ইসলামী বিশ্বে তাকফিরের ফিতনা
[ইমারাতে ইসলামী আফগানিস্তানের আরবি মুখপত্র মাসিক আস সুমুদ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রবন্ধ ]
মূল: নুমান সাঈদ
অনুবাদ: মুনশি আব্দুর রহমান
ইসলামী বিশ্বের ইতিহাসে মুসলমানদের কাফির আখ্যা দেওয়া বা ‘তাকফির’-এর চর্চা এবং এর সূত্র ধরে যুদ্ধ ও হত্যাযজ্ঞ কোনো অভিনব ঘটনা নয়; বরং এটি বহু পুরোনো এক কলঙ্কজনক ধারাবাহিকতা। ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হিসেবে আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু-এর বিরুদ্ধে খারেজীদের বিদ্রোহ এবং তাকফিরের ধুয়ো তুলে তাদের নির্বিচার মুসলিম হত্যার কথা স্মরণ করা যায়।
হযরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু ও মুয়াবিয়া রাদিআল্লাহু আনহু-এর মধ্যকার মীমাংসা এবং তৃতীয় পক্ষের সালিশি খারেজীদের কাছে কেবল অবৈধই ছিল না; বরং কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে সাধারণ মুসলমানদের পর্যন্ত তারা ‘মুরতাদ’ বা ধর্মত্যাগী হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। এসব নিরীহ মুসলমানের রক্ত ঝরানোকে তারা নিজেদের জন্য ফরজ বলে সাব্যস্ত করে। আর এমন ভ্রান্ত পথে পা বাড়াতে তারা পবিত্র কুরআনের কোনো সরল বা বাহ্যিক অর্থের ওপর নির্ভর করেনি; বরং মূল পাঠ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নিজেদের মনগড়া ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়েছিল।
কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি খারেজীদের ছিল এক তীব্র অনুরাগ। সাহাবীদের যুগে লোকেরা এমনকি তাদেরকে ‘কুররা’ বা ‘কুরআন পাঠকদের দল’ বলেও ডাকত। একপর্যায়ে তারা যখন বসরা দখল করে প্রায় ছয় হাজার মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করল, ইতিহাস সেই মর্মান্তিক ঘটনাকে ‘বসরার ফিতনা’ হিসেবে সাব্যস্ত করে। বসরার পর খারেজীদের অন্যতম শীর্ষ নেতা দাহহাক আক্রমণ শানায় কুফায়। উন্মুক্ত তরবারি হাতে কুফার জামে মসজিদে প্রবেশ করে সে সেখানকার অধিবাসীদের নির্দেশ দেয়, যেন প্রত্যেকে একে একে তার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের তথাকথিত ‘কুফরি’ থেকে তওবা করে। অন্যথায় বসরার মতো কুফাতেও রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার হুমকি দেয় সে। মূলত, দাহহাকের উদ্দেশ্য ছিল কুফাতেও বসরার সেই গণহত্যারই পুনরাবৃত্তি ঘটানো। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ-এর তীক্ষ্ণ প্রজ্ঞা ও অসীম ধৈর্য দাহহাকের সেই ভয়াবহ পরিকল্পনাকে সমূলে নস্যাৎ করে দেয়, আর কুফাবাসীও রক্ষা পায় এক নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে।
মাওলানা মানাযির আহসান গিলানি রহিমাহুল্লাহ তাঁর ‘ইমাম আবু হানিফার রাজনৈতিক জীবন’ গ্রন্থে এই ঘটনার এক চমৎকার বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর বর্ণনা মতে, ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ যখন মসজিদে গিয়ে দাহহাকের সামনে দাঁড়ালেন, তখন শান্ত কণ্ঠে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কুফাবাসীকে তুমি কেন হত্যার নির্দেশ দিয়েছ?” দাহহাকের সোজাসাপ্টা উত্তর, “কারণ তারা মুরতাদ হয়ে গেছে, আর মুরতাদকে হত্যা করা বাধ্যতামূলক।” জবাবে ইমাম বললেন, “মুরতাদ তো সে, যে নিজের ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। কিন্তু কুফার অধিবাসীরা তো সেই আকিদাতেই অটল রয়েছে যার ওপর তারা জন্মগ্রহণ করেছে; তারা তো নিজেদের ধর্ম পরিবর্তন করেনি। তাহলে তুমি কীভাবে তাদের ওপর ধর্মত্যাগের ফতোয়া আরোপ করছ?” ইমামের এই অকাট্য যুক্তি দাহহাকের অন্তরে গিয়ে বিঁধল। নিজের ভুল স্বীকার করে সে বলে উঠল, “আমরা ভুল করেছি।” এই বলে সে নিজের তরবারি নামিয়ে রাখল এবং সঙ্গীদেরও তরবারি কোষবদ্ধ করার নির্দেশ দিল। এভাবেই খারেজীদের নিশ্চিত গণহত্যার হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিল কুফাবাসী। তাকফির আর হত্যার বাজারে চরমভাবে উত্তপ্ত সেই যুগটি ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম তিক্ত এক অধ্যায় হয়ে আছে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আজও আমরা তাকফিরি চিন্তাধারার এক নতুন ঢেউ আছড়ে পড়তে দেখছি, যা ইতোমধ্যেই ইসলামী বিশ্বের অনেক সংবেদনশীল অঞ্চলকে গ্রাস করে ফেলেছে। অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে ইসলাম-বিদ্বেষী অপশক্তিগুলো এই চরমপন্থী চিন্তাধারাকে নিজেদের হীন স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে। পরিস্থিতি আজ এতটাই ঘোলাটে যে, উম্মাহর শীর্ষস্থানীয় আলেম ও চিন্তাবিদগণ পর্যন্ত মাঝে মাঝে বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন। এই বিষাক্ত চিন্তাধারার ভয়াবহ প্রসারে সর্বত্র মুমিনদের মাঝে আজ এক চরম বুদ্ধিবৃত্তিক নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।
কয়েক দশক আগে আলজেরিয়ায় এই সমসাময়িক খারেজী ও ‘বিপর্যয় সৃষ্টিকারী’দের প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে। ‘ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট’ নামে সেখানে একটি রাজনৈতিক জোট গঠিত হয়, যার পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলন। নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডেই প্রায় আশি শতাংশ ভোট পেয়ে এই ফ্রন্ট অভাবনীয় এক বিজয় ছিনিয়ে আনে, যা বিশ্বব্যাপী ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলোকে রীতিমতো হতবাক করে দেয়। ফলশ্রুতিতে এই জনরায়কে নস্যাৎ করতে তারা তড়িঘড়ি করে নানা হীন পদক্ষেপ গ্রহণ করে; একপর্যায়ে নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করা হয় এবং সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করে নেয়।
এরপরই শুরু হয় ইসলামী আন্দোলনগুলোকে ভেতর ও বাইর থেকে দুর্বল এবং ধ্বংস করার এক সুপরিকল্পিত অভিযান। চতুর্দিকে বোনা হতে থাকে নানা চক্রান্তের জাল। এর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ ষড়যন্ত্রটি ছিল ইসলামী আন্দোলনগুলোর অভ্যন্তরে এমন একটি বহিরাগত (খারেজী) চিন্তাধারার বীজ বপন করা, যা তাদের মধ্যে ফাটল ধরাবে এবং ভেতর থেকেই তাদের নিঃশেষ করে দেবে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, শত্রুদের এই ষড়যন্ত্র শতভাগ সফল হয়েছিল। আর তারই মর্মান্তিক পরিণতি হিসেবে মাত্র এক দশকের ব্যবধানে প্রায় এক লক্ষ নিরীহ মুসলমানকে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হতে হয়।
আরেকটি চরম বেদনাদায়ক বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান এবং শীর্ষ আলেমগণ বারবার আলজেরিয়ার সেই গণহত্যার ওপর একটি প্রামাণ্য প্রতিবেদন তৈরির তাগিদ দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—উম্মাহর যুবসমাজ যেন এই মর্মান্তিক ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় এবং এ ধরনের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আগেভাগেই সচেতন হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা ও তথ্য সংরক্ষণের প্রবণতা আজ ক্রমশ বিলুপ্তির পথে। পর্যাপ্ত গবেষণা ও প্রামাণ্য নথিপত্রের এই নিদারুণ অভাবেই অজ্ঞতার এক অন্তহীন ধারা অব্যাহত রয়েছে, যার চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে উম্মাহর আস্ত একটি প্রজন্মকে।
আলজেরিয়ার সেই রক্তাক্ত ইতিহাসের পর মিসর, সিরিয়া ও ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখা যায়। আমরা বেদনার সাথে লক্ষ্য করেছি, সরকারি নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ গড়ে ওঠা বিভিন্ন দল কীভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে শেষ পর্যন্ত তাকফির এবং অন্ধ হত্যার যুক্তিতে পা বাড়িয়েছে। আর আড়ালে থেকে খারেজীরাই নিরন্তর এই বুদ্ধিবৃত্তিক খোরাক জুগিয়ে গেছে।
আফগানিস্তানের বিরুদ্ধেও ঠিক একই ধরনের ষড়যন্ত্রের গভীর ছক কষা হয়েছিল। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, আফগানিস্তানের ইসলামী ইমারত অত্যন্ত দূরদর্শী ও জোরালো কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা এই চরম জটিল পরিস্থিতিকে সফলভাবে মোকাবিলা করতে তাদের সহায়তা করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পদক্ষেপ হলো:
১. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক সকল বুদ্ধিবৃত্তিক, সংস্কারমূলক, নাগরিক ও সামাজিক প্রকল্প বাতিল করা।
২. ছোট-বড় সকল দল, সংগঠন এবং আন্দোলনকে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা।
৩. দেশব্যাপী ফিকহী ও মাজহাবি ঐক্যের সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করা (হানাফি মাজহাবকে ফিকহ বা আইনশাস্ত্রের মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করে)।
৪. খারেজীদের ভ্রান্ত চিন্তাধারা, বিশ্বাস এবং কলঙ্কিত ইতিহাস জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা।
৫. তাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, সুসংগঠিত ও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা।
৬. খারেজীদের সকল শাখার ব্যাপারে একটি সুনির্দিষ্ট পরিচয় নির্ধারণ এবং উলামায়ে কেরামের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ফতোয়া প্রদান করা।
আলহামদুলিল্লাহ, আজ আমাদের একটি নিজস্ব ইসলামী সরকার রয়েছে। অন্যান্য অনেক অঞ্চলের তুলনায় আমাদের বর্তমান পরিস্থিতি বহুগুণে স্থিতিশীল। আমাদের হাতে এখন প্রয়োজনীয় উপকরণ, অবারিত সুযোগ এবং কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা রয়েছে; আর সময়ের সাথে সাথে আমাদের এই সামর্থ্য বেড়েই চলেছে। তাই এখন আর হাহাকার, বিলাপ বা আক্ষেপ করার সময় নেই। অপ্রাসঙ্গিক বিতর্ক আর অর্থহীন যুক্তিতর্কের যুগও অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখন সময় এসেছে লেখক, আলেম সমাজ এবং গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজ নিজ কাঁধে দায়িত্ব তুলে নেওয়ার। তাদেরকে এখন গভীর গবেষণা, বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সংগ্রহ এবং সুতীক্ষ্ণ পর্যালোচনায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। এর মাধ্যমেই উম্মাহর মাঝ থেকে এই ফিতনাগুলোকে সীমিত করতে হবে, তৈরি করতে হবে সেগুলোর প্রামাণ্য দলিল এবং গড়ে তুলতে হবে এমন এক নিশ্ছিদ্র বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা, যা শত্রুদের সকল ষড়যন্ত্র সমূলে নস্যাৎ করে দেবে। একইসাথে তা মুসলিম উম্মাহকে করবে সুরক্ষিত এবং আগামী প্রজন্মকে এই ফিতনার ভয়াবহতা থেকে রাখবে চিরনিরাপদ।
মাজাল্লাতুস সুমূদ (মাসিক আস সুমুদ ম্যাগাজিন) | সংখ্যা ২৪৪
জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি | মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ