
ভূমিকা
সাম্প্রতিক একজন এনালিস্টের একটি ভিডিওতে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আরএসএস এবং হিন্দুত্ববাদীদের ‘অখণ্ড ভারত’ বা বাংলাদেশ দখলের ষড়যন্ত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ওই এনালিস্ট অত্যন্ত যথার্থভাবেই আরএসএস-এর আধিপত্যবাদী দর্শনের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তবে, তিনি এই হিন্দুত্ববাদী দর্শনের সাথে আল-কায়েদার 'সীমানাবিহীন বিশ্ব খেলাফত'-এর ধারণাকে তুলনা করেছেন। শুধু তা-ই নয়, একে তিনি 'চরমপন্থী আইডেন্টিটি পলিটিক্স' বা 'মুসলিম জঙ্গিবাদ' বলেও আখ্যায়িত করেছেন। ইসলামী শরিয়ত ও রাজনৈতিক দর্শনের আলোকে বিচার করলে তাঁর এই বিশ্লেষণ মৌলিকভাবেই বিভ্রান্তিকর। এই নিবন্ধে আমরা ইসলামী খেলাফত, জিহাদ এবং প্রচলিত রাজনীতির প্রকৃত স্বরূপ বিশ্লেষণ করে ওই দাবিগুলোর একটি তাত্ত্বিক জবাব তুলে ধরব। প্রথমেই তার বক্তব্যের চুম্বুকাংশ তুলে ধরছি-
"...মুসলিম জঙ্গীরাও করে মুসলিমদের মধ্যে আইএস আলকাদা দায়েশ তাদের পলিটিক্যাল ফিলোসফি কি ওটা কোন পলিটিক্স না এক্সট্রিমিজম কোন পলিটিক্স না তারপরও তাদের একটা দর্শন আছে যে ওয়ার্ল্ড খেলাফত সারা পৃথিবী বা মুসলিম উম্মাহ তাদের বর্ডারলেস ওয়ার্ল্ড খেলাফত তারা স্বপ্ন দেখে মুসলমানদের রাষ্ট্র হবে একটা অথবা সারা পৃথিবী আমরা দখল করব মুসলমান রাষ্ট্র এই যে আইডেন্টিটি পলিটিক্স এটা এক্সট্রিমিস্টদের মধ্যে আছে" [১]
১. ‘সীমানাবিহীন বিশ্ব খেলাফত’ কি চরমপন্থী আইডেন্টিটি পলিটিক্স?
ওই এনালিস্ট সীমারেখাহীন বিশ্ব খেলাফত কিংবা একক মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্নকে চরমপন্থী চিন্তাধারা বা 'আইডেন্টিটি পলিটিক্স' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু ইসলামী দর্শনে ভৌগোলিক বা নির্দিষ্ট সীমানাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের কোনো স্থান নেই; এখানে ঐক্যের একমাত্র ভিত্তি হলো 'ঈমান'। মূলত ঈমান ও কুফরের সীমারেখাই মুসলমানদের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে। আল্লাহর জমিনে তাঁর প্রদত্ত জীবনব্যবস্থাকে (শরিয়ত) বিজয়ী করার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়া প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। ভৌগোলিক সীমারেখার দোহাই দিয়ে শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ বিধানকে পাশ কাটিয়ে মানবরচিত নিয়মে জীবনযাপন করাকে ইসলামে তাগুতি বা কুফরি ব্যবস্থা হিসেবেই আখ্যায়িত করা হয়। সুতরাং, বিশ্বব্যাপী খেলাফত প্রতিষ্ঠার ধারণা কোনোভাবেই 'চরমপন্থী আইডেন্টিটি পলিটিক্স' হতে পারে না; বরং এটি দ্বীন ইসলামের এক অবিচ্ছেদ্য ও মূল রাজনৈতিক দর্শন।
ইতিহাস ও বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, ভৌগোলিক সীমানা বা বর্ডার সর্বদা পরিবর্তনশীল। আজ আমরা মানচিত্রে যে স্থায়ী সীমানা দেখছি, তা মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী উপনিবেশিক শক্তিগুলোর (যেমন: সাইকস-পিকট চুক্তির মাধ্যমে) নিজেদের স্বার্থে চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম বিভাজন মাত্র। মানব ইতিহাসে সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্রের সীমানা প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হয়েছে। তাই একটি পরিবর্তনশীল ও মানবসৃষ্ট কৃত্রিম সীমারেখাকে চিরস্থায়ী ধ্রুবক ধরে নিয়ে 'বিশ্ব খেলাফত'-এর শাশ্বত ধারণাকে অবাস্তব বা 'চরমপন্থা' হিসেবে বিচার করা নিতান্তই ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতার পরিচায়ক।
২. ইসলামী খেলাফতের সাথে আরএসএস বা হিন্দুত্ববাদের তুলনা কী যৌক্তিক?
সমগ্র পৃথিবীতে খেলাফত প্রতিষ্ঠার চিন্তাধারার সাথে আরএসএস বা হিন্দুত্ববাদীদের ভারতবর্ষ দখলের দর্শনের একটি তুলনা টানা হয়েছে। এই তুলনাটি একেবারেই ভিত্তিহীন ও ভ্রান্ত। কারণ, হিন্দুত্ববাদ বা আরএসএস-এর মতো যারা কুফরি ও তাগুতি ব্যবস্থার জন্য লড়াই করে, তারা মূলত শয়তানের পক্ষাবলম্বন করে মানুষের ওপর মানুষের দাসত্ব চাপিয়ে দিতে চায়। অন্যদিকে, যারা খেলাফতের জন্য লড়াই করেন, তাঁদের সংগ্রাম আল্লাহর রাস্তায় তাঁরই আইন (শরিয়ত) প্রতিষ্ঠার জন্য নিবেদিত। এই পবিত্র সংগ্রামের মূল উদ্দেশ্য হলো মানবতাকে মানবরচিত আইনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর দাসত্বে সমর্পণ করা। সত্য (হক) এবং মিথ্যার (তাগুত) এই দুই বিপরীতমুখী সংগ্রামকে এক পাল্লায় মাপা চরম বিভ্রান্তির পরিচায়ক।
৩. মুজাহিদদের 'মুসলিম জঙ্গি' বা 'সন্ত্রাসী' আখ্যা দেওয়ার ভ্রান্তি
উক্ত এনালিস্ট আল-কায়েদার মুজাহিদদেরকে 'মুসলিম জঙ্গি' আখ্যা দিয়ে তাঁদের কার্যক্রমকে সন্ত্রাসবাদ হিসেবে চিত্রিত করেছেন। অথচ ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে, যারা আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠায় এবং মুসলিম ভূমিকে কাফেরদের আগ্রাসন থেকে মুক্ত করতে লড়াই করছেন, তাঁরা কোনোভাবেই সন্ত্রাসী নন; বরং তাঁরা 'ফরজে আইন' বা অপরিহার্য ধর্মীয় দায়িত্বই পালন করছেন। পশ্চিমা বিশ্ব এবং তাগুতি জীবনব্যবস্থার পূজারীরাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মুসলমানদের এই পবিত্র সংগ্রামকে 'সন্ত্রাসবাদ' বা 'বিদ্রোহ' বলে আখ্যায়িত করে থাকে। বস্তুত, যারা আল্লাহর বিধানকে পাশ কাটিয়ে মানবরচিত আইনে জীবন পরিচালনা করে এবং ক্ষমতার দাপটে আল্লাহর হারামকে হালাল বলে সাব্যস্ত করে, তারাই দ্বীন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত।
৪. আল-কায়েদা এবং আইএস (ISIS)-কে একই পাল্লায় মাপা
উক্ত এনালিস্ট আইএস, আল-কায়েদা—সবাইকে একই মানদণ্ডে পরিমাপ করেছেন। অথচ তাত্ত্বিকভাবে এদের মধ্যে বিস্তর ফারাক বিদ্যমান। তথাকথিত 'ইসলামিক স্টেট' বা আইএস খিলাফতের নামে যেসব অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, আল-কায়েদা তার কঠোর বিরোধিতা করে। আল-কায়েদার লক্ষ্য হলো এমন এক খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা, যা উম্মাহর স্বাধীন ইচ্ছা, সম্মতি ও 'শূরা'র (পরামর্শভিত্তিক) ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। তারা খুলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শের হুবহু অনুসরণ করতে চায়। গায়ের জোরে ক্ষমতা দখলকারী এবং নিরীহ মানুষের হত্যাকারী কোনো স্বঘোষিত শাসক তাদের কাম্য নয়। সুতরাং, ঢালাওভাবে সব সশস্ত্র দলকে একই চরমপন্থার তকমা দেওয়া একেবারেই বাস্তবতাবিবর্জিত।
৫. প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থাই কি 'স্বাভাবিক রাজনীতি'?
বর্তমান প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে 'স্বাভাবিক রাজনীতি' হিসেবে ধরে নিয়ে উক্ত এনালিস্ট খেলাফতের সংগ্রামকে চরমপন্থা আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু ইসলামী শরিয়তের আলোকে বর্তমানের এই গণতন্ত্র বা ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি নিজেই একটি শিরকি ও কুফরি ব্যবস্থা। কারণ, এই ব্যবস্থায় আইন প্রণয়নের নিরঙ্কুশ অধিকার আল্লাহর পরিবর্তে সাধারণ মানুষ বা পার্লামেন্টের হাতে ন্যস্ত করা হয়। অনৈসলামিক পন্থায় কিংবা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করে ধাপে ধাপে ইসলামের বিজয় কখনোই সম্ভব নয়, এই কথা তো এখন প্রমাণিত সত্য, এমনকি ইসলামিক দল গুলোর বেশিরভাগ এখন বলেনা যে তারা ক্ষমতায় গিয়ে ইসলাম কায়েম করবে। আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের জন্য প্রচলিত কুফরি ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করার বদলে সশস্ত্র জিহাদের মাধ্যমে শরিয়ত বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার পথই হলো নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দেশিত প্রকৃত পথ। এই পথকে চরমপন্থা বলা মূলত দ্বীনের ব্যাপারে চরম অজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ।
এখানে এটিও বলতে হয় যে, আধুনিক ‘জাতীরাষ্ট্র’ (Nation-State) বা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ধারণাটি মূলত একটি অসার এবং বিভেদকামী পশ্চিমা দর্শন। এটি মূলত মুসলিম উম্মাহকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দুর্বল করে রাখার একটি কৌশল। ইসলামী রাজনৈতিক দর্শনে এই কৃত্রিম জাতীয়তাবাদের কোনো স্থান নেই; এখানে ঐক্যের একমাত্র ভিত্তি হলো 'ঈমান'। শরিয়তের দৃষ্টিতে ভৌগোলিক পরিচয়ের চেয়ে ঈমান ও কুফরের সীমারেখাই মুসলমানদের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে। তাই বিশ্ব খেলাফতের ধারণা কোনো কাল্পনিক বা চরমপন্থী 'আইডেন্টিটি পলিটিক্স' নয়, বরং এটি আধুনিক জাতীরাষ্ট্রের অসারতার চূড়ান্ত জবাব এবং মুসলিম উম্মাহর বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্ববোধের মূল ভিত্তি।
কিছু জিজ্ঞাসা
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে উক্ত এনালিস্টের দাবি এবং বর্তমান বাস্তবতার আলোকে প্রতিটি সচেতন মুসলমানের জন্য নিচের প্রশ্নগুলো গভীর ভাবনার দাবি রাখে:
১. যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আইন প্রণয়নের নিরঙ্কুশ অধিকার মহান আল্লাহর বদলে সাধারণ মানুষের (বা পার্লামেন্টের) হাতে তুলে দেয়, একজন মুসলিমের জন্য তাকে কি 'স্বাভাবিক রাজনীতি' বলে মেনে নেওয়ার কোনো যৌক্তিক বা শরয়ী সুযোগ আছে?
২. যারা মানবরচিত আইনের দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্ত করে কেবল আল্লাহর আইনের অধীনে আনতে চায়, তাদেরকে কি মানবতাকে শৃঙ্খলিত করতে চাওয়া আধিপত্যবাদী হিন্দুত্ববাদীদের সাথে একই পাল্লায় মাপা যায়?
৩. ইসলামে যেখানে ভৌগোলিক সীমানার ঊর্ধ্বে উঠে শুধুমাত্র 'ঈমান'-এর ভিত্তিতে ঐক্যের কথা বলা হয়েছে, সেখানে ইসলামী খেলাফতের এই বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্ববোধকে পশ্চিমা 'আইডেন্টিটি পলিটিক্স'-এর সংকীর্ণ সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা কি তাত্ত্বিক দৈন্যতা নয়?
৪. পশ্চিমা মিডিয়ার চশমা দিয়ে দেখে আল-কায়েদা এবং আইএস (দায়েশ)-এর মতো সম্পূর্ণ ভিন্ন মানহাজ ও কাঠামোগত দর্শনের দুটি গোষ্ঠীকে একই 'চরমপন্থার' মোড়কে উপস্থাপন করা কি আদৌ কোনো বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের আওতায় পড়ে?
৫. পাশ্চাত্যের শেখানো বুলিতে প্রভাবিত হয়ে আমরা কি আমাদের নিজেদের মুজাহিদদেরকেই 'সন্ত্রাসী' বা 'জঙ্গি' বলতে শুরু করেছি, যারা মূলত তাগুতের বিরুদ্ধে আমাদের দ্বীন এবং ভূমিরক্ষার জন্যই লড়াই করছেন?
৬. বর্তমানে হিন্দুত্ববাদ যখন একটি ভূখণ্ডে মুসলিমদের অস্তিত্ব মুছে ফেলতে আগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে, তখন তার মোকাবেলায় মুসলিমদের এই আদর্শিক ও প্রতিরোধমূলক সংগ্রামকে 'জঙ্গিবাদ' আখ্যা দেওয়া কি প্রকারান্তরে হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসনকেই পরোক্ষ বৈধতা দেওয়া নয়?
পরিশেষে বলতে চাই-
দীনেশ ত্রিবেদী বা আরএসএস-এর হিন্দুত্ববাদী দর্শনের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক থাকা যেমন অপরিহার্য, তেমনি এই সতর্কতার আড়ালে ইসলামী রাজনৈতিক দর্শন ও খেলাফতের মহান ধারণাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করাও এক চরম বিভ্রান্তি। খেলাফত প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কোনো চরমপন্থী জঙ্গিবাদ নয়; বরং এটি মুসলিম উম্মাহর হারানো সম্মান ফিরিয়ে আনার এবং আল্লাহর জমিনে তাঁরই আইন বাস্তবায়নের একমাত্র পথ। আজ সময় এসেছে পশ্চিমা ও তাগুতি প্রচারণার মায়াজাল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসার। মুসলিম উম্মাহকে এখন হক ও বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে হবে। আল্লাহর আইন এবং মানবরচিত আইনের মধ্যকার এই আপসহীন লড়াইয়ে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
*****
সংশ্লিষ্ট লিংক:
[১] উক্ত এনালিস্টের ভিডিও-http://https://youtu.be/fE_q_jbmgb8?si=Fruil4WGuOD_Q2UR
Comment