ভোট ও নির্বাচন : তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও শারয়ি দৃষ্টিভঙ্গি
পর্ব-৩
সিয়াদাহ (Siyadah) ও হাকিমিয়্যাহ : নির্বাচনের শারয়ি বিশ্লেষণ
নির্বাচন মূলত একটি মাধ্যম। এ মাধ্যমের বৈধতা বা অবৈধতা নির্ভর করে—এটি কোন ব্যবস্থার মাধ্যম এবং কোন উদ্দেশ্য থেকে উৎসারিত—তা জানার ওপর। কোনো মাধ্যম যদি বৈধ ব্যবস্থার অধীন হয়, তবে তা বৈধ; যদি হারাম ব্যবস্থার অধীন হয়, তবে তা হারাম; আর যদি কুফরি ব্যবস্থার অধীন হয়, তবে তা কুফর হিসেবেই গণ্য হবে। আমরা যে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করছি, তা কোনো সাধারণ বা নিরপেক্ষ বিষয় নয়; বরং এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক শাখা। এ ব্যবস্থা জনগণকে ‘সিয়াদাহ’—অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব, কর্তৃত্ব, হুকুম, নিয়ন্ত্রণ, প্রভুত্ব, আধিপত্য ও বিধান নির্ধারণের অধিকার প্রদান করে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সিয়াদাহ হলো সর্বোচ্চ ও পরিপূর্ণ কর্তৃত্ব। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে এই সিয়াদাহ এমন মানুষের জন্য সাব্যস্ত করা হয়, যারা নির্বাচিত হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে ইচ্ছামতো আইন ও বিধান প্রণয়ন করতে পারে। অথচ নিরঙ্কুশ সিয়াদাহ ও সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহ তাআলার অধিকার; এতে অন্য কারও কোনো অংশীদারত্ব নেই।
গণতান্ত্রিক নির্বাচনে জনগণের পক্ষ থেকে জনপ্রতিনিধিদের কাঁধে যে সিয়াদাহ অর্পণ করা হয়, সেখান থেকেই আইন প্রণয়নের অধিকার উৎসারিত হয়। এর ফলে তাদের হাতে এসে যায় আইন-কানুন প্রণয়ন, পরিবর্তন ও পরিমার্জনের ক্ষমতা, বিচার-বিশ্লেষণের কর্তৃত্ব এবং তা কার্যকর করার অধিকার। তারা দাবি করে—এসব কিছুই হবে গণমানুষের ইচ্ছার ভিত্তিতে। অধিকাংশ মানুষ যা চায় এবং সমর্থন করে, সেটাই সবার জন্য বাধ্যতামূলক আইন হিসেবে গৃহীত হবে। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিই হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর নির্ভরশীলতা। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদ যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। শাসন করা, আইন প্রণয়ন করা, আইন কার্যকর করা এবং সামগ্রিক সিদ্ধান্ত পরিচালনার অধিকার—সবই সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে ন্যস্ত। এটাই গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামো। ফলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, গণতান্ত্রিক নির্বাচন মূলত ‘সিয়াদাহ’-এরই বাস্তব প্রতিফলন। অর্থাৎ এটি মানুষের ইচ্ছাকে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার একটি প্রক্রিয়া। প্রশ্ন হলো—মানুষের এই ইচ্ছা কীভাবে জানা যাবে? এর উত্তরে তারা বলে—নির্বাচন ও ভোটদানের মাধ্যমে।
অতএব ভোটদান হলো মানুষের ইচ্ছা প্রকাশের একটি মাধ্যম, যার মাধ্যমে তারা আইন প্রণয়নের অধিকার নিজেদের হাতে রাখে। বর্তমানে প্রচলিত সংসদীয় ব্যবস্থায় সংসদ এমন একটি কেন্দ্র, যেখান থেকে বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর মধ্যে সর্বপ্রথম ও প্রধান হলো আইন প্রণয়ন। অন্য কথায়, আইন প্রণয়নের অর্থ হলো—কোনো কিছুকে হালাল ঘোষণা করা কিংবা তার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, অথবা কোনো কিছুকে হারাম ঘোষণা করে তার অনুমতি বাতিল করা। অথচ এ অধিকার সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তাআলার জন্যই নির্দিষ্ট। এই নীতিমালা আল্লাহ তাআলার উলুহিয়্যাত ও প্রভুত্বের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। আসমান ও জমিনের সবকিছু যেহেতু আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি, সেহেতু সর্বক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব ও নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁরই। যিনি ইলাহ, তিনিই একমাত্র আইন ও বিধান দেওয়ার অধিকার রাখেন। কুরআনে এ বিষয়ে অসংখ্য সুস্পষ্ট আয়াত বিদ্যমান।
এখন যদি আমরা গভীরভাবে চিন্তা করি, তবে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ভোট প্রদানের মাধ্যমে মূলত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের আইন প্রণয়নের পূর্ণাঙ্গ অধিকার প্রদান করা হয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ভোট দেওয়ার অর্থ দাঁড়ায়—নিজেদের জন্য ‘সাইয়্যিদ’ নির্ধারণ করা। কোনো মুসলিমের এ বিষয়ে সামান্যতম সংশয়ের সুযোগ নেই যে, প্রকৃত ‘আস-সাইয়্যিদ’ (السيد) এবং প্রকৃত ‘আল-মুতা’ (المطاع) একমাত্র আল্লাহ তাআলাই। ‘আস-সাইয়্যিদ’ হলেন তিনি, যার কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব প্রশ্নাতীত; আর ‘আল-মুতা’ হলেন তিনি, যার আদেশ অমান্য করা যায় না। সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের অর্থ দাঁড়ায়—হালাল ও হারাম নির্ধারণের উদ্দেশ্যে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছার প্রতিফলনে একজন মানুষকে প্রতিনিধি বানানো এবং তার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকা। অথচ এটি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর প্রকৃত মর্মের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে এটি সেই মুসলিমের ঘোষণারও পরিপন্থী, যে বলে—আমি নিজেকে আল্লাহর পূর্ণ আনুগত্যে সোপর্দ করেছি। অর্থাৎ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমি আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে গ্রহণ করি না; আল্লাহ ছাড়া কাউকে আইনদাতা হিসেবে মানি না; এবং আল্লাহর বিধানের বিপরীতে কোনো মানবপ্রণীত বিধান আমি গ্রহণ করি না।
এই দৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসক বলতে কেবল শাসনকার্য পরিচালনাকারী ব্যক্তিকে বোঝানো হয় না; বরং বিশেষভাবে তাকেই বোঝানো হয়, যিনি সব ধরনের আইন প্রণয়নের অধিকার রাখেন—চাই তা শরিয়াহর সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিকই হোক না কেন। মোটকথা, ‘হাকিমিয়্যাহ’ বা সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব নির্বাচিত শাসকের জন্য সাব্যস্ত করা হয়, অথচ তা ছিল একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য নির্দিষ্ট। যে গুণটি কেবল আল্লাহর জন্য নির্ধারিত, নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণ সেটিকেই মানুষের জন্য সাব্যস্ত করে। এ হিসেবে বলা যায়, নির্বাচনের মাধ্যমে তারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্য সত্তাকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করছে। সুতরাং এটি শিরক ছাড়া আর কিছুই নয়।
নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও ভোট প্রদানের শারয়ি বিধান
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বা ভোট প্রদানকারীদের ঢালাওভাবে বিচার করা শাস্ত্রীয় নিয়ম নয়। তাদের উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় চারভাগে বিভক্ত করা যায় :
আদর্শিক গণতান্ত্রিক : যারা মনেপ্রাণে গণতন্ত্রের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী এবং শরিয়তের বিপরীতে জনগণের রায়কে চূড়ান্ত মনে করে—তারা স্পষ্ট কুফরে লিপ্ত।
অজ্ঞ ও সাধারণ শ্রেণি : যারা ইসলাম ও গণতন্ত্রের মৌলিক পার্থক্য সম্পর্কে অজ্ঞ এবং একে কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা মনে করে—শরয়ি ওজরের কারণে তাদের কাফির বলা যাবে না।
আলিমদের অনুসরণকারী : যারা একদল আলিমের ভুল ব্যাখ্যা বা কৌশলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভালো উদ্দেশ্যে ভোট দেয়—ভুল পদ্ধতিতে থাকলেও তাদের ওপর ওজর প্রযোজ্য হবে।
কৌশলগত অংশগ্রহণকারী : যারা গণতন্ত্রকে কুফর মনে করেও একে কেবল একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার নিয়ত রাখে—তাদের এই ইজতিহাদ বা ব্যাখ্যা ভুল হলেও তারা কাফির হবে না।
তাকফির ও আমাদের সতর্কতা
গণতন্ত্র একটি কুফরি ব্যবস্থা হওয়া এবং গণতন্ত্রে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিকে 'কাফির' সাব্যস্ত করার মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর মূলনীতি হলো—কোনো নির্দিষ্ট মুসলিম ব্যক্তিকে কাফির বলার আগে তার ওপর 'হুজ্জাত' (প্রমাণ) কায়েম হওয়া এবং তাকফিরের প্রতিবন্ধকতাগুলো (যেমন: অজ্ঞতা, ভুল ব্যাখ্যা, জবরদস্তি ইত্যাদি) অনুপস্থিত থাকা আবশ্যক।
তাকফিরের প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো :
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সঠিক জ্ঞানের অভাব।
শরিয়তের দলিলের ভুল ব্যাখ্যা বা ভুল অনুধাবন।
জোর-জবরদস্তি বা নিরূপায় অবস্থা (Ikrah)।
অনিচ্ছাকৃত বা ইজতিহাদগত ভুল।
মোটকথা, গণতন্ত্র এবং এর অন্যতম অনুষঙ্গ নির্বাচন একটি কুফরি ব্যবস্থা—এ বিষয়ে আমাদের কোনো সংশয় নেই। দলিল ও উসূলের আলোকে এ সত্য সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। তবে বাস্তবতায় বর্তমানে যে সব ইসলামি দল গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং যাদের আহ্বানে জনগণ ভোট প্রদান করে—তাদের তাকফিরের ক্ষেত্রে একাধিক প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। সে কারণে তাদেরকে সরাসরি কাফির বলে ফতোয়া দেওয়ার সুযোগ নেই। দুঃখজনকভাবে কেউ কেউ গণতন্ত্রকে কুফরি ব্যবস্থা বলে জানার পর এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তিকে নির্বিচারে কাফির ঘোষণা করে বসে। এ ধরনের গণহারে তাকফির করা মারাত্মক বিভ্রান্তিকর এবং শরিয়তসম্মতভাবে সম্পূর্ণ ভুল। এটি সুস্পষ্টভাবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর নীতির পরিপন্থী।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর মানহাজ হলো—কুফরি কথা, কর্ম বা ব্যবস্থাকে কুফর হিসেবে চিহ্নিত করা এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর তাকফির আরোপ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা। কারণ তাকফিরের জন্য শর্ত পূরণ হওয়া এবং প্রতিবন্ধকতা দূর হওয়া আবশ্যক। এ মূলনীতি উপেক্ষা করে আবেগতাড়িত ও সাধারণীকৃত তাকফির করা দ্বীনের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং উম্মাহকে ভয়াবহ বিভক্তির দিকে ঠেলে দেয়। তাই আমরা উসুলিভাবে গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থাকে কুফরি ও শিরকি ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করি, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে কাউকে কাফির বলার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করি। কোনো ধরনের পার্থক্যকরণ বা তাফসিল না করে ঢালাওভাবে তাকফির করা সঠিক নয়, আর এটি আমাদের মানহাজও নয়। এ ব্যাপারে সতর্কতা কাম্য।
চলবে ইনশাআল্লাহ
✍️
Collected
Comment