শায়খ উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ কী মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর ওয়াদা ভঙ্গ করেছিলেন?
[পাকিস্তানি আলেম মুফতি আব্দুর রহিম সাহেবের উত্থাপিত মনগড়া দাবির দালিলিক জবাব]
পর্ব-৪
মুনশি আব্দুর রহমান
[পাকিস্তানি আলেম মুফতি আব্দুর রহিম সাহেবের উত্থাপিত মনগড়া দাবির দালিলিক জবাব]
পর্ব-৪
মুনশি আব্দুর রহমান

পয়েন্ট-৩: মুজাহিদদের নিয়ন্ত্রণের আংশিক সত্য ও প্রকৃত ইতিহাস
মুজাহিদদের নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে মুফতি আব্দুর রহিম আংশিক সত্য বলেছেন। প্রকৃত ঘটনা নিচে ঐতিহাসিক নথিপত্রের আলোকে তুলে ধরা হলো:
মুফতি আব্দুর রহিমের হুবহু দাবি (ভিডিও-সাক্ষাৎকার অনুসারে):
তিনি দাবি করেছেন, বিদেশি মুজাহিদদের বহির্বিশ্বে হামলা চালানো থেকে নিবৃত্ত রাখতে তিনি স্বয়ং মোল্লা উমরকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ নাকি মুজাহিদদের ওপর এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত কঠোরভাবে চাপিয়েও দিয়েছিলেন। ভিডিওতে তাঁর ভাষ্য ছিল ঠিক এমন:
“আমি মোল্লা উমর সাহেব এবং তাঁর ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর সাথে কথা বলি... আমি তাঁদের বুঝিয়ে বলেছিলাম, এখানে যেসব সংগঠন অবস্থান করছে, তারা মূলত সারা দুনিয়ার অপজিশন। আপনারা সারা পৃথিবীর বিরোধীদের এখানে এনে জড়ো করে রেখেছেন। অথচ আপনাদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সম্পূর্ণ বাইরে এদের নিজস্ব ভিন্ন অ্যাজেন্ডা রয়েছে... এদেরকে যেকোনো মূল্যে বাধ্য করুন, যেন এরা বাইরে গিয়ে কোনো বিস্ফোরণ বা হামলা চালাতে না পারে এবং সম্পূর্ণভাবে আপনাদের আনুগত্য মেনে চলে।”
তিনি আরও বলেছেন:
“মোল্লা সাহেব (শায়খ বিন লাদেনকে) বলতেন যে, আপনারা আমাদের অনুমতি ছাড়া কোনোভাবেই জিহাদ করতে পারবেন না, এর বিন্দুমাত্র অনুমতি নেই।”
ঐতিহাসিক নিরিখে এই অর্ধসত্যের বিস্তারিত জবাব:
মুফতি আব্দুর রহিম তাঁর বয়ানে একটি আংশিক সত্য ঘটনাকে অত্যন্ত সুকৌশলে বিকৃত করে এক সুবিশাল মিথ্যার রূপ দিয়েছেন। নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করলেই এর পেছনের প্রকৃত ঘটনা পরিষ্কার হয়ে ওঠে:
১. মুফতি আব্দুর রহিমের এই কথাটি আংশিক সত্য যে, তৎকালীন সময়ে ইসলামি ইমারাত আফগানিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের প্রবল চাপ ছিল। সেই প্রেক্ষাপটেই মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ বিদেশি মুজাহিদদের বহির্বিশ্বে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন । শুধু তা-ই নয়, আন্তর্জাতিক মহলে যেন নতুন করে কোনো উসকানি না পৌঁছায়, সে লক্ষ্যে পূর্বানুমতি ছাড়া মুজাহিদদের যেকোনো ধরনের মিডিয়া ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতেও নিষেধ করা হয়েছিল। এমনকি বিদেশি বা স্থানীয়দের সাথে অবাধে কথা বলার ওপরও নিষেধাজ্ঞা ছিল।
২. মুফতি আব্দুর রহিমের মূল মিথ্যাচারটি এখানেই যে, তিনি মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর একটি ‘সামরিক ও কৌশলগত স্থগিতাদেশ’কে চিরস্থায়ী ‘ফিকহী ফতোয়া’ বা ‘চুক্তি’ হিসেবে প্রমাণের জোর চেষ্টা চালিয়েছেন। নথিপত্র বলছে, আমেরিকা ও ইউরোপের প্রবল চাপ এবং আন্তর্জাতিক অবরোধের কারণেই মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ মুজাহিদদের ওই নির্দেশটি দিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক এই সংকট দূর না হওয়া পর্যন্ত মুজাহিদরা যেন সাময়িকভাবে বহির্বিশ্বে আমেরিকানদের ওপর হামলা বন্ধ রাখেন। এর পরিবর্তে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধফ্রন্টে মনোযোগ নিবদ্ধ করার নির্দেশ দেন তিনি। এটি ছিল সম্পূর্ণ সাময়িক ও কৌশলগত একটি যুদ্ধ-নির্দেশনা; কোনোভাবেই ‘রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া জিহাদ অবৈধ’ মর্মে দেওয়া কোনো ফতোয়া এটি ছিল না।
৩. মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ যদি ফতোয়া প্রদানের মাধ্যমে বহির্বিশ্বে হামলা চিরতরে নিষিদ্ধই করে থাকতেন, তবে ইতিহাস এর পরের ঘটনাই মুফতি আব্দুর রহিমের দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণ করে দেয়। ইতিহাসে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, পরবর্তীতে ফিলিস্তিনের গাজায় মুসলমানদের ওপর ভয়াবহ রক্তপাত ও হত্যাযজ্ঞ শুরু হলে মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ নিজেই ইহুদি লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা চালানোর জন্য মুজাহিদদের সুস্পষ্ট অনুমতি প্রদান করেন । অর্থাৎ, মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ কখনো বৈশ্বিক জিহাদের পথকে অবৈধ মনে করেননি। বরং, পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোকে তিনি কেবল কৌশলগত কারণে শত্রুর ধরন (আমেরিকান থেকে ইহুদি) পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
৪. মুফতি আব্দুর রহিম মুজাহিদদের ‘অবাধ্য’ হিসেবে প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। অথচ ইতিহাস বলছে, মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর ওই সাময়িক স্থগিতাদেশের পর আল-কায়েদার শুরা কাউন্সিলে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। নাইন-ইলেভেন হামলার লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তন করে আমেরিকার ভেতরে থাকা ইহুদি স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানা যায় কি না, তা নিয়ে সেখানে রীতিমতো বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল। এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, তাঁরা মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর নির্দেশনার প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল ও অনুগত ছিলেন। কিন্তু আমেরিকার অভ্যন্তরে থাকা মাঠপর্যায়ের প্রধান রূপকার মুহাম্মাদ আতা তখন জানিয়ে দেন যে, অভিযানের ওই পর্যায়ে এসে লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তন করা একেবারেই অসম্ভব। তা ছাড়া, এতে পুরো মিশনটিই বাতিল হয়ে যাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। তাই চরম বাস্তবতা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে আল-কায়েদার শীর্ষ নেতৃত্ব মূল পরিকল্পনাতেই অটল থাকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এটি কোনোভাবেই ফতোয়া লঙ্ঘন ছিল না; বরং তা ছিল পরিবর্তিত ও জটিল এক পরিস্থিতিতে মুজাহিদদের সামরিক কৌশলের নিখুঁত ও বাস্তব প্রয়োগ।
সারকথা হল- মুফতি আব্দুর রহিম মূলত একটি নির্দিষ্ট আংশিক সত্যকে (মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর সাময়িক স্থগিতাদেশ) সুচতুরভাবে পুঁজি করেছেন। এরপর সেই সত্যের ওপর ভিত্তি করে নিজের মনগড়া ‘৬ আলেম ও ফতোয়ার গল্প’ সযত্নে চাপিয়ে দিয়েছেন। অথচ প্রকৃত ইতিহাস হলো, মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে আন্তর্জাতিক চাপ সামাল দিতে একটি নিখুঁত কৌশলগত নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কখনোই বৈশ্বিক জিহাদকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করেননি কিংবা মুজাহিদদেরকে কাবুলে বন্দিও করে রাখেননি।
*****
চলবে ইনশা আল্লাহ...
Comment