
মাসখানেক আগে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন মংডুর ওয়ামইজ্জাদি পাড়ার বাসিন্দা জাকির হোসেনের ছেলে ইয়াসির আরাফাত (৩০)। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মিলিটারিরা এনভিসি কার্ড নিতে রোহিঙ্গাদের বাধ্য করছে। তারা (মিলিটারিরা) পাড়ায় পাড়ায় এসে রোহিঙ্গাদের বলছে, “এনভিসি কার্ড নিলে কিছু করব না। আর যদি না নাও তাহলে পুড়িয়ে মারব।”’
বাংলাদেশে আসার পর ইয়াসির দুবার রাখাইনে গিয়েছিলেন। একবার মা-বাবাকে এবং দ্বিতীয়বার ভাইকে নিয়ে আসতে তিনি দেশে ফিরে যান।

বুচিদং হরমুরা পাড়ার আব্দুর রহিমের ছেলে আব্দুর রহমান মোবাইল ফোনে বলেন, ‘বৌদ্ধরা আমাদের পাড়ায় এসে বলে, “তোমাদের এনভিসি কার্ড নিতে হবে। যদি এনভিসি কার্ড নাও, তাহলে তোমরা যেকোনও বাস, গাড়িতে চড়তে পারবা। দেশের যেকোনও জায়গায় যেতে পারবা। আর না নিলে তোমাদের মিলিটারিরা এখানে থাকতে দিবে না।” মোবাইল ফোনে সৈয়দ নূর নামে রাখাইনে থাকা আরেক রোহিঙ্গাও একই অভিযোগ করেন।
শুধু ইয়াসির, আব্দুর রহমান ও সৈয়দ নূর নয়, গত সপ্তাহে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের কাছে জানতে চাইলে তারাও জোর করে এনভিসি কার্ড দেওয়ার কথা জানান।

এনভিসি কার্ড না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যদি আমরা এই কার্ডটি নেই, তাহলে আমাদের যেসব সম্পদ আছে সব হুকুমতের (সরকার) হয়ে যাবে। আমরা শুধুমাত্র ৫০ হাজার কিয়াতের মালিক হতে পারব। আমাদের বাকি স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হুকুমত নিয়ে যাবে। এছাড়া, যে কার্ডটি দেওয়া হচ্ছে তাতে আমাদের রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। তাই আমরা এটি গ্রহণ করতে আগ্রহী নই।’
১৯৮২ সালের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনে মিয়ানমারের প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়। এতে মিয়ানমারে বসবাসকারীদের Citizen, Associate এবং Naturalized পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। এমনকি দেশটির সরকার রোহিঙ্গাদের প্রাচীন নৃগোষ্ঠী হিসেবেও স্বীকৃতি দেয়নি। ১৮২৩ সালের পর আগতদের Associate আর ১৯৮২ সালে নতুনভাবে আবেদনকারীদের Naturalized বলে আখ্যা দেওয়া হয়।
ওই আইনের ৪ নম্বর ধারায় শর্ত দেওয়া হয়, ‘কোনও জাতিগোষ্ঠী রাষ্ট্রের নাগরিক কিনা তা আইন-আদালত নয়; নির্ধারণ করবে সরকারের নীতিনির্ধারণী সংস্থা কাউন্সিল অব স্টেট।’ এ আইনের কারণে রোহিঙ্গারা ভাসমান জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত হয়। পরে ২০১২ সালে রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হোয়াইট কার্ড দেওয়া হয়েছিল। ২০১৫ সালে সেটিও বাতিল করে দেওয়ার পর জাতীয়তার স্বীকৃতিস্বরূপ রোহিঙ্গাদের আর কোনোকিছুই দেওয়া হয়নি।
সম্প্রতি সেনা অভিযানের কারণে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসলে আন্তর্জাতিক চাপের কারণে রাখাইন প্রদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড (এনভিসি) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় মিয়ানমার সরকার। জাতীয় যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ১ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ার আওতায় ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সাত হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে এনভিসি কার্ড দেওয়া হয়েছে।
চীনের সিনহুয়া নিউজ এজেন্সিকে উদ্ধৃত করে বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন উপদেষ্টা কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী এ যাচাইকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। রাখাইনের অভিবাসন ও জনসংখ্যাবিষয়ক বিভাগের পরিচালক উ অং মিনের উদ্ধৃতি দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রদেশটির যেসব এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে সেখানে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করে এ যাচাইকরণের কাজ চলছে।
Source
Comment