Announcement

Collapse
No announcement yet.

ভোট ও নির্বাচন : তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও শারয়ি দৃষ্টিভঙ্গি || পর্ব-২

Collapse
This is a sticky topic.
X
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • ভোট ও নির্বাচন : তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও শারয়ি দৃষ্টিভঙ্গি || পর্ব-২

    ভোট ও নির্বাচন : তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও শারয়ি দৃষ্টিভঙ্গি

    পর্ব-২



    নির্বাচন বনাম শুরাব্যবস্থা : একটি তাত্ত্বিক তুলনা

    অনেকেই বিভ্রান্তিবশত গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে ইসলামের 'শুরাব্যবস্থা'র সাথে তুলনা করেন। অথচ এই দুটির মধ্যে অনেক মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। আমরা এখানে তাত্ত্বিক উদাহরণসহ কয়েকটি মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরছি।

    তাত্ত্বিক উদাহরণ :

    টেবিলের ওপর রাখা দুটি বই—একটি পবিত্র কুরআন এবং অন্যটি কার্ল মার্ক্সের 'দ্যা ক্যাপিটাল'—উভয়ই কাগজ, কালি এবং মলাটে সাদৃশ্যপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু তাদের আদর্শিক অবস্থান যেমন বিপরীত মেরুতে, বাহ্যিক কিছু সাদৃশ্য থাকলেও শুরা ও নির্বাচনের অবস্থানও ঠিক তেমনই ভিন্ন।

    মৌলিক পার্থক্যসমূহ :

    ক. সিদ্ধান্তের বাধ্যবাধকতা : শুরাব্যবস্থায় আমির বা খলিফা পরামর্শ গ্রহণ করেন, তবে অধিকাংশের মত মানা তাঁর জন্য বাধ্যতামূলক নয় যদি তা শরিয়তের পরিপন্থী হয়। অন্যদিকে, নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়ই চূড়ান্ত, চাই তা শরিয়ত বিরোধী হোক না কেন।

    খ. সদস্যদের যোগ্যতা : শুরার সদস্য হওয়ার জন্য ইলম, তাকওয়া এবং আমানতদারি শর্ত। কিন্তু গণতন্ত্রে একজন উচ্চশিক্ষিত আলিম এবং একজন অশিক্ষিত বা পাপাচারী ব্যক্তির ভোটের মূল্য সমান।

    গ. অমুসলিমদের ভূমিকা : ইসলামি শাসনব্যবস্থায় মুসলিমদের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে কাফিরদের কর্তৃত্বের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু গণতান্ত্রিক নির্বাচনে কাফির-মুশরিকদের ভোট মুসলিমদের ভাগ্য নির্ধারণের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।

    গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার বাস্তবতা

    বর্তমানে অনেক ইসলামি দল গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতায় গিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। তারা একে 'হিকমাহ' বা কৌশল হিসেবে দাবি করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কুফরি ব্যবস্থার অংশ হয়ে কি আসমানি দ্বীন কায়েম সম্ভব?

    অপারগতা ও ওজর: শরিয়ত বিশেষ অবস্থায় (প্রাণনাশের হুমকি থাকলে) মুখে কুফরি বাক্য উচ্চারণের অনুমতি দেয়, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদি কোনো রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না।

    কার্যকারিতা: গত এক শতাব্দীতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কোথাও পূর্ণাঙ্গ ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এটি মূলত উম্মাহর মাঝে বিভেদ এবং অনৈক্য সৃষ্টির একটি ফাঁদ (Divide and Rule)।

    ভূ-রাজনীতি ও নির্বাচনের বাস্তবতা : সার্বভৌমত্ব হরণের মহড়া

    তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিদেশি পরাশক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ বর্তমানে একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতায় (Open Secret) পরিণত হয়েছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুগুলোতে কূটনৈতিক তৎপরতা মূলত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। অনেক ক্ষেত্রে শাসক কে হবেন, তা জনগণের রায়ের পরিবর্তে বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহলের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। ফলে গণতন্ত্রের বহুল প্রচারিত স্লোগান—'জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস'—একটি তাত্ত্বিক মিথ ছাড়া আর কিছুই নয়। এর মাধ্যমে মূলত মুসলিম জাতির ঈমান হরণের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। নয়তো সাধারণ জনগণ এখানে কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে, যেখানে ক্ষমতার আসল চাবিকাঠি থাকে পর্দার অন্তরালে থাকা শক্তির হাতে।

    নববি দাওয়াত বনাম গণতান্ত্রিক দাওয়াত : একটি আদর্শিক তুলনা

    ইসলামের দাওয়াত এবং গণতন্ত্রের আহ্বানের মধ্যে মৌলিক বৈপরীত্য বিদ্যমান।

    · নববি মানহাজ : রাসুলুল্লাহ ﷺ মানুষের অন্তরে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তার মূল কথা হলো—একমাত্র আল্লাহই নিরঙ্কুশ আনুগত্যের মালিক ও চূড়ান্ত আইনদাতা। এখানে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু নয়, বরং অহি-ই হলো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। এটা বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়াটা হলো ইমান আর না মানাটা হলো কুফর। তাঁদেরকে দ্ব্যর্থহীনভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, তোমাদের কাজ হলো আল্লাহর আইন ও তাঁর সার্বভৌমত্বকে মেনে নেওয়া। ভোটের মাধ্যমে, পরামর্শের মাধ্যমে, অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাইয়ের কোনো অধিকার তোমাদের নেই। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সতর্ক করে বলেন :
    وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا.

    ‘আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে ফয়সালা দিলে কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে তাদের (ভিন্ন আরেকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের) কোনো অধিকার নেই। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্য হবে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হবে।’ [সুরা আল-আহযাব : ৩৬]

    গণতান্ত্রিক মানহাজ : পক্ষান্তরে গণতন্ত্র মানুষকে 'সার্বভৌমত্ব' ও 'আইন প্রণয়নের' চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী বা 'রব' হিসেবে উপস্থাপন করে। এখানে আল্লাহর হালাল-হারামকেও জনগণের ভোটের মুখাপেক্ষী করা হয়। মানুষকে আহবান জানানো হয়, তোমাদের যাচাই-বাছাই করার সুযোগ আছে। হে জনগণ, তোমরাই সব এবং তোমরাই রব (প্রভু)। সকল বিষয়ে তোমরা স্বাধীন। চাইলে যেকোনো কিছুকে তোমরা আইনে পরিণত করতে পারো। চাইলে তোমাদের যেকোনো সুবিধাকে অনুমোদিত ও বৈধ বানাতে পারো। তোমরা চাইলে শাহবাগীদের ভোট দিয়ে সমকামিতা বৈধ করতে পারো, আবার চাইলে ইসলামপন্থীদের ভোট দিয়ে মদ-যিনা সব নিষিদ্ধ করতে পারো। তোমরা যেটা চাইবে সেটাই হবে। দয়া করে আমাদের ভোট দাও; তাহলে আমরা অধিকাংশ মানুষের রায় নিয়ে সকল হারামকে নিষিদ্ধ করব এবং সকল হালালকে অনুমোদিত করব।

    বস্তুত গণতন্ত্রের সিস্টেমটাই এমন যে, আল্লাহর বিধান হোক হোক বা শয়তানের আইন—সবকিছুর বাস্তবায়ন নির্ভর করছে অধিকাংশ মানুষের রায়ের ওপর। তারা যেটার পক্ষে ভোট দেবে, সেটাই ফাইনাল, সেটাই চূড়ান্ত। এ সিস্টেম পাল্টানোর কোনো সুযোগ নেই। কেননা, তা সরাসরি সংবিধান ও গণতন্ত্রের মূল দর্শনের পরিপন্থী। তাই এ সিস্টেমে আইন পাশ করাতে হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদের রায় নিয়েই পাশ করাতে হবে।

    তাহলে দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ আইন ও তাঁর বিধান বাস্তবায়নের বিষয়টিও নির্ভর করছে জনগণ নামক নকল প্রভুদের অনুমোদনের ওপর। ওহ! কত বড় স্পর্ধা!! কত বড় দুঃসাহস!!! আল্লাহর ক্ষুদ্রতম সৃষ্টজীব হয়ে স্বয়ং মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর আইনের বাস্তবায়নের জন্য অধিকাংশ বান্দার রায়ের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে, এরচেয়ে বড় আল্লাহদ্রোহ এবং এর চেয়ে বড় কুফর আর কী হতে পারে?

    পাঠক, বিষয়টি কি চিন্তা করে দেখেছেন কখনো, কত জঘন্য এ ব্যবস্থা, যেখানে আল্লাহর বিধানকে তাঁরই গোলামরা চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে? নাউজুবিল্লাহি মিন জালিক। খারাপ লাগলেও বাস্তবতা এটাই যে, এসব তিক্ত সত্য অনেক ইসলামি দল মানুষকে জানায় না, জানাতে চায় না। উল্টো কেউ যদি এসব হাকিকত তুলে ধরে, ইসলামের মূল দর্শন ফুটিয়ে তোলে তখন দালিলিক খণ্ডন না করে উল্টো তারা তাকে শত্রু জ্ঞান করে।


    ​​চলবে ইনশাআল্লাহ

    ✍️
    Collected‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬‬​

    ‘যার গুনাহ অনেক বেশি তার সর্বোত্তম চিকিৎসা হল জিহাদ’-শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ.

  • #2
    ভোট ও নির্বাচন : তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও শারয়ি দৃষ্টিভঙ্গি || পর্ব-১

    https://dawahilallah.com/forum/%E0%A...6%AC-%E0%A7%A7

    ‘যার গুনাহ অনেক বেশি তার সর্বোত্তম চিকিৎসা হল জিহাদ’-শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ.

    Comment


    • #3
      মুহতারাম ভাই, অত্যন্ত গভীর ও চিন্তাশীল আলোচনা। শুরা ও গণতন্ত্রের পার্থক্য শুধু পদ্ধতিগত নয়; বরং কর্তৃত্বের উৎস ও চূড়ান্ত আইনদাতার প্রশ্নে দুটির ভিত্তিই ভিন্ন। মুমিনের কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠতার রায় নয়, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর ফয়সালাই চূড়ান্ত। তাই বাহ্যিক কিছু সাদৃশ্য দিয়ে শুরাকে গণতন্ত্রের সমার্থক বানানো নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর ধারণাগত ভুল। আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে সত্যকে সত্য হিসেবে বুঝে তার ওপর অটল থাকার তাওফীক দিন। آمين।

      Comment

      Working...
      X