্য নীতি হলো, 'স্রষ্টার অবাধ্য হয়ে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা হারাম'। দেওবন্দি ধারায় পীর বা শায়খকে কখনোই নিষ্পাপ বা 'মাসুম' মনে করা হয় না। প্রকৃত তাসাওউফ শরিয়তের বাইরের কোনো বিষয় নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি বা 'তাজকিয়ায়ে নাফস'-এর একটি বৈধ মাধ্যম। কোনো শায়খ যদি শরিয়তের একটি বিধানও লঙ্ঘন করেন, তবে মুরিদ বা ছাত্রের জন্য তার অন্ধ অনুসরণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
২. আইএসের দাবি অনুযায়ী ছাত্ররা আলেমদের 'গণতন্ত্রের' ভুল পথে অন্ধভাবে অনুসরণ করে— এই কথাটি সর্বৈব মিথ্যা। বড় বড় আলেম বা ইলমের স্তম্ভদেরও কখনো কখনো 'ইজতিহাদি ভুল' (গবেষণালব্ধ ত্রুটি) হতে পারে। গণতান্ত্রিক নির্বাচনে আলেমদের অংশগ্রহণ তাত্ত্বিকভাবে এমনই একটি ভুল ইজতিহাদ।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের নিখাদ নীতি হলো, কোনো আলেমের ইজতিহাদি ভুল চিহ্নিত হলে তার কারণে কোনোভাবেই তার মর্যাদা বা দ্বীনি খেদমতকে অস্বীকার করা যায় না। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ)-বলেন, “জলিলুল কদর কোনো ব্যক্তিত্বের ভুলের শিকার হওয়া অসম্ভব নয়... কিন্তু তার এই ভুলের কারণে তার মাকাম ও মর্যাদাকে কালিমা লেপনের চেষ্টা করা এবং মানুষের অন্তরে বিদ্যমান ভক্তি-শ্রদ্ধাকে শেষ করে দেওয়াও জায়েজ হবে না।”
অর্থাৎ, উম্মাহর ছাত্র ও সাধারণ মানুষ আলেমদের তাকওয়া ও ইলমকে শ্রদ্ধা করেন, কিন্তু এর মানে এই নয় যে, তারা আলেমদের ইজতিহাদি ভুলকে (যেমন: গণতান্ত্রিক রাজনীতি) 'হক' হিসেবে অন্ধভাবে গ্রহণ করেছেন।
৩. আইএসের মূল উদ্দেশ্য আকিদা সংশোধন নয়, বরং মুসলিম সমাজে আলেমদের প্রতি যে ভক্তি ও নির্ভরতার জায়গা রয়েছে, তা ধ্বংস করা। তারা আলেমদের প্রতি ছাত্রদের স্বাভাবিক ইলমি ও আধ্যাত্মিক শ্রদ্ধাবোধকে 'কুফরের প্রতি অন্ধ অনুকরণ' হিসেবে আখ্যায়িত করে চরম ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। আইএসের সমস্যা হলো, তারা ইজতিহাদি ভুলকারী আলেমদের সম্মান করা এবং কুফরের অন্ধ অনুকরণ করার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে না। মূলত আলেমদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়ে তাদের হত্যা করার জঘন্য অপরাধকে আড়াল করতেই তারা এই কাল্পনিক অন্ধ অনুকরণের গল্প ফেঁদেছে।
পরিশেষে এটি সুস্পষ্ট যে, আইএসের মুখপত্র ‘আন-নাবা’-এর সম্পাদকীয়তে উত্থাপিত এই অভিযোগগুলো নিছকই ডাহা মিথ্যাচার, অপব্যাখ্যা এবং উম্মাহর মাঝে বিভেদ সৃষ্টির এক সুপরিকল্পিত হাতিয়ার। প্রকৃত মুজাহিদরা সর্বদা উলামায়ে কেরামের ইলম ও মর্যাদাকে সমুন্নত রাখেন এবং শরীয়তের গণ্ডির ভেতরে থেকেই তাঁদের ভুলগুলো সংশোধনের আন্তরিক চেষ্টা করেন। অন্যদিকে, আইএস নিজেদের তাকফিরি ও খারিজি মানসিকতার বশবর্তী হয়ে ইজতিহাদি ভুলের অজুহাতে আলেমদের রক্ত হালাল করছে এবং মুজাহিদদের ওপর অপবাদের পাহাড় চাপাচ্ছে। তাসাওউফ ও ইলমি শ্রদ্ধাবোধকে ‘অন্ধ অনুকরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তারা মূলত মুসলিম সমাজের আধ্যাত্মিক ও ইলমি মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে চায়। মুসলিম উম্মাহর উচিত এই চরমপন্থী ও পথভ্রষ্ট গোষ্ঠীর বিভ্রান্তিকর প্রোপাগান্ডা থেকে নিজেদের আকিদা ও ঈমানকে সুরক্ষিত রাখা এবং উলামা ও প্রকৃত মুজাহিদদের মধ্যকার ঐক্যের প্রাচীরকে আরও সুদৃঢ় করা।
*****
সমাপ্ত
Comment