Announcement

Collapse
No announcement yet.

শবে বরাত : সুন্নাত নাকি বিদআত || ২য় পর্ব (শেষ) || মুফতি আবু আসেম নাবিল হাফিযাহুল্লাহ

Collapse
This is a sticky topic.
X
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • শবে বরাত : সুন্নাত নাকি বিদআত || ২য় পর্ব (শেষ) || মুফতি আবু আসেম নাবিল হাফিযাহুল্লাহ

    শবে বরাত : সুন্নাত নাকি বিদআত

    মুফতি আবু আসেম নাবিল হাফিযাহুল্লাহ




    ঘ) শবে বরাতের বিষয় ইমামগণের মতামত

    শবে বরাতের করণীয়-বর্জনীয় আমল সম্পর্কে বিভিন্ন মাযহাবের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ইমামগণের কিছু মন্তব্য

    ১. শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (৭২৮ হি.) বলেন,
    ليلة النصف من شعبان فقد روى في فضلها من الأحاديث المرفوعة والآثار ما يقتضي أنها ليلة مفضلة وأن من السلف من كان يخصها بالصلاة فيها، وصوم شهر شعبان قد جاءت فيه أحاديث صحيحة، ومن العلماء من السلف من أهل المدينة وغيرهم من الخلف من أنكر فضلها وطعن في الأحاديث الواردة فيها، كحديث: “إن الله يغفر فيها لأكثر من عدد شعرغنم كلب”… لكن الذي عليه كثير من أهل العلم أو أكثرهم من أصحابنا وغيرهم على تفضيلها وعليه يدل نص أحمد لتعدد الأحاديث الواردة فيها وما يصدق ذلك من الآثار السلفية وقد روى بعض فضائلها في المسانيد والسنن، وإن كان قد وضع فيها أشياء أخر… فأما صوم يوم النصف مفردا فلا أصل له بل إفراده مكروه وكذلك اتخاذه موسما تصنع فيه الأطعمة وتظهر فيه الزينة هو من المواسم المحدثة المبتدعة التي لا أصل لها وكذلك ما قد أحدث في ليلة النصف من الاجتماع العام للصلاة الألفية في المساجد الجامعة ومساجد الأحياء والدروب والأسواق. فإن هذا الإجتماع لصلاة نافلة مقيدة بزمان وعدد، وقدر من القراءة لم يشرع مكروه. فإن الحديث الوارد في الصلاة الألفية موضوع بإتفاق أهل العلم بالحديث.
    ‘পনেরো শাবানের রাতের ফযীলত সম্পর্কে একাধিক ‘মারফু’ হাদীস ও ‘আসারে সাহাবা’ বর্ণিত হয়েছে। এগুলো দ্বারা ওই রাতের ফযীলত ও মর্যাদা প্রমাণিত হয়। সালাফে সালেহীনের কেউ কেউ এ রাতে নফল নামাযের ব্যাপারে যত্নবান হতেন। আর শাবানের রোযার ব্যাপারে তো সহীহ হাদীসসমূহই রয়েছে। সালাফগণের মধ্যে মদীনার কোনো কোনো আলেম এবং পরবর্তীদের মধ্যে কেউ কেউ যদিও এই রাতের ফযীলত অস্বীকার করেন এবং এ সংক্রান্ত হাদীসগুলোকে দুর্বল সাব্যস্ত করেন। যেমন একটি হাদীস: সেদিন আল্লাহ তাআলা কালব গোত্রের বকরির পশম পরিমাণের চেয়ে বেশি মানুষকে ক্ষমা করেন।
    কিন্তু হাম্বলী ও গায়রে হাম্বলী অধিকাংশ আলেমই এই রাতের ফযীলতের কথা স্বীকার করে থাকেন। ইমাম আহমাদ রাহ.-এর মতও তাই। কেননা, এর ফযীলত সম্পর্কে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং এগুলোর সমর্থনে সালাফ (সাহাবী ও তাবেয়ী)-এর ‘আসার’ও বিদ্যমান আছে; যেগুলো ‘সুনান’ ও ‘মুসনাদ’ শিরোনামে সংকলিত হাদীসের কিতাবে (বরং কতক ‘সহীহ’ শিরোনামের কিতাবেও যেমন সহীহ ইবনে খুযাইমা (কিতাবুত তাওহীদ) সহীহ ইবনে হিব্বান প্রভৃতিতে) রয়েছে। যদিও এর কিছু কিছু বর্ণনা ভিত্তিহীনও রয়েছে।
    অবশ্য শুধু পনেরো তারিখের দিনে রোযা রাখার ব্যাপারে যত্নবান হওয়া মাকরূহ। (বরং পনেরো তারিখের সাথে দু-একদিন মিলিয়ে নেওয়া উত্তম।) আর এই দিন বা রাতে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করা এবং সাজ-সজ্জার ব্যাপারে যত্নবান হওয়া ইত্যাদি বিদআত ও ভিত্তিহীন। তেমনি এই রাতে ‘সালাতে আলফিয়া’ নামের মনগড়া নামাযের জন্য জামে মসজিদ, মহল্লার মসজিদ, পথের ধারের মসজিদ এমনকি বাজারের মসজিদে সমবেত হওয়াও বিদআত।’ আর নফল সালাতের জন্য শরিয়ত অনুমোদন করেনি এমন নির্দিষ্ট সময়, রাকাতের নির্দিষ্ট সংখ্যা ও নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্বিরাতের জন্য সমবেত হওয়া মাকরুহ। আর ‘সালাতে আলফিয়া’ সম্পর্কে যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে সকল আহলে ইলম একমত যে, তা মাওযু ও ভিত্তিহীন। -ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকীম ২/৬৩১-৬৩২

    ২. মালিকি মাযহাবের ইমাম ইবনুল হাজ্জ রাহ. (৭৩৭হি.) তাঁর রচিত ‘আল-মাদখাল’ গ্রন্থে’র ১ম খণ্ডের শেষাংশে শবে বরাতের গুরুত্ব ও শবে বরাত কেন্দ্রিক বিভিন্ন রসম রেওয়াজ সম্পর্কে সুন্দর আলোচনা করেছেন। -আল-মাদখাল ১/২৯৯-৩১৩

    ৩. ইবনে রজব হাম্বলী (৭৯৫ হি.)। সালাফগণ এ রাত কীভাবে কাটাতেন সে প্রসংগে ইমাম যাইনুদ্দীন ইবনে রজব হাম্বলী (৭৯৫ হি.) বলেন,
    و اختلف علماء أهل الشام في صفة إحيائها على قولين : أحدهما : أنه يستحب إحياؤها جماعة في المساجد كان خالد بن معدان و لقمان بن عامر و غيرهما يلبسون فيها أحسن ثيابهم و يتبخرون و يكتحلون و يقومون في المسجد ليلتهم تلك و وافقهم إسحاق بن راهوية على ذلك و قال في قيامها في المساجد جماعة : ليس ببدعة نقله عنه حرب الكرماني في مسائله و الثاني : أنه يكره الإجتماع فيها في المساجد للصلاة و القصص و الدعاء و لا يكره أن يصلي الرجل فيها لخاصة نفسه و هذا قول الأوزاعي إمام أهل الشام و فقيههم و عالمهم و هذا هو الأقرب إن شاء الله تعالى. و يتعين على المسلم أن يجتنب الذنوب التي تمنع من المغفرة و قبول الدعاء في تلك الليلة.
    এই রাতের ইবাদত-বন্দেগী কিভাবে করা হবে, এ বিষয়ে শামের আলেমগণ থেকে দুইটি মত পাওয়া যায়:
    এক. ইবাদত বন্দেগীর জন্য মসজিদে সমবেত হওয়া মুস্তাহাব। খালিদ ইবনে মা’দান, লুকমান ইবনে আমের (রহ.) সহ অন্যান্যরা এই রাতে উত্তম পোষাক পরিধান করতেন, সুগন্ধি ও সুরমা ব্যবহার করতেন এবং ঐ রাত তারা মসজিদে ইবাদত বন্দেগীতে কাটিয়ে দিতেন। এ বিষয়ে ইসহাক ইবনে রাহ্ওয়াইহ (রহ.) তাদের সাথে একমত ছিলেন। তিনি দলবদ্ধভাবে মসজিদে ইবাদত বন্দেগী করা সম্পর্কে বলেন, এটা বিদআত নয়। হারব আলকিরমানী তার “মাসায়েল” গ্রন্থে ইসহাক ইবনে রাহওয়াহ থেকে কথাটি বর্ণনা করেন।

    দুই. শামের বিশিষ্ট ফকীহ ও আলেম ইমাম আওযায়ী (রহ.) বলেন, দুআ, আলোচনা ও নফল সালাতের জন্য মসজিদে জামায়েত হওয়া মাকরুহ। কিন্তু কোনো ব্যক্তি একাকি মসজিদে এসে সালাত আদায় করা মাকরুহ নয়।
    ইবনে রজব হাম্বালী রহ. বলেন, আল্লাহ চাহেন তো এটাই সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী কথা। আর প্রত্যেক মুসলিমই এমন সকল গুনাহ (হিংসা-বিদ্বেষ) থেকে বেঁচে থাকার প্রতি যত্নবান হবে, যা আল্লাহর মাগফিরাত এবং ঐ সকল (ফযিলতপূর্ণ) রাতে (আল্লাহর কাছে বান্দার) দুআ কবুল হওয়া থেকে বঞ্চিত রাখে। -লাতাইফুল মাআরিফ পৃ. ১৯০
    এ রাতের করণীয় সম্পর্কে ইবনে রজব (রহ.) বলেন,
    إخواني اجتنبوا الذنوب التي تحرم العبد مغفرة مولاه الغفار في مواسم الرحمة و التوبة و الإستغفار أما الشرك : إنه من يشرك بالله فقد حرم الله عليه الجنة و مأواه النار و ما للظالمين من أنصار و أما القتل فلو اجتمع أهل السموات و أهل الأرض على قتل رجل مسلم بغير حق لأكبهم الله جميعا في النار و أما الزنا فحذار حذار من التعرض لسخط الجبار الخلق كلهم عبيد الله و إماؤه و الله يغار لا أحد أغير من الله أن يزني عبده أو تزني أمته فمن أجل ذلك حرم الفواحش و أمر بغض الأبصار و أما الشحناء فيا من أضمر لأخيه السوء و قصد له الإضرار : لا تحسبن الله غافلا عما يعمل الظالمون إنما يؤخرهم ليوم تشخص فيه الأبصار
    يكفيك حرمان المغفرة في أوقات مغفرة الأوزار.
    কাজেই তোমরা ঐ সকল গুনাহ থেকে বেঁচে থাক যা- রহমত, তাওবা ও ক্ষমা চাওয়ার বিশেষ মুহূর্তে ক্ষমাশীল রবের মাগফিরাত ও ক্ষমা থেকে বান্দাকে বঞ্চিত রাখে।
    শিরক সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:
    إنه من يشرك بالله فقد حرم الله عليه الجنة و مأواه النار و ما للظالمين من أنصار
    ‘যে আল্লাহর সাথে শিরকে লিপ্ত হয়, আল্লাহ তাআলা তার উপর জান্নাত হারাম করে দেন আর তার আবাসস্থল জাহান্নাম। জালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।’ -সূরা মায়েদা (৫): ৭২
    আর হত্যা এমন জঘন্য যে, যদি আসমান ও জমিনবাসী সকলেই কোনো মুসলিমকে অন্যায়ভাবে হত্যা করতে একত্র হয়, আল্লাহ তাআলা তাদের সকলকেই জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।
    আর ব্যভিচার! মহাশক্তিধর আল্লাহর ক্রোধের সামনে থেকে ব্যভিচারের ব্যাপারে সাবধান হও! সকল সৃষ্টি (মানুষ) আল্লাহর দাস কিংবা দাসী। আল্লাহ তাআলা আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন। আর কেউ আল্লাহর চাইতে অধিক আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন নেই যে, তার কোনো দাস-দাসী ব্যভিচারে লিপ্ত হবে। আর এ কারণেই আল্লাহ তাআলা অশ্লীলতাকে হারাম করেছেন এবং চক্ষু অবনত রাখার আদেশ করেছেন।
    আর কারো প্রতি বিদ্বেষ ও ঘৃণাভাব পোষণ করা! হে ওই ব্যক্তি! যে তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি খারাপ ধারণা রাখে এবং তার ক্ষতিসাধনের ইচ্ছা করে! (তার সাবধান হওয়া উচিত। কারণ) আল্লাহ তাআলা বলেন,
    لا تحسبن الله غافلا عما يعمل الظالمون إنما يؤخرهم ليوم تشخص فيه الأبصار
    ‘জালেমরা যা করে, সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলাকে বেখবর মনে করো না। তাদেরকে তো ঐ দিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন, যেদিন চক্ষুসমূহ থাকবে বিস্ফরিত।’ -সূরা ইব্রাহীম (১৪) : ৪২
    গুনাহ মাফের সময়গুলোতে মাগফিরাত থেকে বঞ্চিত হওয়া (ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জন্য) যথেষ্ট। -লাতাইফুল মাআরিফ পৃ. ১৯৪

    ৪. আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. (১০৫২ হি.) চৌদ্দ শাবান দিবাগত রাতের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেন,
    قال العبد الضعيف: نزول الله تعالى إلى السماء الدنيا يكون في كل ليلة لكن يختصر ذلك بالثلث الأخير، وفي ليلة النصف من شعبان يكون من غروب الشمس إلى الفجر ولا ينحصر ذلك في الثلث الأخير، وهذا من فضل هذه الليلة. … فالظاهر ندبة للأحاديث السابقة ومثلها يعمل في الفضائل، وقال به الأوزعي..
    আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতেই নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন। তবে এটা রাতের শেষ এক-তৃতীয়াংশ সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু শাবানের মধ্য রজনীতে এ সময়কাল রাতের এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সূর্যাস্ত থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত এর ব্যাপ্তি থাকে। এটাই এই রজনীর বৈশিষ্ট্য। …আর এটা স্পষ্ট যে, পূর্বে উল্লিখিত হাদীসগুলো দ্বারা এই আমলটা মুস্তাহাব সাব্যস্ত হবে। প্রসঙ্গত, ফাযায়েলের ক্ষেত্রে এই পর্যায়ের হাদীসের উপর আমল করা যায়। এমনটিই বলেছেন ইমাম আওযাঈ রহ.।

    আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. শবে বরাত কেন্দ্রিক বিভিন্ন বেদআত ও গর্হিত কাজ সম্পর্কে বলেন,
    ومن البدع الشنيعة ما تعارف الناس في أكثر بلاد الهند من إيقاد السرج ووضعها على البيوت والجدران وتفاخرهم بذلك واجتماهم اللهو واللعب بالنار وإحراق الكبريت فإنه لا أصل له في الكتب الصحيحة المعتبرة بل ولا في غير المعتبرة، ولم يرو فيها حديث لا ضعيف لا موضوع.
    ولا يعتاد ذلك في غير بلاد الهند من الديار العربية من الحرمين الشريفين زادهما الله تعظيما وتشريفا ولا في غيرهما ولا في البلاد العجمية ما عدا بلاد الهند بل عسى أن يكون ذلك، وهو ظن الغالب اتخاذا من رسوم الهنود في إيقاد السرج للديوالي، فإن عامة الرسوم البدعة الشنيعة بقيت من أيام الكفر في الهند وشاعت في المسلمين بسبب المجاورة والاختلاط. …قال بعض المتأخرين من العلماء إن استحداث السرج الكثيرة زيادة على الحاجة لم يرد باستحبابه أثر في الشرع في موضع….قال علي بن إبراهيم وأول حدوث الوقيد من البرامكة وكانوا عبدة النار فلما أسلموا أدخلوا في الإسلام ما يموهون أنه من سنن الدين. …
    আর শবে বরাত কেন্দ্রিক কিছু গর্হিত বিদআত প্রচলিত আছে, হিন্দুস্তানের অনেক এলাকার মানুষ এগুলোর সাথে পরিচিত। যেমন- বাতি প্রজ্জলিত করা এবং তা ঘর ও দেয়ালে রাখা। এগুলো নিয়ে অহমিকা ও উৎসবে মেতে ওঠা। আগুন (আতশবাজি) নিয়ে আমোদ প্রমোদ ও ক্রীড়া-তামাশায় সমবেত হওয়া। গন্ধক প্রজ্জলিত করা। গ্রহনযোগ্য বিশুদ্ধ কোনো কিতাবে, এমনকি অগ্রহনযোগ্য কোনো কিতাবেও এগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। এ বিষয়ে যয়ীফ বা জাল পর্যায়ের কোনো হাদীসও বর্ণিত হয়নি। …
    সাধারণত হিন্দুস্তানের বাইরে কোনো আরব রাষ্ট্র বা অনারব রাষ্ট্রে এগুলোর প্রচলন দেখা যায় না। যতটুকু মনে হয়, হিন্দুদের দেওয়ালি (দীপাবলি) উৎসব থেকে মুসলিম সমাজে এগুলোর অনুপ্রবেশ ঘটেছে। শুধু এটা নয়, মুসলিম সমাজে প্রচলিত অধিকাংশ বিদআতি প্রথাগুলোই হিন্দু সমাজ থেকে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু-মুসলিম পাশাপাশি বসবাস করার কারণে হিন্দুদের কিছু প্রথা মুসলিমদের মাঝেও দেখা যায়। …
    শবে বরাত বা এ ধরণের নির্দিষ্ট রজনীতে প্রদীপ সজ্জার বিষয়ে পরবর্তী ওলামায়ে কেরাম বলেন, এটা গর্হিত বিদআত। প্রয়োজনের অতিরিক্ত অগ্নি প্রজ্জলন শরীয়তের দৃষ্টিতে কখনোই উত্তম কাজ হতে পারে না। আলী বিন ইব্রাহীম বলেন, অগ্নি প্রজ্জলনের প্রথার সূচনা হয়েছে বারামিক গোত্রের মাধ্যমে। তারা প্রথমে অগ্নি উপাসক ছিল। পরবর্তীতে যখন তারা ইসলাম গ্রহন করে, তখন এই প্রথাকে ইসলামের রীতিনীতির সাথে মিশিয়ে ফেলে। -মা সাবাতা বিসসুন্নাহ পৃ. ২০০-২১৫

    ৫.আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. (১৩৫২ হি.) বলেন:
    هذه الليلة البرائة وصح الروايات في فضل ليلة البراءة وأما ما ذكر ارباب الكتب من الضعاف والمنكرات فلا أصل له ….
    শবে বরাত সম্পর্কে বেশ কিছু সহীহ রেওয়ায়াত রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কিতাব-পত্রে (বিশেষ পদ্ধতির নামায সম্পর্কে যে সকল) যয়ীফ ও মুনকার বর্ণনা রয়েছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। -আলআরফুশ শাযী (সুনানে তিরমিযির টীকা) ১/১৫২

    ৬.আল্লামা মুবারকপুরী (১৩৫৩ হি.) বলেন,
    اعلم أنه قد ورد في فضيلة ليلة النصف من شعبان عدة أحاديث مجموعها يدل على أن لها أصلا … فهذه الأحاديث بمجموعها حجة على من زعم أنه لم يثبت في فضيلة ليلة النصف من شعبان شيء والله تعالى أعلم .
    জেনে রাখ, চৌদ্দ শাবানের দিবাগত রাতের ফযীলতের বিষয় বেশ কিছু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যা সমষ্টিগতভাবে সাব্যস্ত করে যে, শরীঅতে এর ভিত্তি আছে। আর এসকল হাদীস সামগ্রিকভাবে ওই সকল লোকদের বিপক্ষে দলিল, যারা দবি করে যে, চৌদ্দ শাবানের দিবাগত রাতের ফযিলত সম্পর্কে কোনো হাদীস নেই। আল্লাহ অধিক অবগত। -তুহফাতুল আহওয়াযি ৩/৩৬৫
    অন্যান্য যেসকল ইমাম চৌদ্দ শাবান দিবাগত রাতে ইবাদত বন্দেগি করা উত্তম বা মুস্তাহাব বলেছেন, তাদের কয়েকজনের নাম;
    ১. ইমাম শাফিঈ (রহ.)। -কিতাবুল উম্ম ২/৪৮৫
    ২. ইবনে আবিদীন শামি। -রদ্দুল মুহতার ২/২৪-২৫
    ৩. ইবনে নুজাইম। -আলবাহরুর রাইক ২/৫৬

    ঙ) শবে বরাতকে কেন্দ্র করে বিশেষ নামাজের প্রথা

    ১. আল্লামা তাহের পাটনী ( ৯৮৬ হি.) বলেন,
    وأول حدوث هذه الصلاة ببيت المقدس سنة ثماني وأربعين وأربع مئة… وقال زيد بن أسلم : ما أدركنا أحدا من مشايخنا وفقهائنا يلتفتون إلى ليلة البراءة وفضلها على غيرها. وقال ابن دحية : أحاديث صلاة البراءة موضوعة .
    এই নামাজের প্রচলন সর্ব প্রথম ৪৪৮ হিজরীতে শুরু হয়, বায়তুল মুকাদ্দাসে। যায়েদ বিন আসলাম বলেন, আমি কোনো মাশায়েখ এবং ফকীহদের মাঝে এমন কাউকে দেখিনি, যিনি শবে বরাতের রাত বা অন্য কোনো রাতের উপর এ রাতের ফযীলতের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেছেন। ইবনে দিহয়া বলেন, শবে বরাতের (নির্ধারিত) নামাজ সংক্রান্ত সবগুলো হাদীস মাউযু। -তাযকিরাতুল মাউযুআত পৃ. ৪৫-৪৬

    উল্লেখ্য, শবে বরাতের দিন নামায আদায়ের বিশেষ পদ্ধতি বর্ণনা করে মাওযুআতের কিতাবে অনেকগুলো বর্ণনা এসেছে। যেমন, সালাতুর রাগাইব ইত্যাদি। সালাতুর রাগাইব নামে বিশেষ এক ধরনের নামাযের প্রচলন হিজরি চতুর্থ শতকেরও পরে হয়েছে। যা সম্পূর্ণ জাল হাদীস নির্ভর। অনেকে সালাতুর রাগাইবের সূচনাকে মনে করে শবে বরাতের সূচনা। আবার অনেকে চৌদ্দ শাবানের রাতে নির্দিষ্ট পদ্ধতির নামাযের ফযিলত সংক্রান্ত জাল এই মাওযু হাদীসগুলোর উপর ভিত্তি করে বলে দেয় যে, ‘শবে বরাত সম্পর্কে বর্ণিত সকল হাদীস মওযু ও ভিত্তিহীন। এবং এ বিষয়ে গ্রহনযোগ্য কোনো হাদীস পাওয়া যায় না।

    ২. ইবনুল কায়্যিম রহ. ‘আল-মানারুল মুনীফ’ কিতাবে চৌদ্দ শাবানের রাতে নির্দিষ্ট পদ্ধতির নামাযের ফযিলত সংক্রান্ত কিছু জাল হাদীস উল্লেখ করে বলেন,
    والعجب ممن شم رائحة العلم بالسنن أن يغتر بمثل هذا الهذيان ويصليها . وهذه الصلاة وضعت في الإسلام بعد الأربع مئة ونشأت من بيت المقدس فوضع لها عدة أحاديث
    আশ্চর্যের বিষয় হল, যারা সুন্নাহ’র ইলমের ঘ্রাণ পেয়েছে, তারা কিভাবে ঐ সকল ব্যক্তিদের প্রলাপে ধোঁকার শিকার হয়ে যায় এবং সেই (ভিত্তিহীন হাদীস নির্ভর বিশেষ পদ্ধতির) নামাযও তারা আদায় করে। অথচ এসকল সালাত তৈরী করা হয়েছে চারশত বছর পর এবং এর সূচনা হয় বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে। এমনকি এবিষয়ে আরো কিছু ভিত্তিহীন হাদীস তৈরী করা হয়েছে। -আল মানারুল মুনীফ, ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ, পৃ.৯৯

    ৩. হুবহু উক্ত কথাটিই বলেছেন মোল্লা আলী ক্বারী রহ. الأسرار المرفوعة কিতাবে। -আলআসরারুল মারফুআহ পৃ. ৪৪০।
    আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হককে হক হিসেবে গ্রহণ করার এবং বাতিলকে বর্জন করার তাওফিক নসিব করুন। আমিন
    وصلى الله على سيدنا ومولانا محمد وعلى آله وصحبه وسلم

    ***


    গ্রন্থপঞ্জি

    ১. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, আবু বকর ইবনে আবি শাইবা (২৩৫ হি.), তাহকীক: শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামাহ, বৈরুত, লেবানন, ২০০৬ খ্রি.।
    ২. মুসনাদে আহমাদ, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (২৪১ হি.), তাহকীক: শায়খ শুআইব আলআরনাউত (১৪৩৮ হি.), মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০১৫ খ্রি.।
    ৩. সহীহ মুসলিম, ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (২৬১ হি.), আল মাকতাবাতুল ইসলামিয়া, বাংলাবাজার, ঢাকা।
    ৪. সুনানে ইবনে মাজাহ, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মাজাহ (২৭৫ হি.), আল মাকতাবাতুল ইসলামিয়া, বাংলাবাজার, ঢাকা।
    ৫. সহীহ ইবনে হিব্বান, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে হিব্বান (৩৫৪ হি.), আর-রিসালাতুল আলামিয়্যাহ, দিমাশক, সিরিয়া।
    ৬. মাজমাউয যাওয়ায়েদ, নুরুদ্দীন হাইসামী (৮০৭ হি.), দারুল কিতাব আল আরাবী, বৈরুত, লেবানন।
    ৭. আল বাহরুর রায়েক, ইবনে নুজাইম (৯৭০ হি.), দারুল মা’আরেফা। (শামেলা)
    ৮. রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী), ইবনে আবেদীন শামী (১২৫২ হি.), দারুল ফিকর, বৈরুত।
    ৯. আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, মুনযিরী রহ. (৬৫৬ হি.), দারুল হাদীস, কায়রো, ১ম সংস্করণ, ১৯৯৪ খ্রি.।
    ১০. লাতাইফুল মাআরিফ, ইবনু রজব হাম্বলী (৬৯৫ হি.), দারুল হাদীস, কায়রো, মিশর।
    ১১. শুআবুল ঈমান, ইমাম বায়হাকী (৪৫৮হি.), দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, লেবানন, ১৯৯০ খ্রি.।
    ১২. ইকমালু তাহযিবিল কামাল, আলাউদ্দিন মুগলতায়ী (৭৬২ হি, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন।
    ১৩. তাহযীবুত তাহযীব, ইবনে হাজার আলআসকালানী (৭৫২ হি.), দারুল কুতুব আলইলমিয়্যাহ, বয়রুত।
    ১৪. তাহযীবুল কামাল, আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ আলমিযযী (৭৪২ হি.), মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, বয়রুত।
    ১৫. সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪২ হি.), মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, বয়রুত।
    ১৬. মীযানুল ই’তিদাল, শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪২ হি.), দারুল ফিক্র।
    ১৭. আলকাশেফ, শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪২ হি.), দারুল কুরতুবা, বয়রুত।
    ১৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফায, শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪২ হি.), দারুল কুতুব আলইলমিয়্যাহ, বয়রুত।
    ১৯. সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা, শায়েখ মুহাম্মাদ আলবানী (১৪২০ হি.), মাকতাতুল মাআরিফ, রিয়াদ।
    ২০. তুহফাতুল আহওয়াযী শরহু জামিইত তিরমিযী, আব্দুর রহমান মুবারকপুরী (১৩৫৩ হি.), দারুল ফিক্র, লেবানন।
    ২১. আলমানারুল মুনীফ, ইবনুল কায়্যিম আল জাওযিয়্যাহ (৭৫১ হি.), মাকতাবাতুর রায়্যান, ঢাকা।
    ২২ আলআসারুল মারফুআ, আব্দুল হাই লাখনবী (১৩০৪ হি.), দারুল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ।
    ২৩. আলফাওয়াইদুল মাজমুআ, ইমাম শাওকানী (১২৫০ হি.), আলমাকতাবাতুত তাওফীকিয়্যাহ।
    ২৪. আলআসরারুল মারফুআ ফীল আলখবারিল মাওযুআ, মুল্লা আলী আলক্বারী (১০১৪ হি.), আলমাকতাবাতুল ইসলামী।
    ২৫. তাফসীরে ইবনে কাসীর, হাফেয ইবনে কাসীর (৭৭৪ হি.), দারুল হাদীস আলক্বাহেরা।
    ২৬. কাশ্শাফুল কিনা’ আন মুতুনিল ইক্বনা, মানসুর ইবনে ইউনুস, দারুল ফিক্র, বয়রুত।
    ২৭. শরহুয যুরকানী আলা মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়া, মুহাম্মাদ যুরক্বানী (১১২২ হি.), দারুল কুতুব আলইলমিয়্যাহ। মাকতাবাতুশ শামেলা।
    ২৮. আলমাসনু ফী মা’রিফাতিল হাদীসিল মাউযু, মুহাদ্দিস আলী আলক্বারী আলহারাবী (১০১৪ হি.), মাকতাবাতুল মাতবুআত আলইসলামিয়াহ, হালাব, মাকতাবাতুশ শামেলা।
    ২৯. ফিরুযুল লুগাত, আলহাজ্ব মৌলুভী ফিরোজ উদ্দীন।
    ৩০. আলমাদখাল, ইমাম ইবনুল হাজ্জ রাহ. (৭৩৭হি.) (মাকতাবাতুল মুসাওয়ারাহ)।
    ৩১. তাযকিরাতুল মাউযুআত, মুহাম্মাদ তাহের বিন আলী আল হিন্দী (মাকতাবাতুল মুসাওয়ারাহ)।
    ৩২. ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকীম, শাইখুল ইসলাম আব্দুস সালাম ইবনে তাইমিয়া (৭৬৮ হি.), (মাকতাবাতুল মুসাওয়ারাহ)।
    ৩৩. মা সাবাতা বিসসুন্নাহ ফী আইয়ামিস সুন্নাহ, আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. (১০৫২ হি.), (মাকতাবাতুল মুসাওয়ারাহ)।
    ৩৪. যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ, আব্দুর রহমান ইবনে ইসমাঈল আলবুসিরী (৮৪০ হি.), দারুল কুতুব আলইলমিয়্যাহ, লেবানন।
    ৩৫. আলমাসনু ফী মা’রিফাতিল হাদীসিল মাওযু, মুহাদ্দীস আলী আলক্বারী আলহারাবী (১০১৪ হি.), মাকতাবাতুর রাইয়্যান।


    সমাপ্ত

    ✍️
    Collected‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬​
    ​​
    ‘যার গুনাহ অনেক বেশি তার সর্বোত্তম চিকিৎসা হল জিহাদ’-শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ.

  • #2
    জেনে রাখ, চৌদ্দ শাবানের দিবাগত রাতের ফযীলতের বিষয় বেশ কিছু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যা সমষ্টিগতভাবে সাব্যস্ত করে যে, শরীঅতে এর ভিত্তি আছে। আর এসকল হাদীস সামগ্রিকভাবে ওই সকল লোকদের বিপক্ষে দলিল, যারা দবি করে যে, চৌদ্দ শাবানের দিবাগত রাতের ফযিলত সম্পর্কে কোনো হাদীস নেই। আল্লাহ অধিক অবগত। -তুহফাতুল আহওয়াযি ৩/৩৬৫
    অন্যান্য যেসকল ইমাম চৌদ্দ শাবান দিবাগত রাতে ইবাদত বন্দেগি করা উত্তম বা মুস্তাহাব বলেছেন, তাদের কয়েকজনের নাম;
    ১. ইমাম শাফিঈ (রহ.)। -কিতাবুল উম্ম ২/৪৮৫
    ২. ইবনে আবিদীন শামি। -রদ্দুল মুহতার ২/২৪-২৫
    ৩. ইবনে নুজাইম। -আলবাহরুর রাইক ২/৫৬

    বারাকাল্লাহ ফীকুম আখী! প্রথম পর্বের আলোচনাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদেরকে এই রাতের ফজিলত লাভের তাওফিক দিন, আর আজকে ইবাদাতের নামে রসম রেওয়াজ ও বিদআতি কর্মকাণ্ড থেকে হেফাজত করুন, আমাদের অন্তর থেকে সকল প্রকার বিদ্বেষ দূর করে দিয়ে আমাদেরকে তার মাগফিরাতে আম এর উপযুক্ত বানান, রাত্রিতে কিছু সময় হলেও তার ইবাদাতে লিপ্ত থাকার সুযোগ করে দিন, আর যদি তার হাবিবের মত লম্বা সময়ের অমলের তাওফিক দেন তাহলে এটাই চাই তার কাছে! হে রব্বানা! এই গুনাহগারদের মাহরুম করবেন না, এমনটাই প্রত্যাশা আপনার সমীপে!
    আমীন ইয়া রব্বাল মুত্তাকিন ওয়া ইয়া রব্বাল মাজলুমীন!
    "আমরা তাওবা করার পূর্বে মরতে চাই না এবং মৃত্যু সামনে আসার পরে তাওবা করতে চাই না'​
    আবু হাযেম রহ

    Comment

    Working...
    X