শায়খ উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ কী মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর ওয়াদা ভঙ্গ করেছিলেন?
[পাকিস্তানি আলেম মুফতি আব্দুর রহিম সাহেবের উত্থাপিত মনগড়া দাবির দালিলিক জবাব]
পর্ব-৭
মুনশি আব্দুর রহমান
[পাকিস্তানি আলেম মুফতি আব্দুর রহিম সাহেবের উত্থাপিত মনগড়া দাবির দালিলিক জবাব]
পর্ব-৭
মুনশি আব্দুর রহমান

পয়েন্ট-৬: মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর ঈমানি দৃঢ়তার অবমূল্যায়ন
মুফতি আব্দুর রহিম এই সাক্ষাৎকারে ‘মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর ঈমানি দৃঢ়তার চরম অবমূল্যায়ন করেছেন। ঐতিহাসিক নথিপত্রের আলোকে এর বিস্তারিত জবাব নিচে তুলে ধরা হলো:
মুফতি আব্দুর রহিমের হুবহু দাবি (ভিডিও-সাক্ষাৎকার অনুসারে):
ভিডিও-সাক্ষাৎকারে মুফতি আব্দুর রহিম তৎকালীন ইসলামি ইমারাতের আমির মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহকে একজন অত্যন্ত দুর্বল, হতাশ ও আপসকামী শাসক হিসেবে তুলে ধরার অপচেষ্টা করেছেন। তাঁর বয়ান অনুযায়ী, মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ কেবল নিজের রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার স্বার্থে আমেরিকার ভয়ে তটস্থ ছিলেন। আব্দুর রহিমের দাবি, মুজাহিদদের থামাতে ব্যর্থ হয়ে মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ নাকি তাঁর (আব্দুর রহিমের) কাছে সাহায্য ভিক্ষা চেয়েছিলেন। তাঁর হুবহু কথাটি ছিল এমন:
“শেষ পর্যন্ত মোল্লা উমর সাহেব রহিমাহুল্লাহ আমাদের হযরতের কাছে বার্তা পাঠালেন—মুফতি সাহেবকে (আব্দুর রহিমকে) আমার কাছে পাঠান, আমি খুব জরুরি কথা বলতে চাই। আমি যখন সেখানে গেলাম, তখন তিনি (মোল্লা উমর) বললেন, ‘আমি এখন একেবারে নিরাশ ও হতাশ হয়ে পড়েছি। একমাত্র আপনিই এই সংকটের কোনো সমাধান বের করতে পারেন। এখন আপনিই বলুন আমি কী করব, তারা (মুজাহিদরা) তো কিছুতেই থামছে না’।”
ঐতিহাসিক নিরিখে এই মিথ্যাচারের বিস্তারিত জবাব:
মুফতি আব্দুর রহিম নিজের এই মনগড়া গল্পকে বাস্তব রূপ দিতে গিয়ে মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর মতো একজন ঈমানদার ও দৃঢ়চেতা নেতার তাওয়াক্কুল ও অসীম সাহসিকতাকে চরমভাবে অবমূল্যায়ন করেছেন। নির্ভরযোগ্য নথিপত্র থেকে মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর যে আপসহীন ও পাহাড়সম দৃঢ়তার প্রমাণ পাওয়া যায়, তা আব্দুর রহিমের এই দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত:
১. ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুজাহিদদের কার্যক্রমে মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ কখনোই ‘হতাশ’ বা ‘নিরাশ’ হয়ে পড়েননি। আমেরিকার ভয়ে আপস করার কোনো পথও তিনি খোঁজেননি। নাইন-ইলেভেনের পর আমেরিকা যখন শায়খ উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহকে হস্তান্তরের দাবি জানায় এবং তা না মানলে আফগানিস্তানে হামলার সুস্পষ্ট হুমকি দেয়, তখনও তিনি আব্দুর রহিমের কল্পিত বয়ানের মতো বিন্দুমাত্র ভীত হননি। বরং তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন, “আমেরিকার দাবি মেনে নিয়ে কোনো মুসলিমকে কাফেরদের হাতে তুলে দেওয়া আমাদের ধর্মে সম্পূর্ণ অবৈধ। সুতরাং আপনাদের এই দাবি মেনে নেওয়া আমাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।”
২. মুফতি আব্দুর রহিম মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহকে এমনভাবে চিত্রিত করেছেন, যেন তিনি জাগতিক পরাশক্তির ভয়ে ভীত ছিলেন। অথচ ইতিহাস থেকে জানা যায়, আমেরিকার আক্রমণের হুমকির জবাবে মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ আফগান জাতির উদ্দেশে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, তা ছিল তাঁর সুদৃঢ় ঈমানি শক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন: “আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আর আমেরিকা আমাদেরকে পরাজয়ের প্রতিশ্রুতি (হুমকি) দিয়েছে। সুতরাং আমরা দেখব, এই দুই প্রতিশ্রুতির মধ্যে চূড়ান্ত পরিণতিতে কোনটি সত্য হয়।”
৩. মুফতি আব্দুর রহিম বোঝাতে চেয়েছেন, যেকোনো মূল্যে মুজাহিদদের আটকে রেখে মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ কেবল নিজের রাষ্ট্র ও ক্ষমতা বাঁচাতে মরিয়া ছিলেন। কিন্তু তৎকালীন তালেবান সরকারের মুখপাত্র মোল্লা আব্দুল হাই মুতমাইনের স্মৃতিকথাসহ অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করে যে, মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন—আমেরিকার মূল লক্ষ্য কেবল শায়খ বিন লাদেন নন, বরং পুরো আফগানিস্তানের ইসলামি ইমারাতকে সমূলে ধ্বংস করা। এ কারণে তিনি নিজের জীবন বা সরকার টিকে থাকার বিন্দুমাত্র পরোয়া করেননি। শরীয়তের বিধান লঙ্ঘন করে একজন মুসলিমকে কাফেরদের হাতে তুলে দেওয়ার চেয়ে তিনি বরং নিজের রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যাওয়া এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হওয়াকেই হাসিমুখে বেছে নিয়েছিলেন।
৪. স্বয়ং শায়খ উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর এই পাহাড়সম দৃঢ়তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছিলেন, “সমগ্র বিশ্বের ক্রুসেডারদের রক্তচক্ষু ও হুমকির মুখেও মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ সত্যের ওপর অটল ও অবিচল থেকেছেন। যখন পুরো দুনিয়া আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছিল, তখনও তিনি মুজাহিদদের প্রতি সমর্থন ও আশ্রয় প্রদান থেকে একচুলও সরে আসেননি।”
সারকথা হল- মুজাহিদদের ‘অবাধ্য’ ও ‘রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার হীন কূটকৌশল থেকেই মুফতি আব্দুর রহিম মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহকে একজন অসহায় ও হতাশ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি চরম মিথ্যাচার করে দাবি করেছেন, মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ নিরাশ হয়ে তাঁর কাছে সাহায্যের হাত পেতেছিলেন। অথচ ঐতিহাসিক নথিপত্র সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহ ছিলেন তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সাহসী ও আপসহীন এক অবিসংবাদিত নেতা। সমগ্র পৃথিবীর রক্তচক্ষু এবং নিজের রাষ্ট্র হারানোর প্রবল ঝুঁকি উপেক্ষা করেও তিনি ইসলামি ভ্রাতৃত্ব ও জিহাদের প্রশ্নে পাহাড়ের মতো অবিচল ছিলেন। মুফতি আব্দুর রহিমের এই অবমাননাকর বক্তব্য মোল্লা উমর রহিমাহুল্লাহর সুদৃঢ় ঈমানি শক্তির চরম অবমূল্যায়ন এবং একটি নির্জলা মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়।
*****
চলবে ইনশা আল্লাহ...
Comment