শায়খ উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ কী মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর ওয়াদা ভঙ্গ করেছিলেন?
[পাকিস্তানি আলেম মুফতি আব্দুর রহিম সাহেবের উত্থাপিত মনগড়া দাবির দালিলিক জবাব]
পর্ব-৫
মুনশি আব্দুর রহমান
[পাকিস্তানি আলেম মুফতি আব্দুর রহিম সাহেবের উত্থাপিত মনগড়া দাবির দালিলিক জবাব]
পর্ব-৫
মুনশি আব্দুর রহমান

পয়েন্ট-৪: নাইন-ইলেভেন হামলাকে ‘অবাধ্যতা’ প্রমাণের অপচেষ্টা
নাইন-ইলেভেন (৯/১১) হামলাকে মুজাহিদদের নিছক 'অবাধ্যতা' হিসেবে প্রমাণের যে অপচেষ্টা মুফতি আব্দুর রহিম চালিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতার এক নির্লজ্জ বিকৃতি।
মুফতি আব্দুর রহিমের হুবহু দাবি (ভিডিও-সাক্ষাৎকার অনুসারে):
তিনি দাবি করেছেন যে, বিদেশি মুজাহিদরা সেই ৬ সদস্যের কমিটির তথাকথিত ফতোয়া মেনে নেননি এবং তারই চরম পরিণতি হিসেবে নাইন-ইলেভেনের মতো ঘটনা ঘটেছিল। তাঁর ভাষ্যমতে:
“এই কথাগুলো (রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া জিহাদ অবৈধ) রীতিমতো লিখিত রূপ পেল এবং চুক্তিনামায় সবার স্বাক্ষর নেওয়া হলো। সেখানে উসামা বিন লাদেনের স্বাক্ষর ছিল, মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর স্বাক্ষর ছিল, এমনকি আমাদের সবারই স্বাক্ষর ছিল... কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সংগঠনগুলোর লোকেরা এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেনে নেয়নি। আর তাদের সেই অবাধ্যতার চূড়ান্ত পরিণতিই হলো ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা (৯/১১)।”
ঐতিহাসিক নিরিখে এই মিথ্যাচারের বিস্তারিত জবাব:
মুফতি আব্দুর রহিম নাইন-ইলেভেনের হামলাকে মুজাহিদদের ‘অবাধ্যতা’ এবং ‘চুক্তি লঙ্ঘন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। অথচ নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রগুলো দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, আল-কায়েদা কখনোই আমিরের অবাধ্য ছিল না; বরং এই ঐতিহাসিক হামলার প্রেক্ষাপট ও বাস্তব পরিস্থিতি ছিল একেবারেই ভিন্ন:
১. নাইন-ইলেভেনের হামলা কোনো তাৎক্ষণিক অবাধ্যতা বা চুক্তি লঙ্ঘনের ফসল ছিল না। ইতিহাস বলছে, ১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানে অবস্থান নেওয়ার পর থেকেই আল-কায়েদা আমেরিকার বুকে এমন একটি বিধ্বংসী আঘাত হানার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করছিল। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল আমেরিকাকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল ‘ওয়ার অব অ্যাট্রিশন’ বা ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের অনিবার্য ফাঁদে আটকে ফেলা। একই সাথে এই মহাযুদ্ধের ডামাডোলে ঘুমন্ত মুসলিম উম্মাহকে নতুন করে জাগ্রত করাও তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।
২. মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ যখন আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সাময়িকভাবে আমেরিকার ওপর বহির্বিশ্বে হামলা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন, তখন নাইন-ইলেভেন হামলার সার্বিক প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। এমনকি হামলাকারীরা ততদিনে আমেরিকার ভেতরে নিজেদের গোপন অবস্থানও সুনিশ্চিত করে ফেলেছিলেন। মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর ওই নির্দেশটি কোনোভাবেই চিরস্থায়ী ‘ফতোয়া’ ছিল না, বরং তা ছিল সম্পূর্ণ সাময়িক ও কৌশলগত একটি সামরিক সিদ্ধান্ত।
৩. মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার দাবিটি একেবারেই ভিত্তিহীন। কারণ, ফিলিস্তিনের গাজায় মুসলমানদের ওপর ইহুদিদের বর্বর হত্যাযজ্ঞ শুরু হলে স্বয়ং মোল্লা উমরই পরবর্তীতে মুজাহিদদের ইহুদি লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হানার সুস্পষ্ট অনুমতি প্রদান করেছিলেন। একটি বিশেষ বৈঠকে তিনি শায়খ উসামাকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “হে উসামা, আমি তোমাকে অনুমতি দিচ্ছি। তুমি চাইলে ইহুদিদের যেকোনো জায়গায় আঘাত হানতে পারো।”
৪. আল-কায়েদা কখনোই মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর অবাধ্য হওয়ার কথা চিন্তাও করেনি। মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ যখন ইহুদিদের ওপর হামলার অনুমতি দিলেন, তখন আল-কায়েদার শুরা কাউন্সিলে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক বসে। সেখানে বিস্তারিত আলোচনা হয়—কীভাবে মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর এই নতুন নির্দেশনার সাথে আমেরিকার ভেতরে চলমান পরিকল্পনার নিখুঁত সমন্বয় ঘটানো যায়। গভীর পর্যালোচনার পর শুরা কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নেয় যে, আমেরিকার ভেতরের পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুগুলো পরিবর্তন করে ইহুদি স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো হবে। সিদ্ধান্তটি তাৎক্ষণিকভাবে মাঠপর্যায়ের রূপকার মুহাম্মাদ আতাকে জানিয়েও দেওয়া হয়।
৫. আমেরিকার অভ্যন্তরে অবস্থানরত ফিল্ড কমান্ডার মুহাম্মাদ আতা তখন শুরা কাউন্সিলকে পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, অভিযানের ওই চরম মুহূর্তে এসে লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তন করা একেবারে অসম্ভব। নতুন করে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করতে গেলে অপারেশনের চরম গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যাওয়ার কিংবা পুরো মিশনটিই চিরতরে বাতিল হয়ে যাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। মাঠপর্যায়ের এই কঠিন বাস্তবতার প্রেক্ষিতে এবং বহুল প্রতীক্ষিত অপারেশনটি যেন কোনোভাবেই ফাঁস না হয়ে যায়, সেই চরম আশঙ্কায় শায়খ উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে মূল পরিকল্পনাটিই দ্রুত বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
সারকথা হল- নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হীন বাসনা থেকেই মুফতি আব্দুর রহিম নাইন-ইলেভেন হামলাকে মুজাহিদদের ‘অবাধ্যতা’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন। অথচ প্রকৃত ইতিহাস অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আল-কায়েদার শীর্ষ নেতৃত্ব মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর নির্দেশনার প্রতি ছিলেন চূড়ান্তভাবে শ্রদ্ধাশীল। এমনকি তাঁর নির্দেশ মেনে তাঁরা শুরা কাউন্সিলে লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তনের আন্তরিক চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু কেবল অপারেশনাল বাধ্যবাধকতা এবং পরিবর্তিত রূঢ় বাস্তবতার কারণেই তাঁরা নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সফল ও নিখুঁত বাস্তবায়ন ঘটিয়েছিলেন। মুজাহিদদের এই চূড়ান্ত আত্মত্যাগের মহাকাব্যকে মনগড়া ফতোয়া লঙ্ঘনের ‘অবাধ্যতা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা একটি নির্জলা মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়।
*****
চলবে ইনশা আল্লাহ...
Comment