বিশ্বব্যাপী চরম বঞ্চনা ও নগ্ন বিশ্বাসঘাতকতার আরও একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল এই সপ্তাহে। কারণ, বায়তুল মাকদিসের (জেরুজালেম) পুণ্যভূমিতে চলমান বরকতময় জিহাদ আজ পদার্পণ করেছে তার হাজারতম দিনে। গাজার মর্যাদাপূর্ণ মাটিতে সগৌরবে প্রবাহিত পবিত্র রক্তের উপাখ্যান এবং অবিস্মরণীয় সব বীরত্বগাথাই হলো এই সহস্র দিনের মূল নির্যাস। প্রবাহিত এই রক্তস্রোত আজ গোটা বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—যেকোনো আধুনিক সমরাস্ত্রের চেয়ে সুদৃঢ় ঈমান ও আকিদার শক্তি ঢের বেশি। একইসাথে তা এ কথাও সপ্রমাণ করেছে যে, সম্মান ও মর্যাদার রণাঙ্গনে ঈমান আর জিহাদ—কেবল এই দুটি উপাদানের যুগলবন্দিতেই রচিত হয় চূড়ান্ত ফয়সালার ইতিহাস।
অতিক্রান্ত এই সহস্র দিন ক্যালেন্ডারের পাতায় খসে পড়া নিছক কোনো সংখ্যা নয়; বরং তা অবিচল দৃঢ়তায় খোদাই করা এক জীবন্ত ইতিহাস। এর মধ্য দিয়ে সূচনা হয়েছে এমন এক নতুন যুগের, যেখানে উন্মোচিত হয়েছে সমস্ত গুপ্ত সত্য এবং খসে পড়েছে কপটতার যাবতীয় মুখোশ। ফলে প্রতিটি পক্ষের প্রকৃত অবস্থান আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এই দিনগুলোর প্রতিটি ক্ষণে গাজা পুরো বিশ্বের সাথে কথা বলেছে কেবল রক্ত আর ধৈর্যের ভাষায়। সে উচ্চকণ্ঠে এ ঘোষণাই দিয়েছে—নিজেদের অধিকারের প্রশ্নে যে জাতি আপসহীন, বিপদ যত ভয়ংকরই হোক না কেন, তাদের কখনো পরাজয় ঘটে না। আগ্রাসী শক্তির দম্ভ যতই গগনচুম্বী হোক, সেই ইস্পাতকঠিন জাতিকে কোনোভাবেই ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়।
কঠোর অবরোধ, নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ আর যুদ্ধের ভয়াবহ দামামাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গাজা আজ সংঘাতের সমস্ত সমীকরণকে নতুন করে সাজিয়েছে। সে নিজেকে পরিণত করেছে এমন এক অজেয় শক্তিতে, যাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ন্যূনতম কোনো সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই। শত্রুদের বাসনা ছিল যুদ্ধটি হবে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও দ্রুতগতির। অথচ তা পরিণত হয়েছে ইচ্ছাশক্তির এক দীর্ঘস্থায়ী এবং কঠিন পরীক্ষায়। আর এই পরীক্ষার ফলাফল অকাট্যভাবে প্রমাণ করেছে, সামরিক সক্ষমতা যত বিশালই হোক না কেন, ঈমানের ভিত্তির ওপর প্রতিরোধ গড়ে তোলা কোনো জাতিকে তা কখনো পরাস্ত করতে পারে না। যে জাতি তাদের অবিচলতার শক্তি খোঁজে সুদৃঢ় বিশ্বাসের গভীরে, পৃথিবীর কোনো মহাবিপদই তাদের টলাতে সক্ষম নয়।
গাজার সীমান্ত পাহারায় রত বীর মুজাহিদরা আজ প্রতিরোধ ও সাহসিকতার যে অবিস্মরণীয় ইতিহাস রচনা করছেন এবং শত্রুর সারিতে যে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটাচ্ছেন, তা-ই মূলত এই জীবন্ত উম্মাহর স্পন্দিত হৃদয়ের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। একদিকে পর্দার অন্তরালে যখন চলছে নানা চুক্তি ও সমঝোতার ঘৃণ্য পাঁয়তারা; দোহার কূটনৈতিক সেলুনগুলোতে তড়িঘড়ি করে ছুটছে একের পর এক প্রতিনিধিদল, বসছে সম্মেলন, ঠিক তখনই এর মোক্ষম জবাব ধেয়ে আসছে বন্দুকের নল থেকে। মর্যাদা আর অবিচলতার পরিখা থেকে গর্জে ওঠা এই জবাব বারবার এ কথাই প্রমাণ করছে যে, আলোচনার টেবিলে বসে ভিক্ষা করে কখনো অধিকার আদায় করা যায় না। বরং রণাঙ্গনের বুকে সীমাহীন ধৈর্য, দৃঢ়তা আর অদম্য প্রতিরোধের মাধ্যমেই তা ছিনিয়ে আনতে হয়।
রাজনীতির ময়দানগুলো আজ নানা উদ্যোগ আর প্রতিশ্রুতির ভিড়ে ঠাসা থাকলেও, এই সংঘাতের প্রকৃত চিত্রটি তুলে ধরার সবচেয়ে সত্যনিষ্ঠ সাক্ষী কেবল ওই রণাঙ্গন। কতশত পরিকল্পনার ঢাকঢোল পেটানো হয়েছে, দেওয়া হয়েছে কত চুক্তির ঘোষণা! কিন্তু রূঢ় বাস্তবতার কঠিন প্রাচীরে আছড়ে পড়ে তার সবই আজ ধূলিসাৎ। বর্তমান পরিস্থিতির রূপরেখা নির্ধারণে সবচেয়ে দৃশ্যমান শক্তি হিসেবে টিকে আছে কেবল মুজাহিদদের ইস্পাতকঠিন ইচ্ছাশক্তি। এই শক্তিই অত্যন্ত জোর দিয়ে জানান দিচ্ছে—যে জাতি হাসিমুখে আত্মত্যাগ করতে জানে, তাদের কখনো অবজ্ঞা করা চলে না। রুদ্ধদ্বার কক্ষের ওপারে বসে তাদের ওপর কোনো ভবিষ্যৎও চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
ইতিহাস তার পাতায় স্বাধীনচেতা বীরদের বীরত্বগাথা যেমন সযত্নে লিপিবদ্ধ করেছে, তেমনি যারা পেছন থেকে ছুরি মেরেছে, তাদের কলঙ্কের কথাও লিখে রেখেছে। আর এই কঠিন পরীক্ষা গোটা উম্মাহর জন্য এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে থাকবে। কেননা, উম্মাহর সন্তানদের অবস্থান আজ নানা ভাগে বিভক্ত; যদিও তাদের কেউ কেউ এই পবিত্র সংগ্রামের দায়ভার স্বেচ্ছায় নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছে। হাজার দিনের অসীম ধৈর্য আর আল্লাহর ওপর নিঃশর্ত তাওয়াক্কুলের পর সমাগত এই চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণ আজ সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে, এর সাধারণ মানুষ, আলেম সমাজ এবং সকল নেতৃত্বকে তাদের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দায়িত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কাপুরুষোচিত কোনো অজুহাত দেখানোর সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই, নেই ঘরে বসে থাকার কোনো যৌক্তিক কারণও। কেননা, আজকের এই যুদ্ধ কেবল এক টুকরো ভূখণ্ডের যুদ্ধ নয়; বরং এটি সমগ্র উম্মাহ ও তাদের ঈমানের যুদ্ধ। নিশ্চয়ই ধৈর্যের সাথেই বিজয় নিহিত, আর কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি। যারা এই ঈমানদার প্রজন্মকে নিঃসঙ্গ ফেলে গেছে, তারা এদের বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না। আল্লাহর চূড়ান্ত ফয়সালা না আসা পর্যন্ত তারা ঠিক এভাবেই বিজয়ী বেশে টিকে থাকবে।
দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধ জিহাদের প্রজ্বলিত শিখাকে নিভিয়ে দেবে—উম্মাহর শত্রুরা যদি এমনটি ভেবে থাকে, তবে এই সহস্র দিন তাদের সেই বদ্ধমূল ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছে। এই দীর্ঘ সময়কাল মুজাহিদদের অবিচলতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। সেইসাথে উম্মাহর এই বিশ্বাসকেও করেছে আরও সুদৃঢ় যে, আল্লাহর নির্ধারিত বিধান কখনো পরিবর্তিত হয় না। বাতিল বা মিথ্যার কাছে যত বিশাল শক্তি বা নিষ্ঠুরতার হাতিয়ারই সঞ্চিত থাকুক না কেন, তার ধ্বংস অনিবার্য। অন্যদিকে, সত্য যতই ক্ষতবিক্ষত হোক না কেন, তা চিরঞ্জীব। যতদিন এই উম্মাহর বুকে এমন সব বীর পুরুষের পদচারণা থাকবে, যারা সত্যের পতাকা ধারণ করেন, এর প্রতিরক্ষায় বুক চিতিয়ে দাঁড়ান এবং এই পবিত্র পথে নিজেদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটুকু অকাতরে বিলিয়ে দেন—ততদিন সত্যকে কেউ কখনো মুছে ফেলতে পারবে না।
আর চূড়ান্ত শুভ পরিণাম তো কেবল আল্লাহভীরু মুত্তাকিদের জন্যই নির্ধারিত।
*****
সূত্র: সাপ্তাহিক আল-বায়ান নিউজলেটার, ১ম সংখ্যা, ১৮ মুহাররম ১৪৪৮ হিজরি, ০৩ জুলাই ২০২৬ ইং
সূত্র: সাপ্তাহিক আল-বায়ান নিউজলেটার, ১ম সংখ্যা, ১৮ মুহাররম ১৪৪৮ হিজরি, ০৩ জুলাই ২০২৬ ইং