Announcement

Collapse
No announcement yet.

পাঠচক্র- ৫১ || ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১- বিজয়ের সোপান ।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি [আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ - ত্রয়ত্রিংশ পর্ব

Collapse
This is a sticky topic.
X
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • পাঠচক্র- ৫১ || ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১- বিজয়ের সোপান ।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি [আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ - ত্রয়ত্রিংশ পর্ব


    আল হিকমাহ মিডিয়া পরিবেশিত
    ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
    বিজয়ের সোপান
    ।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
    [আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
    –।।থেকে- ত্রয়ত্রিংশ পর্ব


    বিলাসী জীবনে অভ্যস্তদের প্রতি আহ্বান


    যারা ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ ও আল্লাহর জমিনে আল্লাহর খিলাফত প্রতিষ্ঠার গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, তারা পূর্বে আলোচিত বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদ প্রবক্তার বাস্তব অবস্থা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান এসব মতবাদ প্রবক্তাদের মাথায় বুটিদার পাগড়ী, দেহজুড়ে সজ্জিত পোশাক, বিলাসিতার চাদর তাদের পুরো শরীরে, নরম বিছানার কোলে তারা রয়েছেন বিশ্রামের আবেশে তাদের একেকজন সুউচ্চ প্রাসাদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে, ক্ষণিকের স্বপ্ন জগতে তাদের সার্বক্ষণিক বিচরণ ইবলিসের প্রতারণায় নিজেদের আমল তাদের কাছে সুমহান কীর্তি শয়তানের ধোঁকার ফাঁদে তাদের উদ্ভ্রান্ত চলাফেরা মিছে সুখস্বপ্নে তারা বিভোর শয়তানি ঔদাসীন্যে ডুবে থেকে শয়তানেরই দেখানো পথে তাদের এগিয়ে চলা শয়তানের প্রণীত নীতি ঘিরে তাদের কর্মপরিকল্পনা, শয়তানি ভিত্তিপ্রস্তরের ওপরই তারা সুউচ্চ ইসলামী সমাজের প্রাসাদ নির্মাণের কাজে মহা ব্যস্ত। কেউ যখন এসব অবস্থা প্রত্যক্ষ করে, তখন সে দিশেহারা হয়ে যায়। অনুতাপ অনুশোচনায় ওই ব্যক্তি অশ্রু ঝরাতে থাকে আর মর্মবেদনা নিয়ে ক্ষত বিক্ষত হৃদয়ে এজাতীয় ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকে, হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা! তোমাদের দুর্ভোগ হোক! তোমরা কি আল্লাহর কিতাব পাঠ করোনি? রাসূলুল্লাহ -এর সীরাত অনুসরণের প্রতিশ্রুতি কি তোমরা গ্রহণ করোনি! যুগে যুগে দাওয়াতের বিপ্লবী পথিকদের অবস্থা সম্পর্কে তোমরা কি অবগতি লাভ করোনি! ওহুদ ও আহযাব যুদ্ধের ঘটনায় তোমাদের জন্য কি কোন শিক্ষা নেই!

    হে আমার সম্প্রদায়! অচেতনার অলস নিদ্রা থেকে তোমরা জেগে ওঠো। উদাসীনতা ঝেড়ে ফেলে সচেতন হও। সত্যিই যদি তোমরা আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করতে চাও, তবে শুনে রাখো, আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠার এই পথ অতি দীর্ঘ, অতি দুর্গম আর কণ্টকাকীর্ণ। এ পথে চলতে গিয়ে পথিক ভাষা হারিয়ে ফেলে। বর্শা-তরবারির ঝলক এ পথের মোড়ে মোড়েমৌখিক ভাষায় নয়, তলোয়ারের ভাষায় ঝংকৃত হয় মঞ্চ। গোলযোগের দরুন বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়। লড়াইয়ের ময়দানে রক্ত মূল্যহীন হয়ে পড়ে। মৃত্যুর দুয়ারে আছড়ে পড়ে মানব দেহ, আর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে থাকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সেই দুয়ারের আঙ্গিনায়। তিক্ত স্বাদের যন্ত্রণায় পথিকের দেহ নীল হয়ে ওঠে। বিপদ-আপদ আর দুর্যোগের বিষাক্ত দাঁত দেহকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। অপরিচিতির রশি গলায় ফাঁস হয়ে বসে যায়। জি হ্যাঁ, এই হলো মানব নেতৃত্বের আসন পুনরুদ্ধারে প্রচেষ্টারত ব্যক্তিদের পথ। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার এই হল কার্যকরী পন্থা।




    জিহাদের পথে দুর্যোগ মোকাবেলা ও ধৈর্য ধারণ


    এটি অপরিবর্তনীয় এক ঐশী নীতি। বিশ্বপ্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম। দ্বীন প্রতিষ্ঠার গুরুদায়িত্ব পালনকারীদের জন্য এমনটাই নির্ধারণ করে রেখেছেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা

    যারা দাওয়াতের গুরুদায়িত্ব বহন করতে চান, নবীজির রিসালাতের প্রচারকার্যে আত্মনিয়োগ করেন, অথবা স্বজাতির জন্য গৌরব অর্জন করতে চান, কোনো মতবাদের বিস্তার করতে চান অথবা কোন আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাদের পথ একটাই; যে পথ পাড়ি না দেয়ার কোনো বিকল্প নেই।

    তা সুদীর্ঘ, দুর্গম, দুর্লঙ্ঘনীয় এমন এক পথ, যার সর্বত্র প্রবৃত্তি বিরোধিতার যাবতীয় উপকরণ। এর বাঁকে বাঁকে ক্লান্তি অবসাদের তীব্র রোদ্দুর। রক্ত-ঘামে সিক্ত এ পথের মাটি।

    দুর্যোগ-দুর্বিপাকের এ এক দীর্ঘ অধ্যায়। কষ্ট যন্ত্রণার এ এক বিরাট কলেবর। এসবের মাঝেই লুকিয়ে আছে সম্মান ও গৌরব। এরই পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে সুমহান দাওয়াতের কত রহস্য!

    যুগ যুগের এ এক এমন সুদীর্ঘ সেতুবন্ধন, যা পাড়ি দিতে গিয়ে কেঁদেছিলেন নূহ নবী, অগ্নিগর্ভে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন ইব্রাহীম, করাত দিয়ে দ্বিখণ্ডিত হয়েছিলেন ইয়াহইয়া, জবাই হতে শুয়েছিলেন ইসমাঈল, অল্প কিছু দেরহামের বিনিময়ে বিক্রয় হয়েছিলেন ইউসুফ এবং কাটিয়েছিলেন বন্দিশালায়, মিথ্যাচারের অপবাদ পেলেন আর কষ্ট স্বীকার করলেন লুত, জবাই হলেন সাইয়্যেদ ইয়াহইয়া; ব্যাধি আক্রান্ত হয়ে কষ্ট সহ্য করলেন আইউব, মরুভূমিতে নিঃসঙ্গ অবস্থায় পথ চললেন ঈসা, যারপরনাই কেঁদে গেলেন দাউদ, শত্রুতার শিকার হলেন মুহাম্মাদ , তাঁর শিরস্ত্রাণ ভেঙে গেল এবং চেহারা মোবারক রক্তাক্ত হলো। (আলাইহিমুস সালাম)

    আল্লাহর কসম! এ পথে রয়েছে ক্লান্তি, বিপদ-আপদ, কষ্ট-মুসিবত আর ত্যাগ-তিতিক্ষা। যুগ যুগ ধরে অভিন্ন এই কাফেলার প্রথম সদস্য হলেন আদম আলাইহিস সালাম। কারণ, তাঁর সন্তানদের মাঝে তাওহীদবাদী রাসূলগণ সকলেই নিজেদের দুর্বিনীত সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে এমনই কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেশতাব্দীর পর শতাব্দী ওই একই রকম কষ্টের বোঝা তাঁদেরকে বহন করতে হয়েছেওই তো মক্কার প্রাণকেন্দ্রে সর্বজন শ্রদ্ধেয় মুহাম্মাদ কষ্টের জীবন পার করছেন। দারিদ্র্য, নিঃসঙ্গতা, হিংসা-বিদ্বেষ আর শত্রুতায় জর্জরিত হচ্ছেন। কারণ, তিনি তো ওই শ্রেণীর লোকদের পথিকৃৎ; যারা তাঁর পরেও দুর্গম পথের কষ্টকর যাত্রা অব্যাহত রাখবেন, আর তাঁদের মর্যাদা উন্নীত হতে থাকবে। যারা ঐশী দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কল্যাণের পথে, পুনর্গঠন ও সংশোধনের পথে মানুষকে আহ্বান করবেন কিংবা কোনো অন্ধ জাহিলি শক্তিকে, প্রবৃত্তি পূজারীদের পছন্দের কোনো জীবনব্যবস্থাকে অথবা মানব সমাজের চরিত্রহীন শ্রেণীর পছন্দনীয় কোন উদ্ভ্রান্ত জীবনযাত্রাকে চ্যালেঞ্জ করবেন।

    আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের নির্যাতিত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ বলেন, কুরআনে কারীমের প্রায় ৯০ টি স্থানে সবরের কথা বলা হয়েছে। উম্মাহর সর্বসম্মতিক্রমে সবর করা ওয়াজিব। বরং এভাবে বলা যায়, সবর হচ্ছে অর্ধেক ঈমান। কারণ, ঈমানের অর্ধেক হচ্ছে শোকর আর অর্ধেক হচ্ছে সবর। ইসলামের মধ্যে সবরের অবস্থান অনেক উঁচুতে। দেহের জন্য যেমন মাথা ঈমানের জন্য তেমনই সবর। যার সবর নেই; তার যেন ঈমানই নেই, যেমনিভাবে যার মাথা নেই; তার দেহের কোনো মূল্য নেই।

    উলামায়ে কেরাম সবরের সংজ্ঞা এভাবে দিয়েছেন: কষ্ট ও ক্রোধের সময় আত্মনিয়ন্ত্রণ। অভিযোগ না করে জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নিয়ন্ত্রণ।

    সবর তিন প্রকার:

    ১. আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে সবর করা;

    ২. আল্লাহর নাফরমানি বা অবাধ্যতার ক্ষেত্রে সবর করা;

    ৩. আল্লাহর দেয়া পরীক্ষার সময় সবর করা।



    এই শেষ প্রকার তথা আল্লাহর দেয়া পরীক্ষার সময় সবর করাএটিই যুগে যুগে দাওয়াতের কাণ্ডারি ও নবীর রিসালাতের দায়িত্ব পালনকারীদের সঙ্গী ছিল। একইভাবে রাসূলদের উত্তরসূরীদেরকে এবং মানবতার মুক্তির দিশারীদেরকে বিভিন্ন বিপদের সময় এই সবরেরই অনুশীলন করতে হয়েছে।

    যেহেতু বিপদাপদে সবর করা, দাওয়াত প্রচার করতে গিয়ে দুর্বিনীত অহংকারীদের প্রবল বিরোধিতার মুখে ধৈর্যধারণ করা রাসূলদের সীরাত এবং কেয়ামত দিবস পর্যন্ত আসতে থাকা তাঁদের অনুসারী ও উত্তরসূরীদের বৈশিষ্ট্য, তাই কুরআনুল কারীমে এ বিষয়ে অনেক আলোচনা এসেছেরাসূলুল্লাহ -এর অন্তরে কুরআন অবতীর্ণকারী রব মানব চরিত্রের খুঁটিনাটি ও রহস্য সম্পর্কে, দাওয়াতের দুর্লঙ্ঘনীয় পথ ও কষ্টকর যাত্রা সম্পর্কে, দুর্গম এই পথের কাঁটা বিছানো একেকটি মঞ্জিল সম্পর্কে অধিক অবগত তাই কুরআনুল কারীম এ বিষয়ে রবের নির্দেশনায় ভরপুর। সেসব দেখে মুহাম্মাদ -এর অনুসারীরা রক্তস্নাত এ পথে সবর করতে এবং ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে অনুপ্রাণিত হন।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইরশাদ করছেন-

    يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱسْتَعِينُوا۟ بِٱلصَّبْرِ وَٱلصَّلَوٰةِ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَ ٱلصَّٰبِرِينَ ﴿البقرة: ١٥٣﴾

    “হে মু’মিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চিয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন” [1]

    অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন-

    يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱصْبِرُوا۟ وَصَابِرُوا۟ وَرَابِطُوا۟ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ﴿آل‌عمران: ٢٠٠﴾

    ‘হে ঈমানদানগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, (ধৈর্যের এ কাজে) একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করো, (শত্রুর মোকাবেলায়) দৃঢ়তা অবলম্বন করোএকমাত্র আল্লাহকেই ভয় করতে থাকো, (এভাবেই) আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হতে পারবে”! [2]

    অন্য এক জায়গায় তিনি ইরশাদ করেন-

    وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَىْءٍ مِّنَ ٱلْخَوْفِ وَٱلْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ ٱلْأَمْوَٰلِ وَٱلْأَنفُسِ وَٱلثَّمَرَٰتِ وَبَشِّرِ ٱلصَّٰبِرِينَ﴿البقرة: ١٥٥﴾

    “এবং অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের”[3]

    কোনো সন্দেহ নেই যে, এটি একটি দীর্ঘ নির্জন পথ। কিন্তু এই পথে চলার প্রতিদান বিরাট। এ পথের পথিকদের প্রাপ্তি বিশাল। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের পাতায় পাতায় যে পুরস্কারের কথা জ্বলজ্বল করছে, তা দেখে যে কারো পক্ষে মৃত্যুর দুয়ারে আঘাত হানা সম্ভব। সেসব প্রতিদানের কথা ভাবলে বর্শা আর তরবারির ছায়ায় আশ্রয় নেওয়ার যৌক্তিকতা ধরা পড়ে।

    নিশ্চয়ই! আপনারা যারা নিজেদের দ্বীনের পথে অবিচল, যারা এই দ্বীনকে শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরেছেন, নিজেদের মতাদর্শের ওপর অটল রয়েছেন, নিজেদের দ্বীন প্রতিষ্ঠার পথে পার্থিব জগতকে তুচ্ছ করেছেন; আপনাদের যাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কেবল এটাই, রবের সন্তুষ্টি অর্জন করবেন এবং তাঁর জান্নাতে চিরস্থায়ী আবাস লাভ করে তাঁর নৈকট্য পেয়ে ধন্য হবেনআপনারা এখন থেকেই সুসংবাদ গ্রহণ করুন!

    নিশ্চয়ই! প্রতিটি মু’মিন দলের, সত্যের দাওয়াতি মিশন নিয়ে দাঁড়িয়েছে; এমন প্রতিটি ব্যক্তির জেনে রাখা উচিত, বিপদ-আপদ সহ্য করা, দুর্যোগ-দুর্বিপাকের মোকাবেলা করা, ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করা প্রতিটি হকপন্থী দাওয়াতি মিশনের ললাটের লিখনএর কোনো বিকল্প নেই এবং এ থেকে পালানোর কোনো সুযোগ নেই। আর কীভাবে এর কোনো বিকল্প থাকতে পারে, অথচ কুরআন আমাদেরকে অতীত দাওয়াতি মিশনগুলোর খুন রাঙ্গা পথের ঘটনা শোনাচ্ছে? অতীত যুগের পুণ্যবান লোকদের দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার কথা বর্ণনা করছে আল্লাহর পথের সে সমস্ত পথিক যারা আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করতে ইচ্ছুক, তার শরীয়তকে প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী, বাস্তব জগতে কার্যকরভাবে তাঁর মানহাজ ও শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে উদগ্রীবকুরআন সে সমস্ত মহামানবের বৈশিষ্ট্য আমাদের কাছে তুলে ধরছে-


    أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا۟ ٱلْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ ٱلَّذِينَ خَلَوْا۟ مِن قَبْلِكُم مَّسَّتْهُمُ ٱلْبَأْسَآءُ وَٱلضَّرَّآءُ وَزُلْزِلُوا۟ حَتَّىٰ يَقُولَ ٱلرَّسُولُ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ مَعَهُۥ مَتَىٰ نَصْرُ ٱللَّهِ أَلَآ إِنَّ نَصْرَ ٱللَّهِ قَرِيبٌ ﴿البقرة: ٢١٤﴾

    ‘তোমরা কি মনে করে নিয়েছো যে, তোমরা (এমনি এমনিই) জান্নাতে চলে যাবে, (অথচ) পূর্ববর্তী নবীর অনুসারীদের (বিপদের ) মত কিছুই তোমাদের ওপর এখনো নাযিল হয়নি। তাদের ওপর (বহু) বিপর্যয় ও সংকট এসেছে, কঠোর নির্যাতনে তারা নির্যাতিত হয়েছে, (কঠিন) নিপীড়নে তারা শিহরিত হয়ে ওঠেছে, এমন কি স্বয়ং আল্লাহর নবী ও তার সঙ্গী সাথীরা (অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এক পর্যায়ে) এই বলে (আর্তনাদ করে) উঠেছে, আল্লাহ তা’আলার সাহায্য কবে আসবে? তোমরা শুনে নাও, আল্লাহর সাহায্য একান্তই নিকটবর্তী।[4]

    কি দ্ব্যর্থহীন সুস্পষ্ট সম্বোধন! মু’মিন দলের জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে কোনো অস্পষ্টতাই রাখা হয়নি। আল্লাহর কাছে থাকা প্রতিদানের আশায় যারা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের পক্ষে এক চূড়ান্ত লড়াইয়ে নিয়োজিত, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যাদের উদ্দেশ্য, আল্লাহর দ্বীনের সাহায্য করা যাদের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য, তাঁদের উদ্দেশ্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে এর চাইতে উত্তম সম্বোধন আর কি হতে পারে?

    এ এক এমন সম্বোধন, যার মধ্য দিয়ে আরহামুর রাহিমীন আল্লাহ তা’আলা পরীক্ষিত ব্যক্তিদের অন্তরের দুয়ারে করাঘাত করছেন। এই আয়াতের মাধ্যমে যেন তিনি তাঁর পথের পথিকদের কাঁধে হাত রেখে সাহস যোগাচ্ছেন। তাওহীদবাদী বান্দাদেরকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। রাসূলদের অজ্ঞাত অপরিচিত অনুসারীদেরকে আশ্বস্ত করছেন। যখন জাহেলিয়াতের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার দাওয়াতি সূর্য আচ্ছন্ন করে রেখেছে, জাহেলিয়াতের ধ্বজাধারীরা দাওয়াতের প্রথম সারির সংগ্রামী সাধকদেরকে দমিয়ে রেখেছে, তখন তিনি প্রিয় বান্দাদের দিকে রহমতের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

    উপরোক্ত আয়াতটি প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন এক মহা সম্বোধন, যা তাওহীদবাদীদের দেহের ওপর ধৈর্যের মৃদু শীতল পরশ বুলিয়ে দেয় জাহেলিয়াতের হিংস্র পশুগুলোর দন্ত নখর মু’মিন বান্দাদের দেহ ক্ষতবিক্ষত করে তুলছে বিপদ ও কষ্টের উদ্যত থাবা সেগুলোকে রক্তাক্ত করে তুলছে এবং কষ্ট ও যন্ত্রণা তাঁদেরকে কম্পিত করে তুলছে এমন অবস্থায় দয়ার সাগর আল্লাহর উপরোক্ত সম্বোধন প্রিয় বান্দাদের জন্য যেন ব্যথার উপশম‌।

    উপরোক্ত আয়াতটির মাঝে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা রাসূলদের অনুসারীদের জন্য পথের মানচিত্র এঁকে দিয়েছেন, যাতে করে জীবন পথের আঁকাবাঁকা গলি ঘুপচিতে তাঁদের বাহন হারিয়ে না যায় প্রবৃত্তির উপর্যুপরি স্রোতে তাদের চিন্তার তরী যাতে ডুবে না যায় পৃথিবীর সর্বত্র ফিৎনার এই প্রবল প্লাবনে তাঁরা যেন পথ ভুলে না যান। তাঁরা যেন পুরোপুরি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন, বিপদ-আপদ সহ্য না করে জান্নাতে যাওয়া যাবে না তাঁরা যেন বুঝতে পারেন কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার না করে জান্নাতের পথ পাওয়া যাবে না অনিদ্রার সুরমা চোখে না মেখে এবং কাঁটার বিছানায় না শুয়ে বিজয় ও প্রতিষ্ঠা লাভ করা যাবে না।

    আবু মুসআব যারকাবী রহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার হিকমত ও প্রজ্ঞার দাবি হচ্ছে, নিজ বান্দাকে বিপদ-আপদ দেওয়া, তাঁদেরকে পরীক্ষা করা, বাতিল ও বাতিলপন্থীদেরকে অদৃষ্টের লিখন হিসেবে সত্য ও সত্যপন্থীদের ওপর চাপিয়ে দেয়া। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-


    وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِىٍّ عَدُوًّا شَيَٰطِينَ ٱلْإِنسِ وَٱلْجِنِّ يُوحِى بَعْضُهُمْ إِلَىٰ بَعْضٍ زُخْرُفَ ٱلْقَوْلِ غُرُورًا وَلَوْ شَآءَ رَبُّكَ مَا فَعَلُوهُ فَذَرْهُمْ وَمَا يَفْتَرُونَ ﴿الأنعام: ١١٢﴾


    ‘আমি এভাবেই প্রত্যেক নবীর জন্য (যুগে যুগে কিছু কিছু) দুশমন বানিয়ে রেখেছি মানুষের মাঝ থেকে, (কিছু আবার) জ্বিনদের মাঝ থেকে, যারা প্রতারণা করার উদ্দেশে একে অন্যকে চমকপ্রদ কথা বলে, তোমার মালিক চাইলে তারা (অবশ্য এটা) করত না, অতএব তুমি তাদের ছেড়ে দাও, তারা যা পারে মিথ্যা রচনা করে বেড়াক’! [5]

    এটি এমন একটি প্রাকৃতিক নিয়ম, যা কোনোভাবেই পরিবর্তিত হবার নয়। যারা এই দ্বীনের হাতল আঁকড়ে ধরবে, পৃথিবীতে এর শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ হবে, তাঁদেরকে অবশ্যই আল্লাহর এই পরীক্ষার একটা অংশ ভোগ করতে হবে। শত্রুদের শত্রুতার একটা অংশ অবশ্যই তাঁদেরকে নিতে হবে।

    এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে রাসূলুল্লাহ কে উদ্দেশ্য করে বলা ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের এই উক্তিতে, যারাই আপনার মত পয়গাম নিয়ে এসেছেন তারাই শত্রুতার শিকার হয়েছেনঅতএব যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ -এর পথে এবং তাঁর সাহাবা রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলতে চায়, তাঁদের আদর্শের দাওয়াত প্রচার করতে চায়, তাঁকে অবশ্যই বাতিল ও বাতিলপন্থীদের পক্ষ থেকে নিজ অবস্থা এবং আদর্শের প্রতি তাঁর অবিচলতা অনুপাতে কিছুটা হলেও শত্রুতা ও কষ্টের সম্মুখীন হতে হবে। এই শত্রুতার মূল কার্যকারণ হচ্ছে, সত্যপন্থীরা যদিও দুর্বল অবস্থা ও সীমাবদ্ধতার ভেতর বসবাস করেন, তবুও বাতিলপন্থীরা যখন তাঁদেরকে দেখতে পায়, তখন পুনরায় তাদের ভুল নিজেদের সামনে ফুটে ওঠে। এতে করে তাদের উল্লাস বন্ধ হয়ে যায়। প্রবৃত্তির পিছনে তাদের যাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কারণ তারা তখন নিজেদের বিবেকের কাছে লজ্জিত হয়। নিজেদের দুর্বলতা, মেকি ক্ষমতা ও লাঞ্ছনা-গঞ্জনা নিজেরদের চোখেই দেখতে পায়। তারা তো আগে থেকেই নিজেদের খেয়াল খুশি ও প্রবৃত্তির লাঞ্ছিত অপদস্থ দাসে পরিণত হয় বসে আছে



    [1] সূরা বাকারা; ০২: ১৫৩

    [2] সূরা আলে ইমরান; ০৩: ২০০
    [3] সূরা আল-বাকারা; ০২: ১৫৫
    [4] সূরা আল বাকারা; ০২: ২১৪
    [5] সূরা আনআম; ০৬: ১১২





    আরও পড়ুন

    দ্বাত্রিংশ পর্ব

  • #2
    সত্যের পথে চলার ইতিহাস কখনোই কাঁটামুক্ত ছিল না। নবী-রাসূলদের উত্তরাধিকার বহনকারীরা যুগে যুগে বিরোধিতা, অপবাদ ও পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। তাই বাতিলের শত্রুতা দেখে হতাশ না হয়ে, বরং নিজের অবস্থান ও আমলকে আরও দৃঢ় করা উচিত। কারণ সত্যের প্রতি অবিচলতাই শেষ পর্যন্ত সম্মান ও সফলতার পথ খুলে দেয়, ইনশাআল্লাহ।

    Comment

    Working...
    X