কেন ইসলামী ইমারতকে সমর্থন করা উচিত?
[ইমারাতে ইসলামী আফগানিস্তানের আরবি মুখপত্র মাসিক আস সুমুদ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রবন্ধ]
অনুবাদ: মুনশি আব্দুর রহমান
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, মুসলিম সমাজ চিরকালই এমন এক শাসনব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা লালন করে এসেছে, যার মূল ভিত্তি রচিত হবে ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর। তারা এমন এক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখে, যা ইসলামী শরিয়তের সুশীতল ছায়াতলে মানুষকে একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান করবে; কারণ এমন এক নিষ্কলুষ জীবনই মানুষের সহজাত প্রকৃতির চিরায়ত দাবি।
আফগানিস্তানের ইসলামী ইমারত মূলত এই ভূখণ্ডের ইসলামী সমাজ, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের একেবারে অন্তস্তল থেকে উৎসারিত এক অনন্য শাসনব্যবস্থা। নিজেদের অসীম ত্যাগ ও কালজয়ী সাহসিকতার মাধ্যমে তারা সুপ্রাচীন মুসলিম উম্মাহর লালিত অনেক স্বপ্নকেই আজ বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে। এই প্রবন্ধের অবতারণা মূলত একটি মৌলিক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে: আমি কেন ইসলামী ইমারতকে সমর্থন করি? কেন আমি আফগানিস্তানের এই ইসলামী ইমারতকে চরমপন্থা ও শিথিলতার ঊর্ধ্বে থাকা এক সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা বলে মনে করি?
সত্য বলতে, প্রতিটি সুস্থ বিবেকের মানুষেরই উচিত যেকোনো বিষয়কে কেবল সত্য ও ন্যায়ের মাপকাঠিতে বিচার করা। কোনো পার্থিব পদবি বা বিশেষ সুযোগ-সুবিধা লাভের আশায় আমি কলম ধরিনি। বরং কেবল অকৃত্রিম সত্য এবং নির্জলা বাস্তবতাকে জনসমক্ষে তুলে ধরাই আমার একমাত্র উদ্দেশ্য। আর এই তাগিদ থেকেই আমি কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয় লিপিবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
এটি আজ আর কারও অজানা নয় যে, ভাড়াটে সৈন্যদের সহায়তায় সর্বাধুনিক সামরিক সরঞ্জামে সজ্জিত হয়ে ন্যাটো ও দখলদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন আফগানিস্তান দখল করে নেয়, ঠিক সেই সামরিক আগ্রাসনের সূচনালগ্নেই মরহুম আমিরুল মুমিনীন মোল্লা মুহাম্মাদ উমর মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ এক ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছিলেন। ঈমান ও সুদৃঢ় বিশ্বাসে পরিপূর্ণ তাঁর সেই অমোঘ বাণীগুলো ইতিহাসের সোনালী পাতায় চিরকাল খোদাই করা থাকবে। মূলত সেই পবিত্র কাফেলাটিই ছিল সততা ও সত্যনিষ্ঠার এক প্রদীপ্ত দৃষ্টান্ত। দখলদারিত্বের সেই বিভীষিকাময় শুরুর দিনগুলোতে একটি রেডিও সাক্ষাৎকারে তিনি দীপ্তকণ্ঠে বলেছিলেন:
“আমেরিকা আমাদের পরাজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আর মহান আল্লাহ আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিজয় ও শাসনক্ষমতা লাভের। সুতরাং, কার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নেয়, তা দেখার জন্যই আমরা অপেক্ষায় থাকব।”
নিঃসন্দেহে, যেসব মহান নেতা এমন এক পবিত্র ও একনিষ্ঠ পথের সূচনা করেছিলেন, তাঁদের সরব উপস্থিতিই এই ব্যবস্থার সত্যতা ও যৌক্তিকতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। দখলদারদের আনুষ্ঠানিক আগ্রাসনের পরপরই, স্বাধীন, ধর্মপ্রাণ ও মুজাহিদ আফগান জাতি অবতীর্ণ হয় সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের এক রক্তস্নাত ময়দানে। এই সাহসী জাতি এমন সব পবিত্রা মায়েদের গর্ভে জন্ম নিয়েছে এবং এমন সব সত্যনিষ্ঠ শিক্ষকদের হাতে গড়া, যাদের বেড়ে ওঠাই হয়েছে জিহাদ, স্বাধীনতা ও অসীম সাহসিকতার চেতনার আশ্রয়ে।
এটা নিশ্চিত সত্য যে, জিহাদের অন্যতম প্রজ্ঞা হলো সংস্কারক তথা সংশোধক এবং ফাসাদ সৃষ্টিকারী তথা বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের মধ্যকার পার্থক্যকে দিবালোকের মতো স্পষ্ট করে দেওয়া। টানা দুই দশক ধরে চলা আফগান জিহাদে আমরা দেখেছি, এই পবিত্র ভূখণ্ডের সবচেয়ে একনিষ্ঠ, ধর্মপ্রাণ ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই পথে শরিক হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সম্মানিত আলেম সমাজ, পবিত্র কুরআনের হাফেজ ও ক্বারীগণ এবং এই মাটির নিবেদিতপ্রাণ সাধারণ মানুষেরা। তাঁরা গভীর ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রদীপ্ত জিহাদের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এই কণ্টকাকীর্ণ পথে অনেকেই শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেছেন, কেউ কেউ বন্দিত্ব বরণ করেছেন, আবার হাজারো পরিবার হয়েছে বাস্তুচ্যুত। কেবল জিহাদ এবং দেশ স্বাধীনের পক্ষে ফতোয়া দেওয়ার অপরাধে হাজার হাজার আলেম এবং হাফেজে কুরআনকে গুম করা হয়েছিল। এককথায়, আফগানরা সেদিন এমন এক পবিত্র ও বরকতময় জিহাদের সূচনা করেছিল, সমসাময়িক ইতিহাসে যার নজির মেলা ভার।
অবশেষে একুশ বছরের সুদীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর, মহান আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাদের দেওয়া সেই চিরন্তন প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন। অগণিত শহীদের পবিত্র রক্ত, মজলুমের চাপা আর্তনাদ এবং ব্যথিত মা ও এতিমদের চোখের পানি আজ চূড়ান্ত সফলতা বয়ে এনেছে। মুজাহিদ আফগান জাতির সামনে এসে ধরা দিয়েছে এক সুস্পষ্ট ও গৌরবময় বিজয়। ইসলাম-বিদ্বেষী শত্রুদের লজ্জাজনক ও অপমানজনক পলায়নের সেই ঐতিহাসিক দৃশ্য আমরা অত্যন্ত গর্ব ও সম্মানের সাথে অবলোকন করেছি। আফগানিস্তান তথা গোটা বিশ্বের ইতিহাসে দিনটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এক চরম পরাজয়ের দিন হিসেবে চিরকাল লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে। এই বিজয়কে ঘিরে স্বাধীনচেতা আগামী প্রজন্ম অনন্তকাল ধরে গর্ব করবে এবং সেই মহান বীরদের পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
ইসলামী ইমারতের চূড়ান্ত বিজয় এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর, আজ যখন দেশে পূর্ণ নিরাপত্তা বিরাজ করছে এবং এমন একটি সরকার গঠিত হয়েছে যা মুসলমানদের ধর্ম, সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় বদ্ধপরিকর, ঠিক তখনই ইসলামের কট্টর শত্রুদের সাথে আঁতাতকারী কিছু ষড়যন্ত্রকারী চক্র নানা ধরনের মিথ্যা অভিযোগ ও বানোয়াট খবর ছড়াতে শুরু করেছে। সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এই অপপ্রচারের মাধ্যমে তারা জনমনে ইসলামী ইমারতের নির্মল ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করার এক নির্লজ্জ অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সাহসী মুজাহিদ আফগান জাতির সেই বিজয়ের আজ প্রায় চার বছর পেরোতে চলেছে। ইসলামী ব্যবস্থার পতন ঘটাতে ব্যর্থ ও হতাশ হয়ে পড়া কাফের এবং মুনাফিক চক্রটি এখন ভিত্তিহীন সমালোচনা ও ঠুনকো আপত্তির ধোঁয়াশা তুলে জনগণের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। মূলত যারা ইসলামী শাসনব্যবস্থার দর্শন ও ইতিহাস বোঝে না, যারা শরয়ী লেনদেন, দায়বদ্ধতা ও পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ এবং যারা রহমতের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র জীবনী সম্পর্কে বিন্দুমাত্রও জানে না, তারাই সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ ও সংশয়ের বিষবৃক্ষ বপন করে চলেছে; যাতে কিছু মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে ইসলামী ইমারতের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে।
কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, প্রতিটি ধর্মপ্রাণ ও স্বাধীনচেতা মানুষেরই উচিত এমন একটি বরকতময় ব্যবস্থাকে ভালোবাসা এবং একে সর্বাত্মক সমর্থন জোগানোকে নিজের পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে করা। ইসলামী ইমারতকে সমর্থন করার পেছনে আমি মূলত যে বিষয়গুলোর ওপর জোর দিচ্ছি, তা নিচে দেওয়া হলো:
• ইসলামী শরিয়তের বাস্তবায়ন: ইসলামী ইমারতকে সমর্থন করার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ইসলামের বিধানগুলোর পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ বাস্তবায়ন।
• পর্দা, নামাজ এবং অন্যান্য শরয়ী দায়িত্ব পালন: পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিপরীতে ধর্মীয় মূল্যবোধের দৃঢ় সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
• বিদেশি আধিপত্যের অবসান: ইসলামী ইমারত তাদের অদম্য প্রতিরোধের মাধ্যমে দেশের হারানো স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করেছে।
• নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ: এই স্থিতিশীলতা জ্ঞান-বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বিকাশের পথ প্রশস্ত করে এবং সমাজকে সর্বপ্রকার বিভেদ ও মতানৈক্য থেকে রক্ষা করে।
• সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি দমন।
• আইনের দৃষ্টিতে সকলের সমতা নিশ্চিতকরণ।
• সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো: আক্রমণাত্মক পশ্চিমা মিডিয়া ও অপসংস্কৃতির বিষাক্ত ছোবল থেকে মুসলিম উম্মাহকে রক্ষায় ইসলামী ইমারত এক সুদৃঢ় ঢাল হিসেবে কাজ করছে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ইসলামী ইমারতকে সমর্থন করা নিছক কোনো রাজনৈতিক পছন্দ নয়; বরং এটি এক গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস ও সুদৃঢ় আকিদার বিষয়। এই ব্যবস্থাটি ইসলামী মূল্যবোধ, প্রকৃত স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ইসলামী সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা রক্ষার সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দণ্ডায়মান। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ইসলামী ইমারতকে সমর্থন করার অর্থ হলো—প্রকৃতপক্ষে ধর্ম, দেশ, আত্মমর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাধীন ও নিখাদ ইসলামী ভবিষ্যতেরই সমর্থন করা।
মাজাল্লাতুস সুমূদ (মাসিক আস সুমুদ ম্যাগাজিন) | সংখ্যা ২৪৪
জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি | মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
Comment