আল হিকমাহ মিডিয়া পরিবেশিত
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- ত্রয়োবিংশ পর্ব
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- ত্রয়োবিংশ পর্ব
শ্রবণ ও আনুগত্য ওয়াজিব হবার দলীলসমূহ
দ্বীনের যেকোনো বিষয়ে আল্লাহ যাকে দায়িত্ব দান করেছেন, মুসলিমদের যে কোনো বিষয়ে আল্লাহ যাকে কর্তৃত্ব দান করেছেন, সে ক্ষেত্রে ওই দায়িত্ব ও কর্তৃত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির নির্দেশ শ্রবণ করা এবং তাঁর আনুগত্য করা ইবাদাত হিসেবে গণ্য হয়। এর মাধ্যমে বান্দা তার রবের নৈকট্য লাভ করে। কারণ, উলুল আমরের আনুগত্য প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের অন্যরূপ। একাধিক হাদীসে আমরা এমনটাই দেখতে পাই। আল্লাহর নাফরমানি ভিন্ন অন্য সব ক্ষেত্রে উলুল আমরের আনুগত্য ওয়াজিব হওয়ার বিষয়ে উলামায়ে কেরাম ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন। ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ উক্ত বিষয়ে কাজী ইয়াযসহ আরো অনেকের সূত্রে ইজমা বর্ণনা করেছেন।
ইসলামে শ্রবণ ও আনুগত্যের বিরাট মর্যাদা রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা তাঁর কিতাবুল কারীমে তাওহীদবাদীদেরকে তাঁর আনুগত্য, তাঁর রাসূলের আনুগত্য এবং উলুল আমরের আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴿النساء: ٥٩﴾
‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, আনুগত্য করো (তাঁর) রাসূলের এবং সেসব লোকদের, যারা তোমাদের মাঝে দায়িত্বপ্রাপ্ত। অতঃপর কোনো ব্যাপারে তোমরা যদি একে অপরের সাথে মতবিরোধ করো, তাহলে সে বিষয়টি (ফয়সালার জন্যে) আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও, যদি তোমরা (সত্যিকার অর্থে) আল্লাহর ওপর এবং শেষ বিচার দিনের ওপর ঈমান এনে থাকো! (তাহলে) এই পদ্ধতিই হবে (তোমাদের বিরোধ মীমাংসার) সর্বোৎকৃষ্ট উপায় এবং বিরোধপূর্ণ বিষয়সমূহের ব্যাখ্যার দিক থেকেও (এটি) হচ্ছে উত্তম পন্থা’।[1]
ইমাম কুরতুবী নিজ তাফসীর গ্রন্থে উক্ত আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, “পূর্বের আয়াতে শাসকদেরকে সম্বোধন করে আমানত যথাযথভাবে আদায় করা এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে মানুষের মাঝে বিচার-ফয়সালা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাই, এই আয়াতে প্রজাদেরকে সম্বোধন করে আল্লাহ তা’আলা তাঁর নিজের আনুগত্যের নির্দেশ জানাচ্ছেন। আর আল্লাহর আনুগত্য হচ্ছে তাঁর আদেশসমূহ পালন করা এবং নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকা। অতঃপর এ আয়াতের দ্বিতীয় পর্যায়ে আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূলের ﷺ আনুগত্য করার নির্দেশ জারি করেন। অতঃপর, তৃতীয় পর্যায়ে শাসকবর্গের আনুগত্যের আদেশ দেন। উলুল আমর দ্বারা শাসকবর্গ উদ্দেশ্য হওয়ার এ বিষয়টি অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের এবং আবু হুরায়রা ও ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ সাহাবীদের মতামত। আহলে ইলমদের এ বিষয়ে মতানৈক্য রয়েছে। ইমাম তাবারী নিজ তাফসীর গ্রন্থে এমনটাই উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন: “উলুল আমর তথা উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাদেরকে যাদের আনুগত্যের আদেশ করেছেন তাঁদের বিষয়ে উলামায়ে কেরামের মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করে বলেছেন, তাঁদের দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে শাসকবর্গ। আবার কেউ কেউ বলেছেন, তাঁদের দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ফুক্বাহায়ে কেরাম। অন্য আরেকটি দল বলেছে, তাঁরা হচ্ছেন দ্বীনের বিজ্ঞ আহলে ইলম ব্যক্তিবর্গ।”
অতঃপর ইমাম তাবারী রহিমাহুল্লাহ উলুল আমর দ্বারা শাসকবর্গ হওয়ার মতটিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কারণ, আল্লাহর আনুগত্য এবং মুসলিমদের কল্যাণের ক্ষেত্রে শাসকবর্গের আনুগত্য জরুরী মর্মে রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হাদীস রয়েছে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের মধ্যে অধিকাংশ ফুক্বাহায়ে কেরাম ও মুফাসসিরীনে কেরাম এটিকেই অগ্রাধিকারযোগ্য সাব্যস্ত করেছেন বলে জানিয়েছেন ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ।”
ইমাম জাসসাস ‘আহকামুল কুরআন’ গ্রন্থে এ বিষয়ে উলামায়ে কেরামের কয়েকটি মতামত উল্লেখ করার পর বলেন, “এটিও জায়েজ আছে যে, সকলেই উদ্দেশ্য হবেন। অর্থাৎ উক্ত আয়াত দ্বারা ফুকাহায়ে কেরাম ও উলামায়ে কেরামের পাশাপাশি যুদ্ধের আমীর সকলকেই বোঝানো হয়েছে। কারণ, শব্দটি তাঁদের সকলকেই শামিল করছে। আর তা এভাবে যে, শাসকবর্গ সৈন্য পরিচালনা, যুদ্ধের ব্যবস্থাপনা এবং শত্রুর প্রতিরোধের ক্ষেত্রে উলুল আমর। আর উলামায়ে কেরাম শরীয়ত হেফাজত এবং জায়েজ-নাজায়েজ বিষয়ে উলুল আমর। তাই আল্লাহ তা’আলা মানুষদেরকে তাঁদের আনুগত্যের এবং তাঁদের নির্দেশ মান্য করা আদেশ দিয়েছেন।”
এবার আসি সেসব হাদীসের আলোচনায়, যেগুলো মুসলিমদের কোনো বিষয়ে দায়িত্ব ও কর্তৃত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নির্দেশ শ্রবণ করা এবং তাঁদের আনুগত্য করার অপরিহার্যতা বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে। শ্রবণ ও আনুগত্যের এই বিষয়টিকে মুসলিমদের নেতা রাসূলুল্লাহ ﷺ গুরুত্বহীনভাবে ছেড়ে দেননি। মুসলিমদের কোনো বিষয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত যেকোনো ব্যক্তির নির্দেশ অমান্যের ভয়াবহতা ও ভয়ঙ্কর পরিণতির কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ বিষয়টিকে এতটা গুরুত্ব দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর অনুসারীদেরকে শ্রবণ ও আনুগত্যের ব্যাপারে উৎসাহিত করে ইরশাদ করছেন-
مَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ عَصَى اللَّهَ وَمَنْ يُطِعْ الْأَمِيرَ فَقَدْ أَطَاعَنِي وَمَنْ يَعْصِ الْأَمِيرَ فَقَدْ عَصَانِي وَإِنَّمَا الْإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتَلُ مِنْ وَرَائِهِ وَيُتَّقَى بِهِ فَإِنْ أَمَرَ بِتَقْوَى اللَّهِ وَعَدَلَ فَإِنَّ لَهُ بِذَلِكَ أَجْرًا وَإِنْ قَالَ بِغَيْرِهِ فَإِنَّ عَلَيْهِ مِنْهُ
“যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আনুগত্য করল। আর যে ব্যক্তি আমাকে অমান্য করল, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে অমান্য করল। আর যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য করছে, সে প্রকৃতপক্ষে আমারই আনুগত্য করছে। আর যে ব্যক্তি আমীরকে অমান্য করছে, সে প্রকৃতপক্ষে আমাকেই অমান্য করছে। ইমাম হচ্ছে ঢাল স্বরূপ যার পেছনে থেকে লড়াই করা হয় এবং যার দ্বারা আত্মরক্ষা করা হয়। তিনি যদি তাকওয়ার ব্যাপারে নির্দেশ দেন এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন, তবে এর দ্বারা তাঁর প্রতিদান লাভ হবে। আর যদি তিনি অন্যায় কিছু করেন, তবে এর দায়ভার তাঁকে নিতে হবে।” [2]
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও ইরশাদ করেন-
(( اسْمَعُوا وأطِيعُوا ، وَإنِ استُعْمِلَ عَلَيْكُمْ عَبْدٌ حَبَشيٌّ ، كأنَّ رأْسَهُ زَبيبةٌ )) رواه البخاري .
“তোমরা শ্রবণ করো এবং আনুগত্য করো যদিও তোমাদের আমীর বানিয়ে দেওয়া হয় একজন আবিসিনীয় দাসকে যার মাথা দেখতে কিশমিশের মত।”[3]
আবু যার গিফারী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
عَنْ أَبِى ذَرٍّ قَالَ إِنَّ خَلِيلِي أَوْصَانِي أَنْ أَسْمَعَ وَأُطِيعَ وَإِنْ كَانَ عَبْدًا مُجَدَّعَ الأَطْرَافِ
“আমার খলিল (অন্তরঙ্গ বন্ধু) আমাকে ওসিয়ত করেছেন, যেন আমি শ্রবণ ও আনুগত্য বজায় রাখি যদিও আমীর হন ত্রুটিপূর্ণ একজন আবিসিনীয় ক্রীতদাস।”[4]
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরো ইরশাদ করেন-
السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ عَلَى الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ فِيمَا أَحَبَّ وَكَرِهَ مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِمَعْصِيَةٍ فَإِذَا أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَةَ
“একজন মুসলিমের জন্য পছন্দ-অপছন্দ সব বিষয়ে শ্রবণ ও আনুগত্য বজায় রাখা ওয়াজিব যতক্ষণ পর্যন্ত সে কোনো গুনাহের নির্দেশ লাভ না করে। যদি গুনাহের নির্দেশ লাভ করে তখন কোনো শ্রবণ ও আনুগত্য নেই।”[5]
হাফেজ ইবনে রজব ‘জামিউল উলূম ওয়াল হিকাম’ গ্রন্থে বলেছেন, “শাসকের শ্রবণ ও আনুগত্যের মাঝে মুসলিমদের পার্থিব জীবনের সৌভাগ্য নিহিত রয়েছে। এর দ্বারা জীবনযাত্রা কল্যাণমুখর হয়ে থাকে। এর দ্বারা বান্দারা তাদের দ্বীন প্রচার ও রবের ইবাদাতের ক্ষেত্রে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে থাকে।
আলী ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুও এমনটাই বলেছেন । তিনি বলেন, ‘সৎ হোক কিংবা অসৎ—একজন ইমাম বা নেতা ছাড়া কখনই মানুষের মাঝে কল্যাণ সাধিত হতে পারে না। আমীর যদি পাপাচারী হয়, তবে মু’মিন ব্যক্তি তাঁর আনুগত্যের ক্ষেত্রে নিজের রবের ইবাদাত করবে। আর পাপাচারী ব্যক্তিকে তার মৃত্যু দিবসের হাতে সোপর্দ করে দেয়া হবে।”
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, “উলুল আমর ব্যক্তিবর্গের আনুগত্য ওয়াজিব। কারণ আল্লাহ তা’আলা তাঁদের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব, যে ব্যক্তি উলুল আমরের আনুগত্যের মধ্য দিয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, সে আল্লাহর কাছে প্রতিদান লাভ করবে। আর যে ব্যক্তি পদমর্যাদা ও সম্পদের লোভে তাঁদের আনুগত্য করবে এভাবে যে, তারা যদি তার স্বার্থ রক্ষা করে; তাহলে সে তাঁদের আনুগত্য করবে। আর যদি রক্ষা না করে; তবে তাদের অবাধ্যতা করবে, তবে এমন ব্যক্তির জন্য আখিরাতে কোনো অংশ নেই। ইমাম বুখারী ও মুসলিম, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে নবীজি ﷺ থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন-
«: ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ، وَلَا يُزَكِّيهِمْ، وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ: رَجُلٌ عَلَى فَضْلِ مَاءٍ بِالْفَلَاةِ يَمْنَعُهُ مِنِ ابْنِ السَّبِيلِ، وَرَجُلٌ بَايَعَ رَجُلًا سِلْعَةً بَعْدَ الْعَصْرِ، فَحَلَفَ بِاللَّهِ لَأَخَذَهَا بِكَذَا وَكَذَا، فَصَدَّقَهُ وَهُوَ عَلَى غَيْرِ ذَلِكَ، وَرَجُلٌ بَايَعَ إِمَامًا لَا يُبَايِعُهُ إِلَّا لِدُنْيَا، فَإِنْ أَعْطَاهُ مِنْهَا وَفَى، وَإِنْ لَمْ يُعْطِهِ مِنْهَا لَمْ يَفِ»
“তিন ব্যক্তির সাথে আল্লাহ কেয়ামত দিবসে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না, তাঁদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। এরা হলো: (১) ওই ব্যক্তি, মরুভূমিতে অবস্থানকালে যার কাছে অতিরিক্ত পানি রয়েছে আর সে মুসাফিরকে পানি দিতে অস্বীকৃতি জানায়; (২) ওই ব্যক্তি,যে আসরের পর কারো কাছে কোনো পণ্য বিক্রি করার সময় আল্লাহর নামে কসম করে বলে যে, সে এই মূল্যে পণ্যটি ক্রয় করেছে; আর অপর ব্যক্তিও তাকে সত্যায়ন করে, কিন্তু বাস্তবে সে মিথ্যাবাদী। (৩) আর হচ্ছে ওই ব্যক্তি, যে কোনো ইমামকে বাইয়াত দেয় কেবলই জাগতিক স্বার্থে। ইমাম যদি বাইয়াতের কারণে তাকে কিছু দান করেন তবে সে বাইয়াত রক্ষা করে আর যদি কিছু না দেন তবে সে বাইয়াত রক্ষা করে না।”[6]
শরীয়তের এমনি আরও বহু দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য রয়েছে। সবকিছু এখানে উল্লেখ করলে আমাদের আলোচনা শুধু দীর্ঘই হবে। এসব অসংখ্য দলীল দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, উলুল আমরের আনুগত্য শরীয়তের দৃষ্টিতে ওয়াজিব। এটি এমন একটি ইবাদাত, যার দ্বারা বান্দা তার রবের নৈকট্য লাভ করে এবং অতি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হয়। এই আনুগত্যের দ্বারা মানুষ দ্বীনের মাঝে বিভেদ তৈরি না করা এবং মুসলিমদের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার ক্ষেত্রে সহযোগী ভূমিকা রাখতে সমর্থ হয়। ভূপৃষ্ঠে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় চেষ্টারত মুজাহিদ ভাইয়ের কর্তব্য হলো, এই ইবাদাতের স্বাদ আস্বাদন করতে চেষ্টা করা। এজন্য তাঁকে তাঁর আমীরের ডাকে সর্বদাই লাব্বাইক বলতে হবে। আর তাঁকে বুঝতে হবে, আমীরের আনুগত্যের মধ্য দিয়ে তিনি সকল অন্তরের মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আনুগত্যের ভেতরেই সকাল-সন্ধ্যা যাপন করছেন।
আমরা যে আনুগত্যের কথা এতক্ষণ আলোচনা করলাম, তার দ্বারা উদ্দেশ্য হল ভালো কাজে আনুগত্য। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং তাঁর রাসূল ﷺ-এর আদেশ-নিষেধের সীমানার ভেতরেই এই আনুগত্যের বিস্তৃতি। এছাড়া আনুগত্য ওয়াজিব হওয়ার জন্য নির্দেশিত বিষয় সাধ্যের অতিরিক্ত না হওয়াও একটি শর্ত। এর বাইরে কোনো শ্রবণ ও আনুগত্যের কথা নেই। আহলে ইলম ব্যক্তিবর্গের সিদ্ধান্ত এমনই। একাধিক হাদীস থেকে আমরা এমনটাই জানতে পারি।
সহীহ বুখারীসহ অন্যান্য গ্রন্থে আলী ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত একটি হাদীস এসেছে। এই হাদীস থেকে আমরা দেখতে পাই, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ بَعَثَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَرِيَّةً فَاسْتَعْمَلَ رَجُلًا مِنْ الْأَنْصَارِ وَأَمَرَهُمْ أَنْ يُطِيعُوهُ فَغَضِبَ فَقَالَ أَلَيْسَ أَمَرَكُمْ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ تُطِيعُونِي قَالُوا بَلَى قَالَ فَاجْمَعُوا لِي حَطَبًا فَجَمَعُوا فَقَالَ أَوْقِدُوا نَارًا فَأَوْقَدُوهَا فَقَالَ ادْخُلُوهَا فَهَمُّوا وَجَعَلَ بَعْضُهُمْ يُمْسِكُ بَعْضًا وَيَقُولُونَ فَرَرْنَا إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ النَّارِ فَمَا زَالُوا حَتَّى خَمَدَتْ النَّارُ فَسَكَنَ غَضَبُهُ فَبَلَغَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ لَوْ دَخَلُوهَا مَا خَرَجُوا مِنْهَا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ.
“রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি দল পাঠালেন এবং আনসারদের ভেতর একজনকে তার আমীর নির্ধারণ করলেন। আর দলের লোকদেরকে আমীরের আনুগত্যের নির্দেশ প্রদান করলেন। তো একবার দলের আমীর রাগান্বিত হয়ে বললেন, ‘রাসূলুল্লাহ ﷺ কি তোমাদেরকে আমার আনুগত্যের নির্দেশ দেননি’? লোকেরা বলল, ‘জি হ্যাঁ, দিয়েছেন’। তখন আমীর বললেন, ‘তোমরা কাঠ সংগ্রহ করে আনো’। তখন তারা কাঠ সংগ্রহ করে আনল। অতঃপর, আমীর তাদেরকে আগুন জ্বালাতে বললে তারা আগুন জ্বালাল। তখন আমীর বললেন, ‘এই আগুনে ঝাঁপ দাও। তখন লোকেরা চিন্তা করতে লাগল এবং একে অপরকে ধরে রাখল আর বলল, ‘আমরা আগুন থেকে বাঁচার জন্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছি’। তারা এমনটাই করতে থাকল। এরই মধ্যে আগুন নিভে গেল। এদিকে আমীরের রাগ পড়ে গেল। এই ঘটনা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে পৌঁছালে তিনি ইরশাদ করেন, “তারা যদি আগুনে ঝাঁপ দিত, তবে কেয়ামতের আগ পর্যন্ত সেখান থেকে বের হতে পারত না। আনুগত্য তো কেবল ভালো কাজে।”[7]
খাত্তাবী রহিমাহুল্লাহ বলেন, “এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, শাসকবর্গের আনুগত্য ওয়াজিব কেবলই ভালো কাজে। যেমন, যুদ্ধের জন্য বের হতে বলা হলে, বিভিন্ন ইবাদাত সংক্রান্ত এবং মুসলিম জনকল্যাণমূলক কাজের ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ক কোনো নির্দেশ দেয়া হলে অকুন্ঠ আনুগত্য প্রদর্শন করতে হবে। তবে কোনো গুনাহের ব্যাপারে যদি শাসকের নির্দেশ আসে, যেমন অবৈধভাবে কাউকে হত্যা করা ইত্যাদি, তবে সেসব ক্ষেত্রে আনুগত্যের কোনো বৈধতা নেই। আনুগত্য তো কেবলই ভালো কাজে, খারাপ কাজে নয়। আর ভালো কাজ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, শরীয়তের দৃষ্টিতে যেসব বিষয় বৈধ। যত হাদীসে সাধারণভাবে উলুল আমরের আনুগত্য ওয়াজিব হওয়ার কথা বলা আছে, সবগুলো হাদীসই এ বিষয়টি দ্বারা শর্তযুক্ত।”
ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাদীসটি একথার প্রমাণ বহন করে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর নফরমানী করে উলুল আমরের আনুগত্য করবে, সে গুনাহগার হবে। এক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে তার অপারগতা গ্রহণযোগ্য হবে না। বরং অপরাধের গুনাহের দায় তাকে নিতেই হবে, যদিও এমন হয় যে, আমীরের নির্দেশ না পেলে সে কাজটি করত না। হাদীস থেকে এমনটাই সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়। তৌফিক-এর উৎস একমাত্র আল্লাহ!”
এ কারণেই প্রত্যেক অধীনস্থ ব্যক্তির কর্তব্য হলো: আল্লাহর অবাধ্যতা করে কারো আনুগত্য না করা। আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে কাউকে সন্তুষ্ট করতে না চাওয়া। যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতা করে কারো আনুগত্য করবে, আল্লাহর কাছে তার অপারগতা গ্রহণযোগ্য হবে না। এমন কাজের কারণে সে ব্যক্তি গুনাহগার সাব্যস্ত হবে। অতএব, আমরা বুঝতে পারলাম, স্রষ্টার অবাধ্যতা করে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করার কোন বৈধতা ইসলামে নেই।
[1] সূরা আন-নিসা; ০৪: ৫৯
[2] সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৭৯৭
[3] সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৬৭২৩
[4] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ৪৮৬১
[5] সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৬৭২৫
[6] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ৩১০
[7] সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪০৮৫
আরও পড়ুন
দ্বাবিংশ পর্ব