ধরাছোঁয়ার বাইরে গুমের সিন্ডিকেট, দেশ ছেড়ে নিরাপদে পালিয়েছে অনেকেই

বলপূর্বক গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। অন্তত ২৫ জন সেনা কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোয় এমন অপরাধী বেশকিছু কর্মকর্তা এখনো ‘ইন সার্ভিসে’ রয়ে গেছে। তাদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা সত্ত্বেও কোনো কাজ হয়নি। এমনকি চিহ্নিত এই অপরাধীদের বাধ্যতামূলক অবসরে পর্যন্ত পাঠানো হচ্ছে না। ফলে গুমের বিচার ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে।
গুমের তদন্ত, অনুসন্ধান ও বিচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র গণমাধ্যমকে জানায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) থেকে ১১ জন অবসরপ্রাপ্ত ও এলপিআরে থাকা জেনারেল ও সিনিয়র পর্যায়ের সেনাকর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং তাদের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের পাসপোর্ট বাতিল করেছিল। একজন ছাড়া বাকি ১০ জন ঊর্ধ্বতন সেনাকর্মকর্তা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টেই ছিল। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল করা হয়নি। কয়েকমাস আগে তারা সীমান্ত অতিক্রম করে নিরাপদে ভারতসহ অন্যান্য দেশে পালিয়ে গেছে।
পতিত শেখ হাসিনার শাসনামলে (২০০৯-২০২৪) বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় মদদে সংঘটিত গুম এক বিভীষিকায় পরিণত হয়। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, ওই সময় তিন হাজার ৫০০ ব্যক্তিকে গুম করা হয় (হিউম্যান রাইটস ওয়াচ)। এদের মধ্যে ছিল সাবেক সেনাকর্মকর্তা, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, বিভিন্ন পেশাজীবী, সাংবাদিক এবং অন্যান্য নিরীহ ব্যক্তি। গুম কমিশনে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৮৫০ জনের গুমের অভিযোগ দায়ের হয়েছে। কমিশনের মতে, এখনো নিখোঁজ ২১১ জন হয়তো আর কখনোই ফিরে আসবে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ও গুম কমিশনের অনুসন্ধান প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গুমের ‘সুপিরিয়র কমান্ড’ ছিল শেখ হাসিনা স্বয়ং। তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক ছিল গুমের ‘মাস্টারমাইন্ড’।
নির্দেশদাতাদের অন্যতম ছিল তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। আর গুম-খুনের ভয়ঙ্কর ব্যক্তিটি ছিল সেনাকর্মকর্তা মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসান। গুম-খুনের বর্বরতায় জিয়াউল আহসান কুখ্যাত নায়ক ও নৃশংসতার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। গুম হওয়া ব্যক্তিদের নিজ হাতে খুন করার সময় সে ভিকটিমের মাথার কাছে অস্ত্র নিয়ে গুলি করত। কারণ গুলির পর ভিকটিমের ছিটকে আসা গরম রক্ত ও মগজ শরীরে পড়লে সে এক ধরনের পৈশাচিক ফিলিংস অনুভব করত।
জিয়াউল আহসান কতটা ভয়ংকর ও অমানবিক ছিল তার আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে, সে কীভাবে খুন করে তার একটি ঘটনা স্ত্রীকে দেখানোর জন্য ঘটনাস্থল বরিশালের এক নদীতে নিয়ে গিয়েছিল। গুম হওয়া ব্যক্তিকে রাতে ওই নদীতে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয় এবং তার স্ত্রী এই নৃশংস হত্যার দৃশ্য উপভোগ করে। শেখ হাসিনার খুবই ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন ছিল জিয়াউল আহসান। জাহাঙ্গীর কবির নানকের মাধ্যমে সে হাসিনার প্রিয়ভাজন হয়। নানক তাকে দিয়ে দুটি খুন করিয়েছিল। এরপর হাসিনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। তাকে দিয়ে যা ইচ্ছা তা করানো যাবে, তাই হাসিনা তাকে কাছে টেনে নেয়। সপ্তাহে একদিন গণভবনে গিয়ে সে হাসিনার সঙ্গে খাবার খেত।
গুম কমিশন থেকে জানা গেছে, গুমের ঘটনায় প্রধান ভূমিকা ছিল রাষ্ট্রের ৫টি নিরাপত্তা সংস্থার। এগুলো হলো র্যাব, পুলিশ, ডিবি, সিটিটিসি ও এনটিএমসির। এছাড়া জড়িত ছিল সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই ও জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের বিরুদ্ধেও গুমে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া যায়। গুম করে ভিকটিমদের গোপন বন্দিশালা আয়নাঘরে বন্দি করে রাখা হতো।
তাদের ওপর ভয়ঙ্কর নির্যাতন চালানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। গুম করে অনেককেই নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে এবং লাশের চিহ্ন যাতে পাওয়া না যায় সেজন্য পেট ফেড়ে ইট-বালু ভরে কিংবা ভরা সিমেন্টের বস্তার সঙ্গে বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে। ঢাকার বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বরিশালের কয়েকটি নদী এবং সুন্দরবনের নদী হয়েছে অনেক লাশের ঠিকানা। কমিশনের তথ্যে উঠে এসেছে গুম হওয়া বহু ব্যক্তির নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা। তাদের অস্বাস্থ্যকর সেলে বন্দি রাখা, গোপনাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া, ঘূর্ণায়মান চেয়ারে বসিয়ে নির্যাতন, উল্টো করে ঝুলিয়ে মারধর, ঠোঁট সেলাই ইত্যাদি বিভিন্ন কায়দায় নির্যাতন করা হতো।
গুম কমিশনের রিপোর্ট থেকে আরো জানা যায়, ডিজিএফআইর জেআইসি এবং র্যাবের টিএফআই সেল ছিল মূল আয়নাঘর। দেশব্যাপী এমন অসংখ্য গোপন বন্দিশালা বা আয়নাঘরের সন্ধান পেয়েছে কমিশন। তাদের পক্ষ থেকে সারা দেশের এমন ১৪টি আয়নাঘর পরিদর্শনও করা হয়েছে। কমিশন সেগুলো যেভাবে আছে সেভাবে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। আরও জানা গেছে যে, গোপন বন্দিশালায় এমন ব্যক্তিরাও দেখা করত যারা হিন্দিসহ অন্যান্য বিদেশি ভাষায় কথা বলত। গুম করে অনেক ভিকটিমকে সীমান্তের ওপারে ভারতীয় বাহিনীর হাতেও তুলে দেয়া হয়েছে।
গুম কমিশন তাদের অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, গুমের ঘটনায় সেনাবাহিনী প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দায়ী নয়। তবে তারা গুমের ঘটনা জানতো না, এটা বলার সুযোগ নেই। কারণ সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে বলেছে যে, দুইজন সেনা সদস্য তার কাছে আশ্রয় চেয়েছে, তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে চায় না। গুম কমিশন ১,৮৫০ জনের গুমের অভিযোগ পর্যালোচনা করে ২৫৩ জনের একটি তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি করেছে যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গুম হয়েছিল।
এক দশকের বেশি সময় ধরে তারা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। কিন্তু তারা অভিজ্ঞতার যে কাহিনি গুম কমিশনকে পৃথকভাবে বর্ণনা করেছেন, তা অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল। এমন ঘটনা কাকতালীয় হওয়া সম্ভব নয়। এমনকি এটা হাতেগোনা কিছু অবাধ্য কর্মকর্তার বিচ্ছিন্ন অপরাধও হতে পারে না। গুমের এসব ঘটনা একটি সাংগঠনিক ও পদ্ধতিগত কাঠামোর অস্তিত্ব নির্দেশ করে।
এত মানুষ গুম করার কারণ কী?
গুম কমিশন, আইসিটি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, শেখ হাসিনার প্রতিহিংসা চরিতার্থ, আওয়ামী লীগের সমালোচনাকারীদের দমন, জামায়াত-শিবির দমন, বিএনপির পটেনশিয়াল নেতাদের শেষ করে দেওয়া, ভারতবিরোধী লোকদের দমন এবং মাদ্রাসা ও ইসলামের পক্ষের আলেম-ওলামা যাতে কোনো ধরনের অবস্থান সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য জঙ্গি তকমা দিয়ে গুম করে দমন করাই ছিল উদ্দেশ্য।
গুম কমিশন থেকে আরো জানা গেছে, গুম হওয়া ব্যক্তিদের সম্ভাব্য চার ধরনের পরিণতি হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে;
গুম হওয়া ভিকটিমকে হত্যা করা।
বিচারের আগেই ভিকটিমকে মিডিয়ার সামনে উপস্থাপনা করে জঙ্গি তকমা দিয়ে ফৌজদারী মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো।
ভিকটিমকে সীমান্ত পার করে ভারতের পাঠিয়ে ভারতীয় বাহিনীর মাধ্যমে গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা করা।
এবং ভিকটিমের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে খুব অল্পসংখ্যক ক্ষেত্রে মামলা না দিয়ে ছেড়ে দেয়া।
বাহিনীগুলোতে গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা
রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোতে এখনো গুমের সঙ্গে জড়িতরা অপরাধীরা রয়ে গেছে। এদের চিহ্নিত করে আইসিটি ও গুম কমিশন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করেছে। কিন্তু তারা সেখানে বহাল তবিয়তে আছে। অনুসন্ধানে অনেকের নাম জানা গেছে। সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তা র্যাব, ডিজিএফআই, এনএসআই, এনটিএমসি ও সিটিটিসিতে প্রেষণে থাকাকালে গুমে ভয়াবহভাবে জড়িয়ে পড়ে। তেমনি গুমের অপরাধী কর্মকর্তারা র্যাব, পুলিশ, বিজিবিতে রয়েছে।
সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন প্রধানরা অবসর নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। জড়িতদের মধ্যে মেজর জেনারেল শেখ মোহাম্মদ সরওয়ার হোসেন, মেজর জেনারেল কবির আহমেদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তানভীর মাযহার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল সরওয়ার মোস্তফা, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম আজাদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কামরুল হাসান, কর্নেল মাহবুব আলম, কর্নেল মোমেন, লে. কর্নেল সরওয়ার বিন কাশেম (র্যাব ইন্ট.), লে. কর্নেল মশিউর রহমান, লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন উল্লেখযোগ্য। নৌবাহিনীর কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহাইয়েল অপহরণ ও গুম খুনে জিয়াউল আহসানের মতোই ছিল দুর্ধর্ষ। সে বর্তমানে জেলে আছে।
পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) সাবেক প্রধান মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান গুমে জড়িত এক দুর্ধর্ষ অপরাধী। বর্তমানে আসাদুজ্জামান পলাতক রয়েছে। সে ১৮ ব্যাচের কর্মকর্তা। শেখ হাসিনার আমলে তথাকথিত ক্রসফায়ারে যারা হত্যার শিকার হয় বেশির ভাগই আসাদুজ্জামান ও তার ডান হাত হিসেবে পরিচিত এসপি আরিফুর রহমান মণ্ডলের হাতে হয়েছে। সাবেক আইজি শহীদুল আলমের নির্দেশে এবং পলাতক এসবি প্রধান মনিরুলের আশীর্বাদপুষ্ট তারা। আরিফুর রহমান মণ্ডল ছিলেন সিরাজগঞ্জের সাবেক এসপি।
র্যাবের গুম স্কোয়াডে আলেফ উদ্দিন ছিল একজন দুর্ধর্ষ গুমকারী। তেমনি ছিল শাহ মোহাম্মদ মশিউর রহমান। গুমে জড়িত ছিল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন ফারুকী। সে র্যাব-২ দায়িত্ব পালন করত। বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছে। সিসিটিসির গুম স্কোয়াডে ছিল মাহতাব উদ্দিন ও ইশতিয়াক আহমেদ, ওবাইন, মেজবাহ উদ্দিন, আতিকুর রহমান চৌধুরী, আহমেদউল ইসলাম। তারাও অনেক গুমের সঙ্গে জড়িত। র্যাবের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাকিল আহমেদ ও জসিম উদ্দিন এবং এডিসি ইমরানও গুমে জড়িত কর্মকর্তা।
র্যাবের গুম-খুন-নির্যাতন
গুমের জন্য র্যাবপ্রধানও দায়ী। সর্বাধিক গুম করেছে র্যাব এবং তাদের সদস্যরা। র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন বা টিএফআই সেল র্যাব-১ সদর দপ্তরে অবস্থিত। এটিকে র্যাব একাধিক সংস্থার যৌথ জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করত। বাস্তবে এটি পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হতো র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সরাসরি তত্ত্বাবধানে। এটি র্যাবের মূল গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’। যেমন জেআইসি ডিজিএফআইর মূল বন্দিশালা বা আয়নাঘর। র্যাবের টিএফআই সেলে হাজার হাজার মানুষকে দিনের পর দিন, মাস কিংবা বছর অন্ধকার কক্ষে চোখ ও হাত-পা বেঁধে আটকে রাখা হতো।
গুম কমিশনে ৩৮টি সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, এ কেন্দ্রে বন্দিদের পিটিয়ে, বিদ্যুৎ শক দিয়ে, উল্টো ঝুলিয়ে, মাথা ঘুরিয়ে এমনকি শরীরের অঙ্গ ছিঁড়ে নির্যাতন করা হতো। শিশু ও মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিরাও নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পাননি। নারীদেরও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো। এই সেলটির পরিচালনায় সেনা সদস্যরাই মূলত নিয়োজিত ছিল। তবে পুলিশের সদস্যরাও এসব অভিযানে অংশ নিত। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে র্যাবের অপহৃত বা ডিজিএফআইর হেফাজত থেকে আনা ব্যক্তিদের এই গোপন বন্দিশালায় আনা হতো। অনেক ক্ষেত্রে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া বা রেললাইনে শুইয়ে দেওয়া হতো, যাতে খোঁজ ও শনাক্তকরণ অসম্ভব হয়।
জিয়াউল আহসানের আরো নৃশংসতার কাহিনি
গুম খুনের কুখ্যাত নায়ক মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসান একজন সিরিয়াল কিলার হিসেবে ১ হাজার ৩০টি খুন করার কাহিনি গণমাধ্যমে-এ এর আগে প্রকাশ হয়েছে। তার নৃশংসতার আরো ঘটনা জানা গেছে। মেজর জেনারেল (অব.) তারিক সিদ্দিকের নির্দেশেই বেশির ভাগ গুম খুন সে করেছে। তারিক সিদ্দিক নির্দেশ দিতে বিলম্ব করলেও জিয়াউল গুম করতে বিলম্ব করত না। বিশেষ করে র্যাবের গোয়েন্দা প্রধান থাকাকালে বেশির ভাগ গুম খুন সে করেছে। র্যাব ও এনটিএমসিতে সে সেনাবাহিনী থেকে বাছাই করে দুর্ধর্ষ প্রকৃতির (খুনি) কর্মকর্তাদের প্রেষণে আনত। দেখা যেতো র্যাব-১ দিয়ে গুম করাত, রাখত র্যাব-৪ এ, আর খুন করাত র্যাব-৭ দিয়ে। একবার বিজিবির লেন্স নায়ক নজরুল ইসলাম নামে একজন পালিয়ে গোপালগঞ্জে আত্মগোপন করে।
জিয়াউল আহসানকে তার পরিচিত এক কর্মকর্তা বিষয়টির খোঁজ নিতে বললে জিয়াউল আহসান তাকে তুলে এনে গুলি করে সুন্দরবনের নদীতে ফেলে দেয়। ওই কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে নজরুল ইসলাম সম্পর্কে জানতে চাইলে তার উত্তর ছিল, ‘সুন্দরবনে মাছের খাবার করে দিয়েছি।’ অথচ ওই কর্মকর্তা তাকে হত্যা করার কথা বলেনি। বরগুনার তাফালবাড়ির সংলগ্ন নদী এবং বরিশালের বিভিন্ন নদীতে নিয়ে গিয়ে অসংখ্য গুম হওয়া মানুষকে জিয়াউল আহসান হত্যা করেছে। গোয়েন্দা নজরদারির জন্য জিয়াউল আহসান প্রথম ‘এনএমসি’ তৈরি করেন। পরে একটি ‘এনটিএমসি’ নাম হয়। এটি প্রতিষ্ঠার কোনো আইনগত বৈধতা নেই। এই প্রতিষ্ঠানে ইসরায়েলের নিষিদ্ধ পেগাসাস প্রযুক্তি আনা হয়েছিল।
গুমের ক্ষেত্রে ২০০৯ থেকে ২০২৪ র্যাবের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তালিকাই দীর্ঘ। এই প্রতিষ্ঠানে জিয়াউল আহসানের ২০ থেকে ২৫ জন বিশ্বস্ত কর্মকর্তা আছে। জিয়াউল আহসান গুম খুনে ৫ থেকে ২০ জনের টিম নিয়ে ৪/৫টি গাড়িতে করে যেত। একদিনে তার সর্বোচ্চ ১৩ জনকে হত্যার রেকর্ড রয়েছে। জিয়াউল আহসানের কোর্সমেট ছিল কর্নেল মোস্তাফিজ। সে এখন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে। জিয়াউল আহসানের খুনের নেশা সম্পর্কে সে ৯ পর্বে বিভিন্ন কাহিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছে। ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের ৭ খুনের ঘটনায় জিয়াউল আহসান তারেক সাঈদকে ফাঁসিয়েছিল জেনারেল তারিক সিদ্দিকের ইশারায়। তার চক্রান্তেই নদীতে লাশ ভেসে ওঠে এবং তারেক সাঈদ এ ঘটনায় ফেঁসে যায়। শুধু হাসিনা সিন্ডিকেটের গুমই নয়, জিয়াউল আহসান ভাড়াটে খুনি হিসেবে অনেক খুন করেছে। পরকীয়া, জমিসংক্রান্ত ও ব্যবসায়িক বিরোধ এমনকি মাছের ব্যবসা এবং অন্যান্য বিষয়েও সে টাকার বিনিময়ে খুন করিয়ে দিত।
গুমের কাঠামো ছিল তিন স্তরবিশিষ্ট পিরামিডের মতো
গুম কমিশন থেকে জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার আমলে গুমের যে কাঠামো চলমান ছিল, তা তিন স্তরবিশিষ্ট পিরামিডের মতো। পিরামিডের শীর্ষে ছিল কৌশলগত স্তর, যেখানে শেখ হাসিনা, জেনারেল তারিক সিদ্দিক, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যাদের গুম ও বিচারবহির্ভুত হত্যার আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা ছিল। এর নিচে ছিল নির্বাহী স্তর, যেখানে ছিল জ্যেষ্ঠ জেনারেল, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার শীর্ষ সদস্য। এদের মাধ্যমেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশ সরাসরি বাস্তবায়নের পর্যায়ে আসতো এবং এই ব্যক্তিরাই সম্পৃক্ততার সাক্ষ্য দিতে সক্ষম।
সর্বনিম্ন স্তরে ছিল কার্যকর। নিরাপত্তা বাহিনীর নিম্নপদস্থ সদস্যরা যারা উপরের নির্দেশ অনুযায়ী অপারেশন পরিচালনা করত বা টিমে থাকত। এই প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ডিজিএফআইর যেসব জেনারেল ছিল গুমের আদেশ দেয়ার সময় তারা কার্যত সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশেষ করে শেখ হাসিনা ও জেনারেল তারিক সিদ্দিকের মধ্যবর্তী সংযোগকারীর ভূমিকায় ছিল। জেনারেল আকবর গুম কমিশনকে জানান যে, জেআইসির ভুক্তভোগী হুম্মাম কাদের চৌধুরীর বিষয়টি সে সরাসরি শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করে। ডিজিএফআইর একজন জুনিয়র কর্মকর্তা কমিশনকে বলে, সে নিজে পরিচালককে এক বন্দির ভবিষ্যত নিয়ে এমনভাবে কথা বলতে শুনেছিলেন তাতে স্পষ্ট ছিল, শেখ হাসিনা ওই বন্দি সম্পর্কে অবগত ছিল এবং এ বিষয়ে নিজস্ব মতও প্রকাশ করেছিল। যারা শেখ হাসিনার কমান্ড রেস্পন্সিবিলিটি প্রমাণ করতে পারতো, সে সাক্ষ্যদাতারা পালিয়েছে।
দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলছে গুম কমিশনের সদস্যরা
দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গুম কমিশনের সদস্যরা বলেছেন, গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে এটা বাহিনীগুলোর ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলার পাশাপাশি দেশের জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির সম্মুখীন করবে।
এ বিষয়ে গুম কমিশনের সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, গুমের অপরাধী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দেশের নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হবে। তিনি বলেন, আইসিটি যে ১১ জন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল, তাদের পালিয়ে যেতে দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ডিজিএফআইর সাবেক ডিজিরাও রয়েছে। ফলে তাদের বিচারের সম্মুখীন করা যাচ্ছে না। তারা পালিয়ে যাওয়ায় যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে তা হলো- তারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বৈরী রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাকে সরবরাহ করে দেবে কিংবা ওই গোয়েন্দা সংস্থাই তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে নেবে। এটা দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
নাবিলা ইদ্রিস বলেন, এদের পালিয়ে যেতে দেওয়ার মাধ্যমে বৈরী দেশের গোয়েন্দা বাহিনীর হাতে তাদের এক অর্থে সোপর্দ করা হয়েছে। অথচ তাদের পাসপোর্ট বাতিল করা ছিল এবং তারা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টেই ছিল। সহজেই তাদের গ্রেপ্তার করা যেত। তিনি আরো বলেন, গুমের অপরাধী যারা চাকরিতে বহাল আছে, তারা পদে পদে বৈরী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার ব্লাকমেইলের শিকার হবে। সে যে গুমের জন্য অপরাধী সেটা যেন মানুষ জেনে না যায় সেজন্য বাঁচার লক্ষ্যে তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচার করবে। সেটা সেনাবাহিনী কিংবা অন্যান্য বাহিনীকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। যে একজন মেজর বা ক্যাপ্টেন আছে এবং গুমের সঙ্গে জড়িত, তাদের লম্বা ক্যারিয়ার। তারা দেশকে ঝুঁকিতে ফেলে দেবে।
তথ্যসূত্র:
১. গুমের অপরাধী সিন্ডিকেট এখনো বিচারের বাইরে
– https://tinyurl.com/36cw2czm
Comment