শায়খ উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ কী মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর ওয়াদা ভঙ্গ করেছিলেন?
[পাকিস্তানি আলেম মুফতি আব্দুর রহিম সাহেবের উত্থাপিত মনগড়া দাবির দালিলিক জবাব]
পর্ব-৬
মুনশি আব্দুর রহমান
[পাকিস্তানি আলেম মুফতি আব্দুর রহিম সাহেবের উত্থাপিত মনগড়া দাবির দালিলিক জবাব]
পর্ব-৬
মুনশি আব্দুর রহমান

পয়েন্ট-৫: কাবুল দখলের আগে থেকেই প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর বৈশ্বিক জিহাদ
মুফতি আব্দুর রহিমের বহির্বিশ্বে হামলা সম্পর্কে মিথ্যাচারের নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা ভ্রান্ত বয়ান এবং ঐতিহাসিক নথিপত্রের আলোকে এর বিস্তারিত জবাব নিচে তুলে ধরা হলো:
মুফতি আব্দুর রহিমের দাবির অন্তর্নিহিত বয়ান:
ভিডিও-সাক্ষাৎকারে মুফতি আব্দুর রহিম সরাসরি মুখ ফুটে না বললেও, তাঁর পুরো আলোচনার মূল সুরটি ছিল ঠিক এমন—মুজাহিদরা আফগানিস্তানে আশ্রয় নেওয়ার পর ইসলামি ইমারাত বা রাষ্ট্রের নির্দেশ অমান্য করে বহির্বিশ্বে হামলা চালাতে শুরু করেন। তাঁর ভাষ্যমতে, মুজাহিদদের এই ‘অবাধ্যতা’ এবং ভিনদেশে হামলার কারণেই মূলত আফগানিস্তান বিপদের মুখে পড়েছিল। তাঁর নিজের ভাষায়: “মোল্লা সাহেব বলতেন যে, আপনারা আমাদের অনুমতি ছাড়া কোনোভাবেই জিহাদ করতে পারবেন না, এর বিন্দুমাত্র অনুমতি নেই... কিন্তু আমাদের সংগঠনগুলোর লোকেরা এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি এবং অবশেষে সেটাই ঘটল, যা ১১ সেপ্টেম্বরে (৯/১১) ঘটেছিল...”
ঐতিহাসিক নিরিখে এই আংশিক বা বিকৃত বয়ানের বিস্তারিত জবাব:
মুফতি আব্দুর রহিম অত্যন্ত সুকৌশলে বোঝাতে চেয়েছেন যে, মুজাহিদরা আফগানিস্তানে রাষ্ট্র কায়েম হওয়ার পর হঠাৎ করেই চুক্তি ভঙ্গ করে বহির্বিশ্বে হামলা শুরু করেছিলেন। কিন্তু নির্ভরযোগ্য ইতিহাস প্রমাণ করে যে, ১৯৯৬ সালে মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর নেতৃত্বাধীন তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অনেক আগে থেকেই আল-কায়েদাসহ অন্যান্য ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের বৈশ্বিক জিহাদ শুরু করেছিল। এটি কোনো হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত বা আফগান রাষ্ট্রের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা ছিল না।
নথিপত্রে উল্লেখিত কাবুল দখলের পূর্ববর্তী বৈশ্বিক জিহাদের অকাট্য প্রমাণসমূহ:
১. ইতিহাস বলছে, ১৯৯২ সাল থেকেই আল-কায়েদা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছিল। সোমালিয়ায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন হস্তক্ষেপ ব্যর্থ করে দেওয়ার লক্ষ্যে আল-কায়েদা তাদের সুদক্ষ সামরিক ক্যাডার প্রেরণ করে। সেখানে তাঁরা স্থানীয় ইসলামি আন্দোলনগুলোর সাথে একীভূত হয়ে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল মোগাদিশুর যুদ্ধ (যা ‘মারাকাতু হুল ওয়া যাক’ বা ‘معركة هول وذاق’ নামে সুপরিচিত)। এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মার্কিন সৈন্যদের হত্যা করে তাদের মৃতদেহ রাস্তায় ঘোরানো হয়েছিল।
২. ১৯৯২ সালে খালিদ শেখ মুহাম্মাদের ভাগনে রামজি ইউসেফ নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের একটি টাওয়ার ধ্বংস করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন । এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩ সালে তিনি অত্যন্ত সফলভাবে ট্রেড সেন্টারের গ্যারেজে বিস্ফোরকভর্তি একটি গাড়ির প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণ ঘটান। যদিও ওই হামলায় ভবনটি ধসে পড়েনি, তবুও এতে প্রায় এক হাজার মানুষ হতাহত হয়েছিল।
৩. ১৯৯৩ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার পর রামজি ইউসেফ ফিলিপাইনে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি খালিদ শেখ মুহাম্মাদের সাথে মিলে মার্কিন যাত্রীবাহী বিমানগুলোতে বিস্ফোরক ব্যবহার করে হামলার ছক কষেন। ১৯৯৪ সালে তাঁরা সফলভাবে একটি হংকংগামী বিমানে তরল বিস্ফোরক তুলে পরীক্ষামূলক একটি অভিযানও চালিয়েছিলেন। এর পাশাপাশি ম্যানিলায় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং পোপকে গুপ্তহত্যার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও তাঁদের ছিল। যদিও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার কারণে শেষ পর্যন্ত তা আর বাস্তবায়িত হয়নি।
৪. বিমান ব্যবহার করে হামলার এই অভিনব ধারণাটি মুজাহিদদের কাছে একেবারেই নতুন কিছু ছিল না। আশির দশকে পেশোয়ারে অবস্থানকালেই বয়োজ্যেষ্ঠ এক মিসরীয় পাইলট একটি বিমানে বিস্ফোরক ভর্তি করে গুরুত্বপূর্ণ কোনো মার্কিন ভবনে আত্মঘাতী হামলার ধারণা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে সুদানে অবস্থানকালে খালিদ শেখ মুহাম্মাদ শায়খ উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে তিনি ১০টি মার্কিন যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে সেগুলো দিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর, অথবা নিজেদের দাবি আদায়ে আকাশেই সেগুলো ধ্বংস করে দেওয়ার একটি বড় প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
সারকথা হল- ইতিহাসের পাতা থেকে এটি একেবারেই সুস্পষ্ট যে, আল-কায়েদা বা বিদেশি মুজাহিদরা আফগানিস্তানে তালেবানের আশ্রয়ে গিয়ে হঠাৎ অবাধ্য হয়ে বহির্বিশ্বে হামলা শুরু করেননি। সোমালিয়া থেকে শুরু করে নিউইয়র্ক ও ফিলিপাইন পর্যন্ত বিস্তৃত তাঁদের এই বৈশ্বিক সামরিক অপারেশনগুলো মূলত ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যেই সংঘটিত হয়েছিল । ১৯৯৬ সালে মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ যখন কাবুলের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হন, তখন আল-কায়েদার এই বৈশ্বিক সংঘাত আগে থেকেই চলমান একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ছিল। মুফতি আব্দুর রহিম কেবল নিজের বর্তমান রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হীন বাসনা থেকেই ইতিহাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেন মুজাহিদরা আফগানিস্তানে গিয়েই কেবল এসব ঝামেলার সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন। তাঁর এই আখ্যান নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক নথিপত্রের বর্ণনার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক ও ভিত্তিহীন।
*****
চলবে ইনশা আল্লাহ...
Comment