Announcement

Collapse
No announcement yet.

ভোট ও নির্বাচন : তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও শারয়ি দৃষ্টিভঙ্গি || পর্ব-১

Collapse
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • ভোট ও নির্বাচন : তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও শারয়ি দৃষ্টিভঙ্গি || পর্ব-১

    ভোট ও নির্বাচন : তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও শারয়ি দৃষ্টিভঙ্গি

    পর্ব-১


    ভূমিকা

    ইসলাম ও গণতন্ত্র কেবল দুটি ভিন্ন শাসনপদ্ধতিই নয়, বরং দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী জীবনদর্শন। দুটির অবস্থান দুই মেরুতে। ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র হলো 'শুরা' বা পরামর্শভিত্তিক ব্যবস্থা, যা অহি ও শারয়ি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। অন্য দিকে, প্রচলিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো মানবসৃষ্ট আইন ও নিরঙ্কুশ জনসার্বভৌমত্ব। এই দুই ব্যবস্থার সংঘাত মূলত 'হক' ও 'বাতিল'-এর চিরাচরিত দ্বন্দ্বেরই প্রতিফলন। বর্তমান প্রবন্ধে আমরা ভোট ও নির্বাচনের পারিভাষিক সংজ্ঞা, ঐতিহাসিক বিবর্তন এবং ইসলামি শরিয়তের আলোকে এর বিশ্লেষণ ও বিধান নিয়ে একটি তাত্ত্বিক আলোচনা উপস্থাপন করব ইনশাআল্লাহ।

    সংজ্ঞা ও পরিচয় (Definition and Identity)

    কোনো বিষয়ের শারয়ি বিধান প্রদানের পূর্বে তার প্রকৃত স্বরূপ (Nature) অনুধাবন করা আবশ্যক। বিভিন্ন প্রামাণিক অভিধান ও বিশ্বকোষে 'ভোট' ও 'নির্বাচন'-এর যে সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে, তা নিচে তাত্ত্বিক ক্রমানুসারে আলোচনা করা হলো :

    ভোট (Vote) : ব্ল্যাক’স ল ডিকশনারি-এর ভাষ্যমতে, ভোট হলো কোনো প্রস্তাবিত বিষয়ে ব্যক্তির ইচ্ছা বা পছন্দের একটি আনুষ্ঠানিক বহিঃপ্রকাশ। এটি মূলত কোনো প্রতিনিধি বাছাই বা আইন পাসের ক্ষেত্রে একক ব্যক্তির সিদ্ধান্তের প্রতিফলন। [Black's Law Dictionary, 2019, p. 1891]

    ভোটদান (Voting) : এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা অনুযায়ী, ভোটদান হলো কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা নির্বাচকমণ্ডলীর যৌথ ইচ্ছা নির্ধারণের একটি পদ্ধতি। এর মূল লক্ষ্য থাকে কোনো সামষ্টিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা প্রতিনিধি নির্বাচন। [The New Encyclopædia Britannica (2010), Vol. 12, p. 461]

    গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে ভোট : অক্সফোর্ড ডিকশনারি অফ পলিটিক্স-এর মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোট হলো নাগরিকদের রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের এবং প্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রধান মাধ্যম। [The Concise Oxford Dictionary of Politics (3rd ed., 2009), pp. 550–551]

    বিশ্লেষণ : উল্লিখিত সংজ্ঞাগুলো থেকে প্রতীয়মান হয় যে, 'ভোট' মূলত একটি মাধ্যম, যা প্রয়োগের ক্ষেত্র রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক—উভয় পরিসরেই বিস্তৃত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি সভাপতি, অধিনায়ক বা নির্দিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তি নির্বাচন কিংবা সীমিত পরিসরের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য ব্যবহৃত হয়; আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইন প্রণয়ন, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং শাসনকার্যে নেতৃত্ব নির্ধারণের মতো মৌলিক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে কার্যকর হয়। একইভাবে সব আইন ও রাষ্ট্রনীতিও সমপর্যায়ের নয়। কিছু আইন নিছক পার্থিব কল্যাণ ও সামাজিক শৃঙ্খলার সাথে সম্পৃক্ত, যেগুলোর সাথে ইসলামের কোনো মৌলিক সংঘর্ষ নেই; পক্ষান্তরে কিছু আইন দ্বীন ও শরিয়াহর মৌলিক বিধানসমূহের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট, যেখানে ইসলামের সাথে স্পষ্ট বিরোধ পরিলক্ষিত হয়। অতএব বিষয়বস্তুর প্রকৃতি ও প্রেক্ষাপটের তারতম্যের কারণে এ সকল ক্ষেত্রে বিধানও একরূপ হতে পারে না।

    বর্তমান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু যেহেতু গণতান্ত্রিক ভোট-নির্বাচন, তাই সাধারণ ও সীমিত পরিসরের ভোট-নির্বাচন এখানে আলোচ্য নয়। কারণ সাধারণ বিষয়ে ভোট-নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভোট-নির্বাচনের উদ্দেশ্য, তাৎপর্য ও ফলাফল মৌলিকভাবে ভিন্ন, যা উপলব্ধি করতে না পেরে অনেকেই বিষয়টিকে এক করে ফেলে বিভ্রান্তির শিকার হন। প্রকৃতপক্ষে গণতান্ত্রিক ভোট-নির্বাচন হলো জনগণের মাধ্যমে জীবনব্যবস্থার রূপরেখা নির্ধারণ, নিজেদের মতো করে আইন প্রণয়ন, মানবরচিত বিচারিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শাসক নির্বাচন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। সুতরাং গণতান্ত্রিক ভোট-নির্বাচনের সারকথা হলো—জনগণের পক্ষ থেকে নিজেদের জন্য বিধানদাতা ও কর্তৃত্বশীল সত্তা নির্ধারণের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা।

    নির্বাচনের ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট

    'নির্বাচন' বা Election শব্দটির একটি গভীর ধর্মতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে।

    ভাষাতাত্ত্বিক উৎস : ল্যাটিন শব্দ 'Selectionem' বা 'Eligere' থেকে ইংরেজি 'Election' শব্দের উদ্ভব, যার অর্থ 'বাছাই করা'। গ্রিক দর্শনে একে 'Eklogē' বলা হয়। [Oxford English Dictionary (2nd ed., 1989). Entry: "Election".]

    ধর্মতাত্ত্বিক সংযোগ : Encyclopedia of Religion and Ethics-এর তথ্যানুযায়ী, নির্বাচনের ধারণাটি প্রাচীন খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের (Christian Theology) কাঠামোতে ব্যাপকভাবে আলোচিত। সেখানে 'নির্বাচন' বলতে ঈশ্বর কর্তৃক কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা জাতিকে মনোনীত করার ঐশী প্রক্রিয়াকে বোঝানো হতো। [Hastings, J. (Ed.). (1913). Encyclopaedia of Religion and Ethics (Vol. 5, p. 256). T. & T. Clark.]

    প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় চর্চা : প্রাচীন গ্রিসের এথেন্স এবং রোমান সাম্রাজ্যে সীমিত আকারে নির্বাচনের প্রচলন ছিল। মধ্যযুগে ক্যাথলিক চার্চের প্রধান 'পোপ' নির্বাচনের ক্ষেত্রেও বিশেষ নির্বাচনী ব্যবস্থা (Papal Conclave) অনুসরণ করা হতো। [Baumgartner, F. J. (2003). Behind Locked Doors: A History of the Papal Elections. Palgrave Macmillan.]

    ভারতীয় প্রেক্ষাপট : প্রাচীন ভারতের বৈদিক যুগে 'সমিতি'র মাধ্যমে রাজা নির্বাচনের নজির আছে। বিশেষ করে বাংলার ইতিহাসে অষ্টম শতাব্দীতে অরাজকতা (মাৎস্যন্যায়) নিরসনে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক গোপালকে রাজা হিসেবে নির্বাচিত করা পাল বংশের এক অনন্য ঐতিহাসিক ঘটনা। [Majumdar, R. C. (1943). The History of Bengal (Vol. 1, pp. 96–98). University of Dacca.]

    আধুনিক নির্বাচন ব্যবস্থা ও মানবরচিত আইনের সীমাবদ্ধতা

    সপ্তদশ শতাব্দী থেকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্মেষ ঘটে। তবে এই ব্যবস্থা শুরু থেকেই বৈষম্যমুক্ত ছিল না। দীর্ঘকাল পর্যন্ত নারী, শ্রমিক এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। ক্রমাগত আন্দোলনের মুখে তারা তাদের আইন সংশোধন করতে বাধ্য হয়েছে।

    এই পরিবর্তনশীলতা প্রমাণ করে যে, মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত আইন সর্বদাই অপূর্ণাঙ্গ এবং সময়ের সাথে পরিবর্তনশীল। পক্ষান্তরে, আল্লাহর দেওয়া শরিয়ত পূর্ণাঙ্গ এবং শাশ্বত। যা আজ সঠিক, কাল তা ভুল—এমন ব্যবস্থা কখনোই উম্মাহর জন্য স্থায়ী আদর্শ হতে পারে না।​



    ​​চলবে ইনশাআল্লাহ
    ‘যার গুনাহ অনেক বেশি তার সর্বোত্তম চিকিৎসা হল জিহাদ’-শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ.
Working...
X