আল হিকমাহ মিডিয়া পরিবেশিত
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- সপ্তবিংশ পর্ব
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- সপ্তবিংশ পর্ব
ইখওয়ানুল মুসলিমিনের বিচ্যুতি
উসমানী খিলাফতের সূর্য যখন অস্তমিত হয়ে গেছে তখন মুসলিমদের খিলাফতের এই শূন্যস্থান পূরণে মুসলিম বিশ্বে অনেকগুলো ইসলামী দলের অভ্যুদয় ঘটে। অল্প দিনের ভেতরেই সেগুলো পূর্ব থেকে পশ্চিম সর্বত্র আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়।
এসব দলের শীর্ষে রয়েছে ইখওয়ানুল মুসলিমিন বা মুসলিম ব্রাদারহুড। তারা সঠিক লক্ষ্যবস্তুতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে সক্ষম হয়। অত্যন্ত উঁচু মাপের মতাদর্শ ও ভাবধারার ওপর তারা প্রতিষ্ঠিত হয়। অল্প দিনের মধ্যেই মতাদর্শ প্রচার-প্রসারে, বাস্তবায়নে এবং কর্মী সদস্য ও শুভানুধ্যায়ীদের মনে তা বদ্ধমূল করার ক্ষেত্রে দলটি প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করে।
অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য সরল-সঠিক পথের অবলম্বন হিসেবে তারা তাদের মতাদর্শ বাস্তবায়নে সর্বতোভাবে নিয়োজিত হয়। তারা ঘোষণা করে ওঠে, ইসলামের পুনঃপ্রতিষ্ঠাই একমাত্র সমাধান—কুরআনই একমাত্র সংবিধান—জিহাদই একমাত্র পথ—শাহাদাতই হতে পারে সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা—খিলাফতে রাশেদার প্রাসাদ পুনর্নির্মাণ শরীয়ত নির্দেশিত কর্তব্য—মানবজীবনে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই!
তখন উম্মাহর হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারে স্বপ্নচারী মুসলিম যুবকের সামনে এই জামাতের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ব্যতিরেকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার আর কোনো পথ ছিল না। মানবতার হারানো সিংহাসনে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উম্মতকে অধিষ্ঠিত করার মাধ্যমে সে লক্ষ্য পূরণ হওয়ার ছিল।
এভাবে সময় যেতে থাকে। একপর্যায়ে বিপদাপদের সম্মুখীন হয়ে এবং তিক্ত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দলটি তাদের আদর্শ থেকে সরে যেতে শুরু করে। তাদের চির অম্লান দৃষ্টিভঙ্গি আর অমর মূল্যবোধগুলো শয়তানি রাজনীতি আর বহুমুখী ষড়যন্ত্রের কবলে একেবারে অন্তঃসারশূন্য নিস্তেজ হয়ে যায়। মাসলাহাত বা কল্যাণের এমন চোরাবালিতে তারা পতিত হয়, মনে হয় যেন আল্লাহকে বাদ দিয়ে এই কল্যাণকেই তারা উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করেছে।
ইখওয়ানুল মুসলিমিন বিপদ-আপদের মুখে ভেঙে পড়ে। তারা প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে আরম্ভ করে। শিরকী গণতন্ত্র নিয়ে পরিতুষ্ট হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আনীত সত্য সঠিক মানহাজ বিরোধী বহু বাতিল পন্থার অনুসরণ করতে শুরু করে। যাই হোক, শাসন ক্ষমতা লাভ করে ভূপৃষ্ঠে আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ ইখওয়ানুল মুসলিমিনের আর ভাগ্যে জোটেনি[1]। আমরা এভাবে বলতে চাই—তারা যদিও এই সুযোগ লাভ করেনি, কিন্তু সোনালী অতীতের স্মৃতিচারণ তারা করে গেছে। পূর্ববর্তী নেতৃবৃন্দের (রাহিমাহুমুল্লাহ) গৌরবময় কীর্তিমালার গান তারা গেয়ে গেছে।
দলটি যখন তাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায় তখন এই বাস্তবতা অনুধাবনের অনিবার্য ফলাফলস্বরূপ অনেক যুবক —আমি নগণ্য তাদের একজন—চিন্তিতভাবে গোটা বিশ্ব জুড়ে অনুসন্ধানের দৃষ্টি বুলাতে থাকে। তাঁরা সেসব জামাত খুঁজতে থাকেন, যাদেরকে কখনো হতাশা স্পর্শ করে না। যাদের মাঝে আপস, পৃষ্ঠপ্রদর্শন, আদর্শ থেকে বিচ্যুতি এবং নিজেদের চিন্তা চেতনা থেকে সরে আসার লেশমাত্র সম্ভাবনা থাকবে না। অনেক চিন্তা-ভাবনা ও পর্যবেক্ষণের পর সত্যসন্ধানী এসব যুবকের অন্তর সে সমস্ত লৌহমানবের দিকে ঝুঁকে যায়, ক্রুসেডাররা যাদের ভয়ে তটস্থ। মুরতাদ গোষ্ঠীর জন্য যারা মূর্তিমান আতঙ্ক। প্রলয়ংকারী ঝড়ের মাঝে যাদের অবস্থান অনড়। দেহমন উজাড় করে নিজেদের আদর্শ বাস্তবায়নে যারা নিয়োগ করেন সর্বশক্তি। নিজেদের রক্ত দিয়ে যারা জীবন্ত আদর্শের চিত্র আঁকেন। যে মূল্যবোধ তাঁরা নিজেদের মাঝে ধারণ করেছেন, তার জন্য তাঁরা সবরকম ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন। ত্যাগ-তিতিক্ষার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখনো সে পথে অবিচল থাকা সে সব দল ও জামাত আর কোনটাই নয়, সেগুলো হচ্ছে জিহাদী দল ও জামাতগুলো। এগুলোর শীর্ষে রয়েছে জামাতে কায়েদাতুল জিহাদসহ এই মানহাজের অন্যান্য যেসব দল তাগুত গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ ও জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত। এসব দল সালফে সালেহীনের পথে নিজেদেরকে পরিচালিত করছে। আপনজনেরা যখন তাঁদেরকে ফিরে আসতে বলছে, দূরের লোকেরা যখন তাঁদের কুৎসা রটাচ্ছে, গোটা জাহেলী ব্যবস্থা যখন একযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে নেমে পড়েছে, এমনই এক পরিস্থিতিতে তাঁদের চলার পথে সান্ত্বনা হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার নিম্নোক্ত বাণী—
وَكَأَيِّن مِّن نَّبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهُ رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ ﴿آلعمران: ١٤٦﴾ وَمَا كَانَ قَوْلَهُمْ إِلَّا أَن قَالُوا رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ ﴿آلعمران: ١٤٧﴾ فَآتَاهُمُ اللَّهُ ثَوَابَ الدُّنْيَا وَحُسْنَ ثَوَابِ الْآخِرَةِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ ﴿آلعمران: ١٤٨﴾
“আর বহু নবী ছিলেন, যাদের সঙ্গী-সাথীরা তাঁদের অনুবর্তী হয়ে জিহাদ করেছে; আল্লাহর পথে-তাদের কিছু কষ্ট হয়েছে বটে, কিন্তু আল্লাহর রাহে তারা হেরেও যায়নি, ক্লান্তও হয়নি এবং দমেও যায়নি। আর যারা সবর করে, আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন। তারা আর কিছুই বলেনি-শুধু বলেছে, হে আমাদের পালনকর্তা! তুমি আমাদের যাবতীয় গুনাহখাতা মাফ করে দাও, আমাদের কাজকর্মের সব বাড়াবাড়ি তুমি ক্ষমা করে দাও । আর (বাতিলের মোকাবেলায়) তুমি আমাদের কদমগুলোকে মযবুত রাখো, হক ও বাতিলের (সম্মুখসমরে) কাফিরদের ওপর তুমি আমাদের বিজয় দাও। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা এই নেক বান্দাদের দুনিয়ার জীবনেও (ভালো) প্রতিফল দিয়েছেন এবং পরকালীন জীবনেও তিনি তাদের উত্তম পুরষ্কার দিয়েছেন; আল্লাহ তা’আলা নেককার বান্দাদের ভালোবাসেন”। [2]
পূর্বের আলোচনা থেকে আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হলো, নীতি ও আদর্শের ওপর টিকে থাকা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, মুসলিম জামাতের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। জামাত যদি সত্যিই তার অনুসারীদের জন্য নমুনা হতে চায়, রবের দেয়া দায়িত্ব পালন করে যেতে চায় এবং ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে অবশ্যই আদর্শের ওপর টিকে থাকতে হবে। যদি এ বিষয়ে গুরুত্ব না দেয়া হয়, তাহলে পরিণতিতে ব্যর্থতা, বিনাশ আর বিলুপ্তি ছাড়া আর কিছুই জুটবে না। আমাদের জানা থাকতে হবে যে, কোনো সুনির্দিষ্ট নীতি ও আদর্শের তোয়াক্কা না করে, যার যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে চিন্তা গবেষণা ও দৃষ্টিভঙ্গির চর্চা করে কোনো জামাত স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পেরেছে এর নজির নেই। শক্তিশালী কোনো ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত না থেকে; উদ্ভ্রান্তভাবে পথ চলে কোনো জামাত অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে এমন নজিরও নেই। বরং এমন জামাতের ধ্বংস অনিবার্য। এমন জামাত বিলুপ্ত হতে বাধ্য।
সত্যান্বেষী ব্যক্তিদের মানসপটে উজ্জ্বল একটি ছবি আমরা এঁকে দিতে চাই। ইসলামী আন্দোলনের সর্বস্তরের সদস্যদেরকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আমরা জানাতে চাই। তা হলো, মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য নীতি-আদর্শের ওপর টিকে থাকা, সর্বাধিক উপযোগী পন্থা অবলম্বন করা, সবচাইতে কার্যকরী উপায় প্রয়োগ করা এমনই জরুরি একটি বিষয়, যার কোনো বিকল্প নেই। সর্বস্তরের লোকদের যে বিষয়টি বুঝতে হবে তা হলো, দুর্গম ও রক্ত পিচ্ছিল এই পথে রয়েছে অনেক বাধা বিপত্তি। রয়েছে নানান শঙ্কা আর ঝুঁকি। দাওয়াতের এই পথ চলা কোনো আনন্দ ভ্রমণ নয়। এটি কোনো মনভোলানো খেলা নয়, আর না কোনো শান্তিপূর্ণ কাব্যিক বিনোদন। এসব বিষয়ের উজ্জ্বল চিত্র যাতে সত্যান্বেষী ব্যক্তিদের মানসপটে অঙ্কিত হয়ে যায়, তাই আমাদের কর্তব্য হলো তানজিম কায়েদাতুল জিহাদের মানহাজ ও দাওয়াত নিয়ে আলোচনা করা। কারণ, এই জামাতটির নাম দিকে দিকে উচ্চারিত হয়েছে। লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিপদ-আপদ সত্ত্বেও নীতি আদর্শের ওপর টিকে থাকার এই দৃষ্টান্ত, আল্লাহর তৌফিকে সত্য-সঠিক মানহাজ আঁকড়ে ধরে রাখার এই নমুনা এবং সর্বাধিক কার্যকরী পন্থা অবলম্বন করার মত এই অনন্যসাধারণ দৃঢ়তার সঙ্গে যেন সত্যসন্ধানী ব্যক্তির চেতনা পরিচিত হয়, সে লক্ষ্যেই আমাদের এই আলোচনা।
কল্যাণমুখী এই দাওয়াতের ঘোষণাকারী এবং এর পতাকা উত্তোলনকারী শাইখ মুজাহিদ উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ একটি সঠিক পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি আল্লাহর সাহায্য ও তৌফিকে লক্ষ্য বাস্তবায়নে সুদূরপ্রসারী কৌশল ও ধারাবাহিকতার কৌশল গ্রহণ করেছেন। সামনের আলোচনায় বিষয়টি স্পষ্ট হবে ইনশা আল্লাহ।
শায়খ উসামা রহিমাহুল্লাহ আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ায় এবং সাথীদের সহযোগিতায় দ্বীন ইসলামের সৈনিকদেরকে এক পতাকাতলে সমবেত করেছেন। রোমকদের উত্তরসূরী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এক কাতারে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা তাঁর এই প্রচেষ্টায় অসাধারণ সহজতা ও সাফল্য দান করেছেন। মোবারক এই দাওয়াতটি যে ভিত্তি ও অমূল্য রত্নতুল্য মতাদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তা হলো মুসলিমদের ঘাড়ে চেপে বসা মুরতাদ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জিহাদি আন্দোলনরত ব্যক্তিবর্গের রক্তভেজা অভিজ্ঞতা সম্ভারের সারনির্যাস ।
পুরানো বেদনার স্মৃতিচারণে শিক্ষার উপকরণ থাকে। তাই চলুন কিছুটা পেছনে ফিরে তাকানো যাক। এতে করে পাঠকবৃন্দ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে গৃহীত উক্ত পন্থাটি কতটা সরল-সঠিক, তা অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন । এবং এই কৌশল নির্ণয় যে অন্তঃসারশূন্য ভিত্তিহীন কোনো কিছু নয়, তা বুঝতে সক্ষম হবেন। তারা আরো জানতে পারবেন, এই কর্মপন্থাটি একরাশ রক্তভেজা অমূল্য বাস্তব অভিজ্ঞতার নির্যাস। এর প্রথম চিত্র অঙ্কিত হয়েছিল বিলাদুশ শাম তথা সিরিয়ায়। এর রক্ত-লাল খসড়া রচিত হয়েছিল, কেনানার ভূমি ও বহু কল্যাণের সমাবেশস্থল মিশরে। বিশ্বব্যাপী জিহাদী আন্দোলনগুলোর স্বপ্নদ্রষ্টা ও নেতৃবৃন্দ সুনিপুণ দক্ষতায় এই চিত্র এঁকেছিলেন। রক্তের হরফে তাঁরা খসড়া তৈরি করেছিলেন। মিশরের ভূমিতে এই ব্যাপক কল্যাণের উচ্ছল ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হয়েছিল মহান শিক্ষক সাইয়্যেদ কুতুব শহীদের অবদানে। তারপর, এক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন ডক্টর শহীদ সালেহ সারিইয়া। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, জামাতুল জিহাদ[3] এবং আল জামাআহ আল ইসলামিয়্যাহ তাঁদের দেখানো বিপ্লবের সুপ্রশস্ত রাজপথে তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলবে।
খিলাফতের পতনের পরের তিন দশকের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তিম সংগ্রামের পর বিপ্লবী যুবকদের কাছে[4] একথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, মোবারক এই জিহাদের কাঙ্খিত ফলাফল লাভ করা সহজ ব্যাপার নয় বিশেষ কিছু কারণে। এই কারণগুলো আমরা সুপ্রিয় পাঠকের বোঝার সহজার্থে পয়েন্ট আকারে নিম্নে তুলে ধরছি—
প্রথমত:
ভূপৃষ্ঠে শয়তানের সাম্রাজ্য আমেরিকা হচ্ছে ঐ সমস্ত মুরতাদ সরকার ব্যবস্থার মূল শিকড়, যেগুলো পূর্ব থেকে পশ্চিমে সর্বত্র তাওহীদবাদীদের বুকে চেপে বসে আছে। অর্থ, তথ্য ও সামরিক সাহায্য দিয়ে আমেরিকা মুরতাদ সরকারগুলোকে প্রত্যক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করছে। ইনশা আল্লাহ্, এই আমেরিকার কারণেই এসব মুরতাদ গোষ্ঠী লাঞ্ছনা, অভিশাপ ও ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।
দ্বিতীয়ত:
বর্তমান সময়ে কোনো একটি স্থানে তাওহীদের সৈনিকদেরকে সমবেত করা, এক পতাকাতলে তাঁদেরকে একত্রিত করা, একই কাতারে তাঁদেরকে শামিল করা, তাঁদের শক্তিগুলোকে কাজে লাগানোর উপযুক্ত করা—এ বিষয়গুলো একরকম অসম্ভব। কারণ, শত্রু তো আর বাইরের কেউ না। অর্থাৎ আসলি কাফের যেমন ইহুদি-খ্রিস্টান গোষ্ঠী- কেবল তারাই তো এখন শত্রু নয়[5]। তারাই একমাত্র শত্রু হলে ব্যাপারটা তেমন কঠিন ছিল না। কারণ, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উম্মতের মাঝে কেউই এদের কুফরি ও এদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ফরজ দায়িত্বের ব্যাপারে সন্দিহান নয়। তবে, আল্লাহ তা’আলা যাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন, যাদেরকে চেতনাগত অন্ধত্বে নিক্ষিপ্ত করেছেন, তারা ইহুদি-খ্রিস্টানদেরকে শত্রু না ভাবলে নাও ভাবতে পারে! আল্লাহ তা’আলার কাছে আমরা এমন অবস্থা থেকে আশ্রয় কামনা করি !
তৃতীয়ত:
মুসলিম জনসাধারণের বোধ-বুদ্ধি মুরতাদ গোষ্ঠীর ব্যাপারে ইসলামের হুকুম পুরোপুরি ধারণ করার উপযোগী নয়। রক্তপিপাসু এই মুরতাদ গোষ্ঠী আর তাদের সহযোগীদের কুফরীর ব্যাপারে জনসাধারণকে আশ্বস্ত করা এবং এদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সঙ্ঘবদ্ধ করা একরকম অসম্ভব। বিশেষত: যখন আমরা জানতে পেরেছি, এ সমস্ত তাগুত গোষ্ঠী ভিক্ষুক ওলামা ও পেটুক ফকিহদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে আত্মরক্ষা করছে। উপার্জনের ধান্দাবাজ এ সমস্ত আলিম শরীয়তের দ্ব্যর্থহীন মূলপাঠ বিকৃত করতে এবং সেগুলোকে তার আসল অর্থ ও সঠিক মর্ম থেকে সরিয়ে আনতে ভীষণ পটু। প্রভুদের চাহিদা ও নির্দেশনা অনুযায়ী তারা শরীয়তের বক্তব্যগুলোকে ব্যাখ্যা করে। প্রভুদের নিকৃষ্ট শাসন ব্যবস্থার ওপর তারা শরীয়তের লেবাস চড়াতে এ কাজ করে থাকে।
অপরদিকে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, ক্রুসেডার খ্রিস্টান এবং তাদের মিত্র অভিশপ্ত ইহুদিদেরকে টার্গেট বানানোর প্রশংসনীয় ফলাফল হাতে আসতে শুরু করেছে। পরিশ্রমের ফসল প্রায় পেকে গেছে। জিহাদের কাঙ্খিত ফলাফল আল্লাহর সাহায্যে প্রায় পুরোপুরি প্রস্তুত। এর কারণগুলোকে আমরা তিনটি পয়েন্টে ভাগ করব, যাতে সুহৃদ পাঠক খুব সহজেই তা বুঝতে পারেন-
প্রথম কারণ:
আসলি কাফের, যাদের কুফরীর বিষয়টা জরুরিয়াতে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত হওয়াতে স্বতঃসিদ্ধ, তাদেরকে টার্গেট বানিয়ে ইসলামের সৈনিকদেরকে সঙ্ঘবদ্ধ করা, একীভূত করা, এক পতাকাতলে সমবেত করা এবং ন্যাক্কারজনক ক্রুসেড হামলার মোকাবেলায় এক সারিতে দাঁড় করানো সম্ভবপর হয়েছে। উম্মতে মুহাম্মদীর অন্তর থেকে ইসলাম, ইসলামী মূল্যবোধ ও ইসলামী ভাবাদর্শকে চিরতরে মিটিয়ে দিতে ক্রুসেডার শক্তি যখন তৎপর, তখন তাদের বিরুদ্ধে ইসলামের সৈন্যদল ঐক্যবদ্ধ।
দ্বিতীয় কারণ:
ক্রুসেডারদেরকে এবং তাদের মিত্র শক্তি কুকুর ও শুকরের বংশধর ইহুদি গোষ্ঠীকে টার্গেট বানানোতে রক্তপিপাসু মুরতাদ গোষ্ঠীর আসল চেহারা মুসলিম জনসাধারণের সামনে খুলে গিয়েছে। বিশেষত: মিডিয়ার মাধ্যমে এসব মুরতাদের দল তাদের প্রভু ইহুদি-খ্রিষ্টানদের জন্য মাতম গাইতে শুরু করেছে। প্রভুদের দুঃখ-দুর্দশায় ভাগ বসিয়ে তারা ভারাক্রান্ত বিবৃতি দিতে আরম্ভ করেছে। তাদের নাপাক প্রভুদের নিকৃষ্ট স্বার্থবিরোধী তাওহীদবাদীদের যেকোনো বরকতময় সক্রিয়তায় তারা কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করতে আরম্ভ করেছে। এ অবস্থায় মুসলিম জনসাধারণের কাছে অনেক কিছু খোলাসা হয়ে গেছে।
তৃতীয় কারণ:
দরবারী আলেম আর পেটুক ইসলামী আলিমদের ধর্মহীনতা, আসল চরিত্র ও মুখোশ মুসলিম জনসাধারণের কাছে উন্মোচিত হয়ে গেছে। বিশেষত: তাদের প্রভু ইহুদি-খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে মুজাহিদদের যেকোনো মোবারক কাজ সম্পাদিত হওয়ার পর তারা টেলিভিশনের পর্দায় বিমর্ষ চেহারায় উপস্থিত হয়। নিহত ক্রুসেডার কীটগুলোর জন্য তারা হৃদয় সিঞ্চিত মায়া দেখাতে থাকে। শুধু তাই নয়, নিজেদের পথভ্রষ্টতা আর ভ্রান্তিতে আরও ডুবে গিয়ে তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উত্তরসূরীদেরকে গালাগাল আর অভিশাপ দিতে থাকে। এমনকি তাদেরকে জাহান্নামী বলে আখ্যা দিতে থাকে। এগুলো দেখে মুসলিম জনসাধারণের বোঝার আর কিছুই বাকি থাকে না!
উপরোক্ত বিষয়গুলো মাথায় রাখলে, শাইখ উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহর অনুসৃত মানহাজ বোঝা সহজ হবে। এই মানহাজের অন্যতম মূল লক্ষ্য হচ্ছে, পথভ্রষ্টতায় নিপতিত খ্রিস্টান এবং অভিশপ্ত ইহুদিদের বিরুদ্ধে লড়াই করা। একই সাথে তাদের লেজুড় মুরতাদ গোষ্ঠীর ব্যাপারে বেখবর না থাকা।
এ বিষয়ে কেউ আরো গভীরে যেতে চাইলে তাকে বলব, মুসলিমদের নিকট ও দূর অতীতের ইতিহাসে এমন অসংখ্য অভিজ্ঞতার কথা রয়েছে, যা এই মানহাজের যথার্থতা ও উপযুক্ততা বুঝতে সহায়তা করবে। আফগানিস্তানের মহান ইমাম শহীদ আবদুল্লাহ আযযাম রহিমাহুল্লাহর অভিজ্ঞতা আমাদের সবার সামনেই রয়েছে।
إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَذِكْرَىٰ لِمَن كَانَ لَهُ قَلْبٌ أَوْ أَلْقَى السَّمْعَ وَهُوَ شَهِيدٌ ﴿ق: ٣٧﴾
‘এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্যে, যার অনুধাবন করার মত অন্তর রয়েছে। অথবা যে নিবিষ্ট মনে শ্রবণ করে’।[6]
[1] লেখাটি ২০০৬-০৭ এর দিকে রচিত। পরবর্তীতে ২০১২ সালে আরব বসন্তের সময় তারা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতায় আসে। ২০১৪ সালে পশ্চিমা সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতাচ্যুত। একদিকে তারা আদর্শের সাথে আপস করলো, দ্বীনের মূলনীতিতে ছাড় দিয়ে গণতন্ত্র গ্রহণ করলো। সেক্যুলার সংবিধান দ্বারা শাসন করলো। অন্যদিকে এতো ছাড় দিয়েও ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা তো দূরে থাক, দুনিয়াবী বিচারেও তারা ব্যর্থ হলো। তারা যে পরিণতি এড়ানোর জন্য জিহাদ ও মুজাহিদিন থেকে দূরে ছিল, সেই পরিণতি ঠিকই তাদের খুঁজে নিলো। - সম্পাদক
[2] সূরা আলে ইমরান; ০৩: ১৪৬—১৪৮
[3] শাইখ আইমান আয-যাওয়াহিরি হাফিজাহুল্লাহ’র পূর্বের জামাত
[4] যাদের শীর্ষে রয়েছেন জিহাদী আন্দোলনের এক অমূল্য প্রতিভা মুজাহিদ শাইখ আইমান আয-যাওয়াহিরি
[5] মুসলিমদের মধ্যে মিশে থাকা মুসলিম নামধারী সেকুল্যার, মুনাফিক, তাগুত শাসকগোষ্ঠী, তাদের অধীনস্ত মুরতাদ বাহিনী … ইত্যাদি অনেক শত্রু রয়েছে। -সম্পাদক
[6] সূরা কফ, ৫০: ৩৮