আর্থিক সংস্কারে ইমারাতে ইসলামিয়ার টেকসই সাফল্য: ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতার নতুন অধ্যায়

দীর্ঘ কয়েক দশকের যুদ্ধ, বিদেশি হস্তক্ষেপ, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে আফগানিস্তানের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা একসময় গভীর সংকটের মুখে পড়ে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনসাধারণের আস্থা দুর্বল হয়ে যায়, বিনিয়োগ কার্যক্রম স্থবির হতে শুরু করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন এক কঠিন বাস্তবতায় ইমারাতে ইসলামিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর দেশটির আর্থিক খাতকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সেই পদক্ষেপগুলো আজ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো একটি নির্ভরযোগ্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা। মানুষের সঞ্চয়, ব্যবসায়িক লেনদেন, বিনিয়োগ এবং আর্থিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ব্যাংক। ফলে ব্যাংকিং খাতে আস্থা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তা সমগ্র অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফগানিস্তানের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, আফগানি মুদ্রার মূল্য সংরক্ষণ, মুদ্রাস্ফীতি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
আর্থিক সংস্কারের মূল উদ্যোগ ও অর্জন
কেন্দ্রীয় ‘দা আফগানিস্তান ব্যাংক’ (DAB) গত এক বছরে ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক সংস্কার বাস্তবায়ন করেছে। ডিএবি-এর প্রথম উপ-মহাব্যবস্থাপক সিদ্দিকুল্লাহ খালিদের মতে, এই সময়ে ব্যাংকিং খাতের সম্পদ প্রায় ১৫ বিলিয়ন আফগানি, মুনাফা ৩.৪ বিলিয়ন আফগানি এবং মূলধন ৩ বিলিয়ন আফগানি বৃদ্ধি পেয়েছে। জনগণের ব্যাংক আমানতের ওপর থেকে বিধিনিষেধ শিথিল করার ফলে গত বছরের শেষ তিন মাসেই আমানত বেড়েছে ৭.৯ বিলিয়ন আফগানি। এই সূচকগুলো ব্যাংকিং খাতে ফিরে আসা জনআস্থার স্পষ্ট প্রমাণ।
আফগানি মুদ্রার স্থিতিশীলতা এই সাফল্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিগত চার বছর ধরে ডলারের বিপরীতে আফগানি মুদ্রার মান অটুট রয়েছে। ১৪৪৬ হিজরি সনে (জুলাই ২০২৪-জুন ২০২৫) আফগানি মুদ্রা ডলারের বিপরীতে ০.৭৯ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছে। ডিএবি কর্তৃক বৈদেশিক মুদ্রা রপ্তানির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ, মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্রগুলোর নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং সক্রিয় বাজার ব্যবস্থাপনার ফলেই এই স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব হয়েছে।
ইসলামি ব্যাংকিং সম্প্রসারণ
ব্যাংকিং খাতের ইসলামিকরণ এই সংস্কারের অন্যতম স্তম্ভ। সুদভিত্তিক ব্যাংকিং সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে সব বাণিজ্যিক ব্যাংককে শরিয়াহ-সম্মত আর্থিক সেবা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি আয়োজিত এক বৈঠকে সিদ্দিকুল্লাহ খালিদ জানান, ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণ ইসলামিকরণের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং শিগগিরই কয়েকটি ব্যাংককে সম্পূর্ণ ইসলামি ব্যাংকিং লাইসেন্স প্রদান করা হবে।
ইসলামি আর্থিক সেবার পরিধিও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রায় ১৬ হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইসলামি অর্থায়ন পেয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৭১ শতাংশ বেশি। স্থানীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ডিজিটাল ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি
আধুনিক ব্যাংকিং সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণে জোর দিয়েছে ইমারাতে ইসলামিয়া। গত বছরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৬২টি নতুন ব্যাংক শাখা ও উপ-শাখা চালু করা হয়েছে। তিনটি ব্যাংক শাখাবিহীন ব্যাংকিং লাইসেন্স পেয়েছে এবং চারটি ব্যাংক মাইক্রোফাইন্যান্স উইন্ডো প্রতিষ্ঠার অনুমোদন পেয়েছে।
আর্থিক সেবার মান উন্নয়নে মানবসম্পদ উন্নয়নও অগ্রাধিকার পেয়েছে। ইমারাতে ইসলামিয়া ক্ষমতা গ্রহণের আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া আফগানিস্তান ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স (AIBF) পুনরায় চালু করা হয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, বিশেষায়িত দক্ষতা এবং ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার গুণগত মান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি
আর্থিক খাতের এই সংস্কার দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির অংশ। ইমারাতে ইসলামিয়া তার জাতীয় বাজেট সম্পূর্ণভাবে দেশীয় রাজস্ব থেকে অর্থায়ন করছে, যা অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার একটি বড় অর্জন। কাস্টমস সংস্কার, দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ এবং রাজস্ব সংগ্রহ ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সরকারি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জাতীয় ক্রয় কমিশন চলতি বছরের জন্য ১২৮টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করেছে, যার মোট ব্যয় ৬২.১ বিলিয়ন আফগানি—যা সম্পূর্ণভাবে দেশীয় রাজস্ব থেকে অর্থায়িত। এছাড়া, সম্প্রতি অর্থনৈতিক কমিশন ইমারাতে ইসলামিয়ার অর্থনৈতিক নীতি অনুমোদন করেছে, যার লক্ষ্য বিনিয়োগ আকর্ষণ, দেশীয় উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন।
আজিজি ব্যাংকের প্রধান মীরওয়াইস আজিজি এক সাক্ষাৎকারে কঠিন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আফগানিস্তানের ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে বিস্ময়কর বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, আর্থিক খাতের এই স্থিতিশীলতা জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
উন্নয়নের সকল সূচকেই ক্রমাগত উন্নতি করে যাচ্ছে ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান। ইতিমধ্যে ইসলামি শাসনের সুফল ভোগ করতে শুরু করেছে জনগণ; সর্বত্রই সততা, নিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়ণতার স্পষ্ট প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থার সংস্কার, ইসলামি অর্থনীতি বাস্তবায়ন এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসার—এই ধারা অব্যাহত থাকলে আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতে আফগানিস্তান নামধারী উন্নত দেশগুলোকেও অর্থনৈতিক-সামরিক-সামাজিক সকল দিক দিয়েই ছাড়িয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
তথ্যসূত্র
1. The Lasting Victories of Monetary and Banking Reform
– https://tinyurl.com/mwemdpzx
2. Commentary Afghanistan on Track for Self-Sufficiency, Economic Stability, and Regional Autonomy
– https://tinyurl.com/4b2c7unn


Comment