আল হিকমাহ মিডিয়া পরিবেশিত
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- পঞ্চম পর্ব
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- পঞ্চম পর্ব
ইসলামী আন্দোলনসমূহ: ইসলামী সমাজ নির্মাণে তাদের কর্মপদ্ধতি
বর্তমানে অধিকাংশ ইসলামী আন্দোলন এলোমেলো পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে এক সঙ্কটকাল অতিক্রম করছে। এই অবস্থায় তাদের চিন্তাধারা, মানহাজ এবং মত অনুসারে ইসলামী সমাজ নির্মাণের অনেকগুলো পথ ও পন্থা রয়েছে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা অন্তর্দৃষ্টি খুলে দিয়ে যাদেরকে সঠিক পথের দিশা দান করেছেন, তাঁদের কাছে এই সমস্ত জামাতের দুর্বলতা, ভঙ্গুর কর্মপন্থা ও কার্যক্রমের অসারতা একদম স্পষ্ট। এ বিষয়গুলো এক পাশে রাখলেও একথা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে যে, তারা এলোমেলো পদক্ষেপের এমন এক প্যাঁচ ও গোলক ধাঁধায় পড়ে গিয়েছে, যা কখনোই কোনো উপকার বয়ে আনবে না। আর এর ফলে মুখলিস যুবকদের শ্রম ও শক্তি বৃথা হয়ে যাচ্ছে, যারা ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে এবং খিলাফতে রাশেদা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছে।
আল্লাহর দ্বীনের খাদেম হে প্রিয় ভাই! আমরা কথা বাড়াব না। ভূপৃষ্ঠে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সরল ও সঠিক পথের বর্ণনা দেবার পূর্বে আমরা সংক্ষেপে কতিপয় ইসলামী দলের মানহাজ ও পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করতে চাই। এ দলগুলো কয়েক যুগ ধরে এবং কয়েক দশক যাবৎ ইসলামী সমাজ নির্মাণের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবুও উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন বা প্রাপ্তি তারা লাভ করতে পারেনি। তাদের মানহাজ নিয়ে আমার এই সংক্ষিপ্ত আলোচনার উদ্দেশ্য হলো: এমন মানহাজের অসারতা স্পষ্টরূপে তুলে ধরা, যা মুহাম্মাদ ﷺ-এর আনীত আদর্শ ও পদ্ধতির পরিপন্থী।
ভূমিকা:
নিষ্ঠাবান তাওহীদবাদীদের নিকট স্বতঃসিদ্ধ বিষয় হলো, কোনো একটি বিষয় গ্রহণ করার পূর্বে বা কোনো বিষয়ে অগ্রসর হবার পূর্বে সে বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ﷺ হুকুম ও ফয়সালা জেনে নেওয়া।
কারণ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا۟ بَيْنَ يَدَىِ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ إِنَّ ٱللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
‘মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের সামনে অগ্রণী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শুনেন ও জানেন’।[1]
মুমিনের দায়িত্ব হলো, তাঁদের মাঝে মতবিরোধপূর্ণ প্রতিটি বিষয়কে শরীয়ত দিয়ে বিচার করা। এবিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইরশাদ করেন-
فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴿النساء: ٥٩﴾
‘অতপর কোনো ব্যাপারে তোমরা যদি একে অপরের সাথে মতবিরোধ করো, তাহলে সে বিষয়টি (ফয়সালার জন্যে) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি প্রত্যাবর্তন করো, যদি তোমরা (সত্যিকার অর্থে) আল্লাহর ওপর এবং শেষ বিচারের দিনের ওপর ঈমান এনে থাকো! আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম’।[2]
একজন মুসলিম যখন এই বিষয়টি জানবেন, তখন তাঁর জন্য আবশ্যক হল নির্দ্বিধায় ও নিঃসংকোচে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে আত্মসমর্পণ করা যদি সত্যিই তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবেসে থাকেন। মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজ প্রবৃত্তির ওপর আল্লাহ-রাসূলের নির্দেশকে প্রাধান্য দেয়া। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইরশাদ করেন-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥٓ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَٰلًا مُّبِينًا ﴿الأحزاب: ٣٦﴾
‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো কাজের আদেশ করলে কোনো ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন ক্ষমতা নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়’। [3]
আল্লাহর শপথ করে বলছি হে ভাই!আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ফয়সালা বিরোধী যেকোনো সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যাত। এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর অনুসরণ এবং সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করা হারাম ও নিষিদ্ধ। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সিদ্ধান্ত অনুসরণ আমাদের জন্য যতই কষ্টদায়ক হোক না কেন! আমাদের যা শেখানো হয়েছে এবং আমাদের শাসকেরা আমাদের যা আদেশ করেছে তার বিপরীত হোক না কেন! কারণ, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ
“যে ব্যক্তি এমন কাজ করবে আমাদের এই দ্বীন যার ওপর নেই, তার সে কাজ প্রত্যাখ্যাত বলে বিবেচিত হবে ।”[4]
ইমাম নববী উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন,“আরবদের নিকট 'الردّ' মূলত: 'المردود'-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অর্থাৎ বাতিল এবং অগ্রহণযোগ্য। এই হাদীসটি ইসলামের একটি মৌলিক নীতি। এটি নবীজি ﷺ- এর জাওয়ামি'উল কালিম তথা সমন্বিত অর্থবোধক বাণীসমূহের একটি। উক্ত বাণীতে সব রকম বিদ‘আত, কুসংস্কার ও নব উদ্ভাবন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ব্যাপারে স্পষ্ট ঘোষণা এসেছে”।
হাফেজ ইবনে রজব হাম্বলী রহিমাহুল্লাহ "জামে' আল'উলুম ওয়াল হিকাম" গ্রন্থে লিখেছেন-
“এই হাদীসের শাব্দিক পাঠ হলো, যে বিষয় আমাদের দ্বীনে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। হাদীসটির অন্তর্নিহিত মর্ম হলো, যে বিষয় আমাদের দ্বীন ইসলামের অন্তর্ভুক্ত, তা প্রত্যাখ্যাত নয়। উক্ত হাদীসে "أمر" তথা "বিষয়" বলে বোঝানো হয়েছে 'দ্বীন ও শরীয়ত'। যেমন অন্য এক হাদীসে এসেছে —مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ অর্থাৎ-আমাদের এই দ্বীনে যে ব্যক্তি নতুন কিছু আনবে, তা প্রত্যাখ্যাত বলে বিবেচিত হবে।[5]
অতএব, সামগ্রিক অর্থ দাঁড়ালো, যে ব্যক্তির কাজ শরীয়ত বহির্ভূত হবে, যে কাজ শরীয়তের সাথে সম্পৃক্ত না হবে, তা প্রত্যাখ্যাত বলে বিবেচিত হবে। আর নবীজি ﷺ এর এই উক্তি لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا এদিকে ইঙ্গিত করছে যে, সকল কর্ম সম্পাদনকারীর কার্যাবলী শরীয়তের আলোকে বিধিবদ্ধ হওয়া অপরিহার্য। আদেশ-নিষেধ প্রতিটি ক্ষেত্রে শরীয়তের ফয়সালার অনুরূপ হওয়া অনিবার্য। অতএব, যে ব্যক্তির কাজ শরীয়ত সমর্থিত হবে, তা গ্রহণযোগ্য হবে। আর যার কাজ শরীয়ত বহির্ভূত হবে, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।
মুসলিমের কর্তব্য হলো: সত্যকে গ্রহণ করা, যদিও তা নিজ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যায়। আল্লাহর নির্দেশ সুস্পষ্টভাবে জেনে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সামনে আত্মসমর্পণ করা; কিছুতেই মুখ ফিরিয়ে না নেওয়া। কারণ, সত্য প্রত্যাশী ব্যক্তিকে সত্যের অনুকূল বাণীই সন্তুষ্ট করতে পারে। অপরদিকে বাতিলের পক্ষে অবস্থানকারীকে সে কথাই সন্তুষ্ট করতে পারে, যাতে তার নিজের বড়ত্বের আলোচনা রয়েছে। আর এর বাইরে যা কিছু হবে, বাতিলের পক্ষে অবস্থানকারী কখনোই তা গ্রহণ করতে পারে না।
শাইখুল ইসলাম রহিমাহুল্লাহ বলেন,
“নেতৃত্বের অভিলাষী ব্যক্তি —যদিও তা অন্যায় অভিলাষ হয়—এমন কথাই পছন্দ করে, যাতে তার বড়ত্বের আলোচনা রয়েছে, যদিও তা ভুল হোক না কেন। একইভাবে, এমন কথায় সে রেগে যায়; যে কথায় তাকে তিরস্কার করা হয়েছে, যদিও তা সত্য হোক না কেন। অপরদিকে মু’মিন ব্যক্তি সত্য কথা শুনে খুশি হন, চাই সে কথা তাঁর পক্ষে হোক কিংবা বিপক্ষে। একইভাবে তিনি ভুল কথা অপছন্দ করেন, চাই তা তাঁর পক্ষে হোক কিংবা বিপক্ষে। কারণ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সত্য-সঠিক ও ন্যায়কে পছন্দ করেন এবং অন্যায় অসত্যকে অপছন্দ করেন”।
[1] সূরা আল হুজুরাত; ৪৯ : ১
[2] সূরা আন নিসা; ৪: ৫৯
[3] সূরা আল আহযাব; ৩৩ : ৩৬
[4] সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২৫৫০, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৪৫৯০
[5] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ৪৫৮৯