আল হিকমাহ মিডিয়া পরিবেশিত
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- চত্বারিংশ পর্ব
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- চত্বারিংশ পর্ব
সাহায্য ও বিজয়
এটি এমন একটি বাস্তবতা যা সন্দেহাতীত। কোনো প্রকার সংশয় একে ঘিরে তৈরি হতে পারে না। কোনো প্রকার অস্পষ্টতা এ বিষয়ে থাকতে পারে না। আল্লাহকে যথাযথভাবে চিনতে পেরেছে; এমন কোনো তাওহীদবাদী ব্যক্তির মনে এবিষয়ে কিঞ্চিৎ সন্দেহ থাকতে পারে না যে, এই সাহায্য ও বিজয় অবশ্যই রূপ লাভ করবে। সাহায্য ও বিজয়ের এই বাস্তব রূপায়ণ প্রত্যেক এমন ব্যক্তির জন্য, যিনি দাওয়াতের পথে রয়েছেন, যিনি রবের মানহাজের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব ও আমানত পূরণের সংগ্রামে রয়েছেন।
সময় যতই পার হোক বিজয় অবশ্যই আসবে। জাহেলিয়াত যতই শক্তিশালী হোক, জাহেলি শক্তি যতই ষড়যন্ত্র করুক, দম্ভভরে চক্রান্তের যতই জাল বিস্তার করুক, যতভাবেই তারা চেষ্টা করুক, জঘন্য ও নিকৃষ্ট যত উপায়ই তারা অবলম্বন করুক, প্রচার প্রোপাগান্ডা ও বৈষয়িক শক্তি নিয়ে যতভাবেই তারা উপস্থিত হোক না কেন, মু’মিনদের পক্ষে বিজয় আসবেই। পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় এমনটাই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। পুরো ব্যবস্থাকে তিনি এভাবেই সাজিয়েছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সান্তনা ও সুসংবাদ দান করেছেন। জাহেলিয়াতের অন্ধকারে যখন মক্কার পাহাড়-পর্বত ছেয়ে গেছে, মক্কায় রাসূলুল্লাহর দাওয়াত যখন বাহ্যিক বিচারে কাঙ্খিত ফলাফলশূন্য হলো,কুরাইশের বড় বড় অপরাধীরা যখন সীমালংঘন করল, জাহেলিয়াতের ধ্বজাধারীরা যখন ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করল, তখন আল্লাহ তা’আলা তাঁর হাবীবে মোস্তফা ﷺ-কে সান্তনা ও সুসংবাদ জানিয়ে ইরশাদ করেন-
حَتَّىٰ إِذَا اسْتَيْأَسَ الرُّسُلُ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ قَدْ كُذِبُوا جَاءَهُمْ نَصْرُنَا فَنُجِّيَ مَن نَّشَاءُ وَلَا يُرَدُّ بَأْسُنَا عَنِ الْقَوْمِ الْمُجْرِمِينَ ﴿يوسف: ١١٠﴾
‘এমনকি নবীরা (কখনো কখনো) নিরাশ হয়ে যেত, তারা মনে করত, তাদের (বুঝি সাহায্যের প্রতিশ্রুতিতে) মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করা হবে, তখন তাদের কাছে আমার সাহায্য এসে হাযির হলো, (তখন) আমি যাকে চাইলাম তাঁকেই শুধু (আযাব থেকে) নাযাত দিলাম; আর না-ফরমান জাতির ওপর থেকে আমার আযাব কখনোই রোধ হবে না’। [1]
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, “(এখানে যাদের কথা বলা হয়েছে) তাঁরা হলেন নবীদের অনুসারীগণ। নবীদের প্রতি তাঁরা ঈমান এনেছিলেন এবং তাঁদেরকে সত্যায়ন করেছিলেন। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তাঁরা বিপদের সম্মুখীন থাকেন, সাহায্য বিলম্বিত থাকে। শেষ পর্যন্ত রাসূলগণ যখন তাঁদের সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, তাদের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেলেন এবং তাদের এই ধারণা জন্মে গেল যে, তাঁদের সম্প্রদায় তাঁদেরকে অস্বীকার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে, তখন রাসূলদের কাছে আল্লাহর সাহায্য আসে”।
উপরোক্ত আয়াতে কারীমা অবতীর্ণ হওয়ার পর খুব বেশি সময় অতিবাহিত হয়নি; এর ভেতরেই আনসারদের কাফেলা মক্কায় প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে। মূলত: সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁদেরকে প্রেরণ করেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে সাহায্য-সহযোগিতার বাইয়াতে আবদ্ধ হন। আর এটাই ছিল প্রথম বাইয়াতে আকাবা । আর এরপর অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবা। এরপর মক্কা মুকাররমা থেকে পবিত্র শহর মদীনা-মুনাওয়ারায় প্রথম মুহাজির কাফেলা হিজরত করে। হিজরতের সোনালী এই সূত্রে সর্বশেষ যুক্ত হয়ে একে পূর্ণাঙ্গতা দান করেন মুহাম্মাদ ﷺ। আরহামুর রাহিমীন মহান প্রভুর অনুমতি পেয়ে তিনি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ভূখণ্ড ছেড়ে ইসলামী জগতের প্রাণকেন্দ্র, পূণ্যময় পবিত্র ভূমি মদীনায় হিজরত করেন। এতে করে বরকত ঘেরা এই ভূমিতে মানবতার মুক্তির দূত মুহাম্মাদ ﷺ-এর নেতৃত্বে প্রথম ইসলামী সমাজের অভ্যুদয় ঘটে। কুরআনের অনুশাসনে পরিচালিত এই সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা লাভের পর কুরাইশের জাহেলী সামরিক শিবিরের সাথে তাওহীদবাদী শিবিরের প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
নিশ্চয়ই! মদীনার পবিত্র ভূমিতে কুরআনের অনুশাসনে পরিচালিত যে সমাজ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হাত ধরে গঠিত হয়েছিল তা এমনি এমনি অস্তিত্বে আসেনি। বরং তা ছিল এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। তা ছিল বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার ফসল।
প্রথম যুগের ধৈর্যশীল সাহাবীদের অবস্থা, তাঁদের বেদনাদায়ক উপাখ্যানের মধ্য দিয়ে ইসলামী বিপ্লবের ধারা এবং জাহেলিয়াতের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিটি মু’মিন দলের অগ্রযাত্রার সঠিক কর্মপন্থা আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। মানবসমাজের ভ্রান্ত চিন্তাধারা জাহেলিয়াতের যে সমস্ত মূল্যবোধ দ্বারা প্রভাবিত, সেগুলোর বিলোপ সাধনকারী দলের পথচলার রূপরেখা আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। মু’মিনরা একথা বুঝতে পারেন, সাহায্য ও বিজয়ের জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষা, বিপদ ও কষ্ট স্বীকার করা, সাথীদের রক্তমাখা লাশের স্তূপের ওপর দিয়ে জিহাদের খুন রাঙ্গা পথ পাড়ি দেয়া একান্ত অপরিহার্য।
সাইয়্যেদ কুতুব রহিমাহুল্লাহ তাঁর রচিত যিলালিল কুরআন' গ্রন্থে বলেন, “দাওয়াতের পথে এটি আল্লাহর সুন্নাহ যে, এখানে বিপদ ও কষ্ট সহ্য করতে হবে। এ পথে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হবে। চরম বিপদাপদের সম্মুখীন হতে হবে। অতঃপর সাহায্যের যত বাহ্যিক উপায়-উপকরণকে ঘিরে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা দোলা খেতে থাকে, যাবতীয় উপায় ও মাধ্যম থেকে নিরাশ হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য আসে। তখন যাদের মুক্তি লাভের যোগ্যতা রয়েছে, তাঁরা মুক্তি লাভ করেন। তাঁরা অবিশ্বাসীদের ওপর আপতিত হতে চলা ধ্বংসযজ্ঞ থেকে পরিত্রাণ লাভ করেন। পরাক্রমের অধিকারী গোষ্ঠী যেই ধ্বংসযজ্ঞ ও বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চালায় তা থেকে যোগ্য ব্যক্তিরা বেঁচে যান। আর অপরাধীদের ওপর আল্লাহর আযাব নেমে আসে। আল্লাহর ভয়ঙ্কর শাস্তি তাদেরকে ছিন্নভিন্ন, চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। তারা দাঁড়াবার সুযোগটাও পায় না। অপর কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারী তাদেরকে এই আযাব থেকে বাঁচাতে পারে না।
এসবের তাৎপর্য হলো, বিজয় যেন মূল্যহীন এমন কোনো বিষয়ে পরিণত না হয়, যার দরুন বিপ্লবী দাওয়াত একটি তামাশা হয়ে দাঁড়াবে। সাহায্য যদি এতটাই সস্তা হতো, তাহলে প্রতিদিন নতুন নতুন লোক, নতুন নতুন মতবাদ নিয়ে দাঁড়িয়ে যেত। এর জন্য কোনো কষ্ট স্বীকার করতে হতো না। অথবা হলেও খুবই কম ত্যাগ স্বীকার করতে হতো। আর দ্বীনে হকের দাওয়াত ঠাট্টা মশকরা ও তামাশার বিষয় হওয়াটা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। কারণ, এই দাওয়াত তো মানব গোষ্ঠীর জীবনযাত্রা প্রণালী ও মানহাজ। তাই অনধিকার চর্চাকারীদের কুকর্ম থেকে একে রক্ষা করা অপরিহার্য”।
[1] সূরা ইউসুফ; ১২: ১১০
আরও পড়ুন