ইরানের হামলায় উল্লাস, আর আল কায়েদার বেলায় অপবাদ কেন?
-মুনশি আব্দুর রহমান
[একটা ফিচার ইমেজ]
আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া বা চায়ের আড্ডায় কান পাতলেই একটা বিষয় খুব শোনা যাচ্ছে। লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বদলা নিতে ইরান যখন ইসরায়েল বা তাদের মিত্রদের ঘাঁটিতে মিসাইল ছুঁড়ল, তখন অনেকেই খুশিতে বাগবাগুম। চারদিকে বেশ একটা উৎসব উৎসব আমেজ! সবাই ইরানকে বাহবা দিচ্ছে। কিন্তু এই আনন্দের জোয়ারে আমরা একটা চরম সত্য আর অদ্ভুত এক হিপোক্রেসি বেমালুম ভুলে বসে আছি। একটু পেছন ফিরে তাকালেই দেখবেন, ঠিক একই কারণে—লেবানন ও ফিলিস্তিনের মজলুমদের রক্তের বদলা নিতে যখন আল-কায়েদার মুজাহিদরা আমেরিকার বুকে কাঁপন ধরিয়েছিল, তখন এই ইরানপন্থি আর শিয়া অনুসারীরাই সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করেছিল। তারা তখন প্রতিরোধ যোদ্ধাদের 'সন্ত্রাসী' তকমা দিয়ে গালমন্দ করেছে, নিরপরাধ মানুষের ওপর হামলার ভুয়া অপবাদ দিয়ে তাদের নিয়ে মশকরা করেছে। আজ যারা ইরানের এই হামলায় বীরত্ব খুঁজছেন, তাদের একটু ইতিহাসের পাতা থেকে ঘুরে আসা দরকার।
৯/১১ হামলার তিন বছর পর ২০০৪ সালের রমজান মাসে (অক্টোবর) ইমামুল মুজাহিদ শাইখ উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ তাঁর "আমেরিকার জনগণের প্রতি বার্তা" শীর্ষক এক অডিও বার্তায় চমৎকার কিছু কথা বলেছিলেন। তিনি সেখানে উল্লেখ করেন—
"কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে জ্ঞানী মানুষের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল- ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা, যেন ভবিষ্যতে তা এড়ানো যায়। কিন্তু আমি তোমাদের (আমেরিকান) দেখে বিস্মিত হই। আমরা ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর চতুর্থ বছরে পদার্পণ করেছি। বুশ (তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট) এখনও তোমাদেরকে বিভ্রান্তি ও গুজবের মধ্যে রেখেছে। তোমাদের কাছ থেকে হামলার আসল কারণ লুকাচ্ছে। তাই, পূর্বের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি করার মতো ‘কারণ’ এখনো তোমাদের মাঝে রয়ে গেছে। আমি তোমাদেরকে পিছনের কারণগুলো সম্পর্কে বলবো। তোমাদেরকে সেই মুহূর্তগুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিবো- যখন হামলার এ সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল। যাতে তোমরা সঠিক কারণ সম্পর্কে চিন্তা করতে পারো।
আমি তোমাদেরকে বলছি; (আল্লাহ তাআলা জানেন) টাওয়ারগুলোতে আঘাত করার কথা আমাদের মনে কখনো উদয় হয়নি। কিন্তু যখন তোমাদের অপরাধের পাল্লা ভারি হলো এবং আমরা ফিলিস্তিন ও লেবাননে আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে আমেরিকান-ইসরায়েলি জোটের অন্যায় ও অত্যাচার প্রত্যক্ষ করলাম, তখন আমার মনে দ্রুত এ চিন্তাটা আসলো।
যে ঘটনাগুলো আমাকে সরাসরি ব্যথিত করেছিল তা হলো, ১৯৮২ সাল এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ। আমেরিকা ইসরায়েলিদের লেবাননে আক্রমণ করার অনুমতি দিয়েছিলো। আমেরিকান তৃতীয় নৌবহর এতে সহায়তা করেছিলো। তারা লেবাননে মুসলিমদের উপর বোমা হামলা করে। এতে অনেক মানুষ নিহত, আহত ও আতঙ্কিত হয়। অন্যরা হয় বাস্তুচ্যুত। এখনও আমার সেই হৃদয়বিদারক করুণ দৃশ্য মনে পড়ে! সর্বত্র পড়ে আছে রক্ত, নারী-শিশুর ছিন্নভিন্ন দেহ! মুসলিমদের অগণিত ঘর-বাড়ি ধ্বংস করা হয়েছিল! টাওয়ারগুলো তার অধিবাসীসহ চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হয়েছিল! আমাদের দেশগুলোর উপর বৃষ্টির মতো গোলা বর্ষণ করা হয়েছিল। পরিস্থিতি ছিল ‘শক্তিশালী কুমিরের শিশু শিকারের ন্যায়’- যে শিশুর চিৎকার করা ছাড়া কোনো উপায় কিংবা শক্তি নেই। আর কুমির কি অস্ত্র ছাড়া কোনো সংলাপ বুঝে?
গোটা বিশ্ব নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। তারা শুনছিল আর দেখছিল! সেই কঠিন মুহূর্তে, আমার মনে এমন সব ভাবনার জোয়ার উঠেছিল, যার বিবরণ দেয়া কঠিন। পরিস্থিতির কারণে এমন অপ্রতিরোধ্য অনুভূতির জন্ম হয়, যা অন্যায় নিরোধে এবং জালিমদের শাস্তি দিতে দৃঢ়প্রত্যয়ী করে।
আমি যখন লেবাননের সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত টাওয়ারগুলো দেখছিলাম, তখন আমার মনে এসেছিল যে, আমাদেরও একইভাবে জালিমকে শাস্তি দেওয়া উচিত। আমেরিকার টাওয়ারগুলো ধ্বংস করা উচিত। যাতে আমরা যা আস্বাদন করেছি, তার কিছুটা স্বাদ তারাও পেতে পারে এবং আমাদের শিশু ও নারীদের হত্যা থেকে বিরত থাকে।
সেদিনই আমি বুঝতে পেরেছি, নিষ্পাপ শিশু ও নারীদের অন্যায়ভাবে, ইচ্ছাকৃত হত্যা করা; একটি মার্কিন অনুমোদিত আইন। এও বুঝতে পেরেছি, তাদের পক্ষ থেকে ‘সন্ত্রাস’ হলেও সেটাকে ‘স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র’ বলা হবে। আর মুসলিমদের পক্ষ থেকে তার প্রতিরোধ হলো তার নাম হবে ‘সন্ত্রাসবাদ’ ও ‘পশ্চাদগামিতা’।
আমেরিকা জুলুম ও অবরোধের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। সিনিয়র বুশ ইরাকে মানব-ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিশু গণহত্যায় অংশগ্রহণ করেছিল। বুশ জুনিয়র একই পথে হেঁটেছে। সে ইরাকের তেল চুরি করার জন্য ও নিজের পুরনো এজেন্টকে (প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেন) পদচ্যুত করে একজন নতুন এজেন্ট বসানোর জন্য, লক্ষ লক্ষ শিশুদের উপর লক্ষাধিক পাউন্ড বোমা এবং বিস্ফোরক বর্ষণ করেছিল। এছাড়া অন্যান্য আরো নৃশংসতা তো ছিলই..
এসব জঘন্য ও ভয়াবহ অন্যায়ের জবাবেই ১১’ই সেপ্টেম্বরের হামলা ঘটেছিল। একজন লোককে কি নিজ সীমান্ত রক্ষা করার কারণে ভর্ৎসনা করা যেতে পারে? নিজেকে রক্ষা করা এবং নিপীড়ককে অনুরূপ শাস্তি দেওয়া কি নিন্দনীয়? যদি তাই হয়, তাহলে আমাদের তা করা ছাড়া উপায় নেই।
এটা সেই বার্তা, যা আমরা ৯/১১ এর হামলার আগে কয়েক বছর ধরে আমাদের কথা ও কাজের মাধ্যমে বারবার তোমাদেরকে জানাতে চেয়েছি। তোমরা চাইলে ১৯৯৬ সালে ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ‘স্কট’ এর সাথে আমার সাক্ষাৎকারটি পড়ে নিতে পারো। এছাড়া ১৯৯৭ সালে ‘সিএনএন’ এর ‘পিটার আর্নেট’ এর সাথে, তারপর ১৯৯৮ সালে ‘জন ওয়াটার’ এর সাথে আমার সাক্ষাৎকারটিও দেখতে পারো। আর তার প্রয়োগ হিসেবে নাইরোবি, তানজানিয়া ও এডেনের ঘটনাগুলো পড়তে পার।
আরও তথ্য পাওয়া যাবে আবদুল বারী আতওয়ানের সাথে আমার সাক্ষাৎকারে। এমনিভাবে ‘রবার্ট ফিস্ক’ এর সাথে আমার সাক্ষাৎকারেও। এই শেষোক্তজন তোমাদেরই স্বজাতীয় এবং তোমাদেরই আদর্শের। তবে আমি মনে করি, তিনি নিরপেক্ষ। হোয়াইট হাউসে এবং তাদের অনুগত চ্যানেলগুলিতে বসে বসে স্বাধীনতার দাবিদাররা কি পারবে, তার সাথে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করতে? যাতে আমাদের কাছ থেকে তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কারণ সম্পর্কে তিনি যা বুঝেছেন, সেটা আমেরিকান জনগণকে জানাতে পারেন।
এখন তোমরা যদি এসব জঘন্য কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকো, তাহলেই তোমরা সেই সঠিক পথ অবলম্বন করতে পারবে, যা আমেরিকাকে ৯/১১ এর আগের নিরাপত্তার দিকে নিয়ে যাবে। এ ছিল যুদ্ধ ও তার কারণ সম্পর্কে কথা।"
শাইখের এই বার্তাটি আরও অনেক বড়। এখানে শুধু প্রাসঙ্গিক অংশটুকুই কোট করা হয়েছে।
ইরানপন্থি ও সমালোচকদের প্রতি কিছু সাদামাটা প্রশ্ন:
আজ যারা ইরানের রকেট হামলা দেখে খুশিতে বগল বাজাচ্ছেন, তাদের কাছে আমার সোজাসাপ্টা কয়েকটি প্রশ্ন আছে:
১. লেবানন ও ফিলিস্তিনের মজলুমদের প্রতিশোধ নিতে ইরান যখন আজ ইসরায়েল বা তাদের মিত্রদের ঘাঁটিতে হামলা করছে, তখন আপনারা সেটাকে 'বীরত্ব' আর 'প্রতিরোধ' বলে বাহবা দিচ্ছেন। অথচ ঠিক একই কারণে, একই মজলুমদের রক্তের বদলা নিতে শাইখ উসামা রহিমাহুল্লাহ যখন আমেরিকার বুকে হামলা চালিয়েছিলেন, তখন আপনারা সেটাকে 'নিরপরাধ মানুষের ওপর হামলা' আর 'সন্ত্রাসবাদ' বলে কেন ফতোয়া দিয়েছিলেন? আপনাদের এই নির্লজ্জ দ্বিমুখী নীতির কারণ কী?
২. ইরান বছরের পর বছর ধরে কেবল তর্জন-গর্জনই করেছে। তারা ঠিক তখনই সরাসরি ময়দানে নেমেছে, যখন ইসরায়েল তাদের নিজ ঘরে আঘাত হেনেছে, তাদের শীর্ষ কমান্ডারদের হত্যা করেছে এবং তাদের ছায়াশক্তিগুলোকে (প্রক্সি) দুর্বল করে দিয়েছে। কিন্তু আল-কায়েদা তো নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে নয়, বরং সম্পূর্ণ উম্মাহর প্রতি দরদ থেকে, ফিলিস্তিন ও লেবাননের মজলুমদের প্রতি ভালোবাসা থেকেই আগেভাগে আঘাত হেনেছিল। তাহলে উম্মাহর প্রকৃত দরদি কে? যারা নিজের গায়ে আঁচড় লাগলে বদলা নিতে ছোটে তারা, নাকি যারা মজলুমের কান্না শুনে নিজের জীবন বাজি রাখে তারা?
৩. যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর ঘাঁটিতে বড়সড় হামলা করলে কিছু আনুষঙ্গিক ক্ষতি (Collateral damage) বা সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঘটে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আজ ইরানের হামলায় যদি ইসরায়েলের বুকে এমন কিছু ঘটে, তবে আপনারা সেটিকে 'যুদ্ধের স্বাভাবিক পরিণতি' বা 'বদলা' হিসেবে মেনে নিচ্ছেন। তাহলে একই লজিকে ইসলামি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের অভিযানের সময় আপনারা কেন তাদের 'খুনি' বা 'সন্ত্রাসী' উপাধি দিয়ে পশ্চিমা মিডিয়ার সুরে সুর মিলিয়েছিলেন?
সত্যি কথা বলতে কী, ইরান আজ যা করছে, তাদের তো তা আরও বহু আগেই করা উচিত ছিল। কিন্তু তারা কেবল নিজেদের হিসাবনিকাশ কষে সময় পার করেছে, প্রতীক্ষা করেছে ঠিক যতক্ষণ পর্যন্ত বিপদ তাদের নিজেদের ঘরের চৌকাঠে এসে না পৌঁছেছে। যখন তাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে, কেবল তখনই তারা লোকদেখানো আর নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এই প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
অথচ আজ ইরান যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বাহবা কুড়াচ্ছে, মুজাদ্দিদ ইমাম শাইখ উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ অত্যন্ত সীমিত সামর্থ্য আর লোকবল নিয়ে তার চেয়েও বহুগুণ বৃহৎ এবং কার্যকর প্রতিক্রিয়া আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগেই দেখিয়ে গেছেন। তিনি উম্মাহর ব্যথায় ব্যথিত হয়ে জালিমের ঘরে ঢুকে তাদের দম্ভ চূর্ণ করে এসেছিলেন। আর তাঁর সেই দেখানো পথ ধরে, তাঁরই প্রতিষ্ঠিত সংগঠন 'তানজিম আল-কায়েদা' আজও সুদীর্ঘ এই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে যাচ্ছে অবিরাম। আবেগ আর হিপোক্রেসির চশমা খুলে রাখলে উম্মাহ ঠিকই বুঝতে পারবে—কারা শুধুই ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের খেলায় মত্ত, আর কারা সত্যিকারের ইসলামি প্রতিরোধ ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।
*****
Comment