আল হিকমাহ মিডিয়া পরিবেশিত
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- অষ্টাবিংশ পর্ব
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- অষ্টাবিংশ পর্ব
জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ: প্রতিষ্ঠা লাভের কার্যকরী পন্থা
জিহাদ
এটি একটি মৌলিকভিত্তি। একটি সুদৃঢ় স্তম্ভ। ইসলামের চির অমর সুবিশাল বৃক্ষের গভীরে প্রোথিত শিকড়। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ভাষ্য অনুযায়ী ‘জিহাদ দ্বীনের শীর্ষ চূড়া'। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় এবং সর্বাধিক প্রিয় আমল । এমনকি এটি ফরজ হয়ে গেলে অন্য কোনো আমল এর চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।
জিহাদ।
মুসলিম গৌরবের প্রতীক। মুসলিম অস্তিত্বের প্রতিভূ। এটি এমন এক শক্তিশালী হাত, যা সীমালংঘনকারী অহংকারীদের রক্ত প্রবাহিত করেছে আর মিথ্যা প্রভুত্বের দাবিদার পাষণ্ডদের শিকড় উৎপাটিত করেছে। যা জাহেলিয়াতের অন্ধকারে নিমজ্জিত, পথভ্রষ্টতার অগ্রপথিক উদভ্রান্তদের বখে যাওয়া অন্তরকে ভ্রান্তি থেকে উদ্ধার করে সুস্পষ্ট হকের দিকে পথ নির্দেশ করে। মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে কল্যাণ, হেদায়েত ও সুপথে পরিচালিত করে।
জিহাদ।
ইসলামের এক অমূল্য রত্ন। এর দ্বারা জাতি সঞ্জীবন লাভ করে। উন্নতি ও অগ্রগতির চূড়ান্ত শিখরে আরোহণ করে। একে ছাড়া জাতি হয়ে যায় নির্জীব। জীবনের কোনো স্পন্দন থাকে না। হিংস্র হায়েনা আর কুকুরের দল তখন জাতিকে ছিঁড়ে খুবলে খায়।
জিহাদ।
নবী-রাসূলদের সীরাত। তাঁদের অনুসারীদের পথ। তাদের উত্তরসূরীদের আলামত। কিয়ামত দিবস পর্যন্ত যত মানুষ তাঁদের পথ ও পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলতে চায়, জিহাদ হলো তাঁদের সকলের আমল।
জিহাদ।
শহীদ আব্দুল্লাহ আযযাম-এর ভাষ্য অনুযায়ী 'গৌরবের উৎস, সম্মানের কষ্টিপাথর, স্বচ্ছতার ফোয়ারা, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা থেকে উত্তরণে মানব জাতিসত্তার সহায়ক শক্তি।'
জিহাদের কথা উঠলেই তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে চলে আসে এর প্রথম কমান্ডার, মুজাহিদদের পথিকৃৎ ও আলোর পথের দিশারী মুহাম্মাদ ﷺ-এর পবিত্র নাম। তাঁর দীক্ষামূলক নিবিড় তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠেছে নবী রাসূল আলাইহিমুস সালামদের পর ভূপৃষ্ঠে সর্বশ্রেষ্ঠ একদল মানুষ। ঐশী শিক্ষায় উজ্জীবিত অনন্যসাধারণ এই প্রজন্ম যথাযোগ্যভাবে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছেন। তারা কিসরার অগ্নি উপাসকদের দর্প চূর্ণ করেছেন। কায়সারের ক্রুশ ভক্তদেরকে ধ্বংস করেছেন। তাঁরা হিন্দুস্তানের রাজা বাদশাদেরকে অপদস্থ করেছেন। শিরকের অনুসারীদের পতাকা ভূলুণ্ঠিত করেছেন। তাঁরা নিজেদের ত্যাগ-তিতিক্ষা, কষ্ট-মুজাহাদা, ন্যায়-নিষ্ঠা আর জিহাদের মাধ্যমে মানব গোষ্ঠীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। ইনশাআল্লাহ, আমরা তাঁদের আদর্শের প্রতি অবিচল থাকব। আমরা তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করব। আমরা তাঁদের পথের অনুসারী হব। আমরা তাঁদের পন্থার অনুগামী হব। এভাবে আমরা মানবজাতির সিংহাসনে আরোহণ করব। এবং ভূপৃষ্ঠে আল্লাহর খিলাফত প্রতিষ্ঠা করব। আর না হয় এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়ে দেব, ইনশা আল্লাহ।
আল্লাহর পথে জিহাদ ও শাহাদাতের ফজিলত
জিহাদ ও শাহাদাতের বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে এ দুটোর প্রকৃত স্বাদ পাওয়া মানব মনে এমন কিছু স্মৃতি ও বেদনার অবতারণা হয়, যার উষ্ণতা ভাষায় প্রকাশ করা মোটেই সহজ নয়।
জিহাদ নবী-রাসূলদের সীরাত। তাদের অনুসারী ও উত্তরসূরীদের পথ ও পন্থা। শাহাদাত তো খোদ মুহাম্মাদ ﷺ-এর কাঙ্ক্ষিত বস্তু। তাঁর সৌভাগ্যবান সাহাবাদের পরম কাঙ্ক্ষিত বিষয়। সালফে সালেহীন এবং কেয়ামত দিবস পর্যন্ত তাঁদের পথ ও পদাঙ্ক অনুসারী প্রত্যেকের আগ্রহের বস্তু।
কুরআনুল কারীম এ বিষয়ক ইলাহি রৌশনীতে ভরপুর, যা জিহাদের ফরজ দায়িত্ব পালনে মু’মিন বান্দার চেতনাকে উজ্জীবিত করে। এ সমস্ত ঐশী বাণী জান্নাতের উচ্চস্তরে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার মেহমান হবার উদগ্র বাসনা নিয়ে হত্যা ও শাহাদাতের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে মু’মিনকে অনুপ্রাণিত করে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে লড়াই ও হত্যার বিরাট প্রতিদান হিসেবে বিপুল পুরস্কার ও উত্তম আবাসস্থলের কথা জানিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে-
إِنَّ ٱللَّهَ ٱشْتَرَىٰ مِنَ ٱلْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَٰلَهُم بِأَنَّ لَهُمُ ٱلْجَنَّةَ يُقَٰتِلُونَ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِى ٱلتَّوْرَىٰةِ وَٱلْإِنجِيلِ وَٱلْقُرْءَانِ وَمَنْ أَوْفَىٰ بِعَهْدِهِۦ مِنَ ٱللَّهِ فَٱسْتَبْشِرُوا۟ بِبَيْعِكُمُ ٱلَّذِى بَايَعْتُم بِهِۦ وَذَٰلِكَ هُوَ ٱلْفَوْزُ ٱلْعَظِيمُ ﴿التوبة: ١١١﴾
‘আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মুসলিমদের থেকে তাদের জান ও মাল এই মূল্যে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাহে। অতঃপর মারে ও মরে। তওরাত, ইঞ্জিল ও কোরআনে তিনি এ সত্য প্রতিশ্রুতিতে অবিচল। আর আল্লাহর চেয়ে কে অধিক প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী কে? সুতরাং তোমরা আনন্দিত হও সে লেনদেনের ওপর, যা তোমরা তাঁর সাথে করছ। আর এ হলো মহান সাফল্য।[1]
আল্লাহ তা’আলা বসে থাকা লোকদের ওপর সত্যের অনুসারী, তাওহীদের প্রতিরক্ষাকারী, মহৎপ্রাণ এ সমস্ত লৌহমানবদের প্রাধান্য ঘোষণা করেছেন। তাঁদের জন্য ক্ষমা ও মহা প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে ইরশাদ করেন-
لَّا يَسْتَوِى ٱلْقَٰعِدُونَ مِنَ ٱلْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُو۟لِى ٱلضَّرَرِ وَٱلْمُجَٰهِدُونَ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ بِأَمْوَٰلِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فَضَّلَ ٱللَّهُ ٱلْمُجَٰهِدِينَ بِأَمْوَٰلِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ عَلَى ٱلْقَٰعِدِينَ دَرَجَةً وَكُلًّا وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلْحُسْنَىٰ وَفَضَّلَ ٱللَّهُ ٱلْمُجَٰهِدِينَ عَلَى ٱلْقَٰعِدِينَ أَجْرًا عَظِيمًا ﴿النساء: ٩٥﴾ دَرَجَاتٍ مِّنْهُ وَمَغْفِرَةً وَرَحْمَةً وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا ﴿النساء: ٩٦﴾
“মু’মিনদের মাঝে যারা কোনো রকম অক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও বসে থেকেছে, আর যারা নিজেদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহ তা’আলার পথে জিহাদে অবতীর্ণ হয়েছে – এরা উভয়ে কখনো সমান নয়; যারা জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করে, আল্লাহ তাদের পদমর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন গৃহে উপবিষ্টদের তুলনায় এবং প্রত্যেকের সাথেই আল্লাহ কল্যাণের ওয়াদা করেছেন। (কিন্তু এটা ঠিক যে,) আল্লাহ মুজাহিদদের বসে থাকাদের ওপর অনেক শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।এগুলো তাঁর পক্ষ থেকে পদমর্যাদা, ক্ষমা ও করুণা; আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়”। [2]
পক্ষান্তরে, কিছু লোক আছে, যারা ইহজগত ও তার চাকচিক্যকে আখিরাতের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। যারা নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, দেশ, গোত্র ও পরিবারের ভালোবাসাকে আল্লাহর ভালোবাসা, তাঁর রাসূলের ভালবাসা এবং জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ'র চেয়ে প্রাধান্য দেয়। কেবল দুনিয়ার জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে। তাদের ব্যাপারে তীব্র নিন্দা ও সতর্কবাণী উচ্চারণ করে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
قُلْ إِن كَانَ ءَابَآؤُكُمْ وَأَبْنَآؤُكُمْ وَإِخْوَٰنُكُمْ وَأَزْوَٰجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَٰلٌ ٱقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَٰرَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَٰكِنُ تَرْضَوْنَهَآ أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَجِهَادٍ فِى سَبِيلِهِۦ فَتَرَبَّصُوا۟ حَتَّىٰ يَأْتِىَ ٱللَّهُ بِأَمْرِهِۦ وَٱللَّهُ لَا يَهْدِى ٱلْقَوْمَ ٱلْفَٰسِقِينَ ﴿التوبة: ٢٤﴾
‘বলো, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় তোমরা করো এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ করো, আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর রাহে জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না’। [3]
রাসূলুল্লাহ ﷺ স্বশরীরে ২৮ টিরও অধিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। এমনকি যুদ্ধে তাঁর শিরস্ত্রাণ ভেঙে গেছে এবং তাঁর পবিত্র চেহারা মোবারক রক্তাক্ত হয়েছে। তিনি ﷺ যুদ্ধ করে নিহত হয়ে আবার জীবিত হয়ে আবার পুনরায় যুদ্ধ করে নিহত হয়ে, আবার জীবিত হয়ে পুনরায় যুদ্ধ করে নিহত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। তিনি জিহাদের ব্যাপারে এতোটুকু অবহেলা করেননি। তিনি জিহাদের আলোচনা করতে এবং এ বিষয়ে লোকদেরকে অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ করতে কখনোই পিছপা হতেন না। এমনকি মৃত্যুর সময়ও তিনি জিহাদের নির্দেশ দিয়ে বারবার বলছিলেন, “তোমরা উসামার বাহিনীকে পাঠিয়ে দাও।” নবীজি ﷺ-এর জন্য আমার পিতা ও মাতা উৎসর্গিত হোক!
জিহাদের গুরুত্ব ও ফজিলতের ব্যাপারে জ্ঞানগর্ভ হাদীসের সংখ্যা এত বেশি যে, তার সবগুলো এই স্থানে উল্লেখ করা এবং সেগুলোর ব্যাপারে মন্তব্য পেশ করার সুযোগ নেই। তাই আমরা বাহারি এই নববী বাগিচা থেকে টকটকে লাল কিছু ফুল কুড়াব। ইনশা আল্লাহ সেগুলো চেতনাকে উদ্দীপ্ত করবে, অনুভূতিকে জাগ্রত করবে এবং শাহাদাতের আশেক, তাওহীদের অনুসারীদের অন্তরে কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা প্রজ্জ্বলিত করবে। আর সেই আগ্রহ অনুপ্রেরণার পাখায় ভর করে তাঁরা রাসূলুল্লাহ ﷺ -র ডাকে সাড়া দিয়ে জিহাদের ময়দানে সবান্ধবে বা একাকী হাজির হবেন। তাঁরা বুঝতে পারবেন, এই দ্বীন এবং ইসলামী সমাজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজন রক্ত ঝরানোর আর সব রকম ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করার।আমাদের প্রত্যাশা এটিই।
আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত,
« قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّ النَّاسِ أَفْضَلُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُؤْمِنٌ يُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ قَالُوا ثُمَّ مَنْ قَالَ مُؤْمِنٌ فِي شِعْبٍ مِنْ الشِّعَابِ يَتَّقِي اللَّهَ وَيَدَعُ النَّاسَ مِنْ شَرِّهِ ».
এক ব্যক্তি নবীজি ﷺ-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, ‘মানুষদের মধ্যে কে সর্বোত্তম’? তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন, ‘এমন মু’মিন ব্যক্তি যে আল্লাহর রাস্তায় জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করে’। তখন লোকটি বলল, ‘অতঃপর কোন ব্যক্তি? তখন নবীজি বললেন, ‘এমন মু’মিন ব্যক্তি যে পাহাড়ের কোনো পাদদেশে অবস্থান করে আল্লাহকে ভয় করে চলে এবং লোকদেরকে নিজের অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা দেয়’। [4]
ইসহাক ইবনে আবু ফারওয়া বলেন, “নবুয়্যাতের স্তরের সবচেয়ে নিকটবর্তী হচ্ছে আহলে ইলম ও আহলে জিহাদ। আহলে ইলম রাসূলদের আনীত বিষয়ে লোকদেরকে অবহিত করে। আর আহলে জিহাদ রাসূলদের আনীত বিষয় প্রতিষ্ঠায় জিহাদ করে”।
ইবনে দাকিক আল ঈদ বলেন, “সাধারণ যুক্তির বিচার হলো: উপলক্ষ্যমূলক আমলসমূহের মাঝে জিহাদ সর্বোত্তম। কারণ, আল্লাহর দ্বীনের প্রচার প্রসার, কুফরি প্রতিরোধ এবং তা দূর করার মাধ্যম হচ্ছে জিহাদ। তাই এসব বিষয়ের গুরুত্ব অনুপাতে জিহাদের গুরুত্ব অধিক হওয়াটাই সাধারণ যুক্তির বিচার। আর আল্লাহ তা’আলাই ভালো জানেন!”
হাফেজ বলেন, “এটি মুজাহিদ ফি সাবিলিল্লাহ'র জন্য একটি সুস্পষ্ট ফজিলতের বিষয় যে, জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ'র সমপর্যায়ের আর কোনো আমল নেই।”
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি ﷺ বলেছেন,
«مَا مِنْ أَحَدٍ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ يُحِبُّ أَنْ يَرْجِعَ إِلَى الدُّنْيَا وَإِنَّ لَهُ مَا عَلَى الْأَرْضِ مِنْ شَيْءٍ غَيْرَ الشَّهِيدِ فَإِنَّهُ يَتَمَنَّى أَنْ يَرْجِعَ فَيُقْتَلَ عَشْرَ مَرَّاتٍ لِمَا يَرَى مِنْ الْكَرَامَةِ».
“জান্নাতে প্রবেশের পর একমাত্র শহীদ ছাড়া আর কেউ দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্খা করবে না, যদিও দুনিয়ার সকল জিনিস তাকে দেওয়া হয়। শহীদ পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্খা করবে। শাহাদাতের মর্যাদা দেখতে পেয়ে সে আরো দশবার শহীদ হওয়ার কামনা করবে।”[5]
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ يَعْدِلُ الْجِهَادَ؟ قَالَ : (( لاَ أجِدُهُ )) ثُمَّ قَالَ : (( هَلْ تَسْتَطِيعُ إِذَا خَرَجَ المُجَاهِدُ أنْ تَدْخُلَ مَسْجِدَكَ فَتقومَ وَلاَ تَفْتُرَ ، وَتَصُومَ وَلاَ تُفْطِرَ )) ؟ فَقَالَ : وَمَنْ يَسْتَطِيعُ ذَلِكَ ؟! .
‘এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে বলল, ‘আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলে দিন, যা জিহাদের সমপর্যায়ের হবে! তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, ‘আমি এমন কোনো আমল খুঁজে পাইনা’। অতঃপর তিনি ইরশাদ করেন, ‘তুমি কি এমনটা পারবে যে, মুজাহিদ যখন ঘর থেকে বের হবে, তখন তুমি মসজিদে প্রবেশ করে বিরামহীনভাবে নামায আদায় করবে এবং বিরামহীনভাবে রোযা রাখতে থাকবে?’ তখন লোকটি বলল, ‘এটা আবার কে পারবে”? [6]
ইমাম বুখারী বর্ণিত অপর একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন,
«إِنَّ فِي الْجَنَّةِ مِائَةَ دَرَجَةٍ أَعَدَّهَا اللَّهُ لِلْمُجَاهِدِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ مَا بَيْنَ الدَّرَجَتَيْنِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ فَإِذَا سَأَلْتُمُ اللَّهَ فَاسْأَلُوهُ الْفِرْدَوْسَ فَإِنَّهُ أَوْسَطُ الْجَنَّةِ وَأَعْلَى الْجَنَّةِ أُرَاهُ فَوْقَهُ عَرْشُ الرَّحْمَنِ وَمِنْهُ تَفَجَّرُ أَنْهَارُ الْجَنَّةِ».
“জান্নাতে একশটি স্তর রয়েছে যেগুলো আল্লাহ তা’আলা তাঁর পথের মুজাহিদদের জন্য প্রস্তুত করেছেন। প্রতি দুইটি স্তরের মাঝে আসমান ও জমিনের ব্যবধান। অতএব, যখন তোমরা আল্লাহর কাছে চাইবে তখন ফেরদৌস চাও। কারণ তা হলো জান্নাতের মধ্যভাগ এবং সর্বোচ্চ স্তর। বর্ণনাকারী বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে রাসূলুল্লাহ আরো বলেছেন, ‘তার ওপর রয়েছে রহমানের আরশ এবং জান্নাতের নদ-নদী তা থেকেই প্রবাহিত”। [7]
মাসরুক থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘আমরা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি—
وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ ﴿آلعمران: ١٦٩﴾
‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদের তোমরা কোনো অবস্থাতেই ‘মৃত’ বলো না, তারা তো জীবিত, তাদের মালিকের পক্ষ থেকে তাদের রিযিক দেওয়া হচ্ছে’।[8]
এ বিষয়ে আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “তাদের রূহ একটি সবুজ পাখির ভেতর থাকে। আরশের সঙ্গে লটকে থাকা রুমালের মাঝে তা অবস্থান করে। তাঁরা জান্নাতের যেখানে ইচ্ছা সেখানে উড়ে বেড়ান। অতঃপর সে সমস্ত রুমালে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তখন তাঁদের রব তাঁদের প্রতি আরো অধিক মনোনিবেশ করেন। তিনি বলেন, ‘তোমাদের কোনো কিছুর ইচ্ছা আছে’? তাঁরা বলেন, আর কিসের ইচ্ছা থাকবে, আমরা তো জান্নাতের যেখানে ইচ্ছা সেখানে উড়ে বেড়াচ্ছি’? তখন আল্লাহ তা’আলা তিনবার তাঁদেরকে এভাবে জিজ্ঞেস করেন। তাঁরা যখন দেখেন, কিছু না চাওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তাঁদেরকে ছাড়বেন না, তখন তারা বলেন, ‘হে আমাদের রব! আপনি আমাদের দেহে আমাদের রূহ ফিরিয়ে দিন, যাতে আমরা আরেকবার আপনার পথে নিহত হতে পারি। আল্লাহ তা’আলা যখন দেখেন- তাঁদের কোনো প্রয়োজন নেই, তখন তাঁদেরকে ছেড়ে দেন।”
মিকদাম ইবনে মা'দিকারাব আল কিন্দি থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,
« إِنَّ لِلشَّهِيدِ عِنْدَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ قَالَ الْحَكَمُ سِتَّ خِصَالٍ أَنْ يُغْفَرَ لَهُ فِي أَوَّلِ دَفْعَةٍ مِنْ دَمِهِ وَيَرَى قَالَ الْحَكَمُ وَيُرَى مَقْعَدَهُ مِنْ الْجَنَّةِ وَيُحَلَّى حُلَّةَ الْإِيمَانِ وَيُزَوَّجَ مِنْ الْحُورِ الْعِينِ وَيُجَارَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَيَأْمَنَ مِنْ الْفَزَعِ الْأَكْبَرِ قَالَ الْحَكَمُ يَوْمَ الْفَزَعِ الْأَكْبَرِ وَيُوضَعَ عَلَى رَأْسِهِ تَاجُ الْوَقَارِ الْيَاقُوتَةُ مِنْهُ خَيْرٌ مِنْ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا وَيُزَوَّجَ اثْنَتَيْنِ وَسَبْعِينَ زَوْجَةً مِنْ الْحُورِ الْعِينِ وَيُشَفَّعَ فِي سَبْعِينَ إِنْسَانًا مِنْ أَقَارِبِه ».
“আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে শহীদের জন্য বিশেষ কিছু মর্যাদা রয়েছে (এগুলো হচ্ছে) তাঁর রক্তের প্রথম ফোঁটা পড়ার আগেই তাঁকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। জান্নাতে তাঁর স্থান তাঁকে দেখিয়ে দেয়া হয়। তাঁকে জান্নাতের পোশাক পরিধান করানো হয়, কবরের আযাব থেকে তাঁকে পরিত্রাণ দেয়া হয় এবং মহাবিপদের ভয়াবহতা থেকে তাকে নিরাপত্তা দেয়া হয়।তাঁর মাথায় সম্মানের এমন মুকুট পরানো হয়, যার একটি ইয়াকুত পাথর দুনিয়া এবং তদস্থলে যা কিছু রয়েছে সব কিছুর চাইতে উত্তম, ডাগর চোখ বিশিষ্ট ৭২ টি হুরকে তাঁর কাছে বিয়ে দেয়া হয়। তাঁর আত্মীয় স্বজনের মাঝে ৭০ জনের ব্যাপারে তাঁকে মকবুল সুপারিশের অধিকার দেয়া হয়।”[9]
আকীদাহ ও দ্বীনের বন্ধনে আবদ্ধ হে ভাই! আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করতে আগ্রহী হে মু’মিন! তুমি অগ্রসর হও। সত্যি যদি আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করতে তুমি আন্তরিক হয়ে থাকো, তবে কোনকিছুর পরোয়া করো না। তোমার রবের সন্তুষ্টি অর্জনে, জান্নাতুল ফেরদাউসের সুউচ্চ মর্যাদা লাভে, মুজাহিদদের জন্য প্রস্তুতকৃত জান্নাতি নেয়ামত অর্জনে যদি তুমি ব্যাকুল হয়ে থাকো, তবে কারো কথায় কান দিও না।
[1] সূরা আত-তওবা; ০৯: ১১১
[2] সূরা আন-নিসা; ০৪: ৯৫-৯৬
[3] সূরা আত-তওবা; ০৯: ২৪
[4] সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৬৩৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ৪৯৯৫
[5] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৪৯৭৬
[6] সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২৬৩৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৪৯৭৭
[7] সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৬৩৭
[8] সূরা আলে ইমরান; ০৩: ১৬৯
[9] মুসনাদে আহমাদ. হাদীস নং- ১৭১৮২