আল হিকমাহ মিডিয়া পরিবেশিত
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- ষড়বিংশ পর্ব
জামাতের মতাদর্শ ও লক্ষ্য আঁকড়ে ধরা, অবিচল থাকা এবং লক্ষ্য বাস্তবায়নে সর্বোত্তম পন্থা অবলম্বন করা
জামাতের মতাদর্শ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আঁকড়ে ধরা খুব জরুরী একটি বিষয়। মুসলিম জামাতের পতাকাতলে আশ্রয় গ্রহণ করে জামাতের তত্ত্বাবধানে কাজ করতে ইচ্ছুক এমন প্রতিটি মুসলিম ভাইয়ের জন্য এ বিষয়টি ভালোভাবে জানা অত্যাবশ্যক। নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যেতে হলে এবং যে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে দলের কাঠামো নির্মিত হয়েছে, সে উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করতে হলে; এর কোনো বিকল্প নেই। এটি করা না হলে ভবিষ্যতে কাজের পরিণাম হবে ব্যর্থতা। শুধু ব্যর্থতাই নয়, বরং এর ক্ষতি সংক্রমিত হয়ে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। জামাত এমন একটি বিশৃঙ্খল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে যে, প্রতিটি সদস্য নিজের মন মত কাজ করবে। কোনো আদর্শ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের তোয়াক্কা না করে প্রত্যেকেই নিজ নিজ চিন্তা ও ধারণার অনুগমন করবে। এতে করে ব্যাপকভাবে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে। নানান চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভব দেখা দেবে। পরিণতিতে হয় দল ভেঙে ফেলতে হবে অথবা বিভক্ত করে ফেলতে হবে[1] অথবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী সদস্যদেরকে বহিষ্কার করতে হবে।
এ তো গেল এক দিকের কথা। অন্যদিকে মুসলিম জামাতের কর্ণধার ও নেতৃবৃন্দের জানা আবশ্যক যে, তাঁরা হচ্ছেন অন্যদের জন্য আদর্শ ও অনুসরণীয়। তাঁদের দিকে তাকিয়েই দলকে বিচার করা হবে। তাঁদের ত্যাগ-তিতিক্ষার দ্বারাই মানুষ অনুপ্রাণিত হবে। যে আদর্শ তাঁরা প্রচার করেন, যে সত্যের দিকে তাঁরা মানুষকে আহ্বান করেন, তার ওপর তাঁদের অবিচলতা ও অটল অবস্থান দেখেই মানুষ উৎসাহ পাবে। তাঁদের কাজ ও আদর্শের মাঝে যদি কোনো ত্রুটি থাকে, তবে তার কুফল দলের সদস্য এবং অনুসারীদেরকে ভোগ করতে হবে।
তাই পৃষ্ঠপ্রদর্শন, আদর্শ থেকে বিচ্যুতি, লক্ষ্য বাস্তবায়ন না করে পিছু হটা থেকে সর্বতোভাবে নেতাদের নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বিপদসঙ্কুল রক্ত পিচ্ছিল এই পথে কিছুতেই পিছলে পড়া চলবে না। তাঁদেরকে জেনে রাখতে হবে, উম্মাহ তাঁদের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও কষ্ট এবং মুজাহাদার দিকে আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। তাঁদের ধৈর্যের দ্বারা মানুষ হেদায়েত প্রাপ্ত হবে। তাঁদের ত্যাগ-তিতিক্ষার দ্বারা মানুষ সুপথপ্রাপ্ত হবে। তাঁদের অবিচলতা দেখে মানুষ আদর্শ শিখবে।
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ ﴿السجدة: ٢٤﴾
‘আমি তাদের মধ্য থেকে কিছু লোককে নেতা বানিয়েছিলাম, তারা আমারই আদেশে মানুষদের হেদায়াত করত,যখন তারা (অত্যাচারের সামনে কঠোর) ধৈর্য ধারণ করেছে, (সর্বোপরি) তারা ছিল আমার আয়াতের ওপর একান্ত বিশ্বাসী’।[2]
প্রত্যেক দাঈ ব্যক্তির উচিত- এই বেদুইনের বক্তব্য থেকে শিক্ষা লাভ করা। মু’তাযিলাদের ফিতনার সময় ইমাম আহমদ বিন হানবলকে রহিমাহুল্লাহ খলীফা মামুনের দরবারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল[3]। পথিমধ্যে বেদুইন জাবের ইবনে আমের তাঁকে বলেছিল, “শুনুন! আপনি হচ্ছেন মানুষদের প্রতিনিধি। তাই তাদের জন্য দুর্ভাগ্য বয়ে আনবেন না। আপনি আজ মানুষদের নেতা। তাই ওরা আপনাকে যা করতে বলছে তা করার ব্যাপারে সাবধান! কারণ, যদি আপনি তাদের কথা মেনে নেন, তবে কেয়ামতের দিন তাদের বোঝা আপনাকে বহন করতে হবে। আর যদি আপনি আল্লাহকে ভালবেসে থাকেন, তবে যে আদর্শের ওপর আছেন তার ওপর টিকে থাকুন। কারণ, শুধু আপনার নিহত হওয়াটাই আপনার আর জান্নাতের মাঝে প্রাচীর হয়ে আছে। আর যদি আপনি এখন নিহত না হন, তবে একদিন তো মারা যাবেনই। যদি আপনি বেঁচে থাকেন, তবে তা হবে এক সম্মানজনক জীবন।”
ইমাম আহমদ বলেন, “এ বেদুইনের কথা ওদের বক্তব্য মেনে না নেয়ার ব্যাপারে আমার মনোবল চাঙ্গা করে আমাকে দৃঢ়প্রত্যয়ী করে তুলেছিল।”
ইমাম আব্দুল্লাহ আযযাম রহিমাহুল্লাহ বলেন, “জাতি গঠন হয় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমেই। সর্বোচ্চ গৌরবের প্রাসাদ নির্মিত হয় এবং মতাদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয় অনন্যসাধারণ ব্যক্তিবর্গের ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে। যারা নিজেদের সমাজে হন অপরিচিত অবহেলিত। তাঁদের মত লোকদের কারণেই আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য ও রিজিক দেয়া হয়।”
তিক্ত বাস্তবতার চাপ সহ্য করে আদর্শের ওপর টিকে থাকা এবং আদর্শের অনুসারী ব্যক্তিকে যত ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়, যত বাধা-বিপত্তির মুখোমুখি হতে হয়, সবকিছুকে জয় করে মতাদর্শকে আঁকড়ে থাকা কোনো সহজ ব্যাপার নয়। এক্ষেত্রে আদর্শের অনুগামী ব্যক্তির জন্য প্রয়োজন হলো: ইবাদতের মাধ্যমে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা। কল্যাণকর কাজের মাধ্যমে প্রবৃত্তির ওপর চাপ সৃষ্টি করা। এবং গৌরবময় এই উম্মাহর পূর্বসূরীদের জীবনী থেকে আলো গ্রহণ করা। কারণ, জীবন বিসর্জন দিয়ে হলেও আদর্শের ওপর টিকে থাকার অনন্য দৃষ্টান্ত তাঁরা স্থাপন করে গেছেন। জেল জুলুম ও দেশান্তরের মাধ্যমে নিজেদের দেহের ওপর অত্যাচার অবিচার সয়ে নিয়েও খুন রাঙ্গা পথে অবিচল থাকার অনুপম ইতিহাস তাঁরা রচনা করে গেছেন।
জামাতের দায়িত্ব হলো: সদস্যদেরকে আল্লাহর দ্বীন কেন্দ্রিক সম্পর্ক স্থাপনের অনুশীলন করাবে। দলের নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে ব্যক্তি পূজা/অন্ধভক্তি থেকে তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখবে। অন্ধভাবে ব্যক্তি অনুসরণের পরিবর্তে মানহাজে রাব্বানী আঁকড়ে ধরার দীক্ষা দেবে। মতবাদ ও আদর্শকে ব্যক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত না করে মূলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করিয়ে; তবেই সদস্যদের অন্তরে সেই আদর্শের বীজ বপন করবে। এতে সদস্যরাও ঠিক সেই উৎস থেকেই আলো গ্রহণ করতে পারবে, যা থেকে দলের নেতৃবৃন্দ আলো গ্রহণ করেছেন। অভিন্ন ঝর্ণাধারা থেকেই সদস্যরা স্বচ্ছ পানি পান করতে পারবে। যেহেতু অন্তরের নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর হাতে; তিনি যখন চান তা পরিবর্তন করে দিতে পারেন। তাই কখনো নেতা পিছু হটে যেতে পারে, তাঁর শক্তি খর্ব হয়ে যেতে পারে, চিত্র পাল্টে যেতে পারে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, সমাজ ও দলের ক্ষেত্রে এমন বাস্তবতা দেখা গেছে। তাই গভীর ঈমান এবং সঠিক উৎস থেকে সত্যকে জানা ও গ্রহণ করা, মতবাদ ও আদর্শের ওপর টিকে থাকার পক্ষে সবচেয়ে নিরাপদ। মানুষ দলে দলে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করলে, দলে দলে আদর্শ থেকে সরে আসলে, দলে দলে আদর্শ বিকিয়ে দিলেও, সত্যিকারের আদর্শবান ব্যক্তি তাতে বিন্দুমাত্র পরোয়া করবে না।
অতীতে যারা এই দ্বীনের জন্য কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে বড় বড় যেসব ব্যক্তিত্বের পা আদর্শ ও সংগ্রামের পিচ্ছিল পথে হড়কে গেছে, তাদের ব্যাপারে দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিয়োজিত ব্যক্তির বাস্তবসম্মত সঠিক ধারণা লাভ করা প্রয়োজন। তাই আমরা অতি সংক্ষিপ্তাকারে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের মতাদর্শ নিয়ে কিছু আলোচনা করব। এতে করে সংগ্রামী বন্ধুগণ আরও বুঝতে পারবেন, আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার দীর্ঘপথে যাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য এবং একটি কাঙ্খিত ইসলামী সমাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে আশানুরূপ ফলাফল লাভের জন্য আদর্শের ওপর টিকে থাকা এবং কাজের বৈচিত্র্যময় কার্যকরী পন্থা অবলম্বন করা কতটা প্রয়োজন। আল্লাহ তা’আলাই একমাত্র তৌফিক দাতা!
[1] আর এক্ষেত্রে দলের প্রভাব বিনষ্ট হয়ে যাবে।
[2] সূরা আস-সিজদাহ; ৩০: ২৪
[3] উদ্দেশ্য ছিল ইমাম আহমাদকে দিয়ে মু’তাযিলিদের খালকে কুরআনের কুফরী আকীদাহর পক্ষে বক্তব্য দেয়ানো অথবা তিনি অস্বীকার করলে তাঁকে শাস্তি দেয়া। - সম্পাদক
আরও পড়ুন
পঞ্চবিংশ পর্ব -------------------------------------------------------------------------------- সপ্তবিংশ পর্ব
Comment