পবিত্রতার নাজাসাত সিরিজের শেষ পর্বে নিকোলাই বার্দিয়েভের সমালোচনা উল্লেখ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে অধমের মনে হল যে, সাধারণ পাঠকের জন্য বার্দিয়েভের সমালোচনা সহজপাচ্য হয় নি। তাই ai দিয়ে আরও বিস্তারিত লিখিয়ে নিলাম। বলে রাখা ভাল, আমরা কোন দার্শনিককে হক্ব মনে করি না। হক্বকে অনুসন্ধানের জন্য তাদের চেষ্টা প্রশংসনীয়, কিছু ক্ষেত্রে তারা সফলও বটে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে তাদের ব্যর্থতাও হতাশাজনক এবং নিন্দনীয় পর্যায়ের। তাদের যতটুকু আমাদের জ্ঞানে ঠিক মনে হয়েছে, আমরা ততটুকু গ্রহণ করার চেষ্টা করেছি। লেখকের কোন ভুল-ভ্রান্তি নজরে আসলে ফোরামে জানাতে ভুল করবেন না।
১. গণতন্ত্র কী? একটি সহজ সংজ্ঞা
গণতন্ত্র মানে জনগণের শাসন। কিন্তু বার্দিয়েভ এবং অন্যান্য চিন্তাবিদরা বলেন যে আধুনিক গণতন্ত্র শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক পদ্ধতি — কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এই পদ্ধতি ব্যাখ্যা করলেও সেই সিদ্ধান্ত কেমন হওয়া উচিত তা বলে না।
একজন ড্রাইভারের লাইসেন্স আছে, সে গাড়ি চালাতে পারে — কিন্তু তার গন্তব্য নির্ধারণ করতে পারে না। সে সমুদ্রের দিকে যেতে পারেন বা পাহাড় থেকে ফেলেও দিতে পারেন। গণতন্ত্র অনুরূপভাবে কাজ করে: এটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার যন্ত্র, কিন্তু কোন দিকে যাওয়া উচিত তা জানে না।
২. গণতন্ত্রের তিনটি মূল সমস্যা
২.১ সত্যের অনুপস্থিতি: গণতন্ত্র সত্য বিশ্বাস করে না
গণতন্ত্র নিরপেক্ষ থাকতে চায়। এটি বলে: "আমরা ভাল বা খারাপ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেব না। আমরা শুধু গণনা করি কে আছে এবং বেশি মানুষ কি চায়।"
কিন্তু এটা একটি বিপদজনক ত্রুটি। এর মানে গণতন্ত্র সত্যে বিশ্বাস করে না। যদি আপনি সত্যে বিশ্বাস করেন, আপনি বলবেন: "এটি সঠিক, তাই আমরা এটি করব, এমনকি যদিও বেশিরভাগ মানুষ সম্মত না হয়।" কিন্তু গণতন্ত্র বলে: "বেশিরভাগ মানুষ যা বলে তাই সঠিক।"
উদাহরণ: ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব "মানবাধিকার এবং স্বাধীনতা" ঘোষণা করে শুরু হয়েছিল। কিন্তু ১৭৯৩ সালের মধ্যে, একই জনতার ভোটে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। কেন? কারণ জনতার ইচ্ছা খারাপ হতে পারে, এবং গণতন্ত্রের কোনো শক্তি নেই এটি থামানোর।
২.২ আশাবাদী সন্দেহ: গণতন্ত্রের অস্পষ্ট বিশ্বাস
এটি একটি অদ্ভুত বিষয় যে, গণতন্ত্র সত্যে বিশ্বাস করে না, তবুও এটি অত্যন্ত আশাবাদী। এটি বিশ্বাস করে যে অনেক মানুষের ভোট যোগ করলে ভাল ফলাফল আসবে।
ফিলোসফার জাঁ-জ্যাক রুসো এই ধারণার প্রবর্তন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন মানুষ মূলত ভাল এবং সৎ। কিন্তু এটা ভুল। মানুষ স্বার্থপর হতে পারে, অন্যায্য কাজ করতে পারে, এবং সংখ্যার (ভিড়ে) তারা আরও খারাপ হয়ে যায়।
গণতন্ত্র এই বাস্তবতা অস্বীকার করে।
২.৩ স্বাধীনতার বিপরীত প্রভাব: গণতন্ত্র স্বাধীনতা ধ্বংস করে
এটি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু এটি সত্য: গণতন্ত্র ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সীমিত করে।
জঁ-জ্যাক রুসো বলেছিলেন তিনি "বিবেকের স্বাধীনতা" বিশ্বাস করেন না। ম্যাক্সিমিলিয়েন রোবেসপিয়েরে (বিপ্লবের নেতা) এটি বাস্তবায়ন করেছিলেন — তিনি যারা তার সাথে সম্মত ছিল না তাদের কণ্ঠস্বর দমন করেছিলেন।
কেন এমন ঘটে? কারণ আপনি যা চান তা করতে বাধ্য হন কারণ "বেশিরভাগ মানুষ এটি চায়।"
আধুনিক সমালোচকরা (টকভিল এবং মিল) তাদের সময়েই সাবধান করেছিলেন: গণতন্ত্র সকল ব্যক্তিকে সমান করে দেয় এবং চিন্তার স্বাধীনতা চুরি করে। মূর্খ এসে জ্ঞানীর উপর মূর্খতা চাপিয়ে দিতে পারে।
৩. গণতন্ত্র কখন এবং কেন জন্ম হয়েছিল?
গণতন্ত্র একটি রোগের লক্ষণ, কোন সমাধান নয়।
একটি স্বাস্থ্যকর সমাজে, মানুষ একসাথে জৈব ভাবে যুক্ত থাকে। তারা সাধারণ ধর্ম, সাধারণ মূল্যবোধ এবং সাধারণ ঐতিহ্য ধারণ করে। কিন্তু যখন এই সংযোগ ভেঙে যায়, তখন গণতন্ত্র চলে আসে। তবে উপমহাদেশের গণতন্ত্র উপনিবেশের ফলাফল।
আধুনিক যুগে, ঐতিহ্য মারা গেছে, ধর্মের প্রভাব হ্রাস পেয়েছে, এবং সমাজ পরমাণুতে বিভক্ত হয়েছে। এখন মানুষ চিন্তা করে: "ঠিক আছে, আমাদের কাছে আর কিছু নেই — শুধু ভোট দিই এবং সংখ্যা গণনা করি।"
৪. অনটোলজি বনাম সাইকোলগিজম: দর্শনের গভীর স্তর
এখানে একটি গভীর দার্শনিক পার্থক্য আছে -
গণতন্ত্র সাইকোলগিজম। এটি বলে: "যে কোনো সত্য নেই — আমরা শুধু ভোট করি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণ করে।" এটি একটি মানসিক সিস্টেম, যেখানে জনগণের ইচ্ছা সবকিছু নির্ধারণ করে।
কিন্তু জীবনে সত্যিকারের অনটোলজিকাল বিষয় আছে। ন্যায় অন্যায় আছে, এবং এটি বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করুক বা না করুক সঠিক। সত্য সত্য, এবং এটি জনমত দ্বারা পরিবর্তন করা যায় না।
৫. গণতন্ত্রের সাথে দার্শনিক সমস্যাগুলি
৫.১ রুসো এবং সাধারণ ইচ্ছা
ফিলোসফার রুসো বলেছিলেন একটি "সাধারণ ইচ্ছা" থাকা উচিত — জনগণের একটি সত্যিকারের, একীভূত, প্রকৃত ইচ্ছা। সে আরও বলেছিল, Whoever refuses to obey the general will will be forced to do so by the entire body; this means merely that he will be forced to be free.”
কিন্তু তিনিও বলেছিলেন: সাধারণ ইচ্ছা সকল ব্যক্তিগত ইচ্ছার যোগফলনয়।
এমন নয় যে আপনি সবার ভোট যোগ করলেই উত্তর পাবেন। এটি আরও গভীর কিছু — একটি জাতীয় চেতনা যা প্রজন্মের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।
গণতন্ত্র এটি বুঝে না। সে শুধু সংখ্যা গণনা করে। একারনে জনগণের সাধারণ ইচ্ছা না থাকলেও নারীদের জোরপূর্বক মুক্ত-স্বাধীন(!!!) বানানো হয়।
৫.২ কার্ল শ্মিট এবং সিদ্ধান্ত
জার্মান ফিলোসফার কার্ল শ্মিট বলেছেন: The emptiness of mere majority calculus deprives legality of all persuasive power", মূলত, স্মিট বলেছেন যে, ভোট গণনা আইনের বৈধতা বা বাধ্যতামূলক শক্তিকে ভিত্তি দিতে পারে না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে জনগণের কোন ভূমিকা নেই।
যেমন: যুদ্ধের সময়, একজন নেতাকে নিয়মকানুন ভাঙতে হতে পারে জাতিকে বাঁচাতে।
তিনি আরও বলেছেন, All law is situational law. The sovereign produces and guarantees the situation in its totality. He has the monopoly over this last decision.
৫.৩ অ্যালাসডেয়ার ম্যাকইনটায়ার এবং নৈতিকতার পতন
আধুনিক দার্শনিক ম্যাকইনটায়ার বলেছিলেন: আমরা নৈতিক শব্দভাণ্ডার হারিয়েছি।
একবার, মানুষ বলত: "অমুক কাজ ভাল কারণ গুণ (ভালো গুণ) এমন দাবি করে।" এখন, মানুষ শুধু বলে: "হিজাব আমার পছন্দ। আমি এটা পছন্দ করি।" কোনো সাধারণ ভালো বলে কিছু নেই, সব কিছু শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ।
গণতন্ত্র ঠিক এটাই করে: এটা সব মূল্যবোধকে "পছন্দ" হিসাবে বিবেচনা করে।
তিনি আরও বলেছেন,
In any society where government does not express or represent the moral community of the citizens, but is instead a set of institutional arrangements for imposing a bureaucratized unity on a society which lacks genuine moral consensus, the nature of political obligation becomes systematically unclear...A striking feature of moral and political argument in the modern world is the extent to which it is innovators, radicals, and revolutionaries who revive old doctrines, while their conservative and reactionary opponents are the inventors of new ones...What matters at this stage is the construction of local forms of community within which civility and the intellectual and moral life can be sustained through the new dark ages which are already upon us. And if the tradition of the virtues was able to survive the horrors of the last dark ages, we are not entirely without ground for hope. This time however the barbarians are not waiting beyond the frontiers; they have already been governing us for quite some time.
৫.৪ এডমান্ড বার্ক এবং জৈব ঐতিহ্য
ইংরেজ রক্ষণশীল দার্শনিক এডমান্ড বার্ক বলেছিলেন: সমাজ একটি জীবন্ত জিনিস, যন্ত্র নয়।
তিনি বলেছিলেন:
Society is indeed a contract. It is a partnership in all science; a partnership in all art; a partnership in every virtue, and in all perfection. As the ends of such a partnership cannot be obtained in many generations, it becomes a partnership not only between those who are living, but between those who are living, those who are dead, and those who are to be born.
এর মানে: যেসব উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য মানুষ সমাজ গঠন করে, সেসব উদ্দেশ্য হাসিল করতে অনেক প্রজন্ম চলে যায়। তাই একটি জাতির ইচ্ছা শুধু আজকের মানুষের ভোট নয়। এটি গত ১০০ বছরের ইতিহাস, আগের প্রজন্মের মূল্যবোধ, এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য দায়বদ্ধতা অন্তর্ভুক্ত করে।
গণতন্ত্র এটি ভুলে যায়। সে বলে: "আজকের ভোট সবকিছু নির্ধারণ করে। আমরা অতীত নিয়ে চিন্তা করি না।" সে জাতির ঐতিহ্য ভঙ্গ করে এবং একটি জাতির আত্মাকে হত্যা করে। বার্দিয়েভ একই কথা বলেছেন।
৫.৫ হেগেল এবং নৈতিক জীবন
জার্মান দার্শনিক হেগেল বলেছিলেন রাষ্ট্রের একটি চেতনা আছে যা ব্যক্তিগত ইচ্ছার উপরে থাকে। তিনি একে "Sittlichkeit" (নৈতিক জীবন) বলে ডাকেন।
এর মানে: একটি দেশ শুধু পৃথক নাগরিকদের সমষ্টি নয়। এর একটি আত্মা আছে, একটি বিবেক আছে, একটি লক্ষ্য আছে।
গণতন্ত্র এটি অস্বীকার করে এবং মানুষকে বিচ্ছিন্ন "ব্যক্তি পরমাণু" হিসাবে বিবেচনা করে যা দিয়ে শুধু সংখ্যা গণনা করা হয়।
আবার তিনি বলেছিলেন যে, to be independent of public opinion is first and formal condition of achieving anything great
৫.৬ লিও স্ট্রাউস এবং প্রাকৃতিক আইন
দার্শনিক লিও স্ট্রাউস বলেছিলেন: সমস্ত সভ্যতা একটি প্রাকৃতিক আইনের উপর নির্ভর করে —এমন আইন সময়ের সাথে স্থায়ী ও যুক্তিসঙ্গত এবং যা সকলের জন্য প্রযোজ্য।
এটি গণিত বা পদার্থবিজ্ঞানের মতো। ২+২=৪, এবং এটি গণনা বা জনমত দ্বারা পরিবর্তন করা যায় না। একইভাবে, ন্যায়বিচার এবং সত্য হাক্বিকি অর্থে অস্তিত্বশীল।
গণতন্ত্র বলে: "প্রাকৃতিক আইন বলে কিছু নেই। যা বেশিরভাগ মানুষ বলে তাই আইন।" এটি স্ট্রাউসের চেতনার বিরুদ্ধে।
স্ট্রাউস আরও বলেছেন, the problem posed by conflicting needs of society can not be solved if we don't possess knowledge of natural right. The contemporary rejection of natural right leads to nihilism - nay, it is identical with nihilism.Liberal relativism has its roots in the natural right tradition of tolerance or in the notion that everyone has a natural right to the pursuit of happiness as he understands happiness; but in itself it is a seminary of intolerance.
৬. নিয়েটশে এবং জনতার নৈতিকতা
দার্শনিক ফ্রেডরিক নিয়েটশে সাবধান করেছিলেন যে: সাধারণ মানুষ মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে পারে না, শুধু অনুসরণ করতে পারে। যখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি সর্বোচ্চ হয়, তখন প্রতিভা এবং উদ্ভাবন দমন করা হয়।
তিনি লিখেছেন, Again and again I am brought up against it, and again and again I resist it: I don't want to believe it, even though it is almost palpable: the vast majority lack an intellectual conscience; indeed, it often seems to me that to demand such a thing is to be in the most populous cities as solitary as in the desert.
৭. গণতন্ত্রের ভিতরে গোপন সংগ্রাম
বার্দিয়েভ একটি গভীর পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করেন: গণতন্ত্র অভ্যন্তরীণভাবে অস্থিতিশীল।
কারণ:
ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল সংসদ গঠন করলেও প্রকৃত শক্তি ধারণ করে না। প্রকৃত শক্তি রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে থাকে, যা জনগণকে ম্যানিপুলেট করে।
৮. ধর্ম এবং সত্যের অভাব
এখানে বার্দিয়েভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট:
"সত্য পবিত্র। একটি সত্য-ভিত্তিক সমাজ সম্পূর্ণভাবে ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে না।"
মানে: গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষ কারণ এটি অধার্মিক। এটি সত্যে বিশ্বাস করে না, তাই এটি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে পারে না।
ধর্ম নির্দিষ্টভাবে দাবি করে: "এটি সত্য, এবং আমরা এটির জন্য মরতে প্রস্তুত।"
গণতন্ত্র বলে: "সত্য কী তা জানি না, তাই আমরা শুধু ভোট দেব।"
এগুলি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি স্বাস্থ্যকর সমাজের একটি অন্তর্নিহিত ধর্মীয় বিশ্বাস থাকা উচিত।
৯. সমাধান কী?
যদি গণতন্ত্র ত্রুটিপূর্ণ হয়, তাহলে সমাধান কী?
বার্দিয়েভ এবং অন্যরা বলেন আমাদের একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রয়োজন যা:
১০. গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতার বিপরীত সম্পর্ক
এখানে একটি আশ্চর্যজনক সত্য উল্লেখযোগ্য: স্বাধীনতা গণতন্ত্রের মাধ্যমে আসে না।
বার্দিয়েভ বলেন:
সমাজে যখন মানুষ সত্যে বিশ্বাস করে, তারা স্বাধীনভাবে সেই সত্যের জন্য আত্মত্যাগ করতে পারে। ইনকুইজিশনের যুগে, যদিও নিপীড়ন ছিল, একজন ধর্মে বিশ্বাসী ব্যক্তি নিজের বিশ্বাসের জন্য সাহসিকতার সাথে কথা বলতে পারত। তার স্বাধীনতা বাহ্যিক নয়, অভ্যন্তরীণ ছিল — চিন্তা এবং আত্মার স্বাধীনতা।
কিন্তু আজকের গণতান্ত্রিক সমাজে, মানুষ স্বাধীনভাবে যা খুশি বলতে পারে, কিন্তু কোনো সত্য তার কাছে আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। ঠিক-ভুল প্রতিটি মতামত-ই সমান, কোনো ধর্ম বিশ্বাস পবিত্র নয়। এর ফলে মানুষ আসলে আধ্যাত্মিকভাবে বন্দী — তারা জানে না যে তারা কোনটা বিশ্বাস করবে।
একটি সহজ তুলনা
ফলাফল: যে সমাজ মনে করে সত্য নেই, সেখানে সত্যিকারের স্বাধীনতাও নেই।
১০.১ জন ডিউয়ি এবং শিক্ষার মাধ্যমে গণতন্ত্র
আমেরিকান দার্শনিক জন ডিউয়ি গণতন্ত্রকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তিনি নিজেই বার্দিয়েভের সমস্যা স্বীকার করেছেন।
John Dewey: "The conception of education as a social process and function has no definite meaning until we define the kind of society in mind...One of the fundamental problems of education in and for a Democratic society is set by the conflict of a nationalistic and wider social aim."
১০.২ ক্বওমি সনদ
তাই খিলাফাতের দৃষ্টিতে মাদ্রাসা ব্যবস্থা হল প্রকৃত শিক্ষা; গণতন্ত্রের দৃষ্টিতে, যেহেতু মাদ্রাসা গণতান্ত্রিক সমাজকে ধারণ করে না তাই প্রকৃতপক্ষে এই সিস্টেম কোন শিক্ষা দেয় না। একারনে ক্বওমি শিক্ষার্থীদের সমাজের ২য় শ্রেণীর নাগরিক করে রাখা হয়েছে। তারা শিক্ষিত হয়েও অশিক্ষিত, বেকার; রাষ্ট্রের চোখে বোঝা।
আবার জাতীয়তাবাদী শিক্ষার কারণে ৫০ বছরের পুরাতন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ঘৃণা-বিদ্বেষ, অভিযোগ-আপত্তি, নিন্দা-অপপ্রচার চলছে। অথচ মূল অপরাধীরা বেচেও নেই।
এদিকে বার্দিয়েভ জিজ্ঞাসা করছেন: শিক্ষা কীসের জন্য?
১১. প্রযুক্তির আধিপত্য
মানুষকে দাসে পরিণত করতে গণতন্ত্র এবং প্রযুক্তি একসাথে কাজ করে । গণতন্ত্র আমাদের 'ভাবায়' আমরা স্বাধীন, অথচ প্রযুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে।
বার্দিয়েভ বলেছিলেন গণতন্ত্র আধ্যাত্মিক ভিত্তি হারিয়েছে।
পড়ুন https://www.dhakatribune.com/opinion...haped-the-vote
https://www.science.org/doi/10.1126/science.abp9364
https://www.researchgate.net/publication/386347360_The_Role_of_Social_Media_Algorithms_in_S haping_Public_Opinion_During_Political_Campaigns
https://www.multisubjectjournal.com/article/611/7-2-13-537.pdf
https://www.nature.com/articles/s41467-025-59131-4
https://www.fielding.edu/how-artificial-intelligence-shapes-how-we-think-act-and-connect/
https://www.psychologytoday.com/us/blog/positively-media/202501/how-artificial-intelligence-shapes-how-we-think-act-and-connect
১২. কার্ল জাস্পার্স এবং আধুনিকতার সংকট
জার্মান দার্শনিক কার্ল জাস্পার্স বার্দিয়েভের ধারণাকে আরও সুনির্দিষ্ট করেন। তিনি বলেন আধুনিকতার সংকট তিনটি স্তরে ঘটে:
১৩. বার্দিয়েভের মূল যুক্তি: গণতন্ত্র জনগণকে চেনে না
বার্দিয়েভের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ যুক্তি হলো: গণতন্ত্র জনগণের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে, কিন্তু সেই জনগণকে সে চেনে না।” এটি বুঝতে হলে ভাবুন:
প্রশ্ন হলো: ‘জনগণ’ মানে কী? কেবল আজকের ভোটাররা? নাকি হাজার বছরের জাতির, ইতিহাসের সব মানুষ — মৃত, জীবিত এবং ভবিষ্যতের মানুষরা?
গণতন্ত্র বলে: “আজকের ভোটাররাই জনগণ।” বার্দিয়েভ বলেন: “প্রকৃত জনগণ হলো হাজার বছরের সশ্রদ্ধ বার্ধক্য — মৃত পিতা-মাতার সাথে সংযোগ থাকা।”
একটি সহজ উদাহরণ: বাংলাদেশের মতামত কি? আজকের বাংলাদেশিদের ভোট? নাকি সাইয়েদ আহমাদ শহীদ, শাহ জালাল, শাহ পরাণ, শাহ আমানত — সবকিছু মিলিয়ে একটি বাংলাদেশের সত্যিকারের মতামত?
গণতন্ত্র শুধু আজকের ডেমোগ্রাফিক সংখ্যা গণনা করে। সে সামাজিক স্মৃতি, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং হাজার বছরের সামষ্টিক অভিজ্ঞতাকে গণনার বাইরে রাখে। এই কারণেই গণতন্ত্র একটি জাতিকে প্রকৃতপক্ষে চিনতে পারে না — শুধু একটি মুহূর্তের ভোটারদের সমষ্টিকে পরিচয় দিতে পারে।
১৪. সংসদ: গণতন্ত্রের অজৈব সন্তান
বার্দিয়েভ সংসদকে বলেন অজৈব সন্তান — রাজনৈতিক দলের বিভক্তির যন্ত্র।
• প্রতিটি দল নিজের স্বার্থ রক্ষা করে, জাতিয় স্বার্থ নয়।
• নির্বাচন জিততে প্রমিস করে, জিতার পরে ভুলে যাওয়া হয়।
• সরকার পাঁচ বছর থাকে, তারপর আবার পরিবর্তন — কোনো ধারাবাহিকতা নেই।
• সামাজিক নীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি পাঁচ বছর পর পর বদলালে জাতির সামষ্টিক পরিচয় নষ্ট হয়ে যায়।
বার্দিয়েভের ভাষায়: “গণতন্ত্রে সবকিছু ভঙ্গুর। বাস্তব জীবন গণতন্ত্রের সীমানার বাইরে।”
১৫. গণতন্ত্রের কেন্দ্রীয় বিরোধাভাস: যত স্বাধীনতা, তত দাসত্ব
বার্দিয়েভের সবচেয়ে কঠিন দাবি: গণতন্ত্র স্বতন্ত্রতার নামে শুরু হয়, কিন্তু শেষপর্যন্ত তা দাসত্বে পরিণত হয়। কীভাবে? তিনটি ধাপে:
ফলাফল: যত বেশি স্বাধীনতা, তত বেশি বাজারের দাসত্ব। প্রযুক্তি কোম্পানি এবং মিডিয়া হাউসগুলো মানুষের স্বতন্ত্রতার শূন্যস্থান দখল করে নিয়েছে। মানুষ ভোট দিচ্ছে, কিন্তু তাদের ইচ্ছা বাহির থেকে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে।
১৬. ইসলামি দর্শন: বার্দিয়েভের সমালোচনার শেষ সত্য
দ্বীন হিসেবে: ইসলামি দর্শনের মূল ধারণা
ইসলাম বলে, সমস্ত শ্রেষ্ঠত্ব, সমস্ত সার্বভৌমত্ব কেবলমাত্র আল্লাহর। ইসলামি পরিভাষায় এটিকে বলা হয় হাকিমিয়্যাতুল্লাহ — আল্লাহর শাসন। মানুষ নিজে শাসক নয় — মানুষ হলো আল্লাহর খলিফা, তাঁর প্রতিনিধি।
“ সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকার আল্লাহর” — সূরা ইউসুফ: আয়াত ৪০
এই একটি আয়াতেই বার্দিয়েভের সমস্ত সমালোচনার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। গণতন্ত্র বলে: “মানুষের ইচ্ছাই সর্বোচ্চ।” ইসলাম বলে: “হ্যা — কিন্তু শুধুমাত্র আল্লাহর সীমার মধ্যে।” গণতন্ত্রের সমস্যা হলো যে সে ওই সীমা মানে না।
ইসলামি রাজনীতির সামষ্টিক দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে রাজনীতির লক্ষ্য জনগণের সন্তুষ্টি নয়, বরং জনগণের কল্যাণ:
• আমর বিল মারুফ (সৎকাজের নির্দেশ দেওয়া)
• নাহয়ানি আনিল মুনকার (অন্যায় থেকে নিরোধ করা) — সমাজকে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছার অনুগামী করে না।
• আদল (ন্যায়বিচার) — জনসংখ্যা নয়, ন্যায়হীনতা রোধ করাই রাজনীতির মূল তত্ত্ব।
বার্দিয়েভ ধর্মীয় ভিত্তির কথা বলেছিলেন — ইসলামি দর্শন সেই ভিত্তি কী হওয়া উচিত তা বিস্তারিতভাবে দেখিয়ে দেয়: আল্লাহর সন্তুষ্টি, ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকারের সমন্বয়।
১. গণতন্ত্র কী? একটি সহজ সংজ্ঞা
গণতন্ত্র মানে জনগণের শাসন। কিন্তু বার্দিয়েভ এবং অন্যান্য চিন্তাবিদরা বলেন যে আধুনিক গণতন্ত্র শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক পদ্ধতি — কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এই পদ্ধতি ব্যাখ্যা করলেও সেই সিদ্ধান্ত কেমন হওয়া উচিত তা বলে না।
একজন ড্রাইভারের লাইসেন্স আছে, সে গাড়ি চালাতে পারে — কিন্তু তার গন্তব্য নির্ধারণ করতে পারে না। সে সমুদ্রের দিকে যেতে পারেন বা পাহাড় থেকে ফেলেও দিতে পারেন। গণতন্ত্র অনুরূপভাবে কাজ করে: এটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার যন্ত্র, কিন্তু কোন দিকে যাওয়া উচিত তা জানে না।
২. গণতন্ত্রের তিনটি মূল সমস্যা
২.১ সত্যের অনুপস্থিতি: গণতন্ত্র সত্য বিশ্বাস করে না
গণতন্ত্র নিরপেক্ষ থাকতে চায়। এটি বলে: "আমরা ভাল বা খারাপ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেব না। আমরা শুধু গণনা করি কে আছে এবং বেশি মানুষ কি চায়।"
কিন্তু এটা একটি বিপদজনক ত্রুটি। এর মানে গণতন্ত্র সত্যে বিশ্বাস করে না। যদি আপনি সত্যে বিশ্বাস করেন, আপনি বলবেন: "এটি সঠিক, তাই আমরা এটি করব, এমনকি যদিও বেশিরভাগ মানুষ সম্মত না হয়।" কিন্তু গণতন্ত্র বলে: "বেশিরভাগ মানুষ যা বলে তাই সঠিক।"
উদাহরণ: ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব "মানবাধিকার এবং স্বাধীনতা" ঘোষণা করে শুরু হয়েছিল। কিন্তু ১৭৯৩ সালের মধ্যে, একই জনতার ভোটে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। কেন? কারণ জনতার ইচ্ছা খারাপ হতে পারে, এবং গণতন্ত্রের কোনো শক্তি নেই এটি থামানোর।
২.২ আশাবাদী সন্দেহ: গণতন্ত্রের অস্পষ্ট বিশ্বাস
এটি একটি অদ্ভুত বিষয় যে, গণতন্ত্র সত্যে বিশ্বাস করে না, তবুও এটি অত্যন্ত আশাবাদী। এটি বিশ্বাস করে যে অনেক মানুষের ভোট যোগ করলে ভাল ফলাফল আসবে।
ফিলোসফার জাঁ-জ্যাক রুসো এই ধারণার প্রবর্তন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন মানুষ মূলত ভাল এবং সৎ। কিন্তু এটা ভুল। মানুষ স্বার্থপর হতে পারে, অন্যায্য কাজ করতে পারে, এবং সংখ্যার (ভিড়ে) তারা আরও খারাপ হয়ে যায়।
গণতন্ত্র এই বাস্তবতা অস্বীকার করে।
২.৩ স্বাধীনতার বিপরীত প্রভাব: গণতন্ত্র স্বাধীনতা ধ্বংস করে
এটি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু এটি সত্য: গণতন্ত্র ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সীমিত করে।
জঁ-জ্যাক রুসো বলেছিলেন তিনি "বিবেকের স্বাধীনতা" বিশ্বাস করেন না। ম্যাক্সিমিলিয়েন রোবেসপিয়েরে (বিপ্লবের নেতা) এটি বাস্তবায়ন করেছিলেন — তিনি যারা তার সাথে সম্মত ছিল না তাদের কণ্ঠস্বর দমন করেছিলেন।
কেন এমন ঘটে? কারণ আপনি যা চান তা করতে বাধ্য হন কারণ "বেশিরভাগ মানুষ এটি চায়।"
আধুনিক সমালোচকরা (টকভিল এবং মিল) তাদের সময়েই সাবধান করেছিলেন: গণতন্ত্র সকল ব্যক্তিকে সমান করে দেয় এবং চিন্তার স্বাধীনতা চুরি করে। মূর্খ এসে জ্ঞানীর উপর মূর্খতা চাপিয়ে দিতে পারে।
৩. গণতন্ত্র কখন এবং কেন জন্ম হয়েছিল?
গণতন্ত্র একটি রোগের লক্ষণ, কোন সমাধান নয়।
একটি স্বাস্থ্যকর সমাজে, মানুষ একসাথে জৈব ভাবে যুক্ত থাকে। তারা সাধারণ ধর্ম, সাধারণ মূল্যবোধ এবং সাধারণ ঐতিহ্য ধারণ করে। কিন্তু যখন এই সংযোগ ভেঙে যায়, তখন গণতন্ত্র চলে আসে। তবে উপমহাদেশের গণতন্ত্র উপনিবেশের ফলাফল।
আধুনিক যুগে, ঐতিহ্য মারা গেছে, ধর্মের প্রভাব হ্রাস পেয়েছে, এবং সমাজ পরমাণুতে বিভক্ত হয়েছে। এখন মানুষ চিন্তা করে: "ঠিক আছে, আমাদের কাছে আর কিছু নেই — শুধু ভোট দিই এবং সংখ্যা গণনা করি।"
৪. অনটোলজি বনাম সাইকোলগিজম: দর্শনের গভীর স্তর
এখানে একটি গভীর দার্শনিক পার্থক্য আছে -
| ধারণা | অর্থ | উদাহরণ |
| অনটোলগিজম | সত্য একটি বাস্তব বস্তু যা মানুষের বাইরে বিদ্যমান। আমরা সত্যকে আবিষ্কার করি, তৈরি করি না। | ঈশ্বর, প্রকৃতির নিয়ম, সৌন্দর্য — এগুলি সবসময় আছে। |
| সাইকোলজিজম | সত্য মানুষের মনের মধ্যে বিদ্যমান। আমরা এটি তৈরি করি এবং এটি পরিবর্তন করতে পারি। | "আমি বিশ্বাস করি, তাই এটি আমার জন্য সত্য।" |
কিন্তু জীবনে সত্যিকারের অনটোলজিকাল বিষয় আছে। ন্যায় অন্যায় আছে, এবং এটি বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করুক বা না করুক সঠিক। সত্য সত্য, এবং এটি জনমত দ্বারা পরিবর্তন করা যায় না।
৫. গণতন্ত্রের সাথে দার্শনিক সমস্যাগুলি
৫.১ রুসো এবং সাধারণ ইচ্ছা
ফিলোসফার রুসো বলেছিলেন একটি "সাধারণ ইচ্ছা" থাকা উচিত — জনগণের একটি সত্যিকারের, একীভূত, প্রকৃত ইচ্ছা। সে আরও বলেছিল, Whoever refuses to obey the general will will be forced to do so by the entire body; this means merely that he will be forced to be free.”
"যে কেউ সাধারণ ইচ্ছা মানতে অস্বীকার করবে তাকে সমগ্র রাষ্ট্রীয় যন্ত্র দ্বারা তা করতে বাধ্য করা হবে; এর অর্থ হল- তাকে মুক্ত-স্বাধীন হতে বাধ্য করা হবে।"
এমন নয় যে আপনি সবার ভোট যোগ করলেই উত্তর পাবেন। এটি আরও গভীর কিছু — একটি জাতীয় চেতনা যা প্রজন্মের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।
গণতন্ত্র এটি বুঝে না। সে শুধু সংখ্যা গণনা করে। একারনে জনগণের সাধারণ ইচ্ছা না থাকলেও নারীদের জোরপূর্বক মুক্ত-স্বাধীন(!!!) বানানো হয়।
৫.২ কার্ল শ্মিট এবং সিদ্ধান্ত
জার্মান ফিলোসফার কার্ল শ্মিট বলেছেন: The emptiness of mere majority calculus deprives legality of all persuasive power", মূলত, স্মিট বলেছেন যে, ভোট গণনা আইনের বৈধতা বা বাধ্যতামূলক শক্তিকে ভিত্তি দিতে পারে না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে জনগণের কোন ভূমিকা নেই।
যেমন: যুদ্ধের সময়, একজন নেতাকে নিয়মকানুন ভাঙতে হতে পারে জাতিকে বাঁচাতে।
তিনি আরও বলেছেন, All law is situational law. The sovereign produces and guarantees the situation in its totality. He has the monopoly over this last decision.
সমস্ত আইন পরিস্থিতিগত আইন। সার্বভৌম তার সামগ্রিকতায় পরিস্থিতি তৈরি করে এবং গ্যারান্টি দেয়। এই শেষ সিদ্ধান্তে তার একচেটিয়া অধিকার রয়েছে।
আধুনিক দার্শনিক ম্যাকইনটায়ার বলেছিলেন: আমরা নৈতিক শব্দভাণ্ডার হারিয়েছি।
একবার, মানুষ বলত: "অমুক কাজ ভাল কারণ গুণ (ভালো গুণ) এমন দাবি করে।" এখন, মানুষ শুধু বলে: "হিজাব আমার পছন্দ। আমি এটা পছন্দ করি।" কোনো সাধারণ ভালো বলে কিছু নেই, সব কিছু শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ।
গণতন্ত্র ঠিক এটাই করে: এটা সব মূল্যবোধকে "পছন্দ" হিসাবে বিবেচনা করে।
তিনি আরও বলেছেন,
In any society where government does not express or represent the moral community of the citizens, but is instead a set of institutional arrangements for imposing a bureaucratized unity on a society which lacks genuine moral consensus, the nature of political obligation becomes systematically unclear...A striking feature of moral and political argument in the modern world is the extent to which it is innovators, radicals, and revolutionaries who revive old doctrines, while their conservative and reactionary opponents are the inventors of new ones...What matters at this stage is the construction of local forms of community within which civility and the intellectual and moral life can be sustained through the new dark ages which are already upon us. And if the tradition of the virtues was able to survive the horrors of the last dark ages, we are not entirely without ground for hope. This time however the barbarians are not waiting beyond the frontiers; they have already been governing us for quite some time.
যে সমাজে সরকার নাগরিকদের নৈতিক সম্প্রদায়কে প্রকাশ বা প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং একটি সমাজে একটি আমলাতান্ত্রিক ঐক্য আরোপের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার একটি সেট হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে, অর্থাৎ যেখানে প্রকৃত নৈতিক ঐক্যমত্যের অভাব রয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার প্রকৃতি পদ্ধতিগতভাবে অস্পষ্ট হয়ে যায়...আধুনিক বিশ্বে নৈতিক ও রাজনৈতিক যুক্তির একটি আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল যে এটি যারা পুরানো মতবাদগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করে তাদের বিরুদ্ধে উদ্ভাবক, মৌলবাদী এবং বিপ্লবী ট্যাগ দেয়, অথচ তাদের রক্ষণশীল এবং প্রতিক্রিয়াশীল বিরোধীরা-ই প্রকৃতপক্ষে নতুন তত্ত্বের উদ্ভাবক৷..এই পর্যায়ে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হল সম্প্রদায়ের স্থানীয় রূপের বিনির্মাণ যার মধ্যে সভ্যতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক জীবন যা ইতিমধ্যেই আমাদের উপর চেপে বসা নতুন জাহেলি অন্ধকার যুগে টিকে থাকতে সাহায্য করবে। এবং যদি গুণাবলীর ঐতিহ্য সর্বশেষ জাহেলি অন্ধকার যুগের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে সক্ষম হয়ে থাকে, তাহলে কিছুটা হলেও আশা আছে. কিন্তু এবার বর্বর মুশরিকরা সীমান্ত অতিক্রমের অপেক্ষা করছে না; তারা ইতিমধ্যে বেশ কিছু সময় যাবত আমাদের শাসন করছে.
৫.৪ এডমান্ড বার্ক এবং জৈব ঐতিহ্য
ইংরেজ রক্ষণশীল দার্শনিক এডমান্ড বার্ক বলেছিলেন: সমাজ একটি জীবন্ত জিনিস, যন্ত্র নয়।
তিনি বলেছিলেন:
Society is indeed a contract. It is a partnership in all science; a partnership in all art; a partnership in every virtue, and in all perfection. As the ends of such a partnership cannot be obtained in many generations, it becomes a partnership not only between those who are living, but between those who are living, those who are dead, and those who are to be born.
"সমাজ আসলেই একটি চুক্তি. এটা সব শাস্ত্রেই অংশীদারিত্ব; সব কলা-য় অংশীদারিত্ব; প্রতিটি গুণের দিক থেকে অংশীদারিত্ব, এবং সব দিক থেকেই নিখুঁত. যেহেতু সমাজের এই বিশেষ জাতীয় অংশীদারিত্বের ফলাফল অনেক প্রজন্মের মধ্যে পাওয়া যায় না, তাই এটি শুধুমাত্র জীবিত ব্যক্তিদের মধ্যেই নয়, যারা জীবিত, যারা মৃত এবং যারা জন্মগ্রহণ করবে তাদের সবার মধ্যে একটি অংশীদারিত্ব হয়ে ওঠে৷ সমাজ শুধুমাত্র যারা জীবিত তাদের মধ্যে একটি চুক্তি নয়, বরং যারা জীবিত, যারা মৃত এবং যারা ভবিষ্যতে জন্মাবে তাদের মধ্যে একটি চুক্তি।"
গণতন্ত্র এটি ভুলে যায়। সে বলে: "আজকের ভোট সবকিছু নির্ধারণ করে। আমরা অতীত নিয়ে চিন্তা করি না।" সে জাতির ঐতিহ্য ভঙ্গ করে এবং একটি জাতির আত্মাকে হত্যা করে। বার্দিয়েভ একই কথা বলেছেন।
৫.৫ হেগেল এবং নৈতিক জীবন
জার্মান দার্শনিক হেগেল বলেছিলেন রাষ্ট্রের একটি চেতনা আছে যা ব্যক্তিগত ইচ্ছার উপরে থাকে। তিনি একে "Sittlichkeit" (নৈতিক জীবন) বলে ডাকেন।
এর মানে: একটি দেশ শুধু পৃথক নাগরিকদের সমষ্টি নয়। এর একটি আত্মা আছে, একটি বিবেক আছে, একটি লক্ষ্য আছে।
গণতন্ত্র এটি অস্বীকার করে এবং মানুষকে বিচ্ছিন্ন "ব্যক্তি পরমাণু" হিসাবে বিবেচনা করে যা দিয়ে শুধু সংখ্যা গণনা করা হয়।
আবার তিনি বলেছিলেন যে, to be independent of public opinion is first and formal condition of achieving anything great
"জনমত থেকে স্বাধীন হওয়া মহান কিছু অর্জনের প্রথম এবং আনুষ্ঠানিক শর্ত"
৫.৬ লিও স্ট্রাউস এবং প্রাকৃতিক আইন
দার্শনিক লিও স্ট্রাউস বলেছিলেন: সমস্ত সভ্যতা একটি প্রাকৃতিক আইনের উপর নির্ভর করে —এমন আইন সময়ের সাথে স্থায়ী ও যুক্তিসঙ্গত এবং যা সকলের জন্য প্রযোজ্য।
এটি গণিত বা পদার্থবিজ্ঞানের মতো। ২+২=৪, এবং এটি গণনা বা জনমত দ্বারা পরিবর্তন করা যায় না। একইভাবে, ন্যায়বিচার এবং সত্য হাক্বিকি অর্থে অস্তিত্বশীল।
গণতন্ত্র বলে: "প্রাকৃতিক আইন বলে কিছু নেই। যা বেশিরভাগ মানুষ বলে তাই আইন।" এটি স্ট্রাউসের চেতনার বিরুদ্ধে।
স্ট্রাউস আরও বলেছেন, the problem posed by conflicting needs of society can not be solved if we don't possess knowledge of natural right. The contemporary rejection of natural right leads to nihilism - nay, it is identical with nihilism.Liberal relativism has its roots in the natural right tradition of tolerance or in the notion that everyone has a natural right to the pursuit of happiness as he understands happiness; but in itself it is a seminary of intolerance.
আমরা প্রাকৃতিক জ্ঞানের অধিকারী না হলে সমাজের পরস্পরবিরোধী চাহিদা দ্বারা উত্থাপিত সমস্যা সমাধান করা যাবে না. প্রাকৃতিক অধিকারের সমসাময়িক প্রত্যাখ্যান নিহিলিজমের দিকে পরিচালিত করে-না, এটি নিহিলিজমের সাথে অভিন্ন. উদার আপেক্ষিকতার শিকড় সহনশীলতার প্রাকৃতিক অধিকার ঐতিহ্যে থাকলেও; এটি নিজেই অসহিষ্ণুতার সেমিনারি.
৬. নিয়েটশে এবং জনতার নৈতিকতা
দার্শনিক ফ্রেডরিক নিয়েটশে সাবধান করেছিলেন যে: সাধারণ মানুষ মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে পারে না, শুধু অনুসরণ করতে পারে। যখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি সর্বোচ্চ হয়, তখন প্রতিভা এবং উদ্ভাবন দমন করা হয়।
তিনি লিখেছেন, Again and again I am brought up against it, and again and again I resist it: I don't want to believe it, even though it is almost palpable: the vast majority lack an intellectual conscience; indeed, it often seems to me that to demand such a thing is to be in the most populous cities as solitary as in the desert.
বারবার আমি এর বিরুদ্ধে মুখোমুখি হয়েছি, এবং বারবার আমি একে প্রতিরোধ করি: আমি এটি বিশ্বাস করতে চাই না, যদিও এটি প্রায় স্পষ্ট: বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেকের অভাব রয়েছে; প্রকৃতপক্ষে, প্রায়শই আমার কাছে মনে হয় যে সর্বাধিক জনবহুল শহরে বিবেককে তলব করা, মরুভূমির মতো নির্জন স্থানে থাকার মতই।
৭. গণতন্ত্রের ভিতরে গোপন সংগ্রাম
বার্দিয়েভ একটি গভীর পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করেন: গণতন্ত্র অভ্যন্তরীণভাবে অস্থিতিশীল।
কারণ:
- এটি কোনো লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে না, তাই রাজনৈতিক দল এবং গোষ্ঠীগুলি ক্রমাগত সংঘাতে লিপ্ত থাকে
- এটি কোনো সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অফার করে না, তাই সমাজ বিভক্ত থাকে
- এটি সম্পূর্ণরূপে প্রক্রিয়া-ভিত্তিক, তাই এর কোনো স্থায়িত্ব বা ধারাবাহিকতা নেই
- সবকিছু অস্থায়ী এবং পরিবর্তনশীল: প্রতিটি নির্বাচন নতুন নিয়মকানুন নিয়ে আসে
ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল সংসদ গঠন করলেও প্রকৃত শক্তি ধারণ করে না। প্রকৃত শক্তি রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে থাকে, যা জনগণকে ম্যানিপুলেট করে।
৮. ধর্ম এবং সত্যের অভাব
এখানে বার্দিয়েভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট:
"সত্য পবিত্র। একটি সত্য-ভিত্তিক সমাজ সম্পূর্ণভাবে ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে না।"
মানে: গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষ কারণ এটি অধার্মিক। এটি সত্যে বিশ্বাস করে না, তাই এটি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে পারে না।
ধর্ম নির্দিষ্টভাবে দাবি করে: "এটি সত্য, এবং আমরা এটির জন্য মরতে প্রস্তুত।"
গণতন্ত্র বলে: "সত্য কী তা জানি না, তাই আমরা শুধু ভোট দেব।"
এগুলি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি স্বাস্থ্যকর সমাজের একটি অন্তর্নিহিত ধর্মীয় বিশ্বাস থাকা উচিত।
৯. সমাধান কী?
যদি গণতন্ত্র ত্রুটিপূর্ণ হয়, তাহলে সমাধান কী?
বার্দিয়েভ এবং অন্যরা বলেন আমাদের একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রয়োজন যা:
| উপাদান | অর্থ | কেন গুরুত্বপূর্ণ |
| একটি ভাগ করা নৈতিক কাঠামো | সবাই কিছু প্রধান মূল্যবোধে সম্মত থাকে (ন্যায়বিচার, সত্য, ভালো) | এটি ছাড়া সমাজ হল লড়াইয়ের একটি যুদ্ধক্ষেত্র |
| ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা | অতীতের শিক্ষা এবং আমাদের পূর্বপুরুষদের জ্ঞান সম্মান করা | এটি আমাদের শিকড় এবং পরিচয় |
| একটি জাতীয় চেতনা | মানুষ অনুভব করে তারা একটি বৃহত্তর সম্প্রদায়ের অংশ, শুধু পৃথক ভোটার নয় | এটি ঐক্য এবং একতা সৃষ্টি করে |
| ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক ভিত্তি | রাজনীতি নৈতিকতা এবং আধ্যাত্মিক লক্ষ্যের সাথে সংযুক্ত | এটি জীবনে অর্থ এবং উদ্দেশ্য প্রদান করে |
| নেতৃত্ব যা সত্য জানে | এমন নেতা যারা সাহসী, জ্ঞানী এবং একটি দৃষ্টিভঙ্গি আছে | এটি সমাজকে ভালো দিকে গাইড করে |
১০. গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতার বিপরীত সম্পর্ক
এখানে একটি আশ্চর্যজনক সত্য উল্লেখযোগ্য: স্বাধীনতা গণতন্ত্রের মাধ্যমে আসে না।
বার্দিয়েভ বলেন:
"ইনকুইজিশনের জ্বলন্ত আগুনের সময়ে (দ্বাদশ থেকে উনবিংশ শতাব্দী) প্রকৃত চিন্তার স্বাধীনতা ছিল, যা আজকের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের চেয়ে বেশি।"
কিন্তু আজকের গণতান্ত্রিক সমাজে, মানুষ স্বাধীনভাবে যা খুশি বলতে পারে, কিন্তু কোনো সত্য তার কাছে আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। ঠিক-ভুল প্রতিটি মতামত-ই সমান, কোনো ধর্ম বিশ্বাস পবিত্র নয়। এর ফলে মানুষ আসলে আধ্যাত্মিকভাবে বন্দী — তারা জানে না যে তারা কোনটা বিশ্বাস করবে।
একটি সহজ তুলনা
| দিক | ইনকুইজিশনের যুগ | আধুনিক গণতন্ত্র |
| বাহ্যিক স্বাধীনতা | নেই, যদি ধর্মকে আঘাত করে হয়— সরকার নিয়ন্ত্রণ করে | আছে কিন্তু আংশিক — যা খুশি বলতে পারেন, যদি ধর্মকে আঘাত করে হয় |
| অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা | আছে — মানুষ সত্যে বিশ্বাস করে | নেই — সত্য সম্পর্কে সংশয় এবং বিভ্রান্তি |
| আত্মার শক্তি | শক্তিশালী — সত্যের জন্য মরতে প্রস্তুত | দুর্বল — কোনো চূড়ান্ত লক্ষ্য নেই |
১০.১ জন ডিউয়ি এবং শিক্ষার মাধ্যমে গণতন্ত্র
আমেরিকান দার্শনিক জন ডিউয়ি গণতন্ত্রকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তিনি নিজেই বার্দিয়েভের সমস্যা স্বীকার করেছেন।
John Dewey: "The conception of education as a social process and function has no definite meaning until we define the kind of society in mind...One of the fundamental problems of education in and for a Democratic society is set by the conflict of a nationalistic and wider social aim."
"শিক্ষাকে একটি সামাজিক প্রক্রিয়া এবং কাজ হিসেবে চিন্তা করলে এর কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থ নেই যতক্ষণ না আমরা সমাজের ধরণকে সংজ্ঞায়িত করি...গণতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষার মৌলিক সমস্যাগুলির মধ্যে একটি হল শিক্ষা জাতীয়তাবাদী এবং বৃহত্তর সামাজিক লক্ষ্যের সংঘাতের দ্বারা নির্ধারিত হয়।"
১০.২ ক্বওমি সনদ
তাই খিলাফাতের দৃষ্টিতে মাদ্রাসা ব্যবস্থা হল প্রকৃত শিক্ষা; গণতন্ত্রের দৃষ্টিতে, যেহেতু মাদ্রাসা গণতান্ত্রিক সমাজকে ধারণ করে না তাই প্রকৃতপক্ষে এই সিস্টেম কোন শিক্ষা দেয় না। একারনে ক্বওমি শিক্ষার্থীদের সমাজের ২য় শ্রেণীর নাগরিক করে রাখা হয়েছে। তারা শিক্ষিত হয়েও অশিক্ষিত, বেকার; রাষ্ট্রের চোখে বোঝা।
আবার জাতীয়তাবাদী শিক্ষার কারণে ৫০ বছরের পুরাতন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ঘৃণা-বিদ্বেষ, অভিযোগ-আপত্তি, নিন্দা-অপপ্রচার চলছে। অথচ মূল অপরাধীরা বেচেও নেই।
এদিকে বার্দিয়েভ জিজ্ঞাসা করছেন: শিক্ষা কীসের জন্য?
- আমরা কী সম্মান শেখাচ্ছি?
- আমরা কী সত্য শেখাচ্ছি?
- নাকি শুধু কীভাবে সিস্টেমে খাপ খাইয়ে নিতে হয় তা শেখাচ্ছি?
১১. প্রযুক্তির আধিপত্য
মানুষকে দাসে পরিণত করতে গণতন্ত্র এবং প্রযুক্তি একসাথে কাজ করে । গণতন্ত্র আমাদের 'ভাবায়' আমরা স্বাধীন, অথচ প্রযুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে।
বার্দিয়েভ বলেছিলেন গণতন্ত্র আধ্যাত্মিক ভিত্তি হারিয়েছে।
- গণতন্ত্র নাগরিকদের বলে: "আপনি স্বাধীন, আপনি যা চান করতে পারেন।"
- কিন্তু অ্যালগরিদম, বাজার এবং প্রযুক্তি আসলে তাদের চিন্তা এবং পছন্দ নির্ধারণ করে।
পড়ুন https://www.dhakatribune.com/opinion...haped-the-vote
https://www.science.org/doi/10.1126/science.abp9364
https://www.researchgate.net/publication/386347360_The_Role_of_Social_Media_Algorithms_in_S haping_Public_Opinion_During_Political_Campaigns
https://www.multisubjectjournal.com/article/611/7-2-13-537.pdf
https://www.nature.com/articles/s41467-025-59131-4
https://www.fielding.edu/how-artificial-intelligence-shapes-how-we-think-act-and-connect/
https://www.psychologytoday.com/us/blog/positively-media/202501/how-artificial-intelligence-shapes-how-we-think-act-and-connect
১২. কার্ল জাস্পার্স এবং আধুনিকতার সংকট
জার্মান দার্শনিক কার্ল জাস্পার্স বার্দিয়েভের ধারণাকে আরও সুনির্দিষ্ট করেন। তিনি বলেন আধুনিকতার সংকট তিনটি স্তরে ঘটে:
| স্তর | বার্দিয়েভের মতামত | জাস্পার্সের সম্প্রসারণ |
| ধর্মীয় স্তর | সমাজ ধর্ম হারিয়েছে | মানুষ জীবনের অর্থ খুঁজে পায় না |
| জ্ঞানীয় স্তর | সত্য অস্বীকার করা হয় | আমরা কোনটা সত্য তা জানতে পারি না |
| রাজনৈতিক স্তর | গণতন্ত্র নিরপেক্ষ | গণতন্ত্র কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পারে না |
১৩. বার্দিয়েভের মূল যুক্তি: গণতন্ত্র জনগণকে চেনে না
বার্দিয়েভের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ যুক্তি হলো: গণতন্ত্র জনগণের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে, কিন্তু সেই জনগণকে সে চেনে না।” এটি বুঝতে হলে ভাবুন:
প্রশ্ন হলো: ‘জনগণ’ মানে কী? কেবল আজকের ভোটাররা? নাকি হাজার বছরের জাতির, ইতিহাসের সব মানুষ — মৃত, জীবিত এবং ভবিষ্যতের মানুষরা?
গণতন্ত্র বলে: “আজকের ভোটাররাই জনগণ।” বার্দিয়েভ বলেন: “প্রকৃত জনগণ হলো হাজার বছরের সশ্রদ্ধ বার্ধক্য — মৃত পিতা-মাতার সাথে সংযোগ থাকা।”
একটি সহজ উদাহরণ: বাংলাদেশের মতামত কি? আজকের বাংলাদেশিদের ভোট? নাকি সাইয়েদ আহমাদ শহীদ, শাহ জালাল, শাহ পরাণ, শাহ আমানত — সবকিছু মিলিয়ে একটি বাংলাদেশের সত্যিকারের মতামত?
গণতন্ত্র শুধু আজকের ডেমোগ্রাফিক সংখ্যা গণনা করে। সে সামাজিক স্মৃতি, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং হাজার বছরের সামষ্টিক অভিজ্ঞতাকে গণনার বাইরে রাখে। এই কারণেই গণতন্ত্র একটি জাতিকে প্রকৃতপক্ষে চিনতে পারে না — শুধু একটি মুহূর্তের ভোটারদের সমষ্টিকে পরিচয় দিতে পারে।
১৪. সংসদ: গণতন্ত্রের অজৈব সন্তান
বার্দিয়েভ সংসদকে বলেন অজৈব সন্তান — রাজনৈতিক দলের বিভক্তির যন্ত্র।
• প্রতিটি দল নিজের স্বার্থ রক্ষা করে, জাতিয় স্বার্থ নয়।
• নির্বাচন জিততে প্রমিস করে, জিতার পরে ভুলে যাওয়া হয়।
• সরকার পাঁচ বছর থাকে, তারপর আবার পরিবর্তন — কোনো ধারাবাহিকতা নেই।
• সামাজিক নীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি পাঁচ বছর পর পর বদলালে জাতির সামষ্টিক পরিচয় নষ্ট হয়ে যায়।
বার্দিয়েভের ভাষায়: “গণতন্ত্রে সবকিছু ভঙ্গুর। বাস্তব জীবন গণতন্ত্রের সীমানার বাইরে।”
১৫. গণতন্ত্রের কেন্দ্রীয় বিরোধাভাস: যত স্বাধীনতা, তত দাসত্ব
বার্দিয়েভের সবচেয়ে কঠিন দাবি: গণতন্ত্র স্বতন্ত্রতার নামে শুরু হয়, কিন্তু শেষপর্যন্ত তা দাসত্বে পরিণত হয়। কীভাবে? তিনটি ধাপে:
| ধাপ | গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি | বার্দিয়েভের বাস্তবতা |
| ১. স্বাধীনতা | প্রতিটি মানুষ মুক্ত | বাজার এবং মিডিয়া তাদের বিশ্বাস ও পছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে |
| ২. সমতা | সব ধারণা সমান | সত্য এবং মিথ্যা সমান মর্যাদা পায় |
| ৩. নিরপেক্ষতা | সব মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা | সত্যের প্রতি উদাসীনতা, যা নৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি করে |
১৬. ইসলামি দর্শন: বার্দিয়েভের সমালোচনার শেষ সত্য
দ্বীন হিসেবে: ইসলামি দর্শনের মূল ধারণা
ইসলাম বলে, সমস্ত শ্রেষ্ঠত্ব, সমস্ত সার্বভৌমত্ব কেবলমাত্র আল্লাহর। ইসলামি পরিভাষায় এটিকে বলা হয় হাকিমিয়্যাতুল্লাহ — আল্লাহর শাসন। মানুষ নিজে শাসক নয় — মানুষ হলো আল্লাহর খলিফা, তাঁর প্রতিনিধি।
“ সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকার আল্লাহর” — সূরা ইউসুফ: আয়াত ৪০
এই একটি আয়াতেই বার্দিয়েভের সমস্ত সমালোচনার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। গণতন্ত্র বলে: “মানুষের ইচ্ছাই সর্বোচ্চ।” ইসলাম বলে: “হ্যা — কিন্তু শুধুমাত্র আল্লাহর সীমার মধ্যে।” গণতন্ত্রের সমস্যা হলো যে সে ওই সীমা মানে না।
ইসলামি রাজনীতির সামষ্টিক দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে রাজনীতির লক্ষ্য জনগণের সন্তুষ্টি নয়, বরং জনগণের কল্যাণ:
• আমর বিল মারুফ (সৎকাজের নির্দেশ দেওয়া)
• নাহয়ানি আনিল মুনকার (অন্যায় থেকে নিরোধ করা) — সমাজকে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছার অনুগামী করে না।
• আদল (ন্যায়বিচার) — জনসংখ্যা নয়, ন্যায়হীনতা রোধ করাই রাজনীতির মূল তত্ত্ব।
বার্দিয়েভ ধর্মীয় ভিত্তির কথা বলেছিলেন — ইসলামি দর্শন সেই ভিত্তি কী হওয়া উচিত তা বিস্তারিতভাবে দেখিয়ে দেয়: আল্লাহর সন্তুষ্টি, ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকারের সমন্বয়।